পিয়াল রায়
সহকারী সম্পাদক
ভারত

নারীবাদ আন্দোলন, যা গড়ে উঠেছিল নারী ও পুরুষের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সমতা, ন্যায় ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, সময় বিশেষে তাকেই বিপথগামী হতে দেখে মাঝেমাঝে হতাশ হয়ে পড়ি। বারবার মনে হয় আমাদের পূর্বনারীরা যে চরম যন্ত্রণায় পিষ্ট হতে হতে একদিন লড়াইয়ের যুক্তিকেই মুক্তির একমাত্র অস্ত্র হিসেবে হাতে তুলে নিয়েছিলেন, তা বুঝি কুযুক্তি এবং সঠিক চেতনার অভাবে রসাতলে তলিয়ে যেতে বসেছে।  ফেমিনিজমের ভুল ব্যাখ্যা ও চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সমাজে বিদ্বেষমূলক রূপ ধারণ করছে নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ক। নারী-পুরুষ  মেরুকরণ অত্যন্ত কটু ভাবে দৃষ্টিগোচর হয়ে পড়ছে। এই বিভাজন ও দ্বন্দ্বের বীজ, সমতা ও সহযোগিতার পরিবর্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে একে অপরের প্রতি বিষাক্ত ঘৃণা ও অনমনীয় মনোভাব। উভয়ের প্রতি উভয়কেই করে তুলছে অশ্রদ্ধাশীল। প্রকৃত উদ্দেশ্যকে বিকৃত করে একদল লোক নির্বাচনী তথা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে একে ব্যবহার করে নারী সশস্ত্রীকরণকে করে তুলছে দুর্বল৷ সুগার কোটিং করে এমন ভাবে তাকে উপস্থিত করা হচ্ছে যে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ভারতের সব নারীই বুঝি সমাজের সমস্ত নরক থেকে, যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়ে সদাহাস্যজ্বল আকাশে উড্ডীন অথচ একটু তলিয়ে গভীরে তাকালেই তার চরম অসারতা ধরা পড়ে। সিউডো ফেমিনিজম তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে দাঁড়িয়ে আজ আলোর উল্টো পিঠের দিকে তাকানোটাও তাই সমান জরুরি হয়ে পড়েছে।

‘সিউডো ফেমিনিজম’ বা ‘ফেক ফেমিনিজম’ হল মূলত ফেমিনিজমের এমন এক চূড়ান্ত দৃষ্টিভঙ্গি যাকে আপাতদৃষ্টিতে ফেমিনিজমের স্বরূপ বলে ভুল হয় অথচ প্রকৃতপক্ষে যা নারীর ক্ষমতায়ন বা নারী অধিকার রক্ষার মূলনীতি থেকে বিচ্যুত। সরলা দেবী চৌধুরানী (ভারত স্ত্রী মহামন্ডল এর প্রতিষ্ঠাত্রী এবং নারী অধিকার লড়াইয়ের অগ্রদূতী) বোধহয় কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেননি তাঁর নিজস্ব আইডিয়া ভবিষ্যতে কোনোদিন এতটাই বিপুল জন সমর্থন পেতে পারে যে তার বিকৃত ব্যাখ্যা থেকে জন্ম নিতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে বয়ে যাওয়া এক ছদ্ম নারীবাদ। এ প্রসঙ্গে একটা ব্যাপার পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো যে প্রকৃত নারী সশস্ত্রীকরণ কখনোই একজন অযোগ্য এবং অদক্ষ নারীর হাতে দায়িত্ব এবং অধিকার তুলে দেওয়ার কথা বলে না। ঠিক যেমন ভাবে একজন অযোগ্য ও অদক্ষ পুরুষের হাতে তুলে দেওয়া চলে না জগৎ রক্ষার ভার। ফেমিনিজম এবং ফিমেল শভিনিজমের সূক্ষ্ম বিভেদ রেখাটিকে তাই চিনে রাখা দরকার।

আমি এবার এমন কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করবো প্রতিদিন দৌড়ঝাঁপের জীবনে যাদের সঙ্গে কোনো না কোনো ভাবে আমাদের টক্কর লাগে। নানাবিধ কারণে প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের নাম আমি নেব না, প্রয়োজনও নেই। ঘটনাই মুখ্য বিবেচ্য। চেষ্টা করেছি ঘটনাগুলো অবিকৃত রাখার। বন্ধনীর ভিতর প্রত্যক্ষ্যদর্শী নারী অথবা পুরুষ উল্লেখ করে দেব, যাতে পাঠকের বুঝতে কোনো অসুবিধেই না হয় যে ছদ্ম নারীবাদের কুফল একক ভাবে নারী অথবা পুরুষ ভোগেন না, সামগ্রিক ভাবে উভয়েই এর শিকার।

ঘটনা এক
(নারী)
ঘটনা স্থান দিল্লি

একবার বাসে চেপে অফিসে যাচ্ছিলাম। বাসে বেশ ভিড় ছিল। আমার সামনে দিনমজুর শ্রেণীর এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ক্লান্ত,দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কষ্ট পাচ্ছেন । আমি আমার সিট তাঁকে ছেড়ে দিতে চাইছিলাম। আমার সিট ছেড়ে যখন তাঁকে বসার অনুরোধ করলাম, তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলা প্রতিবাদ করলেন। মহিলার বক্তব্য ছিল সিটটি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত, কোনো পুরুষের সেখানে বসার ‘অধিকার’ নেই।  আমি বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম বৃদ্ধ লোকটি অসুস্থ, অন্তত মানবিকতার খাতিরে ওই সিটটির দাবিদার উনি। কিন্তু মহিলা মানতে নারাজ। ক্রমাগত তর্ক করে বোঝাতে চাইলেন এতদিন মেয়েরা কষ্ট পেয়েছে, এখন পুরুষ পাক।

ঘটনা দুই
(পুরুষ)
ঘটনা স্থান মুম্বাই

রাজপথে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে কলেজ যাচ্ছিলাম। হঠাৎ ধাক্কা লেগে যায় একটি মেয়ের সঙ্গে। সে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে প্রকাশ্য রাস্তায় একটি থাপ্পড় মারে। আমি চড় মারার কারণ জিজ্ঞেস করলে, ঠিক ভাবে কথা না বলার অজুহাতে আরো একটি থাপ্পড় মারে। রুখে দাঁড়িয়ে আমি এবার বলি, আর একবার গায়ে হাত দিলে পাল্টা মার খাবেন। এরপরেও যখন তিনি আমাকে তৃতীয় থাপ্পড়টি মারেন, আমিও পাল্টা একটি থাপ্পড় দিই। মেয়েটি চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি চলে যান। আমিও নিজের রাস্তায় চলে যাই।

ঘটনা তিন
(পুরুষ)
ঘটনা স্থান ছত্তিসগড়

আমার বাবা একবার ট্রেনে চেপে কাকার সঙ্গে দেখা করতে ভিলাই থেকে বিলাসপুর যাচ্ছিলেন। প্রচন্ড গরম। সৌভাগ্যক্রমে আমার বাবা একটি সিট পেয়ে যান। কামরার ভিতর তখন যেমন ভিড় তেমন গরম। দুটো স্টেশন পর দুজন মহিলা কামরায় ওঠেন। ওদের মধ্যে যিনি বয়স্কা তিনি আমার বাবার পাশে বসে থাকা লোকটিকে বাধ্য করেন সিট ছেড়ে দিতে এবং সেখানে বসে পড়েন। অন্যজন দাঁড়িয়ে থাকেন। কিছুক্ষণ পর দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটি অজ্ঞান হয়ে পাশের পুরুষটির গায়ে ঢলে পড়েন এবং বসে থাকা মহিলাটি উঠে দাঁড়িয়ে আমার বাবাকে সিট ছেড়ে দিতে বলেন। আমার বাবা সিটটি ছেড়ে দিলে মহিলাকে সেখানে বসিয়ে দেওয়া হয় এবং লোকজন শুশ্রূষা শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং গুটখা খেতে খেতে পরিচিত মহিলার সঙ্গে মোবাইলে নিজেদের ছবি দেখতে শুরু করেন এবং হাসাহাসি করতে থাকেন। ঘটনার আকস্মিকতায় অবাক হয়ে যখন আশেপাশের লোকেরা প্রশ্ন করে তখন তাঁরা সাফ সাফ জানিয়ে দেন যে এটা তাঁরা রোজই করে থাকেন। কারণ হিসেবে তাঁরা মনে করেন কোনো মহিলা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কোনো পুরুষের বসে বসে যাত্রা  অসমীচীন।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মেয়েরা হেয় হয়েছে ঢের ঢের উপায়ে। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে, দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখার মধ্য দিয়ে কয়েক শতাব্দী ধরে চলেছে অপমান এবং অবিচারের অকথ্য অগ্নিবাণ। আবার এটাও ঠিক যে জল যখন মাথার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে তখন মেয়েদের লড়াইতে সমানে সমানে সমর্থন জানিয়েছে পুরুষ। তারাও লড়েছে কখনো ছোট পরিসরে কখনো আবার বৃহত্তর আন্দোলনের জায়গায় দাঁড়িয়ে। “অল মেন আর ডগ” এ কথাটা বলার মাধ্যমে কোনো সাধারণীকরণকে প্রশ্রয় দেওয়ার আগে একটু ভেবে দেখা দরকার যে, আমার পরিবারের পুরুষদের, আমার প্রিয় পুরুষ বন্ধু, সহকর্মী অথবা সহযাত্রীদেরও  আমরা তাহলে সারমেয় গোষ্ঠীভুক্ত করতে স্বচ্ছন্দে অনুমতি দেব কিনা? সমাজের সার্বিক মঙ্গলকামনায় যে সমস্ত পুরুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করেন তাঁদেরও অসম্মান করার এক্তিয়ার আমাদের আছে কিনা?  আমি নিজে একজন মহিলা হওয়ার দরুন খুব ভালো করে জানি প্রত্যেকটা পদক্ষেপে আমাকে কতটা সতর্ক থাকতে হয়। কতখানি সচেতন থাকতে হয় আমার আশেপাশে ঘটে চলা অসামাজিক কার্যকলাপ সম্পর্কে। সমানাধিকারের লড়াইটা চালানো সহজ নয় কিন্তু তাকে আরো বেশি কঠিন করে ফেলি না কি যদি আমার চারপাশের সমস্ত পুরুষকেই একটি নির্দিষ্ট পশুশ্রেণীতে নির্বাসিত করি? আমার বিশ্বাস সদ্বুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষ চিরকালই ছিলেন, আছেন, থাকবেন। তারা নারীর মর্যাদা রক্ষার জন্য যা যা করনীয় সবই করবেন কোনো রকম সঙ্কোচ না রেখেই। সমাজের বিবর্তনের পথ কোনোদিনই সরলরৈখিক ছিল না। দূর ভবিষ্যতেও সেরকম কোনো সম্ভাবনা নেই।

আমাদের আসলে বুঝতে হবে লড়াইটা নারী বা পুরুষের মধ্যে নয়। লড়াইটা কোনো দুই বিপরীত লিঙ্গের  ইগোর লড়াই নয়। লড়াই ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে। শুভ ও অশুভের মধ্যে। জেগে জেগে ঘুমিয়ে থাকার বিরুদ্ধে। নারী সুরক্ষার আইনকে যদি স্বেচ্ছাচারের অবিমিশ্র নিরিখে ব্যবহার করে দুর্বল করে দেওয়া হয় তাহলে নারীকে আরো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেওয়া হয় না কি? কখনো কখনো বিশেষ ভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত(প্রিভিলেজড) নারীর আইনের অপব্যবহার অন্য সমস্ত নারীর বেঁচে থাকার লড়াইকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।  যে আইন নারীকে সমাজে সম্মাননীয় করে তুলতে পারতো, তাকেই এক শ্রেণীর নারী নিজের বিকৃত ইচ্ছা চরিতার্থ করতে গিয়ে সত্যিকারের লড়াইতে সামিল মেয়েদের অসহায় করে তোলে। কে অধিকার দিয়েছে নারী হয়ে নারীকেই বিপদে ফেলার? এহেন হীন প্রচেষ্টার বিরোধিতা হওয়া দরকার। মনে রাখা দরকার নারীবাদ কখনোই পুরুষ বিরোধিতার কথা বলে না,বলে সর্বপ্রকার সমানাধিকারের কথা। সুখের বিষয় মেয়েরা এখন এ ব্যাপারে অনেক সচেতন হয়েছেন। আমার পক্ষ থেকে তাঁদের আন্তরিক অভিনন্দন। না বিজ্ঞান না প্রকৃতি, কেউই নারীকে পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে খাটো করে দেখার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না। পিতৃতান্ত্রিক চিন্তায় যে অসমানতার ধারনা এতদিন ধরে সমাজে শিকড় গেঁড়ে বসেছিল তাকে সমূল উপড়ে ফেলতে গিয়ে যদি অপর পক্ষকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া হয় তাহলে সমানাধিকার কোনোদিনই প্রতিষ্ঠা পাবে না। উল্টে দুটো যুযুধান পক্ষ তৈরি হবে। দু পক্ষই আমি ভালো, আমি শ্রেষ্ঠ বলতে বলতে এক অন্তহীন যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হবে। মাঝখান থেকে মারা পড়বে হাজার হাজার সেই সমস্ত নারী এবং পুরুষ, যাদের কাছে সমানাধিকার বিষয়টি আজও স্বপ্নের মতো। নুন আনতে পান্তা ফুরতে ফুরতে যাদের জীবনও ফুরিয়ে আসে রোজ। এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে নারী দিবসের প্রাসঙ্গিকতা আরো বেশি বৃদ্ধি যে পায় সে কথা অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। এই স্বল্প পরিসরে এটুকুই বলার। আজ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসে ‘শিকড়’পরিবারের পক্ষ থেকে নারী, পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে জানাই আমার শুভেচ্ছা। নিজে  ভালো থাকার পাশাপাশি অন্যকেও ভালো রাখার অঙ্গীকার নিয়ে আজকের দিন সকলের ভালো কাটুক।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

One response to “ছদ্ম নারীবাদ: আলোর নিচে কিছু অন্ধকার”

  1. খুব বাস্তব কথা লিখেছো পিয়াল। নারী-পুরুষের দ্বন্দ্ব নয়, সহযোগিতাই মূল চালিকাশক্তি। যেটা আবার “সমানাধিকার” প্রসঙ্গে কিছুটা ব্যতিক্রমী। “গাড়ির চলাটা হচ্ছে একটা সাধারণ কর্তব্য৷ কিন্তু ঘোরতর প্রয়োজনের সময়ও ঘোড়া যদি বলে ‘আমি সারথীর কর্তব্য করব’, তবে সেই কর্তব্যই ভয়াবহ হয়ে ওঠে।”

    আসল কথা হচ্ছে, “প্রকৃতির ব্যবস্থায় মেয়েরা একটা জায়গা পাকা করে নিয়েছে, পুরুষরা তা পায়নি। পুরুষকে চিরদিন জায়গা খুঁজতে হবে। খুঁজতে খুঁজতে সে কত নতুনেরই সন্ধান পাচ্ছে, কিন্তু চরমের আহ্বান তাকে থামতে দিচ্ছে না; বলছে,’আরো এগিয়ে এসো।’…”

অজ্ঞাত এর জন্য একটি উত্তর রাখুন জবাব বাতিল

Trending