কবি বন্ধু ফকির ইলিয়াসের আজ জন্মদিন। ফকির ইলিয়াসের সাথে পরিচয় সেই আশির দশক থেকে, তবে আমাদের আত্মিক সম্পর্ক আরো বেশি আন্তরিক হয়ে উঠে শিকড়কে কেন্দ্র করে। শিকড়ে আরেক প্রাণপুরুষ কবি ফকির ইলিয়াস, প্রকাশনার শুরু থেকে তিনি সম্পৃক্ত আছেন আমাদের সাথে। সেই নব্বুইয়ের দশক এবং শূন্যদশকে আমাদের যোগাযোগ ছিলো নিয়মিত। যা এখন জীবনের ব্যস্ত পরিক্রমায় অনেকটা কম হয়ে গেছে। তবে ফেইসবুক আর শিকড় নিয়ে আমাদের যোগাযোগ অনেকটাই প্রাণবন্ত আছে।
কবিকে জানার সুযোগ হয়েছে সেই আশির দশকের প্রথম দিকেই, সিলেটের সাহিত্যকেন্দ্রিক বন্ধু বান্ধবদের আড্ডায়। তবে বিশেষ করে বাংলাদেশ বেতারের সিলেট কেন্দ্র থেকে কবির গান প্রায়ই বাজতো। তখন গীতিকার হিসাবেই তাঁর খ্যাত্যিরব্যাপ্তি। তারপর ধীরে ধীরে এক সময় তিনি নিজেকে জড়িয়ে নিলেন কবিতা এবং সাংবাদিকতায় এবং তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন সার্থক কবি হিসাবে।
ফকির ইলিয়াস বাংলা সাহিত্যে বর্তমান সময়ের একজন শক্তিশালী কবি। সমানভাবে তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, গল্প এবং সাংবাদিকতায় রেখে যাচ্ছেন তাঁর মানগত খ্যাতি। তিনি একজন আধুনিকতাবাদী কবি, যার সাহিত্যকর্মে মানবজীবনের গভীরতম অনুভূতি, দার্শনিক চিন্তাভাবনা এবং সামাজিক বাস্তবতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত। যার ফলশ্রুতিতে তিনি বাংলা সাহিত্যে একটি বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন।
ফকির ইলিয়াসের লেখায় উত্তরাধুনিক ধারার বৈশিষ্ট্য বহন করে। তিনি প্রচলিত কাঠামো এবং চেতনার বাইরে গিয়ে সাহিত্যের নতুন রূপ ও কাঠামো নির্মাণ করেছেন। উত্তরাধুনিক সাহিত্য যেখানে বহুমুখী অর্থবোধ, জটিলতা, এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, ফকির ইলিয়াস সেখানেই পাঠককে নিয়ে যান একটি ভিন্ন জগতে। তার লেখায় সমাজের প্রচলিত ধারণা ও মূল্যবোধের প্রতি একধরনের বিদ্রোহ লক্ষ্য করা যায়।
ফকির ইলিয়াস বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিভাবান লেখক, যিনি তার সাহিত্যকর্মে একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা অব্যাহত রাখছেন। তার রচনায় গভীর সমাজচেতনা, দর্শন, এবং কল্পনার মিশ্রণে পাঠককে চমকপ্রদ কাব্য উপহার দিয়ে আসছেন। ফকির ইলিয়াসের উত্তরাধুনিক, বাস্তববাদ কাব্যকর্ম বাংলা সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ অংশ, যা সমকালীন সাহিত্যপ্রেমীদের ভাবনার গভীরে পৌঁছাতে সাহায্য করে। তবে তাঁর কবিতায় পরাবাস্তবতার স্পর্শ বা কিছুটা প্রভাব আছে, তাঁর লেখায় মাঝে মধ্যে তিনি গভীর স্বপ্নময় এবং রহস্যময় চিত্র আঁকার চেষ্টা করেন। এখানে চেনা, অচেনা, যুক্তি, অযুক্তি অথবা বাস্তব, অবাস্তব মিলে যায়। তার কাব্যে, প্রকৃতি, মানুষ এবং তাদের ভেতরের অবচেতন ভাবনাগুলোর এক মনোমুগ্ধকর মিশ্রণ দেখা যায়। তার কবিতায় সময়ের গভীর ক্ষত, মানবিক যন্ত্রণা, এবং অস্তিত্বের সংকট অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রতিফলিত হয়। লেখাগুলোতে অলৌকিক বা রূপকধর্মী ইমেজ ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি সমাজের নিগূঢ় সত্য তুলে ধরেন।
ফকির ইলিয়াসের সাহিত্যকর্ম শুরু হয় গীতিকবিতা দিয়ে। তবে পরবর্তীতে তিনি আধুনিক কবিতা, গল্প এবং প্রবন্ধে নিজের প্রতিভার প্রকাশ ঘটান। তাঁর রচনার সংখ্যা বর্তমানে ২৪টির বেশি। প্রকাশনার যাত্রা শুরু গীতিকাব্য বাউলের আর্তনাদ দিয়ে, গ্রন্থটি আশির দশকে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে গ্রামবাংলার বাউল ও মরমী ধারা ফুটে উঠেছে। তারপর প্যারিস সিরিজ ও অন্যান্য কবিতা, এটি তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ, যেখানে আধুনিক জীবন ও ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা প্রতিফলিত হয়েছে। শহীদ কাদরীর দরবারের দ্যুতি, এটি একটি প্রবন্ধ সংকলন, যা শহীদ কাদরীর সাহিত্যকর্ম নিয়ে লেখা। তাঁর লেখা উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম মেঘাহত চন্দ্রের প্রকার, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ, সংগ্রাম ও মানবিক দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মানচিত্র ও স্বাধীনতার উত্তরাধিকার, একটি প্রবন্ধগ্রন্থ, যা সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজের বিশ্লেষণমূলক বিবরণ প্রদান করে।
ফকির ইলিয়াসের কাব্যে প্রায়ই সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। তার লেখার ভাষা কাব্যিক হলেও তাতে একধরনের গতিশীলতা ও আবেগের অস্থিরতা বিদ্যমান। বিশেষ করে তাঁর সাহিত্যকর্মে গ্রামবাংলার প্রকৃতি, মানুষের আবেগ এবং আধুনিক জীবনের দ্বন্দ্ব এক অনন্য রূপ পেয়েছে। তাছাড়াও যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে লক্ষণীয় তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মানবতাবাদী দর্শন, সমকালীন চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ, এবং বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে তিনি গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর রচনায় মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার মূল্যবোধ সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তিনি বরাবর আপোষহীন, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এবং বিপ্লবী চেতনা।
ফকির ইলিয়াস সাহিত্যকর্মের জন্য পেয়েছেন অনেক সম্মাননা তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য, ফোবানা সাহিত্য পুরস্কার ও ঠিকানা শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ পুরস্কার।
ফকির ইলিয়াস দীর্ঘদিন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। প্রবাসে বসবাস করেও বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রয়েছেন। তিনি প্রবাসী লেখকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। সাংবাদিক হিসেবে তিনি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখা লিখে আসছেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে এবং তিনি নতুন প্রজন্মের লেখকদের জন্য একটি প্রেরণার জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। সর্বোপরি কবি ফকির ইলিয়াস বাস্তব্বাদ ও মুক্তচিন্তার কবি সাথে সাথে তাঁর কাব্যসৃষ্টির গভীর রয়েছে দার্শনিকতা, সমাজচেতনা এবং উত্তরাধুনিক ভাবনার প্রতিফলন।
ফকির ইলিয়াস ১৯৬২ সালের ২৮ ডিসেম্বর, সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন।
কবির জন্মদিনে শিকড় পরিবারের পক্ষ থেকে অভিনন্দন ও শুভ কামনা। শুভ জন্মদিন, কবি।
কবি ফকির ইলিয়াসের কবিতা
মার্বেল পাথরের মন
গুলিগুলো কাচের নাকি সিসার-তা জানতে জানতেই
আমরা পেরিয়ে যাই ঝাড়খণ্ড।
সামনেই জামশেদপুর,
কিছু ঘুড়ি আকাশে উড়ছে তার স্বাধীনতা নিয়ে,
কিছু মানুষ মিছিল করছে অন্য প্রদেশে, অন্য এক মোমবাতি
হাতে বসে আছেন বিধবা নারী, পুলিশের গুলিতে বিক্ষত
স্বামীদেহ পাশে নিয়ে।
এমন আগ্রাসন এই ভূখণ্ডে আগে ছিল না।
এমন অরাজকতার লালচোখ,
এর আগে দেখেনি এই ভূমির মানুষ।
তারপরও বৈষম্য আর বিবাদের মার্বেল ছুড়ে যারা,
করতে চাইছে ধর্মরাজনীতি-
এরা কি পড়েনি মহাত্মার অহিংস নীতি?
এরা কি দেখেনি রায়টের কালোরাত?
মানুষের মনের দিকে তাকাতে আর
ইচ্ছে করে না আমার।
বরং যে মার্বেল পাথরগুলোই ভেদ করছে
মানুষের বুক, ওদের দিকে তাকাই।
পাতাগুলো জলে ভাসে, খুব গোপনে একাই কাঁদে মধুগঙ্গা নদী।
গল্প বলার কাল
কিছু কিছু বৃষ্টি মানুষের মাথার ওপর ছাতা
এগিয়ে দেয়। কিছু কিছু ঝড় মানুষকে খুব
কাছাকাছি সমবেত করে।
বৃষ্টিকে আমি যেদিন আগুনের ট্রেনে তুলে
দিয়েছিলাম; সেদিনই ভেবেছিলাম এই শহরে
আর যেন বর্ষা না আসে। আর যেন কেউ
না শোনে শ্রাবণের থৈ থৈ আওয়াজ।
অথবা বলা যায়— যে ফাগুন মাথায় নিয়ে আগুনে
ঝাঁপ দিয়েছিল বসন্ত, সে রাতেও আকাশ
ধারণ করেছিল শ্বেতবর্ণ। কোথাও কোনো
নক্ষত্র ছিল না। কোথাও ছিল না কোনো
দোয়েলের শিস।
আমি গল্প বলার কাল অনেক আগেই
পেরিয়ে এসেছি। তারপরও লিখে রাখি—
ছাতা ও ছত্রাকের গল্প
বই ও বৈভবের গল্প
বৃষ্টি ও বিষণ্নতার গল্প
কারণ,
মানুষ গল্প ছাড়া কিছুই বলতে পারে না।
আঙুলের অগ্নিচিহ্ন
পাতার কিরণ বুকে নিয়ে ছুটে চলা একদল
মানুষ;অথবা প্রবীণ দুপুর জড়িয়ে বয়ে চলা
কয়েকটি নদীর গল্প আমি যতবার তোমাকে
শোনাতে চেয়েছি,
ততবারই তুমি আনমনা হয়ে গিয়েছ, আর
বলেছ,- থাক ওসব কথা। পাতার আড়ালে
যে কীট, কিংবা নদীতে লুকিয়ে থাকা যে কুমীর-
ওরাই তো একদিন হত্যা করেছিল পিতাকে,
ওরাই একদিন বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা করেছিল,
বাংলাদেশের বুক!
অবিশ্বাসী আকাশের ছায়ায় দাঁড়িয়ে
এখন আমি আর গল্প বলি না।
বরং তাঁর আঙুলের অগ্নিচিহ্ন দেখে,
যে কিশোর আবারও বলে ওঠে
‘ জয় বাংলা ‘-
আমি তার জন্যে পথে পথে রোপণ
করে যাই বৃক্ষ,
পুঁতে রাখি লালগোলাপের শিকড়,
অনন্ত কাল ধরে যে পুষ্প আলো ছড়াবে,
যে পাখি গানে গানে গাইবে,
শেখ মুজিবের কীর্তি-বন্দনা।
পৃথিবীর পশ্চিম দুয়ার
শব্দের কোনো ঘ্রাণ নেই,
ঢেউয়ের বর্ণ কেমন-
তা জানতে চেয়ে যখন তোমার চোখের দিকে
তাকাই; তখন একটি প্রবীণ বটবৃক্ষের ছায়া-
আমাকে বলে,
তোমার একটি ছাতার প্রয়োজন, কবি!
ঝড়থেরাপি
কয়েকটি দীর্ঘ রাতের দেহ দিয়ে তুমি সাজাচ্ছো
বিজলীর ঘর। নিচ্ছো, ঝড়থেরাপি।
দেখে আমারও পরিশুদ্ধ হতে ইচ্ছে করছে খুব- এই নীল
জমিনের গায়ে হাত রেখে বলতে ইচ্ছে করছে-
এই পথ দিয়ে আর কোনো পথিক মাড়ায়নি বৃহস্পতির পথ।
জানি বিজলীরা বহুগামী হয়।
লিখিত নক্ষত্রের দূরে যে চোখ সারারাত জেগে থাকে,
তার ভালোবাসায় পুষ্ট হয় আষাঢ়ের আলো।
চমকানো চাঁদের ছায়ায় সেই আলো
নিরীক্ষণ করে বিরহী মেঘমালা।
আর একক দেবত্ব দেখাতে দেখাতে সমুদ্র
বিশ্বের সবটুকু জল কাছে ডেকে নেয়।
শুধু অবশিষ্ট থেকে যায় অশ্রুর অমরতা।
আমরা অশ্রুর আরাধনায় বার বার সিদ্ধিলাভ চেয়েছি।
ঝড় তখন আমাদেরকে আলিঙ্গন করে
ফিরে গেছে অনন্তের উত্তর প্রদেশে।যাযাবরদের
কোনো ছাদ থাকে না,
থাকে না নির্দিষ্ট কোনো আনন্দ,
পৃথিবীর পশ্চিম দুয়ার যখন আমাকে স্বাগত জানিয়েছিল,
তখনই বুঝেছি,
তোমার জন্ম হয়েছিল আমার জন্য!
আর দশদিক ভরা গোলাপগুলো ছিল
আমাকে দেয়া তোমার ছায়ানন্দ।
ফিলিস্তিন
এই ভূমিতে লুটিয়ে পড়া শিশুদের মাথার খুলি
পাথর হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই!
যে পাখিটি সিরিয়া থেকে উড়ে এসেছিল—
একটি পা হারিয়ে সে’ও এখন আর নির্বাক
তাকায় না আকাশের দিকে!
গাজা উপত্যকার আনাচে কানাচে যে গোলাপগুলো
তুমি দেখছ—
তা’তে লেগে আছে বিধবার সর্বশেষ রক্তের দাগ!
সাদা ভবনটির লনে দাঁড়িয়ে চার বছর পর পর
খুনির আসন বদল করে যারা,
তারাও জানে ফিলিস্তিনী শিশুরা বুলেটবিদ্ধ হয়েও
ছুঁড়ে দেয় একটুকরো ওজনদার পাথর—
যা বিদ্ধ হয় দখলদারদের বুকে!
এভাবেই কেটে যাচ্ছে প্রায় পাঁচ দশক!
এভাবেই অকালে মৃত্যুর জন্য জন্ম নেয়া
হে শিশু-কিশোর, তোমাদের বলি—
বিশ্বের তথাকথিত মানবতাবাদীর মুখে তোমরা
ভার্চুয়াল প্রস্রাব করে দাও,
ওরা ভেসে যাক—
ওরা দেখুক— নিজ মাতৃভূমি হারা মানুষেরা
কী আর্তনাদ লুকিয়ে রেখে যাচ্ছে,
উদ্বাস্তু সূর্যঘেরা তাঁবুর নীচে!
পৃথিবীর প্রথাসূত্র
প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে আমি দেখি,
অনেক আগেই ভেঙে গেছে আমার পাঁজর।
যে শিরদাঁড়া উঁচু করে দাঁড়াবার কথা ছিল,
সেই মেরুদণ্ডে জমাট হয়ে আছে দূষিত রক্ত।
আর পিপাসার নদীপাড়ে অপেক্ষমান বুনো দোয়েলগুলো
নরম মাটিতে আঁচড় কাটতে কাটতে রেখে গেছে
নিজেদের পদছাপ। এই ছাপ দেখে শিকারের জাল গুটিয়ে
নিচ্ছে ভীতু শিকারি। যে কিশোর দুচোখে জীবনের রঙিন স্বপ্ন
নিয়ে পাথর ভাঙে, আমি তার কাছেই শিখতে চেয়েছি ভাঙনের প্রথা।
যে তরুণী ধর্ষিতা পরিচয় গোপন করে এখন সেলাই কল চালায়-
তার মুখেই আমি শুনতে চেয়েছি বিবর্তনের নতুন বয়ান।
নিজে কিছুই পারিনি বলে, রচিত বৃষ্টির গায়ে হাত দিয়ে
আমি পেতে চেয়েছি জলের স্পর্শ।
আর ভিজে যাওয়ার আগে ভোরের সুর্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
পড়তে চেয়েছি পৃথিবীর প্রথাসূত্র।
যে প্রথায় মানুষ আজীবন ভালোবাসার দাস হয়ে থাকে।
যুদ্ধাহত জীবনের গান
আহত কোকিল উড়ে যায়। তার পালকে যে রক্ত লেগে আছে, তা একজন মুক্তিযোদ্ধার।
ডিসেম্বরের এক ভোরে তাঁর আহত দেহটি পড়েছিল আখাউড়া জংশনে। বুলেটের সীসা,
অতিক্রম করেছিল পাখি ও মানুষের শরীর।
সেই মুক্তিযোদ্ধা সাদেক আলি আজও বেঁচে আছেন। বেঁচে নেই কোকিল’টি আর। অনেক
আগেই বিগত হয়েছে পাখিটির ডানার ঝাপটা।এই মাটিতে মিশে গেছে পালকের ভগ্নাংশ।
সাদেক আলি বিষয়টি নিয়ে খুব ভাবেন। যে নদীগুলোতে একদিন বয়েছিল শহিদের রক্ত,
কিংবা যে বৃক্ষগুলোতে একদিন উড়েছিল স্বাধীন বাংলার পতাকা- সেই নদীগুলো আজ
কেমন আছে ? কেমন আছে বৃক্ষগুলো ? ওরা বেঁচে আছে কি ?
যুদ্ধাহত জীবনের গান গেয়ে সাদেক আলি একহাত দিয়ে একতারা বাজান। কেউ তাঁকে
দু’টো টাকা দেয়। কেউ দেয় না। তারপরও এই আখাউড়া জংশনই তাঁর প্রিয় চারণভূমি।
ট্রেন আসে- ট্রেন যায়। তিনি যাত্রীদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের
স্বাধীনতা উপভোগ করেন কয়েকবিন্দু অশ্রুর আলোতে।
পথমেরু
কাঙ্খে কলসি নিয়ে জলভরণে যাবার আগে শিখে নিও
জলভাষা। বকুল কুড়াতে যাবার আগে জেনে নিও কণ্টকের
রাগ। বিরাগে অবিভূত হলে জীবন চিনে নেয় উজান বাতাসের
ঋজুতা। ঢেউ তখন খেলে যায় পৃথিবীর প্রথম প্রণয়ে।
মাটির রশ্মি দেখে খুঁজে নিও পথমেরু। এ প্রান্তরে কতো
মহান মাঝি বেয়েছিল নাও, একটু সহজ ব্যাসার্ধে – পাও
কী না তাদের পদছাপ, তা- ও নিরখিও নয়ন আলোয়।
শূন্য করে পিঞ্জর ছেড়ে যাবার আগে, শিকলের প্রতিটি ফলায়
রেখে যেও আঁচড়। জলরেখাগুলো যেনো তা নিয়ে বাঁচতে পারে।
গৃহীত উত্তরের রঙ
মেঘের আলোয় লুকিয়ে রাখি মেঘালয়।
অনাদি ঈশ্বর এসে ঢেকে দেবেন আমাদের কামঘুম,
সে প্রত্যয় নিয়ে গুণি প্রহর। বুঝে, না বুঝে আমরা
যারা খেলি প্লাস-মাইনাস খেলা,
তাদের সমবেত তাঁবুতে ছিটাই কুয়াশামন।
সংগ্রহ শেষ হলে পাঠিয়ে দেবো তোমার ঠিকানায়।
লোগো দেখে তুমি তা যুক্ত করে নিতে পারবে তোমার ডেস্কটপে।
তারপর ম্যাচমেকিং করে দূর আকাশের রঙের সাথে
মিলিয়ে নিতে পারবে গৃহীত উত্তরের রঙ।
চাইলে ডিলিট ও করতে পারবে।
তবে বলি, তার আগে শিখে নিও ‘সেভ ইয়র সোল’।
এ্যাটাচম্যান্ট করে পাঠিয়ে দিও অন্য কারো কাছে। যে জন যতনে
শিলং শহরে …
কজন অনিমিতা দেবরায়ের খোঁজে দিবানিশী ঘুরে।
ভার্চুয়াল জোছনার গল্প
কিছুটা গৌরবগরজ নিয়ে আছি।
কিছুটা রক্তাক্ত রাতের শরীরে মিশিয়ে শরীর।
এভাবে থেকে যেতে হয়।
বিনয়ের কবিতা পড়ে শিখেছি বিনয়।
আর শক্তির কাছ থেকে ধার নিয়ে শক্তি,
খুঁজেছি নির্জনতার ছায়া।
শনাক্ত করতে পারলে বুঝা যায় ঝড়ভাষা।
দৃষ্টির দিগন্ত ছুঁলে ধরা যায়
বৃষ্টিবর্ণ। প্রতিবেশী প্রেমিকাকে ঘাসগল্প শুনিয়ে
ঘোরা যায় নক্ষত্রনগরে।
কিছুটা মৌনতা নিয়ে আছি।
গৌণ ভুলগুলোর চূড়ায় গোলাপ পাপড়ি
সাজিয়ে বার বার হয়েছি বশ্য।
পারলে দিয়ে যেতাম এর অধিক কিছু।
এই শৌর্যের সন্ধ্যাতারার মেলায়, ভার্চুয়াল জোছনারা
যেমন ভাসে চাঁদের দ্যোতনায়।
তোমার ছায়ার কাছে
আমি কি কোনও ভুল করিনি! আমি কি একটি বারও
তাকাইনি সমুদ্রশামুকের দিকে! একটিবারও কি বলিনি
ঘোর কেটে গেলে এই সবুজকেই ঘিরে রাখে ভোর-
আর তার বিনম্র প্রকাশ, ছায়া হয় সকল মানুষের।
অনেক কিছুই করেছি আমি। অনেক আত্মদগ্ধ জোনাকীর
জালে জালে আটকে থাকে যে রাত- তাকেও বলেছি
মুক্ত রাখো বাহু হে! আবার কোনও চন্দ্র জড়াবার
দরকার হতে পারে। যেতে হতে পারে অবিচল ঝড়ের কাছে।
কোনও অপরাধের ক্ষমাই চাইবো না তোমার কাছে আজ।
কোনও সকালকেই বলবো না- আরেকটু ধীরে বও!
অনেক কিছুই হারিয়ে গিয়েছে। আরো যাক- আরো,
আঁধার চিরে ভাসুক মুখ তোমার- প্রিয়তমা পৃথিবী আমার।
জল ছিটানো ঘুম
তন্দ্রা এবং তন্ত্রে কেটে গেছে কয়েকটি মহাকাল।
কয়েকলক্ষ পৌষের শীত, জবুথবু করে রেখেছে
পাখিদের জীবন। যেসব মানুষ পরিন্দার প্রতিবেশী,
তারাও বন্দী হয়ে পড়েছে আঁটোসাটো পলেস্তারার
ভেতর। থেমে যাচ্ছে প্রদক্ষিণরত সূর্য।
বিগত এমন ইতিহাস অস্বীকার করতে চাইছে
আমাদের ভালোবাসার সাম্পান। ঢেউ ভাঙছে
যে নদী- তাকে সাক্ষী রেখেই লিখতে চাইছে
জীবনের নতুন পরিচ্ছেদ।
মাটিতে জল ছিটাচ্ছে যে ঘুমময় চোখ, মানুষ
তার শুশ্রূষা চেয়ে করছে বিনম্র প্রার্থনা-
পুনরায় লিখিত হোক নতুন সূচিপত্র,
আবার উচ্চকিত হোক বলিষ্ঠ বাহু-
এমন বরণের গানে সুর তোলে, চাঁদের দিকে
না তাকিয়েই মধ্যরাতে বাড়ি ফিরছে
দীনহীন গায়েন।
প্রথম প্রেমের পৃথিবী
রেখে যাচ্ছি বর্ষের সর্বশেষ রেণু। রেখে যাচ্ছি মাটির
ভেতরে লুকিয়ে থাকা সবটুকু খনিজ। যে তুমি সংগ্রাহক
হয়ে তুলতে চাইবে এই জলজ শালুক,
তার হাতেই ফোটে থাকবে সহস্র পদ্মের পরাগ,
কিংবা স্বপ্নের কুমার হয়ে যে কুমারীর নামে
লিখে দেবে প্রথম প্রেমের পৃথিবী-
তার জন্যই জমা থাকবে আমার কবিতার
সর্বশেষ অক্ষর, অযুত মায়ার মহার্ঘ।
মিশে যাচ্ছি সম্ভাবনার আগাম অনুবাদে,
পাখির কোমল চোখে কাজল পরিয়ে যে
পালক, আঁকে নন্দনের নবম শিল্প
আমি তার হাতেই রেখে যেতে চাইছি আমার
কালি ও কলম। প্রচুর প্রেমবৃষ্টিতে ভিজে যারা
নিজেদের ছবি তুলবে,
তাদের পাশেই রেখে যাচ্ছি আপাতত আমার
কাব্যপোট্রেট।
সব দুঃখই পাখি হয়ে যায়
সব দুঃখই পাখি হয়ে যায়। সকল বেদনাই চৈতন্যের
জল হয়ে সমুদ্রে ভাসে। কোনো পরদেশী জাহাজের
পাটাতন তা ছুঁতে পারে, কখনও থেকে যায় অস্পর্শের অতল।
ঝড়গুলো বিভক্ত হয়ে প্রদক্ষিণ করে উত্তর এবং
দক্ষিণ মেরু। যারা পূর্বে থাকে, তারা তাকায় পশ্চিমে।
সূর্য ডুবলো বলে, জোনাকিরা গায়ে জড়ায় রাতের সন্ন্যাস।
দুঃখের অপর নাম সন্ন্যাস-সমুদ্র
বেদনার অন্য নাম কাকাতুয়া পাখি
যারা দুঃখ পেতে চায় না, তারা নির্বাক হাসে
যারা হাসতে ভুলে গেছে, তারা স্মরণ করতে
পারে না কান্নার সর্বনাম।
অথচ আমরা জানি,
আদম-হাওয়া একদিন কাঁদতে কাঁদতেই
পৃথিবীর পথযাত্রী হয়েছিলেন!






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান