সাদিয়া নাজিব
সহকারী সম্পাদক
বাংলাদেশ

বাংলাদেশের নারীর অবস্থান

সকল শক্তির আধার নারী হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বের সকল নারীরই নিজেকে ‘ মানুষ ‘ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এখনো সংগ্রাম করে যেতে হচ্ছে।প্রতিষ্ঠিত কিছু আবেগের চক্রে নারী জীবন বন্দী। রূপ বন্দনা, মমতাময়ী, অপ্সরা ইত্যাদি শব্দগুলো নারীর কোষে কোষে ছড়িয়ে দিয়েছে শৃঙ্খল। নারী ও তাই এইসব শব্দে আশ্রয় নিয়ে অজান্তেই দুর্বল ও ব্যক্তিত্বহীন করে তুলেছে নিজেকে, বিপন্ন করেছে জীবন। নারীর এই অধোগামী চিন্তা ভাবনা মূলত পুজিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো, শ্রেণিবিভাজন এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের উপহার। যার খেসারত প্রতিটি পলে পলে নারীকেই দিতে হচ্ছে।অথচ যদি ধর্মগ্রন্থে আমরা নারীর অবস্থান খুঁজতে যাই, তাহলে দেখতে পাই সেখানে তার অবস্থান কতোটা উচ্চে।যদিও প্রচলিত সমাজ নারীকে করেছে পণ্য এবং কোনঠাসা।
ঋগবেদে দেবীসূক্ত নারী শক্তিকে মহাবিশ্বের সারমর্ম হিসেবে ঘোষণা করেছে।সূক্তটি নারীকে পদার্থ ও চেতনা, চিরন্তন ও অসীম, ব্রম্ম ও আত্মা হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিছু হিন্দু উপনিষদ, শাস্ত্র ও পুরাণ বিশেষত দেবী উপনিষদ, দেবী মাহাত্ম্য ও দেবীভাগবত পুরাণে নারীকে সবচেয়ে শক্তিশালী ও ক্ষমতায়নকারী শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইসলামে পুরুষ ও নারীদের আল্লাহর কাছে সমান মর্যাদার অধিকারী বলে বিবেচনা করে এবং কুরানে উল্লেখ রয়েছে যে, পুরুষ ও নারী ‘ একক আত্মা থেকে সৃষ্টি( ৪.১, ৩৯.৬) এবং অন্যান্য স্থানে।
বাংলাদেশের মুসলিম এবং হিন্দু দুটি ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে এই দুই ধর্মে নারীর অবস্থান কি তা নিয়ে আলোকপাত করা হলো।তবে সমগ্র বাংলাদেশে নারীর অবস্থানের দিকে দৃষ্টিপাত করলে যে চিত্রটি আমরা পাই তা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।
আর্থসামাজিক অবস্থান ভেদে নারীর কিছু অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেলেও বৃহদাংশে নারী এখনো মানুষ নামক মর্যাদা টি অর্জন করতে পারে নি।প্রাচীন বাংলার নারীদের চেয়ে বর্তমান নারীরা বহুক্ষেত্রেই চিন্তা ভাবনায় অগ্রসর হলেও বাস্তব জীবনে তার পরিস্ফুটন সেভাবে ঘটেনি।
এখনো যৌতুকপ্রথা, বাল্যবিবাহ, অশিক্ষা, কুসংস্কার নারীকে বন্দী করে রেখেছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর নিজের মতামত প্রকাশ করার ক্ষেত্র এখনো কন্টকযুক্ত।যদিও আলোর দিশারি হিসেবে অবিভক্ত বাংলার একজন উদ্যমশীল লেখক এবং সমাজকর্মী হিসেবে বেগম রোকেয়াকে স্মরণ করা হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলাদেশের নারীকে বীরের মর্যাদা দিয়েছে। বর্তমানে রাজনৈতিক নারীর অভ্যুদয় এবং আর্থসামাজিক জীবনে নারীর অবাধ অংশগ্রহণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাস্তার ইটভাঙা শ্রমিক নারী,গার্মেন্টস শ্রমিক নারী, গৃহকর্মী নারী এমনতর বিচিত্র পেশায় নারী এলে ও সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে প্রতিটি শ্রেনী পেশার নারীই চিরাচরিত বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।আসলে নারী এখনো নিজেই নিজের কাছে বড্ড অচেনা। নারী কি চায়, কিসে তার জয় কিসে তার আনন্দ এমনকি কি তার প্রয়োজন তা ই এখনো তার কাছে পরিস্কার নয়।কন্যা, জায়া,জননী এই তিনটি মিলে একটি এককস্বত্তা নারী প্রকৃতিরই আরেক রূপ।নারীর মেধা বুদ্ধি কর্মশক্তি, সৃজন সমস্ত কিছুই নারীকে সমৃদ্ধ করেছে।এই পরিপূর্ণতা নিয়ে নারী অগ্রগামিনী না হলে পৃথিবী ও অগ্রসর হবে না।
মানুষ হিসেবে মর্যাদা টি পেতে হলে তাই যে হাতিয়ার টি সর্বাগ্রে প্রয়োজন তা হল শিক্ষা।একজন সুশিক্ষিত নারীই পারে সুন্দরী, রূপসী, ললনা অপ্সরা ইত্যাদি বিশেষণের লোভ থেকে বের হয়ে নিজেকে পণ্য না বানিয়ে মানুষরূপে মর্যাদাশীল হতে।
বাংলাদেশের নারী ‘ না’ শব্দটি বলতে শিখুক। সাহস অর্জন করুক হ্যাঁ এবং না বলতে পারার।এই দুটো শব্দের সঠিক প্রয়োগ বদলে দিতে পারে নারীর জীবন।
‘ বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টির চিরকল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’
এটিই চিরসত্য।জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমানতালে পা ফেলে গড়তে হবে সুন্দর আগামী।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending