শেলির বিখ্যাত উক্তি, “Poets are the unacknowledged legislators of the world”,
কবিরা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন করেন না, কিন্তু মানুষের কল্পনা, বিবেক ও মূল্যবোধের জগতে তাঁর প্রভাব থাকতে পারে। কবিতা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় এবং প্রতিষ্ঠিত সত্যের আড়ালে থাকা অসংগতি দেখতে সাহায্য করে।
একজন কবি তাঁর সময়কে কীভাবে ধারণ করেন, তা তাঁর সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব বোঝার অন্যতম চাবিকাঠি।
কবিতা কেবল অনুভূতির প্রকাশ নয়, অনুভবকে নতুনভাবে চিনতে শেখারও এক শিল্পমাধ্যম। একজন কবি তাঁর সময়, সমাজ, ইতিহাস ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যে জীবনকে আবিষ্কার করেন, কবিতায় তারই রূপান্তর ঘটে। কখনো সেই রূপান্তর স্মৃতির কোমলতায়, কখনো প্রতিবাদের তীব্রতায়, কখনো নিঃসঙ্গতার গোপন ভাষায়, আবার কখনো মানুষের অস্তিত্বসংকটের গভীর উপলব্ধিতে প্রকাশিত হয়। কবির সার্থকতা শুধু কী বলছেন, তার মধ্যে নয়, কীভাবে বলছেন, সেই শিল্পগত স্বাতন্ত্র্যের মধ্যেও নিহিত।

একজন কবি বা লেখককে যথার্থভাবে জানতে হলে শুধু তাঁর কবিতা, গল্প কিংবা অন্যান্য সাহিত্যকর্ম পাঠ করাই যথেষ্ট নয়। তাঁর জীবনদর্শন, চিন্তার জগৎ, ব্যক্তিগত বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা এবং সমকালীন ও পারিপার্শ্বিক অবস্থান সম্পর্কেও গভীরভাবে অবহিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ একজন কবির সৃষ্টিশীল সত্তা কেবল তাঁর লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তাঁর জীবনবোধ, আত্মোপলব্ধি, সামাজিক অভিজ্ঞতা ও সময়ের সঙ্গে নিরন্তর মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তা বিকশিত হয়।
কবি আতাউর রহমান মিলাদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আমি দীর্ঘদিনের পরিচয় ও পারস্পরিক যোগাযোগের সূত্র ধরে তাঁর সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি তাঁর আদর্শিক জগৎ, জীবনদর্শন এবং চিন্তার অন্তর্লোককে বোঝার চেষ্টা করেছি।
কবিকে নিয়ে আমার এই লেখার সূত্রপাত ২০১৬ সালে, তাঁর পঞ্চাশতম জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে আজ আবার তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে লেখাটিকে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন অনুভব করেছি। তাঁর পরবর্তী সময়ের সাহিত্যচর্চা, প্রকাশনার ধারাবাহিকতা এবং সাম্প্রতিক দুটি গ্রন্থ, কান্নার স্বরগ্রাম ও নির্বাচিত ১০০ কবিতা, এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। ফলে এটি কেবল পুরোনো একটি প্রবন্ধের পুনর্লিখন নয়; বরং দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রার দিকে ফিরে তাকিয়ে একজন কবির সৃষ্টিশীলতা, নিজস্বতা ও সম্ভাবনাকে পুনর্বিবেচনার প্রয়াস।

বাংলা কবিতার আশির দশকের অন্যতম শক্তিমান কবি আতাউর রহমান মিলাদের সাহিত্যিক অভিযাত্রা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত। তাঁর কবিতার জগৎকে শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি কিংবা সময়ের রাজনৈতিক অভিঘাত দিয়ে ব্যাখ্যা করলে তার সম্পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়বে না। স্মৃতি, আত্মপরিচয়, নিঃসঙ্গতা, ইতিহাস, প্রবাস এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তাঁর কবিতার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ব্যক্তিমানসের অন্তর্গত অস্থিরতার সঙ্গে বহির্জগতের সংঘাত মিলিয়ে তিনি এমন এক কাব্যভুবন নির্মাণ করেছেন, যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বৃহত্তর সামাজিক ও অস্তিত্ববাদী প্রশ্নের দিকে প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

কবির কাব্যদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের অভ্যন্তরীণ জগৎকে সময় ও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন না করা। মানুষের মন কোনো নির্জন দ্বীপ নয়; ব্যক্তিগত বেদনা, স্মৃতি, ভয়, আকাঙ্ক্ষা ও দ্বিধা সামাজিক পরিবেশ এবং ইতিহাসের সঙ্গে ক্রমাগত সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলোর শিরোনামেও স্মৃতি, অন্ধকার, জটিলতা, দুঃখ ও কান্নার মতো অনুষঙ্গের পুনরাবির্ভাব লক্ষণীয়। এগুলোকে তাঁর সামগ্রিক কাব্যচিন্তার সম্ভাব্য প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখা যায়।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর কবিতাকে পাঠ করলে আত্মপরিচয়ের সংকট, স্মৃতির দ্বৈত ভূমিকা এবং মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব নিয়ে অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। স্মৃতি একদিকে ব্যক্তিকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে, অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়া সময়ের বেদনাও জাগিয়ে তোলে। অন্ধকার কখনো বাইরের বাস্তবতার প্রতীক, কখনো মনের অজ্ঞাত অঞ্চল, আবার কখনো আত্মসমীক্ষার অবকাশ হতে পারে। এই বহুমাত্রিক সম্ভাবনা তাঁর কাব্যবিশ্বকে মনস্তাত্ত্বিক পাঠের উপযোগী করে তোলে। উত্তরাধুনিক প্রেক্ষাপটেও আতাউর রহমান মিলাদের কবিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। উত্তরাধুনিক চিন্তা একক, স্থির ও সর্বজনীন সত্যের ধারণাকে প্রশ্ন করে; ব্যক্তির পরিচয়কে দেখে বহুমাত্রিক ও পরিবর্তনশীল হিসেবে। প্রবাসী জীবনের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নগুলোকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে।

কবির সাম্প্রতিক দুটি কাব্যগ্রন্থ, নির্বাচিত ১০১ কবিতা (২০২৩) ও কান্নার স্বরগ্রাম (২০২৬), পাঠের পর তাঁকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ পেলাম। দীর্ঘদিনের পরিচিত কবির রচনার ভেতরেও যে অনাবিষ্কৃত স্তর থেকে যেতে পারে, এই পাঠ তারই অভিজ্ঞতা।
কবির নির্বাচিত ১০১ কবিতা-তে ব্যক্তি, সমাজ, সময়, প্রেম, দ্রোহ ও মানবিক দায়বোধের বহুমাত্রিক প্রকাশ কবির দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রাকে একত্রে দেখার সুযোগ দেয়। একটি নির্বাচিত কবিতার সংকলন পাঠককে কবির রচনার বিস্তৃত পরিসরে প্রবেশের সুযোগ দেয়। বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত কবিতাগুলো যখন একত্রে পাঠ করা যায়, তখন কবির সাহিত্যিক স্বর, ভাবনার বৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন বিষয়কে দেখার পদ্ধতি নিয়ে সামগ্রিকভাবে ভাবা সম্ভব হয়।
কান্নার স্বরগ্রাম ও কবির সাম্প্রতিক সৃষ্টিশীলতাকে বিচার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর বর্তমান কবিতায় কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, বিষয় ও ভাষার বিন্যাসে কী ধরনের ধারাবাহিকতা বা পরিবর্তন এসেছে, এবং ব্যক্তিগত অনুভব কীভাবে বৃহত্তর জীবনবোধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, এসব প্রশ্ন নিয়ে আরও নিবিড় আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
তাঁর দীর্ঘ কাব্যিক পরিচয়ের পরও এই দুই গ্রন্থ আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রকৃত কবিকে আবিষ্কার করা কখনো শেষ হয় না। প্রতিটি নিবিড় পাঠেই তাঁর পরিচিত শব্দের অন্তরালে খুলে যেতে পারে নতুন অর্থের দরজা। এই দুটি গ্রন্থের গুরুত্ব এখানেই যে, এগুলো আতাউর রহমান মিলাদের দীর্ঘ সাহিত্যিক যাত্রাকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে। একজন কবির সাহিত্যজীবন শুধু তাঁর প্রথম প্রকাশনা কিংবা অতীতের অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকে না। নতুন প্রকাশনা তাঁর সৃষ্টিশীলতার চলমান অবস্থাকে সামনে আনে এবং পুরোনো রচনাগুলোকেও নতুন দৃষ্টিতে পাঠ করার সুযোগ দেয়।
১৯৮৭ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী কবির সাহিত্যিক পরিচয়ে জন্মভূমি ও প্রবাস, স্মৃতি ও বর্তমান, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সমষ্টিগত ইতিহাসের সম্পর্ক বিশেষভাবে বিবেচ্য। তবে তাঁকে সরাসরি উত্তরাধুনিক কবি হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তাঁর কবিতার ভাষা, গঠন, বয়ান ও অর্থ নির্মাণের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বিষয়গত জটিলতা একাই কোনো সাহিত্যকে উত্তরাধুনিক করে তোলে না।

বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজারের শ্রীনগর এলাকায় জন্ম নেওয়া আতাউর রহমান মিলাদের সাহিত্যিক চেতনায় জন্মভূমি ও শৈশবের স্মৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানোর পর তাঁর জীবনে প্রবাসের অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব মানুষের স্মৃতিকে সব সময় দূরে সরিয়ে দেয় না। কখনো দূরত্বই শিকড়ের প্রতি আকর্ষণকে আরও গভীর করে তোলে। প্রবাসী লেখকের কাছে জন্মভূমি শুধু একটি ভূখণ্ড নয়। তা শৈশবের আলো, পরিচিত মানুষের মুখ, নদী ও জনপদের স্মৃতি, ভাষার আশ্রয় এবং নিজের অস্তিত্বের উৎস। বর্তমানের ভিন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে অতীতের সেই পৃথিবীকে ফিরে দেখা মানে শুধু হারানো সময়ের জন্য আকুল হওয়া নয়, নিজের পরিবর্তনকেও উপলব্ধি করা।
আতাউর রহমান মিলাদের কবিতায় স্মৃতি কেবল অতীতের আশ্রয় নয়, আত্মপরিচয়ের নির্মাণ ও ক্ষতেরও অনুষঙ্গ। অন্ধকার শুধু হতাশার প্রতীক নয়, কখনো তা নিজের ভেতরকে দেখার আয়না। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত বেদনা সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়, আর প্রতিবাদ মানবিকতার প্রশ্নে নতুন তাৎপর্য পায়। মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি ও সময়সচেতনতার এই সম্মিলনই তাঁর কাব্যভুবনকে পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক করে তোলে।

১৯৮৪ সালে প্রকাশিত দুঃসময়ের চিৎকার থেকে তাঁর কাব্যযাত্রার সূচনা। পরবর্তী সময়ে হৃদয়ের জানালা খুলে (১৯৯০), আর যদি একটা গুলি চলে (১৯৯৯), কবিতার চেকবই (২০০৫), স্মৃতিহীন অচিন আঁধার (২০০৫), স্বরচিত অন্ধকার (২০১১), জলভরা জটিলতা (২০১৪), স্মৃতির সেলাই (২০২১), নির্বাচিত ১০১ কবিতা (২০২৩) এবং কান্নার স্বরগ্রাম (২০২৬) তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যিক অভিযাত্রার পরিচয় বহন করে। তাঁর গল্পগ্রন্থ তোমার দেওয়া দুঃখ (২০০৫) ও স্বপ্ন ও ছায়া (২০০৭) কবিতার বাইরেও তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিস্তার নির্দেশ করে। কাচঘর অথবা অন্ধকারের আয়না (২০২৭) যন্ত্রস্থ গ্রন্থ হিসেবে তাঁর প্রকাশনাপ্রস্তুতির তালিকায় রয়েছে।
আতাউর রহমান মিলাদের সাহিত্যিক পরিচয়ের আরেকটি দিক তাঁর সম্পাদনাকর্ম। ত্রৈমাসিক শাপলা, ভালোবেসে অন্ধ হই ও তৃতীয় বাংলার কবিতাসহ বিভিন্ন সাহিত্য উদ্যোগের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি সাহিত্যপত্র শব্দপাঠ-এর প্রধান সম্পাদক। নিজের সৃষ্টিশীলতার পাশাপাশি সাহিত্যসম্পাদনায় তাঁর ভূমিকা বাংলা ভাষার সাহিত্যিক পরিসর নির্মাণের সঙ্গে সম্পর্কিত। সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তাঁর সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্য। ত্রৈমাসিক শাপলা, সাম্প্রতিক সাহিত্য, ভালোবেসে অন্ধ হই, তৃতীয় বাংলার কবিতা এবং শব্দপাঠ-এর সঙ্গে তাঁর সম্পাদনাগত কাজের সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে তিনি সাহিত্যপত্র শব্দপাঠ-এর সম্পাদক-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্পাদনা কেবল লেখা সংগ্রহ ও প্রকাশের কাজ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সাহিত্যবোধ, রচনার নির্বাচন, নতুন লেখককে পাঠকের সামনে তুলে ধরা এবং একটি সাহিত্যিক পরিসর নির্মাণের দায়িত্ব। বিশেষত প্রবাসে বাংলা ভাষার সাহিত্যচর্চা ধরে রাখা ও বিকশিত করার ক্ষেত্রে সাহিত্যপত্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের সৃষ্টিশীলতার পাশাপাশি অন্যের সাহিত্যকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ একজন লেখকের সাংস্কৃতিক ভূমিকা প্রসারিত করে। মিলাদের কবিতা, গল্প ও সম্পাদনাকর্মকে একত্রে বিবেচনা করলে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি পূর্ণতর চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব হবে।

কবি আতাউর রহমান মিলাদকে আমি প্রায় চার দশক ধরে জানি। এই দীর্ঘ সময়ে খুব কাছ থেকে তাঁর সাহিত্যচর্চা, কাব্যিক বিবর্তন, সৃজনশীলতার নানা বাঁক এবং একজন ব্যক্তি কবির ক্রমবিকাশ পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়েছে। তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে প্রকাশিত অসংখ্য গ্রন্থ ও রচনার সবগুলো হয়তো আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে নেই, তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকাশনা ও রচনা আমার সংগ্রহে রয়েছে। একজন মনোযোগী ও নিবিড় পাঠক হিসেবে তাঁর সাহিত্যকর্ম পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে আমি দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারি, আতাউর রহমান মিলাদের সৃষ্টিকর্ম কেবল পরিচিতি কিংবা প্রশংসার পরিসরে আবদ্ধ রাখার বিষয় নয়; বরং তা আরও গভীর পাঠ, নিবিড় পর্যালোচনা ও গবেষণার দাবি রাখে। তাঁর সাহিত্যভুবনের বহুমাত্রিকতা, বিষয়বৈচিত্র্য, জীবনবোধ এবং সৃজনশীল অভিযাত্রার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবনের জন্য প্রয়োজন আরও বিস্তৃত ও বিশ্লেষণধর্মী পাঠচর্চা।
তাঁর কবিতার বিষয়বৈচিত্র্য, ভাষার স্বাতন্ত্র্য, ইতিহাসচেতনা, প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিমানসের অন্তর্গত টানাপোড়েন নিয়ে সুসংগঠিত সাহিত্যসমালোচনার সুযোগ রয়েছে। একজন কবিকে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর রচনার শিল্পমূল্য, নির্মাণকৌশল, বিষয়ভাবনা এবং সময়ের সঙ্গে কাব্যচিন্তার বিবর্তন বিচার করা প্রয়োজন।

কবির সাহিত্যিক অভিযাত্রাকে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর অর্জনের পাশাপাশি তাঁর রচনার সম্ভাবনাগুলোকেও দেখতে হবে। তাঁর কবিতা ও কথাসাহিত্য নিয়ে আলোচনা, প্রকাশনা-তথ্য সংরক্ষণ, প্রামাণ্য গ্রন্থপঞ্জি তৈরি এবং বিভিন্ন সময়ের রচনার তুলনামূলক পাঠ ভবিষ্যৎ পাঠক ও গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রশংসামূলক লেখা প্রকাশের পাশাপাশি কবিতার নিবিড় পাঠ, লেখকের সাক্ষাৎকার, প্রামাণ্য গ্রন্থপঞ্জি এবং বিভিন্ন সময়ের রচনার তুলনামূলক আলোচনা প্রয়োজন। কবির সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য কোথায়, তাঁর ভাষা ও নির্মাণের বিশেষত্ব কী, বাংলা কবিতার বৃহত্তর ধারার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন, এসব প্রশ্ন নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা গড়ে তোলা গেলে শিকড়ের সাহিত্যিক ভূমিকা আরও অর্থবহ হবে।

আতাউর রহমান মিলাদ ২০০৮ সালে সংহতি সাহিত্য পদক লাভ করেন। ২০১৬ সালে ‘আমরা কভেন্ট্রিবাসী’ সংগঠনের পক্ষ থেকেও কবিতা-সাহিত্যে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সম্মানিত করা হয়। এই স্বীকৃতিগুলো তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার পথে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
তবে পুরস্কার কিংবা সম্মাননা কোনো সাহিত্যকর্মের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করে না। একজন লেখকের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারিত হয় তাঁর রচনার স্থায়িত্ব, পাঠকের সঙ্গে তার সম্পর্ক, সময়ের পরীক্ষায় তার প্রাসঙ্গিকতা এবং সাহিত্যিক আলোচনায় তার তাৎপর্যের মধ্য দিয়ে।
একজন কবিকে যথার্থ সম্মান জানানোর অর্থ কেবল তাঁর গুণকীর্তন করা নয়। তাঁর রচনার অন্তর্নিহিত শক্তি, সীমা, স্বাতন্ত্র্য ও সাহিত্যিক তাৎপর্যকে নির্মোহভাবে অনুধাবন করাও সেই সম্মানের অংশ।

কবি আতাউর রহমান মিলাদের সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্ক কেবল একজন কবির লেখা প্রকাশের সম্পর্ক নয়, এটি দীর্ঘদিনের সাহিত্যিক সহযাত্রা। ১৯৯৮ সালে শিকড়ের যাত্রার সূচনালগ্ন থেকেই তাঁর কবিতা ও গল্প এই পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হয়ে আসছে। ফলে কবির সঙ্গে শিকড়ের যেমন নিবিড় বন্ধন গড়ে উঠেছে, তেমনি শিকড়ের পাঠকের কাছেও তাঁর কাব্যজগৎ ক্রমে পরিচিত, অনুসন্ধানী ও অনুভবের এক নিজস্ব পরিসর তৈরি করেছে। কবি আতাউর রহমান মিলাদের সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্ক কেবল একজন কবির লেখা প্রকাশের সম্পর্ক নয়, এটি দীর্ঘদিনের সাহিত্যিক সহযাত্রা।
আমরা বিশ্বাস করি, শিকড় আগামী দিনগুলোতে বাংলা সাহিত্যচর্চা, কবিতা নিয়ে গভীর আলোচনা এবং মননশীল সাহিত্যসমালোচনার ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনাময় অবস্থান তৈরি করতে পারবে। সেই যাত্রায় আতাউর রহমান মিলাদের মতো কবিদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে নিবিড় পাঠ, বিশ্লেষণ ও গবেষণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কবির সাহিত্যিক যাত্রা দীর্ঘ, আর সেই যাত্রার মূল্যায়নও একদিনের কাজ নয়। তাঁর রচনার শক্তি ও সীমা, স্বাতন্ত্র্য ও সম্ভাবনা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সমষ্টিগত ইতিহাসের সম্পর্ক আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা দরকার। আমরা চাই, আতাউর রহমান মিলাদের সাহিত্যকর্মকে ঘিরে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পাঠ ও গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি হোক।

জন্মদিনের এই উপলক্ষে কবির প্রতি আমার এবং শিকড়ের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা রইল। তাঁর সৃষ্টিশীলতা আরও সমৃদ্ধ হোক, তাঁর কলমে নতুন অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির প্রকাশ ঘটুক। তাঁর সাম্প্রতিক প্রকাশনাগুলো নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছাক এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে গভীর পাঠ ও গবেষণার যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা আরও বিস্তৃত ও প্রামাণ্য আলোচনার মধ্য দিয়ে বিকশিত হোক।

দীর্ঘজীবী হোন কবি। আপনার কলমে জেগে থাকুক শিকড়ের স্মৃতি, মানুষের মুক্তির স্বপ্ন এবং সেই সৃজনশীল আলো, যা অন্ধকারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে জানে না।

শুভ জন্মদিন, সুপ্রিয় কবি আতাউর রহমান মিলাদ।

ফারুক আহমেদ রনি
সম্পাদক, শিকড়



শিকড়ের পাঠকের জন্য শুভ জন্মদিন, কবি আতাউর রহমান মিলাদ- এর একগুচ্ছ কবিতা

সীলমোহর

রাসেল স্কোয়ারের ষ্টারবাকস’র কফির ধোঁয়া
উড়তে উড়তে মিশে যায়
রমিজের টং দোকানের ফিকে চায়ের কাপে
চামচের টুংটাং ছড়িয়ে পড়ে জন্মগ্রামে
পা ভাঙ্গা বেঞ্চের প্রাণখোলা আড্ডায়
খুচরো গল্পের আনন্দ ভ্রমণে…
মফস্বলি দোকানের লো ভোল্টেজের হালকা আলো
দুর যাপনের নিঃসঙ্গতা পেরিয়ে
আলোকিত হয় ষ্টারবাকস’র রঙিন দোকান
দুরত্ব মেপে রাত গাঢ় হয় কফির কাপে
উপুড় হয়ে খুঁজি কর্তিত স্মৃতির আবেগী উত্তাপ
দীর্ঘ ছায়ার পাশে গহিন অসুখ…
ভাসতে ভাসতে জীবন-হাওয়ার মিঠাই
এইভাবে ঠিক-
রমিজের চা স্টলের প্রাত্যাহিক দৈন্যতা
ষ্টারবাকস এ পায় জৌলুস অবয়ব


ভয়ের বিন্যাস

যে পথে হেটে গেছি রোজ
জয় করে যতো সর্পভয়
কখনও দেখিনি ভেবে
সে পথ কি আমাকে
ডেকেছিলো,একবারও!

ভুল পথে বহুকাল
কুড়িয়েছি সৌখিন আগুন
বহুদাবিভক্ত পৃথিবীর শস্যদানা খুঁটে
উঠেছি বেড়ে
শিকড়হীনতার মৌলিক সৌন্দর্য্যে!

যে যা বলুক,বহুদুর এসে গেছি পথ
হবেনা ফেরা আর,বাতাসের শিস চিনে
সময় ও সম্পর্কে
বিরহ ও বৈরিতায়
জগতের আর্দ্রতা ফেলে অনুদিত ঘুমের প্রহরে


জলজ ভ্রমণ

ভাঙতে চেয়েছি জলের জমাট
বিভ্রম কুয়াশা খুলে,
রাতের শিয়রে একজোড়া চোখ
পর্দা দিয়েছে তুলে।

যত্নে জমা প্রেমে অপ্রেমে
ভাঁজ করা যত ভুল,
দীর্ঘ চুলের গহীন আঁধারে
জ্যোসনায় ফুটা ফুল।

জলের ভেতর জলের উৎসব
জলজ নাভির ঘ্রাণ,
দেহের ভাঁজে গোপন সাঁতার
ঘড়ির কাটায় প্রাণ।

জলের উপর আচড় কাটা মায়া,
হাত বাড়ালেই স্বপ্ন বিভোর ছায়া।


চরাচর

সচল সময় থমকে আছে পায়ের উপর পায়ে
সুলভ মুল্যে কেনা জীবন ভেজাই গরম চায়ে

চায়ের গন্ধ নাকে আসেনা স্থির কলরোল
মোহের ঘোরে বুঝতে পারিনা কখন কোথায় ভুল

ভুলের দেনায় স্বপ্ন হারায় মৃত্তিকা ও মন
বুক পকেটে পোকার বসত নীরব টেলিফোন

টেলিফোনে মন বসেনা আকাশ বাজায় তালি
বৃষ্টি করে মেঘের সাথে জলের ঘটকালি..


হলুদ দ্রাঘিমা

 
পোড়া মাংসের স্বাদ ঝুলে আছে জিভে

আদিকালের তালু চেটে খাচ্ছে সবাই
মাংসের ঘ্রাণেও বাড়ে সর্বগ্রাসী ক্ষুধা

বাবার বোকা ছেলেটা চালাক হয়েছে

মাংসের বাটি চালান করে সন্তর্পণে
অমৃতদিনে কিনে ক্ষুধার্তের ভাগ

পাখির মাংস পোড়া গন্ধ ভাসে বাতাসে
কার ঘরে পাখি মরে মধ্যদুপুরে
কোন উনুনে পুড়ে আগুনের পাখা?


ছায়া ধারণের পর

বহুকাল দাঁড়িয়ে আছি নিঃসঙ্গ সিঁড়িতে
রক্তের দাগ মুছে পবিত্র হয়েছি কবে!
সময় ও সাহসে জেনেছি কার পায়ের ছাপ
পড়ে আছে এই বাংলার জনপদে

ঘুম ভাঙ্গিওনা জনক ও জননীর
পাতা ও বৃক্ষের
শুয়ে আছে যারা অনন্তকালের স্তব্ধ প্রবাহে
যদি পারো
আয়ত্ব করো তাদের জীবন প্রণালী
স্বপ্ন ও সম্ভাবনা
ধ্যানে ও জ্ঞানে

কেঁদে ওঠোনা সহস্র ভুলের নীরব আর্তনাদে
আঙুলে বোনে রোদের স্বভাব
সম্পর্কের নাভি ও নাড়িতে

জন্মসূত্রে এঁকে দাও বিবিধ চুম্বন।


বরফের শোক

বন্ধুরা বলে,ভাগ্য লিখা আছে করতলে
সজ্ঞানে বেঁধেছি ঘর বিদেশে বৈতলে।
কপালে দুঃখ আছে,বন্ধুরা কয় হেসে,
ডাঙ্গায় রেখেছি প্রাণ জল ভালোবেসে।
নিজ গৃহে বাস করি অতিথি স্বভাব,
সুখে আছি সব মিলে মনেতে অভাব।
হাত ধরি হাত ছাড়ি সময় পোহাই,
উষ্ণতা নাই শুধু আগুনের দোহাই।

ফিরতে পারিনা পথে কত শত ভয়,
দুরে কাছে কেউ আজো দেয়নি অভয়।
ঘর খুঁজি দিবানিশি মানুষের ভিড়ে,
ঘর কই? পড়ে আছি অচিন নগরে।
মানুষের ভিড়ে যত পলাতক ছায়া,
ভিন দেশে জুটেনাতো শর্তহীন মায়া।
ঝিম ধরে বসে থাকি ষড়ঋতু প্রাণ,
পাইনা যে মাঠে ঘাটে শৈশবের ঘ্রাণ।
হয়েছি ঘরের বার খুঁজে নেবো সুখ,
রোদের বারান্দা ভরা অসুখ বিসুখ।


তৃতীয় পৃষ্টার জীবন

যতোটা জীবন দেখি ততোটা মানুষ দেখিনা
জীবন বন্দনা করে দেহের কংকাল
জীবন কোথায়?কাঠের পুতুল।
মুর্খতার হাট বসেছে নগরে নগরে
পড়িনি চোখের ভাষা কাংগাল উৎসবে
অন্ধরা আলোতে খুঁজে পোড়ার নিশানা!

ফুরিয়ে যাচ্ছে গান,ভাংগছে ঘুমের নদী
ক্যাসেটবন্দি কান্নার স্রোত
পায়ের রেখা গেছে সমুদ্রের পেটে
ঘুমে ঘুমে বেলা যায় পশ্চিমের ঘাটে
স্যাটেলাইট পৃথিবী জলরং ছবি হয়ে ভাসে

পাইনি খুঁজে আজো তৃতীয় পৃষ্টার জীবন।


নামলিপি

বইয়ের মতো ফিরিয়ে দিতে পারিনি স্মৃতি
আজও তার ছায়াসঙ্গী হই
আমাকে সে দেখেনি কখনও
সে আমার গ্রীণপার্কে দাঁড়িয়ে থাকা একুশ বছর
মাটিতে ঝরে পড়া পাতার বুদবুদ
নিঃশব্দে হারিয়ে যাওয়া পায়ের আওয়াজ
বুকের শাদা পৃষ্টায় কফির বাদামি দাগ

আমি তার ছায়াসঙ্গী হই স্মৃতিকাতর মন্ত্রমুগ্ধতায়
ছায়ার ভেতর খুঁজি ভুলের জখম
সনাতন আলপথে খোয়া গেছে সোনার কাঁকন
হিসেব রাখিনি তার সম্পর্কের ধ্যানে
সে আমার বুকেবাঁধা শোকের ব্যাজ,মৌন মিছিলে

স্মৃতির করাত কাটে স্মৃতিচিহ্ন কাল
ভগ্নাংশ দিনে থাকে চাকার চক্কর
ক্রমাগত ছুটে চলা পর্যটন দিন

দিনশেষে রাতশেষে ভাগাভাগি হই
তার স্মৃতি বুকে আজো একা জেগে রই।


পারদ ভ্রমণ

হতে পারি অবেলার অতিথি
অলস মধ্যাহ্ন কিংবা দুপুর রাতে
তবুতো আসি
ঘুরেফিরে দেখে যাই,শুনে যাই গহীন বিলাপ
প্রাত্যাহিক ভুল শেষে ভাগ শেষে
ভাঁজকরা সময়টুকু উল্টে দেখি বনসাই চোখে
খোসা ছাড়ানো দিনে

কে কখন তোমার মোড়ক উন্মোচন করেছে
সে বিষয়ে উদাসীনতা সফলতা এনেছে বেশী
পূর্ণদৈর্ঘ্য মেঘের পর যেটুকু সংগ্রহ, নিজস্ব আমার
তুমি ধারণ করো বৃষ্টির জলবিন্দু
আমি চিরকাল মুগ্ধ যাদুকর
খুঁজিনি জলের উৎসস্থল

হতে পারি অবেলার অতিথি
দুরবর্তী কোনো নদীর কূলে
তবুতো ফিরে আসি
মধুময় স্মৃতির কনিষ্ট আঙুলে


একটি স্বপ্ন একটি মন

তোমার কুড়িতম জন্মদিনের উল্টোপৃষ্টায়,আমার
হাতের এলোমেলো ছাপ,নিঃশ্বাসের তপ্ত স্পর্শ

গোড়াতেই স্পষ্ট ছিলো জোনাকী খোয়াব
সৌখিন পাখিরা দলবেঁধে গেয়েছিলো নক্ষত্রের গান
জ্যোৎস্নার ফুল তুলে গিঁথেছিলো বিনিদ্র চুলে

জন্মদিনের মধ্যপৃষ্টায়,মধ্য রাতের গল্পগুলো
শুয়ে আছে চুপচাপ,ঘুমচোখে তুমি
জানতে পারবেনা গল্পরা কতটা নীরব ছিলো!
মোমের শরীর খুলে ফোমের বিছানায়
খেলবে তুমি আগুন পাথর

কবেই অতিক্রম করেছো তুমি বোবাস্বপ্ন
শংকা সিঁদুর মুছে ভেজা শাড়ি মেলেছো দাওয়ায়
স্পর্শগন্ধমেখে পড়শিরা হয়েছে কাতর
কুড়িয়েছে নির্লজ্জ ওমের ঘুঙুর

এই শহরের একটি হলুদ বিকেল
জন্মদিনের সোনালী খামে ভরে রেখেছি
ফিরে এসে নিয়ে যাবে স্মৃতির ডাকপিয়ন
দেখে নিও-
কীভাবে পুড়ছে একটি স্বপ্ন একটি মন!


কান্নার স্বরগ্রাম

ছিড়ে গ‍্যাছে স্বর,অন্ধকার এ বিদ্যুতের শহর
পলকে পলকে ভয়,
ফিসফিস,কানাকানি
সন্দেহ চোখে ও মনে…
উৎকণ্ঠিত খিড়কির মুখ
মাকড়শার জালে বিভ্রান্ত সন্ধ্যা এক
পাহারায় উন্মাদ দল
অস্তিত্ব স্পর্ধায় যাত্রার আয়োজন
দুর্বোধ্য মন্ত্রপাঠ,রাতের বন্দনা

এমনও সময় আসে কুয়াশার কান্না
ভারী হয়ে ওঠে…


শূন্যস্থান

বহুতল ভবনের নিচে অসংখ্য কংকাল
অমীমাংসিত ভ্রমণের অপূর্ণ অর্জন
বেঁচে আছে বহুকালের রক্তাক্ত হৃদপিন্ড
ওরা আসে,ভাসে ঘরময়
আর্তস্বরে খুলে বসে ইতিহাসের পাতা
সাহসের লাল গালিচায় মুক্তির সহোদর
শেকড় গভীরে কংক্রিটের হাড়
কথার পাঁজরে আত্মগত অভিমান
অবিন্যস্ত সময়ের ফসিল দেয়াল
দ্রবীভূত মেঘের দীর্ঘশ্বাস,স্মৃতির নহর
জংধরা জবানের ধার,বিমূর্ত জখম
ঈশারা ইঙ্গিতে গোপন ট্রাজেডি
ভয়ার্ত পিতলের চোখে
দিনযাপনের ক্ষমাহীন জল!


ডানার পরশ

ছায়া হতে চেয়েছিলাম,রোদ গেলো সরে
দীর্ঘ অব্যবহারে সরু পথ গেছে মরে
এই মরা পথে একদা বাবা হেঁটেছেন বহুদুর
কালের বাঁশিতে বাজে হারানোর মৃদু সুর!
স্বর ও সুরের ব্যবদানে একচিলতে রোদ
পিপাসার্ত মন খুঁজে ছায়ার প্রবোধ
ছায়ারা যুক্তবর্ণ,অদৃশ্য সূতোর গিঁট
ঝাপসা মনিটরে ওড়ে স্মৃতির কংক্রিট


ক্ষরণ

এক চোখ রেখেছি খোলা অন্য চোখ বন্ধ
দুর থেকে ভেসে আসে ছাড়পোকার দ্বন্দ্ব

দিকে দিকে উত্থিত হাত,প্রার্থনার ফুল
দুরের হাওয়ায় দুলছে মাটি,অর্জনের ভুল।

বিজ্ঞাপিত যাপনের কাল,সময় স্বপ্নহারা
তপ্তরোদে পুড়ছে বুকের ওম,মৃত স্রোতধারা

চারপাশে সন্দেহ এতো,থেমে গেছে গান
ছেঁড়াখোঁড়া খামে,মেঘজমা অভিমান

বেড়ালের পায়ে ঘুরে এক মুন্ডুহীন সাপ
ধারহীন পেন্সিল কাটে,গৃহের পাপ


ভোরের আখ্যান

ভাঙ্গা সেতু পার হয়ে স্বপ্নরা আসে,
তর্কে গড়ানো সন্ধ্যার চায়ের কাপে
ধোঁয়ার কুন্ডুলি মিলায় বাতাসে।

হাতে হাত রেখে আগুন বুকে পুষে,
শীতের সন্ত্রাসে কাঁপে মোমশিখা
চিনিজমা কাপ তর্জনি যায় চুষে।

সামনের দিকে ছড়ানো সবার পা,
খসখসে বেঞ্চে সময় ইস্ত্রিহীন
সবুজ ঘাসের নীচে গরিমা চাঁপা।

রাস্তার মোড়ে মনোহরী দোকান,
পৃথিবী জয়ের ভাড়াটে বাসনায়
নিজেকে পোড়ায় পরগাছা প্রাণ।

মৃতপ্রায় জোনাকীর আলো ওড়ে,
কথার ফুলকিঝরা তুমুল আড্ডা
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ আঘাতের ঝড়ে।

লোডশেডিংয়ে লুকিয়ে থাকা মুখ,
লাল কামিজের তলে শ্রমজীবি রাত
নিশিথের আয়নায় নিষ্প্রভ চোখ।

বাজারের পথ বহুদুর যতিহীন টান
রাত বর্ণনা করে ভোরের আখ্যান!


মেঘের কার্ণিশ

মাটির পুতুল ভেঙে মন খারাপের দিনে
হাত চেপে ধরেছিলো প্রেম,সব জেনে
চুমুতে চিহ্নিত কাল,প্রত্যহ যাচ্ছে বেড়ে
পকেটে তুরুপের তাস হাতে হাতে ঘুরে
কপালে সূর্যের ফোটা,বন্ধক রাখা দিন
ইচ্ছেরা পলাতক,ঘুরে আজন্ম স্বাধীন
পিরীতের সংসার সেতো বুকখোলা মাঠ
হুকখোলা দিনরাত রিপুর রহস্য পাঠ
সবকিছু বুঝা হলো বুঝিনি আবেগ
ঝড় শেষে কার্ণিশে এক টুকরো মেঘ।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মন্তব্য করুন

Trending