কিছু লেখক সময়ের সন্তান নন—সময়ই তাঁদের সন্তান। মহাশ্বেতা দেবী তেমনই এক নাম। তাঁর লেখা কোনও নির্দিষ্ট দশক, মতবাদ বা সাহিত্য-ফ্যাশনের মধ্যে আটকে নেই; বরং প্রতিটি সময়েই নতুন করে পাঠযোগ্য, নতুন করে অস্বস্তিকর, নতুন করে জরুরি। তাঁর জন্মশতবর্ষ শুরু হওয়ার এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই স্মরণ নয় বরং ফিরে দেখা, নতুন করে তাঁর রচনাকে বোঝা, এবং সবচেয়ে বড় কথা—নিজেদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানোই তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান।

২০২৬ ক্যালেন্ডারের পাতায় নিছক একটি সংখ্যা বদল নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক মহীরুহের শতবর্ষে পদার্পণ। ‘শিকড় অনলাইন’-এর নতুন বছরের যাত্রা তাই এবার উৎসর্গিত হল মহাশ্বেতা নামক সেই কলমযোদ্ধার প্রতি, যিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন—সাহিত্য কেবল ড্রয়িংরুমে সাজানো শৌখিন ফুলদানি নয়, সাহিত্য হলো প্রতিবাদের বারুদ, ইতিহাসের ধুলোমাখা দলিল।


মহাশ্বেতা দেবীর গল্প মানেই নিছক কাহিনি নয়। তাঁর গল্প মানে ইতিহাসের অদৃশ্য পাদটীকা, রাষ্ট্রের ভুলে যাওয়া মানুষ, উন্নয়নের চাকা পিষে দেওয়া শরীর, আর নৈতিকতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুরতা। তিনি গল্পকে ব্যবহার করেছেন দলিল হিসেবে—কিন্তু সেই দলিল কখনও শুষ্ক নয়, বরং রক্তমাংসে জীবন্ত ও দগদগে। তাঁর কলমে গল্প হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ, আর প্রতিবাদ হয়ে উঠেছে শিল্প।

আজ যখন আমরা গল্প লিখি বা পড়ি, তখন প্রশ্ন ওঠে—গল্প কি শুধু বিনোদন? না কি গল্প সেই জায়গা, যেখানে সমাজ নিজের আয়নায় নিজেকে দেখতে বাধ্য হয়? মহাশ্বেতা দেবী আমাদের শিখিয়েছেন, গল্প কখনও নিরীহ হতে পারে না। গল্প মানেই পক্ষ নেওয়া—হয় ক্ষমতার, নয় মানুষের।

শিকড় অনলাইন–এর এই বিশেষ গল্প সংখ্যায় আমরা সেই শিক্ষাকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে বহন করতে চেয়েছি। এখানে গল্প মানে কেবল আখ্যান নয়, আছে প্রান্তের কথা, নারীর শরীরের রাজনীতি, আদিবাসী জীবনের নিঃশব্দ ক্ষত, এবং নাগরিক সভ্যতার প্রশ্নবিদ্ধ আত্মতৃপ্তি। প্রত্যেকটি গল্প আলাদা, তবু তাদের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে এক অভিন্ন স্রোত—মানুষের কথা বলার দায়।
মহাশ্বেতা দেবী কোনও ‘মহান লেখক’ হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে চাননি; তিনি বারবার নেমে গেছেন মাটিতে, ধুলোয়, রক্তে। তাঁর জন্মশতবর্ষ তাই আমাদের কাছে উৎসব নয়, এক দায়িত্ব। এই সময় আমাদের নিজেদের সাহিত্যচর্চাকেও প্রশ্ন করতে হবে: আমরা কি কেবল সুন্দর বাক্য বানাচ্ছি, না কি সত্যের কাছে যাওয়ার সাহস রাখছি?

এই বিশেষ গল্প সংখ্যার মাধ্যমে শিকড় অনলাইন সেই সাহসের পক্ষেই দাঁড়াতে চায়। আমরা বিশ্বাস করি, শিকড় মানে শুধু অতীত নয়—শিকড় মানে মাটির গভীরে থাকা সেই অস্বস্তিকর সত্য, যা না ছুঁলে গাছ বাঁচে না। মহাশ্বেতা দেবী আমাদের সেই শিকড়ের দিকেই তাকাতে শিখিয়েছেন।

তাঁর জন্মশতবর্ষের সূচনায় এই গল্পসংখ্যা তাই কোনও স্মৃতিচারণা নয়—বরং এক চলমান সংলাপের শুরু। যে সংলাপ প্রশ্ন তোলে, বিরক্ত করে, ভাবায়, এবং কখনও কখনও নীরব করে দেয়।
গল্পের ভেতর দিয়েই আমরা তাঁকে স্মরণ করছি—কারণ মহাশ্বেতা দেবী নিজেও  বিশ্বাস করতেন গল্পই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ।

পিয়াল রায়
সহসম্পাদক ‘শিকড়’
ভারত

ছবি ঋণঃ পিন্টারেস্ট


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending