গল্পঃ সৈকতের ক্যানভাস

সারি সারি সবুজ ঝাউবীথি, আর নরম বালির মাঝে দীর্ঘ অপরূপ গোকর্ণ সৈকত, সাগরের নীল জলরাশি আর ঢেউয়ের গর্জন প্রকৃতির এক সুরেলা সংগীত হয়ে উঠেছে | প্রজ্ঞা যখন সেখানে পৌঁছালেন , সূর্য্য তখন অস্তরাগের পথে | সমুদ্রের তীরেই হোটেল | তাই সবকিছু সেরে এসে সৈকতের একটি জায়গা দেখে প্রজ্ঞা বসে পড়লেন | সমুদ্রের জলরাশির দিকে তাকিয়ে তিনি এক সুগভীর আবেশে  ডুবে গেলেন | জীবনে প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যক্তিত্ব  হওয়া সত্ত্বেও আজ তিনি  অবসন্ন- একরাশ হতাশা তাঁকে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো | আজকাল রাতে আর তেমন ঘুম হয় না- কোনো  এক কাছের মানুষের চলে যাওয়া তাঁকে বিষন্নতার দিকে ঠেলে দিয়েছে | যদিও কিছুই  করার  ছিল না , নিয়তির অমোঘ বিধান ; কিন্তু প্রজ্ঞা  ধীরে ধীরে যেন অবসাদে ডুবে যাচ্ছিলেন | তাই  বন্ধু-পরিজন সবার কথায় কয়েকদিনের জন্য এই নির্জন সমুদ্র সৈকতটি বেছে নিয়েছিলেন |

দিনটি ছিল পূর্ণিমা | বিশাল আকাশের নিচে, ঝকঝকে চাঁদের আলো সমুদ্রের বুকে সাদাটে রুপালি রেখা এঁকেছে , যা জলরাশির তরঙ্গে কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই দৃশ্য যেন এক স্বপ্নের জগৎ।সৈকতের সোনালি বালু চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে , আর তীর ঘেঁষা নারকেল গাছগুলো ছায়াময় ও রহস্যময় অবয়ব ধারণ করেছে । বাতাসে লেগে আছে সামুদ্রিক লবণাক্ততা; আর মৃদু হাওয়া গায়ে এসে স্পর্শ করলে এক অপরূপ শীতলতার অনুভূতি হচ্ছে ।

গোকর্ণের নির্জন পরিবেশ এই পূর্ণিমা রাতকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।এখানে  বিশেষ জনসমাগম নেই, নেই কোনো শহুরে কোলাহল। শুধু আকাশে অসংখ্য তারার ঝিলমিল আর তার মাঝে উজ্জ্বল চাঁদ, যা নিজের আলোয় পুরো সৈকতকে জ্যোতির্ময় করে রেখেছে।পূর্ণিমার আলোয়, জলে প্রতিফলিত চাঁদকে দেখে মনে হয়, সমুদ্র যেন আকাশকে নিজের মাঝে ধারণ করেছে। দূরে জাহাজের মৃদু আলোক বিন্দু আর মাঝে মধ্যে ঢেউয়ের গর্জন প্রকৃতির বিশালতাকে অনুভব করায়।

পূর্ণিমার আলোয়  সমুদ্র সৈকতে বসে প্রজ্ঞার মনে হলো,  আকাশ আর সমুদ্র একে অপরকে ছুঁয়ে দিয়েছে, আর তিনি তাদের মাঝখানে এক অতি ক্ষুদ্র অস্তিত্ব।পূর্ণিমার রাতের সমুদ্র তাঁকে নিয়ে যায় এক অন্য পৃথিবীতে—যেখানে কোলাহল নেই, শুধু ঢেউয়ের সঙ্গীত, চাঁদের কিরণ আর অবিরাম চলার গল্প। অতল জলরাশির দিকে তাকিয়ে ছিলেন যদিও ; কিন্তু সাগরের উত্তাল বাধনহীন তরঙ্গের মতোই তাঁর মনের গভীরে চলছিল  নীরব তোলপাড় |

এক বছর আগের সেই দিনটার কথা  প্রজ্ঞা আজও ভুলতে পারেন না। যদিও পড়াশোনায় তিনি খুবই মেধাবী ছিলেন ; কিন্তু ছোটবেলা থেকেই রং তুলি ছিল তাঁর পৃথিবী। অন্য বাচ্চারা যখন খেলনা নিয়ে খেলা করত, প্রজ্ঞা তখন আপন মনে কাগজ আর রং পেন্সিল নিয়ে ছবি আঁকতেন | সেই ছবি আঁকার সূত্র ধরেই পরিচয় হয়েছিল চিরন্তনের সাথে | একটি আর্ট গ্যালারিতে দুজনের ছবির প্রদর্শনী ছিল | সেখানেই পরিচয়, বন্ধুত্ব ; ধীরে ধীরে ভালোবাসা – একসাথে সারাজীবন পথ চলার অঙ্গীকার | চিরন্তনের  সঙ্গে দেখা হওয়ার সেই মুহূর্তটা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি। সবকিছুই ছিল যেন এক রূপকথার মতো।

কিন্তু সেই রূপকথার গল্পটা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বদলে গেল। এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা তাঁদের আলাদা করে দিল চিরদিনের জন্য। দুর্ঘটনায় চিরন্তনের মৃত্যু তাঁর জীবনের সমস্ত রং কেড়ে নিয়ে শুধু শূন্যতা আর বিষাদের রঙে রাঙিয়ে দিয়েছিল। চিরন্তনের  সাথে কাটানো সেই আনন্দের মুহূর্তকে স্মরণ করে এক অব্যক্ত কান্না গুমরে উঠে তাঁর বুকে | আজ প্রজ্ঞা নিজের একাকীত্ব এবং হারিয়ে যাওয়া অনুভূতিগুলোর প্রতিধ্বনি শুনতেই এখানে এই আদিগন্ত জলরাশির সামনে নিজেকে এনে দাঁড় করালেন |

এইভাবেই সেই অসীম দিগন্ত বিস্তৃত সৌন্দর্যের মধ্যে তাঁর তিনদিন কেটে যায় | চারদিন পর প্রজ্ঞা ভোরের কনে দেখা আলোয়  সমুদ্র সৈকতে হাঁটছিলেন | উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ দেখতে দেখতে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন | সমুদ্রের ঢেউ প্রকৃতির এক অপূর্ব সঙ্গীত। তার গতিময় ছন্দ এবং অন্তহীন বহমানতা যেন জীবনের এক গভীর প্রতিচ্ছবি।প্রত্যেকটি ঢেউ যেন এক একটি জীবন্ত সত্তা। দূর সমুদ্রের বুকে হঠাৎ উঠে আসা ঢেউটি দেখতে হয়তো শান্ত, কিন্তু যতই তীরের দিকে এগিয়ে আসে, তার মধ্যে জমে থাকা সমস্ত শক্তি ছড়িয়ে দেয় সৈকতে | ঢেউ এসে বালি ভিজিয়ে দিয়ে যায়, আবার তীর থেকে ধীরে ধীরে ফিরে যায় নিজের গভীরতায়। সেই আসা-যাওয়ার ছন্দে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক নীরব কাব্য এবং জীবনের ব্যক্ত ও অব্যক্ত ভাব তরঙ্গ | প্রজ্ঞা  সম্মোহিত ভাবে নিরপেক্ষ দর্শক হিসেবে ঢেউয়ের এই রাগ আর মাধুর্য দেখেন আর ভাবেন —জীবনের মতোই, সমুদ্রের ঢেউও কখনও শান্ত, কখনও উত্তাল।  কিন্তু প্রতিটি ঢেউ পরিশেষে ফিরে যায় সমুদ্রের গভীরে, তার আসল আশ্রয়ে।কিন্তু প্রজ্ঞার জীবনের সেই অসীম ভালোবাসার আশ্রয়টাই তো হারিয়ে গেলো ; তিনি কোথায় ফিরে যাবেন ? এই পৃথিবীতে তাঁর তো নিজের বলতে এখন কেউ নেই ; মা বাবা তো কবেই চলে গেছেন | এইসব ভাবতে ভাবতে প্রজ্ঞার চোখ দুটো জলে ভরে এলো |

এইভাবেই তিনি সৈকত ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চললেন | কিছুদূর যাবার পর  প্রজ্ঞা সৈকতে একটি ছোট ডায়েরি খুঁজে পান, যেটি সমুদ্রের জলে ভেসে এসেছে । ডায়েরিটি পুরনো , কিছু জায়গায় জল লেগে অস্পষ্ট হলেও বাকিগুলো পড়া যায়। এর প্রতিটি পাতায় কোনো এক নামহীন মানুষের গভীর আবেগ এবং দুঃখ-ভরা কথাগুলো লেখা। ডায়েরির লেখাগুলো যেন প্রজ্ঞার নিজের একাকীত্ব এবং হারিয়ে যাওয়া অনুভূতিগুলোর প্রতিধ্বনি।

অবশেষে প্রজ্ঞা ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় দেখতে পান একটি হাতে আঁকা ছবি ; নিচে লেখা আছে-অনন্ত রায় | প্রজ্ঞা বুঝতে পারেন এই ডায়েরিটি একজন  চিত্রশিল্পীর, যিনি এই সমুদ্র সৈকতে প্রতিদিন ছবি আঁকতেন। কিন্তু তাঁর একটি অসম্পূর্ণ ছবির গল্প রয়েছে, যা তিনি শেষ করতে পারেননি।

প্রজ্ঞা  পরেরদিন সকালে ডায়েরির সূত্র ধরে একজন স্থানীয় জেলেকে খুঁজে বের করেন , যিনি চিত্রশিল্পীটির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। জেলের কাছ থেকে প্রজ্ঞা জানতে পারেন , এই সমুদ্রপাড়ের একটি নির্দিষ্ট জায়গা ছিল – যেখানে চিত্রশিল্পীটি পূর্ণিমার রাতে ছবি আঁকতেন। কিন্তু কিছুদিন পর তাঁকে আর দেখা যায় নি | তিনি ফিরে গেছেন না সাগরেই হারিয়ে গেছেন তা কেউ জানে না |

শুরু হয় প্রজ্ঞার মনের অন্বেষণ ; ডায়েরির প্রতিটি পাতায় খুঁজে বেড়ান সেই অদেখা চিত্রশিল্পীকে | কখনো কখনো অনুভব করেন —পূর্ণিমার আলোয় সমুদ্র সৈকতে সেই স্থানে  একজন মানুষ দাঁড়িয়ে সাদা ক্যানভাসে ছবি আঁকছেন। এটি বাস্তব নাকি তাঁর কল্পনা, তা প্রজ্ঞা বুঝতে পারেন না। একদিন ভোরের আলোয় প্রজ্ঞা তাঁর অনুভূতিগুলোকে মুক্ত করতে সমুদ্রের কাছে একটি চিঠি লেখেন|

 ধীরে ধীরে সেই চিত্রশিল্পীর অসমাপ্ত ছবি নিয়ে নিজের জীবন এবং স্বপ্নকে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন প্রজ্ঞা। ডায়েরির গল্প এবং তাঁর নিজস্ব অনুভূতিগুলো তাঁকে বোঝায়,- জীবনের প্রতিটি সম্পর্ক এবং স্বপ্ন, একটি ছবি- যা কখনোই সম্পূর্ণ হয় না;তবু সেখানে লুকিয়ে থাকে  সৌন্দর্য |

একদিন গোধূলি বেলায় – সূর্য যখন অস্তপাটে যাবার প্রস্তুতি করছে;  প্রজ্ঞা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসেন সমুদ্র সৈকতে তাঁর নির্দিষ্ট স্থানে |  সন্ধ্যার সময় সমুদ্র তখন এক অনন্য রূপ ধারণ করেছে| সূর্য  তার সোনালি আভা সমুদ্রের জলরাশিকে রাঙিয়ে দিচ্ছে ; ঢেউয়ের  উপর পড়া সেই সোনালি রং যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম, যেখানে আলো আর জলের মিতালী এক অভূতপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে ।

সন্ধ্যার বাতাসে থাকে হালকা শীতলতার ছোঁয়া। ঢেউয়ের মৃদু গর্জন আর বাতাসের সুমধুর শোঁ শোঁ শব্দ যেন একসাথে সঙ্গীতের মতো বাজতে শুরু করেছে । তীরে ভেসে আসা ঢেউয়ের ফেনা, সাদা মুক্তোর মতো ঝলমল করছে ; আর সেই ফেনায় সূর্যাস্তের শেষ আলো পড়ে এক মোহময় আবহ তৈরি করেছে । তীরে বসে থাকা মানুষেরা কেউ ঢেউয়ের গর্জন শুনে হারিয়ে যায় অতীতের স্মৃতিতে, আবার কেউ সেই শীতল পরিবেশে খুঁজে পায় শান্তি।

প্রজ্ঞা অনুভব করেন, এই সৈকতে তিনি একা নন – তাঁর সাথে আছে সমুদ্রের গভীরতা, চাঁদের অনন্ত সৌন্দর্য আর অসীম আকাশের নিঃশ্বাস। এই রাত যেন চিরকালীন, সময় এখানে বন্ধনহীন উতল হাওয়া | সেই নীরব নীল নীলিমার সৌন্দর্যের মধ্যে বসে অনেকদিন পর প্রজ্ঞা ব্যাগ থেকে বের করলেন তাঁর প্রিয় রং তুলি, ক্যানভাস যা তাঁর বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে অনেকদিন আগে | সাগরের বেলাভূমিতে বসে প্রজ্ঞা আপনমনে এঁকে চলেন তাঁর ভাবনার সুক্ষ অনুভূতিগুলোকে | হারিয়ে যান নিজের সৃষ্টির মাঝে | কিন্তু তিনি  বুঝতেই পারেন না ; সৈকতটি অপরূপ সৌরভে ভরে উঠেছে,আর তাঁর পিছন দিক থেকে একটি রহস্যময় সাদা অবয়ব, নিঃশব্দ চরণে, হাতে একটি ক্যানভাস নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তাঁর’ই দিকে ।

 


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

“মধুমিতা দত্ত” এ একটি মন্তব্য

Samiran Mandal এর জন্য একটি উত্তর রাখুন জবাব বাতিল

Trending