মঙ্গলবারে ওপারে আম্মাজি




সন্ধ্যা নামলে বারান্দায় কিছু কাপড় মেলে থাকে,
হাওয়ায় তাদের অকারণ কাঁপুনি-
মনে হয়, কেউ যেন চলে যেতে গিয়েও
শেষবারের মতো ফিরে তাকাচ্ছে।
রান্নাঘরে আলো জ্বালাই-
চায়ের জল ফুটতে থাকে,
ঘরের প্রতিটি জিনিস নিজের কাজে ব্যবহৃত
শুধু আমার বুকের ভেতর
কী যেন একটা কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়।
এই সময়টাতেই আম্মাজিকে ফোন করতে ইচ্ছে করে।
মুঠোফোন হাতে নিয়ে বসে থাকি,
যদিও জানি, ওপাশ থেকে আর কোনোদিন
সেই চেনা কণ্ঠ ভেসে আসবে না।
তবু মনে মনে নম্বরগুলো সাজাই-
যেন পৃথিবীর সব দূরত্ব পেরিয়ে
একবার শুধু বলতে পারব,
আম্মাজি, আজ খুব তোমার কথা মনে পড়ছে।
কত কথা জমে আছে!
কিছু দুঃখ, কিছু না-বলা অভিমান,
কিছু আনন্দের খবর,
আর আছে এমন কিছু ক্লান্তি-
যার কোনো ভাষা হয় না,
শুধু আম্মাজির কাছে মাথা রাখলেই
সমস্ত আত্ম অনুভূতি ঘুমিয়ে পড়ত।
জীবন আমাকে বড় হতে শিখিয়েছে,
সংসার সামলাতে, দায়িত্ব নিতে,
নিজের কান্না নিজের কাছেই লুকিয়ে রাখতে।
কিন্তু বড় হয়ে যাওয়ারও তো একটা সীমা আছে-
রাত গভীর হলে
আমিও কারও মেয়ে হয়ে যেতে চাই।
জানালার বাইরে গাছের পাতায় বাতাস লাগে,
দূরে কোনো পাখি শেষবারের মতো ডাকে।
আমি আলো নিভিয়ে দিই,
তবু ঘুম আসে না।
আম্মাজি, তুমি কি জানো,
তোমাকে হারানোর পর
পৃথিবী থেকে কত কিছু হারিয়ে গেছে-
অথচ পৃথিবী থেমে থাকেনি এক মুহূর্তও!
সকাল হয়েছে, বাজার বসেছে,
মানুষ কাজে গেছে,
নতুন দিনের জন্য আবার চুলায় হাঁড়ি চড়েছে।
শুধু আমার ভেতরে কোথাও
একটি সন্ধ্যা আজও শেষ হয়নি।
মঙ্গলবার আসে, মঙ্গলবার চলেও যায়।
ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখ বদলায়,
বয়স বাড়ে, অভিজ্ঞতা জমে,
আমার চারপাশে কত মানুষ আসে-যায়।
তবু কিছু সন্ধ্যা আছে
যেখানে আমি আজও অপেক্ষা করি-
একটি ফোন বেজে উঠবে,
ওপাশ থেকে কেউ বলবে,
‘কী হয়েছে রে,মা?’
তারপর আর কোনো প্রশ্ন থাকবে না।
আমি শুধু চুপ করে থাকব,
আর সেই নীরবতার ভেতর
আবার একবার
আম্মাজির মেয়ে হয়ে উঠব।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মন্তব্য করুন

Trending

Discover more from শিকড়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading