আতিকা হাসান একজন কবি, কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার বনশ্রীতে বসবাস করছেন এবং শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায়ও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছেন।
আতিকা হাসান শিকড় সম্পাদকীয় পর্ষদের একজন সদস্য। তাঁর কবিতা, গল্প ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন সাহিত্যবিষয়ক পোর্টাল এবং সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের পরিমণ্ডলে তাঁর সৃজনশীল উপস্থিতি ও নিরন্তর সাহিত্যচর্চা তাঁকে একজন সক্রিয় সাহিত্যকর্মী হিসেবে পরিচিত করেছে।
এ পর্যন্ত তাঁর একক ছয়টি ও যৌথ চারটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ দুটি হলো ‘গ্রন্থিত প্রহর’ ও ‘জলরঙে ভেজা সময়’। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাস ‘জয়িতা’ তাঁর সাহিত্যকর্মের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও বিভিন্ন সাহিত্যধারায় তাঁর বিচরণ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার প্রত্যয়ে তাঁর সৃজনশীল যাত্রার পরিচয় বহন করে।
আতিকা হাসান’র একগুচ্ছ কবিতা
আয়ু সংলাপ
জীবন স্বপ্নগুলো কোন কৈশোর থেকে
চোখের তারায়, মনের দর্পণে
ছবি আঁকতে শুরু করেছিলো, জানিনা।
মায়াকালিতে লিপিবদ্ধ বর্ণিল ভবিষ্যৎ
কখন থেকে মনের গহন তলে জমা হচ্ছিলো,
মনে নেই!
তবে যেদিন থেকে অনুপম নকশার রঙিন আগামী
বুনতে শুরু করেছিলাম সুখানুভবে,
পুলকিত হৃদয়ে
শুধু তারই কিছু রেশ রয়ে গেছে অস্পষ্ট।
যদিওー
পথের ধুলোয়, কাদামাটিতে
কখনো ছিটকে
কখনো ঢলকে পড়ে গেছে
বিন্দু বিসর্গ ভাগ,
কখনো নতুন পুরাতনের যোগ-বিয়োগ
হয়েছে নব উদ্যমে।
রঙিন চশমায় রঙিন জীবন হাতছানি দিয়েছে
ক্রমাগত।
কিন্তু,বিজন দুপুরে অবাক চেয়ে দেখি
জরাগ্রস্থ ধূসর প্রচ্ছদে ঘুরে বেড়াচ্ছে
অভিমানী গল্পের ছেঁড়া পাণ্ডুলিপি,
বিরান ভূমে জলের উপমায় আচ্ছাদিত
তীব্র বেদনার ঘাম
মূর্ছিত আবছায়া,
রোদে পোড়ে পাললিক বর্ষা…
নতুন করে শিখি উপেক্ষিত শিশুপাঠ
অপেক্ষা বৃষ্টি বিন্দুর!
অনর্ঘ্য আবছায়া
আবছা অন্ধকারে ভেজা মাটির কোলে
বেড়ে ওঠা অস্তিত্বেও খুশির পরশ
পূবালী হাওয়ায় সারা অঙ্গ জুড়ে
শরীরী ঢেউ, দেহের কাঁপন
বেদনার চিরকুটেও ডুবন্ত সুখ
মুগ্ধ চোখে বিমুগ্ধ আয়না কথন
সরল তুষ্ট জীবন!
বৈপরীত্যে চিন্তার ভাঁজ, আহা!
একটা জীবন জানল নাー
গভীর অরণ্যে জন্ম নেওয়া স্বাধীনতার সুখ,
বিজন দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার
মোহময় কারুকার্য
খোলা আকাশের নিচে, বিস্তীর্ণ প্রান্তরের
শুদ্ধ মাটির ঘ্রাণ
নির্জন নির্ঝরের ভালোবাসায় সিক্ত
বুকের গোপন কাঁপুনি
উচ্চশিরে আকাশ ছোঁয়া সবুজের
গভীর স্পর্শ।
একটা জীবন দেখলো নাー
শুভ্র শরৎ মেঘমল্লার সৌখিন জীবন বোধ,
বুঝলোই নাー
তীব্র শীতের পর কেমন হয় মোহময়
রোদের উচ্ছ্বাস!
পুনর্জন্ম
দোদুল্যমান সাঁকোটার মাঝখানে হঠাৎ
তাড়িয়ে বেড়ায় ভয়
ডানে বামে ঠিকানাহীন নির্জনতা
নিচে অতল গহীন পুলসিরাত!
ব্যথিত অতীতের আগামীটাও
পরিপূর্ণ অজানায়
পেছনে ফেরার রাস্তাটাー
গুটিয়ে গেছে কী?
আর একবার কাঠপেন্সিল লিখুক জীবন
ভুল করা বিগতের ভুলগুলো মুছে মুছে
হৃদয়ের উত্তাপগুলো ঠান্ডাজলে ধুয়ে
নির্মল হোক শোকের গভীরতা।
আর একবার চলতে শিখি নির্বিকার
জনকের ঘর্মাক্ত দেহের দৃঢ়তার হাত
আঙুল ছুঁয়ে থাকুক বিশ্বাসে।
ভুলের ব্যাকরণগুলো শুধরে শুদ্ধতার আলোয়
উদ্ভাসিত হোক শব্দ-অক্ষর
খড়িমাটির আত্মত্যাগে ব্ল্যাকবোর্ডের শরীরে
জমুক সাদার প্রলেপ
জীবন শিখুক জীবনের তাৎপর্য।
যে অভিমানে ভরা কলম থমকে ছিলো
আধেক বেলা
তার পূর্বাকাশে উঁকি দিক নতুন সূর্যের
মোহময় তেজ
দিগন্ত ভেসে যাক আলোর বন্যায়।
কন্টকময় পথে ফুটুকー
সন্ধ্যামালতী ফুল
জীবন কাটুক ー
জীবনের প্রশ্রয়ে, আয়ুর দামে।
বিবর্ত
কোনো অমাবস্যার নির্জনরাতে
তুমি পেয়েছিলে ক্ষতের ঘ্রাণ,
জানালার কার্নিশে থামলে আধেক বেলায়!
বললে, “সমূহ আরোগ্য তোমার মনের
অন্তঃপুরে অমরত্বের আয়ু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাক।
জীবন কুড়িয়ে নিও তুমি।”
পূর্ণ দৃষ্টি মেলে আমি চেয়েছিলাম অবাক!
কিন্তু, বেলাশেষের আগেই দেখি
তোমার পদছাপে ঝুলে আছে একজীবনের
বোহেমিয়ান অবিশ্বাস!
তোমার নতুন চলার পথেー
আমার অস্পষ্ট আয়ুর দাগ।
অ-প্ৰেম
বহুকাল পূর্বে সে শুধু আমার ছিলো!
প্রাচীন যুগে যখন যাযাবর হয়ে ঘুরছিলো
একা, উদভ্রান্ত
আমি তখন তার প্রেমে পড়েছিলাম।
ইউফ্রেতিসের তীরে বসে অজস্র সূর্যডোবা দেখেছি
তার কাঁধে মাথা রেখে,
তার করতল মুঠোয় ভরে ঘুরেছি পুরো মায়া
সভ্যতার মায়াবী বিকেল,
নীলনদের শীতল বায়ু জুড়িয়েছে দেহমন
তার চোখে দেখেছি পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে
অপর প্রান্ত অবধি।
ভারতবর্ষের সবুজ-শ্যামল লীলাভূমে এসে
তার চোখ ছানাবড়া
বৈষ্ণব পদাবলীতে উদাসী মন।
কাব্যকলায়ー
চিত্রা,ললিতা, ইন্দুরেখার… গুণকীর্তন!
বহুগামী প্রতিভায় সৃষ্ট মহাকাব্য।
কলি’র করাল গ্রাসেー
তাকে কখনো চেনা যায়, কখনো চেনা যায়না!
সে এক অচেনা অ-প্ৰেম!
অতলান্তিকের গহীনে লুকানো
গভীর একবেদনা…





মন্তব্য করুন