আসফ আলির কিস্যা

-ওয়াহিদার হোসেন

ধানখেতের মাঝখান দিয়ে ধান খেতে খেতে আন্ধারকোটা ফরেস্টে ঢুকে পড়ে হাতির দল।হাজিপাড়া, মুন্সীপাড়া,বলোয়াধুরা থেকে পটকার আওয়াজও ততক্ষণে স্তিমিত হয়ে আসে।

ছাম। ছাম।দেখা পাসিত?
চোখ ঘষ্টেও কিছু দেখা যাচ্ছেনা।দেখা যায় খড়ের টুকরো,নাড়া।দুই তিনটা খোটু কাটা হয়েছে।যতদূর চোখ যায় ধান ধান।আমান দেখে ধানগাছগুলো শুয়ে পড়েছে মাটির সঙ্গে। মা জায়নামাযে যেভাবে নুয়ে পড়ে সেজদা দ্যায়।
কিন্তু ছাম মানে তো গাইন দিয়া কুটা শবেবরাতের সময়।নরম উঠানের ওপর যেভাবে দাগ পড়ে যায় ছামের। কিন্ত এতসকালে ছামের দাগ কোথা থেকে আসবে?
জায়গায় জায়গায় শনপাপড়ির মতো উচু নরম মল।

বুজির নাই?আরে বুদ্ধু ওই দ্যাখ ছামের দাগ।
চাচার কথা এতক্ষণে আমান বুঝতে পারে,ধানখেতের নরম জমিতে হাতির বৃত্তাকার পায়ের ছাপ।

আমানের চোখে তখনো পিঁচুটি লেগে আছে। শোরগোল শুনে ভোরে ঘুম ভেঙে গেছে। কিন্তু সাহস হয়নি ওঠার।বাড়ির পিছনে রাতেই হাতি এসেছিল।ইব্রাহিমের কাঠাল খেয়ে চলে গেছে।বাড়ির পিছনে হাতি পারাবারের রাস্তা।হাতিদের নিজস্ব গুগুলম্যাপ আছে। ধুমচি পাড়া থেকে সন্তানসম্ভবা মা দলবল সমেত এখানে এসে ঢুকে পড়ে।জঙ্গলের গহীনতম অংশে তাদের বসবাস। রাতে খেপ দিতে বের হয়।ধানখেত উজাড় করে।
শুনিস।আসফ বলে,
দুইদিন আগে ফরেস্ট লাগোয়া ইসলামের জমির কালানুনিয়া শেষ করে দিছে। দুইবিঘা জমির পাকা নুনিয়া।
হয়তো কয়েকদিনের মধ্যে ঘরোত তুলিল হায়।
হায় হায় করি জমির আলিত বসি মাথা চাপড়েয়ার ধইচ্চে ইসলাম, আর অর বউ আয়েজা।এলা চল্লিশ টাকা কেজি নুনিয়ার।দুই বিঘায়।হাতি যতটা খাইছে তার থাকি বেশি নষ্ট করিছে।ন্যাংটা হয়া পড়ি আছে জমিবাড়ি।এইলা কি সইহ্য করা যায়?ইসলাম কয়,মাহাকাল বাবা আসির কি টাইম পাইন নাই?কেনে বারে এত দোহাই দিনু তাও আসলু?কইলুং ওদি ওদি যাও বাবা।মুই গরীব মানষি।এইবার সংসার চলিবে কেমন করি?

বাড়ি ফিরে চাচা বসে বসে চা খায়।লালচা আর চালের গুন্ডা।দেওগাইয়া ভূত।দেওগাও গ্রাম থেকে ওরা উঠে আসে রাঙ্গালিবাজনায়।এখানকার লোকেরা আসফকে ভূত বলে।রাতের আঁধারে জাল নিয়ে মাছ মারে সকালে গোবিনহাটে,এমএলএ হাটে বিক্রি করে খট্টি দাড়াঙ্গি ঝিলা পয়া শিঙ্গি।কপাল ভালো থাকলে বোয়াল।আড় কি আর আগের মতো আছে?
নাই জন্যে ছুটে যেতে হয় রাতবেরাতে। আসফ ভাবে,আসফের মতো মাছুয়া আর আছে?কোনো বাপের বেটা দেখাতে পারবে?সে হাতটাকে উঁচু করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।

আসফ চা খেতে খেতে আবার উদযোগ করে।সে ভাবে, এখন মাত্র সকাল ছটা। আবার এক নিসি দিলে ক্ষতি কি?
উঠতে হবে নটায়। অসুবিধা নেই।ওর কাজতো রাতে বারোটার পরে। ভোরে ভোরে মাছ ঢেউরায়।একেক ছাপে উঠে আসে আধা কেজি কি পোয়া খানেক মাছ।সকালে আটটার মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে পচে যায় সরে যায়।দেশি মাছের কদর আলাদা।রাঙ্গালিবাজনায় সকাল সকাল নিয়ে গেলে কত টাকাওলা লোক।মাস্টার দোকানদার পাইকার।কত।চা খেতে খেতে দরদাম করে লোকেরা।
আসফ ভাব নেয়,বলে,নিগাও নিগাও।টাটকা।টেস্ট যা হোবেনা!
লোকে নেয়ও।তারপর বাড়ি ফিরে ঘুম।আজকে ভোরে এসে শুয়েছে মাত্র।মাছ বিশেষ পায় নাই।বাড়িতেই রেখে দেবে।আসফ ভাবে,ইচলা আর কয়টা চায়নাপুটি।বেঁচার দরকার কি?বাড়ির লোকগুলোও তো খাবে?
এই মাহাকাল বাবা এসে যত সমস্যা। ঘুমটা ভেঙে গেল।

সারাদিন আসফের কোন কাজ নেই। সে পিওর মাছুয়া। আড়ালে জালিয়া বলে তাকে সম্বোধন করে শরিফুন ভাবি।আসফ জানে।ভাবি ওকে বিশেষ একটা পছন্দ করেনা।কিন্তু ছেলের পাতে বড় দাড়াঙ্গিটা মাছটা তুলে দিতে দ্বিধা বোধ করেনা।আমানের পাতে মাছ তুলে দিলে সে খুশিই হয়।কিন্তু মানুষের মন।কোনদিনই আর দাড়াঙ্গি দিয়ে ভাত খাওয়া হয়না।

চাচা চা খায়া মোক একটু ঘুরি আন্না।
কেনে কোটে যাবু?
যাম বই পড়ির রোহানের নগদ পড়িম।
অ তুই যাবু?নানার বাড়ি?তা মোর সাইকেল খান ধরি যা।পাবু?
মুই হাফপ্যাটেল চালাও।
বড় কদ্দিন হোবো?
আমান হাসে।

আসফ গল্প বলা শুরু করে।একমাত্র নিষ্ঠাবান শ্রোতা আমান।
বাবার ছিলো ঘোড়া।দাদো একদিন আসিয়া বাবা আর চাচাক পুছিল কিরে সাইকেল নিবেন না ঘোড়া?
বাবা কইল, সাইকেল।চাচা কইল ঘোড়া।বাবা ঠকি গেইল।বাবার প্যাটেল মাইরতে দিন শ্যাষ।আর ওদি চাচার হইল ঘোড়া।সাদা ঘোড়া।ইংরেজ আমল।ওই সাদা ঘোড়ার চড়ি ভোরে চাচা কুনোটে গেলে ভোরে ভোরে লোকে ভাবিচিল জ্বিন।
আমানের দাদু গর্জে ওঠে।মুই সাইকেল নিসু।ঠিক আছে। কিন্তু আসফ তুই এত গল্পীদার ক্যানে?ছাওয়াটাক ছাড়।
লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে আসফ সরে পড়ে।

বাবার মুখে গালি শুনে আসফ দমে যায়।শ্রোতা হারানোর জন্য আঙুলে কামড় দেয়।আর এসব ঘটনা সে মায়ের কাছে শুনেছে। বাবা যে সাইকেল নিয়েছিল এর কোনো প্রমাণ সে পায়নি।তবে চাচার ঘোড়াটার ঠ্যাং নাকি কে কেটে দিয়েছিল।পরে ঘোড়াটা মারা যায়।এখন সে এসব গল্প এত ডিটেইলসে কোথায় শুনেছে আসফের মনে পড়েনা।খন্ড খন্ড ঘটনাকে জুড়ে সে কাহিনি বানায়।বেশি কথা বললে এড়িয়ে যায়।আসফ বোঝে।দিনেরবেলা লোকের কাজ থাকে।লোকে গল্প করতে চায়না। কিন্তু আসফ দমেনা।সে গল্প শোনাবেই।তাই বুড়ো বাবার ধমক খেয়ে বছর তিরিশের আসফ ঘরে গিয়ে ঢোকে।ঘুমটাকে ডাকে।আয় আয়।

দুপুরের সময়। মেঘ মেঘে বেলা বাড়ে।পুর্বদিকের মেঘগুলো হাওয়ায় হাওয়ায় পশ্চিমে চলে যায়।হই হড়কম্প থামে।ধানের সিজন শেষ হয়।ততদিনে হাতির বাচ্চা লাইন বেলাইন হয়ে ছুটতে শুরু করে। ধান শেষ হয়ে গেলে হাতিগুলো বেপরোয়া হয়ে ওঠে।ফরেস্টে থেকে বেরিয়ে হানা দেয় লোকালয়ে।মানুষের হাড়ি ভাঙচুর করে। খড়ের ঘরের ভেতর শুড় ঢুকিয়ে দেয়।চাল নুন ডাল সাবাড় করে গৃহস্থ আর মুদি দোকান থেকে।রেশনের চাল খায়।হাতে আগুনের উঁকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে মানুষ।মানুষ মানে সবল যুবকের দল।হাতে পটকা নিয়ে দূরে ভাগিয়ে দিতে চায়।মানুষ আশ্রয় নেয় পাকা ছাদঅলা ঘরে।চাপ চাপ সন্ত্রাসের মধ্যে দিয়ে মাস্টারের পাটাইয়ে আশ্র‍য় নেয় রিংকি। আর পিংকি।ততক্ষণে বাইরে চিৎকার শুরু হয়েছে আগে আইসো আগে আইসো।কেউ আর আগায় না।হাতির সামনে কে আগাবে।একেকটা দলে তিরিশ থেকে চল্লিশটা হাতি।মাস্টারের বাড়িতে দুটো দরজা।একটা সিড়ি দিয়ে ওঠা যায়।আরেকটা ইমার্জেন্সি দরজা।খুলে লাফ দিলেই হলো।

শ্রোতা যখন ঘন হয়ে আসছে রসিদের দোকানে।তখন আসফ উরুতে চাপড় মারে।
বলে, শাললা।দ্যাখ।এইঠে থাকিলে মনে হয় ম্যালেরিয়া হবে।তোমরা জানেন, ইখতিয়ার উদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি হামার উত্তরবঙ্গত আসিয়া মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়।তারপর অরে সেনাপতি অর কাল্লা কাটি দেয়।
বাংলায় বল,জোগেশ বাবু বলেন।
হ্যাঁ। বলতেছি।
আরে মাস্টারের গল্পটা ক না।হায়দার অস্থির হয়ে ওঠে।
জানিস হায়দার নামটা হজরত আলির?
এইটে হজরত আলি কোঠে থাকি আসিল?এইটা তো হাদিসের আলাপ না!হায়দার বলে।
হাদিস কি?জোগেশ মাস্টার জিগ্যেস করে।সদ্য সে দিনাজপুর থেকে রাঙ্গালিবাজনা হাইস্কুলে জয়েন করেছে।চা দোকানে চা খেতে খেতে আসফের গল্প শুনছিল।যদিও এদের সঙ্গে মেলামেশা স্ট্যাটাসের সঙ্গে যায়না।তবু গল্পটা ইন্টারেস্টিং। আসফের কাছ থেকে সে মাছ কেনে।বান্ধা কাস্টমার।
উসখুস করতে করতে হায়দার বলে,
আরে রিংকি পিংকির গল্পটা ক আগত।তারপর মাস্টারেরটা শুরু করিয়া ম্যালেরিয়া দিয়া শেষ করিস।
সে বাজার করতে এসেছিল।বউ বাড়িতে নেই।বাপের বাড়ি গেছে।তাই চা খেতে বেরোনো।

আচ্ছা।আসফ আবার শুরু করে,একদিন রাতিত মাস্টারের বাড়ি ঘেরি ফেলাইসে হাতির দল।রিংকি পিংকি আসি উঠিছে মাস্টারের পাটাই।মাস্টারের পাটাইয়ের চাইরপাশে সেলা বড় বড় জংলী হাতির পায়ের শব্দ। নুনের হাড়ি ওল্টে দিছে।চাউল খাওয়া শুরু কইরছে আন্ধন ঘরের। আর ওইসময় সবায় প্ল্যানিং করছে কুনো রকমে যদি পালানো যায়?কিন্ত পালানোর উপায় একটায়।ইমার্জেন্সি দুয়ার দিয়া লাফ।এমরা যতখুনে বুদ্ধি করে। হাতির শব্দ।পটকার শব্দ।পিংকি দিয়া দিসে ঝাপ।ঝাপ দিয়া হাতির সামনে।যেদি দৌড়ায় সেদি হাতি।মাঠ সাদা হয় গেইছে।রাস্তা নাই।ধানখেত নাই।নাড়া।আর চড়ায় বাদাম।বাদাম খেতের মইধ্যে দিয়া পাগলের মতোন ছুট পিংকির।জ্ঞানহারা অবস্থায়।পাগল অবস্থায়।যেহেতু প্রান বাচানো ফরজ।কিন্ত যাবে কোঠে?
আসফ থামে। শ্রোতাদের দিকে তাকায়।

জোগেশ মাস্টার ঘামতে শুরু করেছে।অন্ধকারে চা দোকানের বালবের আলোয় ওর কপালে ঘাম চিকচিক করছে।আসফ আরও উত্তেজিত হয়ে বর্ণনা শুরু করে,
যায়ায় হাজির পরেশদার বাড়ি।দাদা মোক বাঁচা।বলেই অজ্ঞান।পাচশো মিটার রাস্তা।ষোলো বছরের একটা মেয়ে কেংকরি যে আসিল!মৃত্যুক ফাঁকি দিয়া।একমাত্র আল্লাহ জানে আর পিংকি।পরেশদা আর তাপসী বৌদি বেরেয়া খাবার পানি দিছে।ততখুনে হুয়াই উটচে পিংকি মারা গেইসে।
এটা গাজাখুরি গল্প।হায়দার বলে।
জোগেন মাস্টার জিগ্যেস করে, হুয়াই কি?
গুজব।গুজব কয় মাস্টারদা।আসফ নির্বিকার উত্তর দেয়।
আচ্ছা।
হ্যাঁ। হাতির যা অইত্যাচার।

জোগেন মাস্টার বাড়ি যাওয়ার সময় রাস্তার দুপাশে লাইট মারতে মারতে হাড়ি ফেরে।যদিও সে শুনেছে।মানে আসফই বলেছে হাতি তো পার হয় গেছে।মুজনাই পেরিয়ে।বাচ্চা বড় হয়ে গেছে।এখন মাইগ্রেট করবে।
জোগেন মাস্টার ভাবে একজন গ্রাম্য জেলে কিভাবে মাইগ্রেট শব্দের ব্যবহার জানে?

রাতের অন্ধকারে বাড়ি ফিরে আসফ।আসফ এখন জাল বুনবে।জাল বোনা হয়ে গেলে কিতাব নিয়ে বসে।কিতাবে আছে জংগে খয়বর।হজরত আলি যাকে নবিনন্দিনী মা ফাতেমা আবুল হোসেন সম্বোধন করেন ভালোবেসে।
আবুল হোসেন কিভাবে কলার গাছের মতো শির কেটে কেটে রাস্তা করছে।আহা জংগে খয়বর।যখুনি আসফের গল্প ফুরিয়ে যায় সে কিতাব নিয়ে বসে।কিতাবের নাম জংগে খয়বর। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সেই যে বাবার তাড়া খেয়ে সে হলদিবাড়ি গেল তখন মেলায় কিনেছিল।হলদিবাড়ি হুজুরসাহেবের মেলায়।মেলায় ছিলো সাদ্দাম হোসেনের একখানা ক্যালেন্ডার। যেখানে সানগ্লাস পরা সাদ্দামের ছবি ট্যাঙ্কের সঙ্গে। প্লেনের সঙ্গে। একখানে কোলাজের মতো মুসলিম উম্মাহর হেফাজতকারী ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেন।আমেরিকার জর্জ বুশের বাহিনিকে নাকানি চুবানি খাইয়েছিল।আহা।

জঙ্গে খয়বর বইটাও তখুনি কেনা।পরে এইসব সম্পত্তি সে নিয়ে আসে।ক্যালেন্ডার আমানের ঘরে লাগিয়ে দেয়।এখনো ওখানেই আছে। গোটা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ তখন সাদ্দামের পক্ষে।সাদ্দাম প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে মার্কিন সৈন্যদের কচুকাটা করছে।হাতে হজরত আলির তরবারি জুলফিকার। এরকম একটা ছবি ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে আসফ।তখনো আট্টা বাজেনি।

২.

তা এলা কি করিমো?
আসফ মাথাটাকে ঝাঁকিয়ে বলে বাড়ি ছাড়ি পালাও তোমরা।
শরিফুন প্রত্যুত্তরে বলে দোষ করিবে একজন আর পালাবে সবায়।
তা? কি করির চান?
মরিলে একঠে মরিমো।
তোমার ছাগল ভাই কালিপুজার মেলাত হিন্দু মেয়ের হাত ধরি ঘুরিবে,আর ওমরা ছাড়ি দিবে?
ওইটায় না!
মা’র দিকে তাকিয়ে আমান বুঝতে পারে একটা কিছু হয়েছে। কিন্তু কি ঘটেছে বুঝতে পারেনা।বেচারা জিগ্যেস করে কি হোবে মা?
বিজেপির ঘর আইসেচে।হিন্দুর ঘর আইসেচে।বাড়ি ঘর সাঙ্গার করি দিবে।

আসফ আমানকে কোলে নেয়।বুড়া আর বোনকে নিয়ে হাঁটতে থাকে দলাবাড়ির ভেতর আল দিয়ে।তারপর ঘাটে ওঠে।ছোট হেউতিয়া সাঁকো পার হয়।তারপর আরও দক্ষিণে আরও দক্ষিণে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।ছমিরন দরজা খোলে। বোনকে দেখে অবাক হয়।
ছমিরন জিগ্যেস করে,কি ঘটিল আরো?এতো রাতিত?
আসফ বলে,আর কি কোবো বুজান?মেলা বাড়িত মোজাম্মেল কুন মেয়ের হাত ধরি ঘুইরচে এলা ওমরা বাড়ি জ্বলে দিবার আইসেচে।
সবাই চুপচাপ হয়ে যায়।
আমান ভালো করে ভাতও খায়নাই।
দাঁড়া ভাত রান্ধোং।
অর জইন্যে আর এত রাতিত আর রান্ধির দরকার নাই।
দারা কলা আছে দ্যাং।
দে।

দুই বোনের কথোপকথন সারারাত চলে।
আমান কখন ঘুমিয়ে পড়ে। আসফ বাইরে বেরিয়ে আসে।আকাশ অন্ধকার। একফোঁটা আলো নেই।নিজের হাতটাই দেখা যাচ্ছেনা।তবু সে হাঁটতে শুরু করে দেয়।
সে দেখতে চায় কিভাবে আগুন জ্বলে।
দ্বেষের আগুন।
এই আগুন কি ছাড়খার করে দেবে সব?হাঁটতে হাঁটতে সাঁকো পার হয়।হেউতিয়া পার হয়।আলপথ ধরে ফিরতে থাকে বাড়ির দিকে।ধানখেতের ভেতর গিয়ে দাঁড়ায়।চুপচাপ বসে।লুঙ্গির গাঁটের ভেতর থেকে তাংকুর টেমি বের করে। লুঙ্গি খুলে ফেলে জমিরের পাকা ধানের মাঝখানে বিছিয়ে বুক ভর দিয়ে শুয়ে পড়ে নজর রাখে বাড়ির ওপর। শরিফুনের ভাই মোজাম্মেল পালিয়েছে আগেই।ওকে ধরার আগেই ও মেলা থেকে বেরিয়ে দৌড় মেরে চলন্ত পাঞ্জাব বডি ট্রাকে চড়ে বসে।পিছনে চারপাঁচ জন ধাওয়া করলেও আর ধরতে পারেনা।এসব দাঁড়িয়ে দেখছিল আসফ।সে নিরাপদ দূরত্বে সরে আসে।হিংস্র মবের সামনে সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি।থাকতে চায়নি।জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার উল্লাস সে দেখতে পায়।ক্ষোভের ফুলকি ইতিউতি ছিটকে যায়..

বাইনচোদের নাম মোজাম্মেল।
শালার বাড়ি কাজিপাড়া।
অর বাড়ি জ্বলে দিমো।

কথাগুলো হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন যেভাবে ছড়ায় খড়ের পুঞ্জিতে।উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাঙ্গালিবাজনা।

কথাগুলো কানে আসতে আসতে আসফ সরে গেছে।আসফকে কেউ দেখেনি।সে সন্ধ্যায় মাছ বিক্রি করে বীরপাড়া থেকে ফিরছিল।রাস্তায় এতসব ঘটনা দেখে ওর গলা শুকিয়ে যায়।জান বাঁচা ফরজ।আর যদি সেটা নিজের হয়।তাহলে কথাই নেই।সারারাত ধরে মশা কামড়াতে থাকে।দূরে সড়সড় আওয়াজ পায়।আজ অমাবস্যার পরেরদিন।ফলে তাকে ধানখেতে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।আকাশে একটিও তারা নেই। যতদূর চোখ যায় তীব্র অন্ধকার। সে যখন রাতে রাতে নদীতে মাছ ধরতে যায় তখন এরকম অন্ধকার গ্রাস করে পৃথিবীকে।চরাচরে ছড়িয়ে পড়ে কার যেন কালো চুলের অক্ষর।দেউনিয়ার ঘাট থেকে বসিরের ঘাট।মোক্তারের ঘাট।লোহারপুল।মাছ মারতে মারতে ভাইটায়। উজায়।প্রেত পুরির দেবতারা এইসময় জলে নেমে আসে। ওরা মজা পায়।মাছগুলিকে লুকিয়ে ফেলে।ছাপি জাল দিয়ে ছাপের পর ছাপ দিলেও আর মাছ উঠেনা।

না আর পারা যায়না।তার চোখ বুজে আসে।কিন্তু একটা হিন্দুকেও দেখা যায়না।কোনো উঁকা কোনো চিৎকার শোনা যায়না।
ওইতো মসজিদের আজান শুনা যাছে।নিজেকেই সে বলে।
ভোর হচ্ছে।কটা বাজে সেটাও বোঝা মুশকিল। যেহেতু তাড়াহুড়ায় ঘড়িটা নিতে ভুলে গেছে।অবশ্য ভালোই করেছে।হাতে রেডিয়াম জ্বলে উঠলে রিস্ক।

সকালে চোখ খুলে যায় আসফের।দরজার বাইরে ফকির আসছে।
কায় বারে উঠেন নাই নাকি?
আসফ দরজা খুলে দেখে ছমিরুদ্দি।
হ্যাঁ। দাঁড়াও ভিক্ষা দেছো।
দে বাপ।
এয়যে নেও।
ভিক্ষা দিলে ছমিরুদ্দি ফকির চলে যায়।সারারাত উৎকন্ঠা নিয়ে ধানখেতে কাটিয়ে যখন আসফের মনে হয় আর কেউ আসবেনা। তখন সে বাড়ি এসে ঘরে শুয়ে পড়ে।ঘুম ভাঙতেই গতকালের ঘটনা মনে পড়ে আসফের।মনে মনে ভাবে,তাহালে কিছুই হইলনা? এবারে আমান আর বাকিদের ফিরিয়ে আনতে হবে।কে জানে রাতে তারা ঘুমিয়েছে কিনা?

দাদার ছেলের প্রতি তার অপত্য স্নেহ মাথাচাড়া দিলে আলনা থেকে শার্ট বের করে গায়ে দেয়।আলপথ ধরে।

৩.

চাচা এইলা কি করিস?
ধনুক বানাও।
ধনুক কি?
চিঁয়ারি।
দাঁড়া তোখো বানে দেও।
দে।
আর এইলা কি?
এইলা হচে তীর।
তীর দিয়া কি হোবে?
মানষি মারিমো।
কুন মানষি?
হিন্দুর ঘরোক।
হিন্দুর ঘর মানষি। তাও মারিমো?মুই ভাবিচুং পখি মারিবু।
না পখিনা। মানষি।
মানষি মারা পাপ না?
পাপ। ঠিক।কিন্তু হামার মসজিদ ওমরা ভাঙিছে।
কুন মসজিদ?
বাবরি মসজিদ।
চাচা।হিন্দুর ঘর দাঁত কি রাইক্ষোসের মতো?
কি কইস।অনেক বড় দাঁত।তুই যদি ওমাক না মারিস ওমরা তোক মারি ফেলাবে।
তাহলে অবশ্য মারিয়ারে নাগিবে।কিন্তু আল্লাহ তো পাপ দিবেই, হ্যানা চাচা?
হ্যাঁ ঠিক কইছিস।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending