অপরাজিতা
ভোরের কনে দেখা আলোয় নিজের ছাদ বাগানে হাঁটতে হাঁটতে অপরাজিতা মোবাইলের পর্দায় চোখ বুলিয়ে নেয়। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সোশ্যাল মিডিয়ায় শুভেচ্ছার বন্যা, নানা সংস্থা ও কর্পোরেট দুনিয়ায় ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ নিয়ে চলছে নানা উদ্দিপক ভাষণ। অথচ এই শহরেই, এই সমাজেই, কত নারীর স্বপ্ন এখনো অবরুদ্ধ হয়ে আছে।অপরাজিতার মুখে ফুটে উঠে করুণ অথচ বিজয়ের হাসি | মন চলে যায় অতীতের ফেলে আসা দিনগুলোতে |
একান্নবর্তী পরিবারে অনেক মানুষের মধ্যে বেড়ে উঠা অপরাজিতা শৈশব থেকেই শুনে আসছে,”মেয়ে হয়ে জন্মেছিস যখন, তখন মেয়েদের মতোই তোকে জীবন কাটাতে হবে|” ছোট্ট অপরাজিতা বুঝে উঠতে পারতো না মেয়ে হয় জন্মানো কি অপরাধ! তাছাড়া সে তো ইচ্ছে করে মেয়ে হয়নি | ঈশ্বর তাকে মেয়ে করে পাঠিয়েছেন | মাকে দেখতো নীরবে সবার আবদার, আদেশ মেনে চলতে ; তাঁর যেন নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছে বলে কিছুই নেই | সেই নিয়ে মাকে প্রশ্ন করলে তিনি হেসে বলতেন,” কি করবো বল?আমাদের বাড়িতে মেয়েদের পড়াশোনার কোনো প্রচলনই ছিল না | তাই সবকিছু মেনে নিয়ে মানিয়ে নিয়ে চলতে হচ্ছে | কিন্তু আমি চাই , তুই পড়াশোনা করে নিজের একটি স্বকীয় পরিচয় গড়ে তুলবি |” স্কুলে সবাই বলতো ,” তোর এতো ভালো রেজাল্ট, ছেলে হলে কত সুযোগ থাকতো| মেয়ে তো , খুব বেশি হলে ওই কোনো স্কুলের শিক্ষিকা হয়েই থাকতে হবে|” অপরাজিতা কোনো উত্তর দিত না ঠিকই , কিন্তু মন থেকে মেনে নিতেও পারতো না| মনের গহীন কোণে এক সুতীব্র প্রতিজ্ঞা কাজ করতো| মনে মনে বলতো,”আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে, কিন্তু আমি এটুকু বুঝি— আমি মাথা নিচু করব না। আমি আমার ও মায়ের স্বপ্নের জন্য লড়ব। আমি প্রমাণ করব, মেয়ে হয়ে জন্মানো অভিশাপ নয়; মেয়ে হলেও, আমি মানুষ আমি সম্ভাবনা।”
কৈশোর পেরিয়ে শুরু হলো অপরাজিতার সংগ্রাম | শহরতলীর মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ; তাই মাধ্যমিক পাশ করার সাথে সাথেই মামা , মাসি , পিসি সবাই প্রবল উৎসাহী হয়ে শুরু করে দিলেন তার জন্য পাত্র দেখা| অপরাজিতা স্পষ্ট ভাষায় রুখে দাঁড়ালো, “বিয়েই কি আমার একমাত্র গন্তব্য? আমি এখনো অনেক কিছু শিখতে চাই, জানতে চাই, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। কেন শুধু মেয়ে হয়ে জন্মানোর জন্য আমার ওপর এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হবে?” মা বাবা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন|বাড়ির বাকি সদস্যরা অবাক হয়ে বললেন, “পড়াশোনা তো চলতেই পারে, কিন্তু মেয়েদের একটা ঠিকানা দরকার।” অপরাজিতা মৃদু হেসে বলে,” ঠিকানা কি কেবল বিয়ের পরই পাওয়া যায়? বিয়ে হলো দুটো পরিপূর্ণ মানুষের একসাথে পথচলার অঙ্গীকার;তা কখনোই নারীর সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না।পড়াশোনা, স্বনির্ভরতা, নিজের জীবন গড়ে নেওয়ার অধিকার—সেটাই আমার সত্যিকারের পরিচয়। তারপর তো বিয়ে| জীবন আমার, সিদ্ধান্তও আমার।আমি জানি, পথ কঠিন। সমাজ প্রশ্ন তুলবে, অনেক বাধা আসবে। কিন্তু আমি ভয় পাই না।” অপরাজিতা মা-বাবার দিকে তাকায়। মা চোখের জল লুকিয়ে অপরাজিতার হাত ধরে বললেন, ” আত্মবিশ্বাসই তোর সবচেয়ে বড় শক্তি। নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে এগিয়ে চল স্বপ্নপূরণের পথে। একটা কথা মনে রাখিস, জীবনে সহজে কিছুই আসে না। কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্য তোকে নিয়ে যাবে স্বপ্নের কাছাকাছি।” বাবা বললেন,”অন্যের সাথে নিজেকে কখনো তুলনা করো না। তুমি নিজেই এক অনন্য সৃষ্টি, নিজের পথে চলতে শেখো। মনে রেখো, পড়াশোনা শুধু চাকরির জন্য নয়-এটা তোমার আত্মসম্মান, আত্মনির্ভরশীলতা ও স্বাধীনতার চাবিকাঠি।“
শুরু হলো অপরাজিতার সংগ্রামী জীবন | বাবার স্বল্প মাইনের চাকুরী , সাথে মায়ের সঞ্চিত কিছু গয়না-সেই সম্বল করেই শুরু হলো তার পথচলা|মা বাবার অতন্দ্র প্রহরীতে অপরাজিতা সমাজের সকল বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে চললো |সাথে ছিল আরও একজন – রুহি | রুহি এই শহরতলীর এক পুলিশ অফিসার পূর্ণেন্দু বসু’র মেয়ে | তিনি খুব যত্ন করে মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন | একদিন রুহি তার বাবার সাথে অপরাজিতাকে পরিচয় করিয়ে দিল| রুহি আগেই অপরাজিতা সম্পর্কে সব বলে রেখেছিলো বাবাকে | তাই অপরাজিতা যখন পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো তাঁকে ; তিনি সস্নেহে তার মাথায় হাত রেখে বললেন , “বস মা | আমি তোমার সব কথা শুনেছি | সবসময় মনে রাখবে জ্ঞান এমন একটি আলো, যা কখনো নিভে যায় না। তুমি যত শিখবে, তত এগিয়ে যাবে| তাছাড়া তুমি যদি শিক্ষিত হও, তবে শুধু নিজেই এগিয়ে যাবে না, বরং পুরো সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে| শুনেছি তুমি বৃত্তিও পেয়েছো | তাহলে আর পিছু ফিরে তাকিও না | রুহির সাথে চলে যাও শহরে | ‘মাভৈঃ’ বলে লেগে পড়ো | কোন কিছুর প্রয়োজন হলে অবশ্যই বলো আমাকে , রুহির মতো তুমিও আমার মেয়ে – কোন সংকোচ করো না আমার কাছে | বড় হও, শিক্ষিত হও, নিজের পায়ে দাঁড়াও- তোমার মা বাবার সাথে আমিও সবসময় পাশে আছি |সমাজ যাই বলুক, তুমি তোমার লক্ষ্যে স্থির থেকো। পড়াশোনার শক্তি দিয়ে সব বাধা অতিক্রম করতে পারবে।“ অপরাজিতা দুচোখ ভরা আনন্দঅশ্রু নিয়ে তাঁকে প্রণাম করে বেরিয়ে এলো |
এক উদীয়মান সূর্যের শুভক্ষণে অপরাজিতা রুহির সাথে পাড়ি দিলো তার স্বপ্নপূরণের সন্ধানে| রুহির সাথে একই ‘পিজি’তে গিয়ে উঠলো | মা-বাবার স্বল্প পুঁজি , সাথে তার বৃত্তি – এই দিয়েই শুরু হলো তার কঠিন অধ্যাবসায় | কিছুদিন পর রুহির সহায়তায় পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য টিউশনি শুরু করলো , কখনো কখনো কম খেয়ে খরচ বাঁচাতো বই কেনার জন্য। কিন্তু তবুও সে থামেনি। কারণ সে অন্তর থেকে বিশ্বাস করতো কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্য থাকলে কোনো বাধাই সাফল্যের পথে দাঁড়াতে পারে না। তাছাড়া সফলতা শুধু প্রতিভার ওপর নির্ভর করে না, অধ্যাবসায়ই মানুষকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়।
অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন | অপরাজিতা IPS Officer হয়ে ফিরে এলো তার শহরে | নিজের কর্মক্ষেত্র ছাড়াও নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ শুরু করলো | গড়ে তুললো মহিলা সংগঠন, যেখানে সরকারি অনুদান ও স্বেচ্ছাসেবীদের অর্থে সমাজের প্রান্তিক মহিলাদের স্বাবলম্বী করার জন্য শিক্ষা , হাতের কাজ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ইত্যাদি নানা মাধ্যমে তাদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা হয় |প্রতিটি সফলতা তাকে নতুন স্বপ্ন দেখায় ;অপরাজিতা তার’ই মতো হাজারো মেয়ের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে চায়|সে তাদেরকে বোঝায় সিমোন দে বোভোয়ারের কথা ; যিনি বলেছেন “One is not born, but rather becomes a woman” বোভোয়ার বলতে চেয়েছেন, নারীর পরিচয় এবং অবস্থান জন্মসূত্রে নির্ধারিত নয়; বরং সমাজ, সংস্কৃতি এবং লিঙ্গভিত্তিক নিয়ম-কানুন তাকে ধীরে ধীরে ‘নারী’ হিসেবে গড়ে তোলে।উক্তিটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে ; লিঙ্গ পরিচয়ের সামাজিক নির্মাণের প্রতি ইঙ্গিত দেয়, যেখানে পুরুষ এবং নারী হিসেবে- সমাজ ভূমিকা নির্ধারণ করে দেয়, যা জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। জন্মের পর একটি মেয়েশিশু ধীরে ধীরে বড় হতে হতে সমাজের দ্বারা নির্ধারিত বিভিন্ন ভূমিকা এবং প্রত্যাশার মধ্যে বেড়ে ওঠে, যা তাকে ‘নারী’ হিসাবে তৈরি করে।
অপরাজিতা সমাজের সেই অবহেলিত নারীদের বলে,”একজন নারী হলেন সৃষ্টি, লালন এবং রূপান্তরের ক্ষমতার একটি পূর্ণ বৃত্ত। নারীর ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, অন্তর্নিহিত শক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করা, পক্ষপাতের বিরুদ্ধে লড়াই করা, পরিস্থিতি উন্নত করে নারীর ক্ষমতায়ন মূল্যায়ণের মাধ্যমেই মানবজাতি বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে| সত্যিকারের শিক্ষা ও চেতনার জাগরণের মধ্য দিয়েই তা সম্ভব হবে|”
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে শহরের এক ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে অপরাজিতা।তার হাতে একটি ব্যানার— “নারীর শক্তি, সমাজের অগ্রগতি|” আজকের এই বিশেষ দিনে, তার সংগঠনের মেয়েরা শহরের রাস্তায় নেমেছে নারীর অধিকার, সমতার দাবিতে। তাদের কণ্ঠস্বর উচ্চস্বরে বলছে— “আমরা পিছিয়ে পড়ব না, আমরা গড়ব আগামীর পথ।” হঠাৎ পথের ধারে চোখ পড়ে অদিতির দিকে। বছর পঁচিশের এই মেয়েটি একসময় স্বামীর অত্যাচারে জর্জরিত ছিল, পড়াশোনা করতে পারেনি; কিন্তু আজ সে নিজেই একটা ছোট ব্যবসার মালিক। অদিতি ও কয়েকজন গৃহবধূ মিলে একটি হ্যান্ডমেড পণ্য বিক্রির উদ্যোগ শুরু করেছে, যা এখন ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অদিতি তাকে দেখে হাসিমুখে বলে, “দিদি, আমি আর ভয় পাই না। আমি জানি, আমি পারব।”
অপরাজিতার চোখে জল আসে, তবে সেটা দুঃখের নয়, গর্বের। সে জানে, প্রতিটি পরিবর্তন ছোট ছোট আলো থেকে শুরু হয়। আজকের এই নারী দিবস সেই আলো জ্বালানোরই এক প্রতীক— “প্রতিটি নারী যখন নিজের আলো খুঁজে পাবে, তখন সমাজও আলোকিত হবে।”
অপরাজিতা অনুভব করে, নারী— শব্দটি যেন এক অপার সম্ভাবনার নাম। যুগে যুগে তাকে কেউ বন্দি করতে চেয়েছে রীতিনীতির শৃঙ্খলে, কেউ তার পথ রুদ্ধ করতে চেয়েছে সমাজের অলিখিত নিয়মে। তবু নারী থেমে থাকেনি। সে যুগ ভেদ করে এগিয়ে গেছে, অন্ধকার চিরে আলো’কে আপন করে নিয়েছে।কখনও সে জননী, কখনও সৃষ্টিশীল শিল্পী, কখনও সে বিজ্ঞানী, কখনও সংগ্রামী বিপ্লবী। আজ নারী আর শুধু ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়। সে মহাকাশ ছুঁয়েছে, রাষ্ট্রনেতা হয়েছে, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছে, শিল্প-সাহিত্য-অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। ইতিহাস বলে, নারী শুধু স্বপ্ন দেখে না, সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতেও জানে। গার্গী, মৈত্রেয়ী থেকে মেরি কুরি, সরোজিনী নাইডু, কল্পনা চাওলা— এ কাহিনি শুধু কয়েকজনের নয়, কোটি কোটি নারীর। অপরাজিতার মনে হয়— সমাজ এখনো ভয় পায় নারীর শক্তিকে, নারীর আত্মপ্রকাশকে।তাইপথচলা শেষ নয়, লড়াই এখনো চলছে— সমতার, মর্যাদার, স্বীকৃতির।
অপরাজিতার মন আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠে | বস্তুত আন্তর্জাতিক নারী দিবস শুধু এক দিনের উদযাপন নয়, শুধু ফুল-উপহার পাওয়ার দিন নয়, নয় শুধু একদিনের সম্মান পাওয়ার দিন; এটি এক শপথের দিন— নারীর পথচলা থামবে না, নারীর কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হবে না, নারীর স্বপ্ন আর বিসর্জন হবে না। প্রতিটি নারী নিজেই এক বিপ্লব, এক নবজাগরণের প্রতীক। নারী দিবস মানে প্রতিটি নারীর নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্প, তার লড়াই, তার স্বপ্নকে বাস্তব করার প্রতিজ্ঞা। নারী মানেই শক্তি, নারী মানেই স্বাধীনতা, নারী মানেই অনন্ত সম্ভাবনা!
অপরাজিতা নিজের অফিসের জানালা দিয়ে সূর্যাস্তের আকাশের দিকে তাকায়; তার মনে হয়— ঠিক যেমন সূর্যের আলো গোধূলির আভায় মিশে যাচ্ছে, তেমনি নারীর শক্তি কখনোই নিভে যায় না। বরং প্রতিবার নতুনভাবে জ্বলে ওঠে, নতুন আলো ছড়ায়, নতুন ইতিহাস লেখে-নারীর স্বপ্ন আর তার বাস্তবতা একাকার হয়ে যায় — শক্তিতে, স্বাধীনতায়, আত্মবিশ্বাসে।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন -“একটি জাতির অগ্রগতির সর্বোত্তম থার্মোমিটার হল তার নারীদের প্রতি আচরণ|” তাই আজকের নারী দিবস শুধু একটি তারিখ নয়, এ এক যৌথ পথচলা, নারী পুরুষ নির্বিশেষে — অপরাজিতার, অদিতির, আমাদের সবার, সমাজের সকল নারী পুরুষের| কাজী নজরুল ইসলামকে অনুসরণ করে বলতে পারি-
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর”|






অজ্ঞাত এর জন্য একটি উত্তর রাখুন জবাব বাতিল