কবি মাসুদ খান : নন্দনচেতনা ও পরাবাস্তবতার অনুসন্ধান
– ফারুক আহমেদ রনি
কবি মাসুদ খান, জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯ সালে, জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ।। এই ছোট জেলাশহর থেকে কবির যাত্রা শুরু। প্রকৌশলবিদ্যা ও ব্যবসায় প্রশাসনে শিক্ষিত, পরবর্তীতে কানাডার টরন্টোতে বসবাস ও শিক্ষাদান, তাঁর জীবনানুভূতির ভৌগোলিক বিস্তারই ইঙ্গিত করে যে তাঁর কবিতা যেমন দেশের মাটির গন্ধে ভরা, তেমনি সভ্যতার উত্তর-আধুনিক একাকিত্বে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চিন্তাকেও ধারণ করে।
তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ; পাখিতীর্থদিনে (১৯৯৩) থেকে কবিতাসংগ্রহ (২০২৫). বাংলা কবিতায় তৈরি করেছে এক নীরব, গভীর, পরিণত, মহাজাগতিক-রোমান্টিক ধারাবাহিকতা। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা তাঁর লেখার পরিণত মূল্যায়নের স্বাক্ষর।
আমার সাহিত্যচর্চার সূচনালগ্ন থেকেই কবি মাসুদ খান আমার কাছে একটি সুপরিচিত ও স্মরণীয় নাম। লিটল ম্যাগাজিন এবং দৈনিক পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত তাঁর কবিতার মধ্য দিয়েই প্রথম তাঁর কাব্যভাষার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। তখনো আমাদের ব্যক্তিগত কোনো যোগাযোগ গড়ে না উঠলেও, তাঁর কবিতা আমার পাঠচেতনায় এক ধরনের নীরব কিন্তু গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায়। সেই ছাপ সময়ের সঙ্গে ম্লান না হয়ে বরং ক্রমে দৃঢ়তর হয়েছে।
পরবর্তীকালে ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে যোগাযোগের সূত্রপাত ঘটে, তিনি কানাডায়, আর আমি যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত। ২০১২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত সংহতি কবিতা উৎসবে তাঁকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি একবাক্যে সম্মতি জানান। সেই মুহূর্তটি আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বাঁকবদলের সূচনা করে। উৎসবে তাঁর অংশগ্রহণ আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করে তোলে; পাঠক থেকে সহযাত্রী হয়ে ওঠার এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আমি তাঁর কবিতাকে আরও গভীরভাবে অনুধাবনের সুযোগ পাই। এরপর থেকে ‘শিকড়’-এর নানা সংখ্যায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়ে আসছে, এবং আমি নিজেকে বরাবরই তাঁর কবিতার একনিষ্ঠ অনুরাগী হিসেবে বিবেচনা করি।
উল্লেখ্য, সেই কবিতা উৎসবে বাংলাদেশ থেকে যুক্ত হয়েছিলেন বিশিষ্ট কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি মারুফ রায়হান এবং কবি ওবায়েদ আকাশ। তাঁদের উপস্থিতি উৎসবটির সাহিত্যিক গুরুত্ব ও বিস্তৃতিকে আরও গভীরতা দেয়। বিভিন্ন প্রজন্ম ও ভিন্ন ভিন্ন কাব্যভাষার কবিদের অংশগ্রহণে এই আয়োজনটি পরিণত হয় এক আন্তর্জাতিক সাহিত্যসম্মিলনে, যেখানে বাংলা কবিতা দেশ ও প্রবাসের ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে এক যৌথ সৃজনসংলাপের পরিসর নির্মাণ করে।
আজ বিলেতের কবিপাড়ায় মাসুদ খান একান্ত স্বজন, আপনজন হিসেবেই পরিচিত কবি-ব্যক্তিত্ব।
আমার অবস্থান থেকে কবির কাব্যজগতকে যেভাবে দেখে এসেছি, তারই সংক্ষিপ্ত একটি আলোচনার সঙ্গে কিছু নির্বাচিত কবিতা পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
কবি মাসুদ খানের কবিতায় নন্দনচেতনা ও পরাবাস্তবতার অনুসন্ধান
বাংলা কবিতার সুদীর্ঘ ঐতিহ্যে লক্ষ্য করা যায় যে প্রতিটি যুগেই কিছু কবির আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা প্রবল কাব্যশক্তি ও স্বতন্ত্র সৃজনদৃষ্টির অধিকারী।তাঁরা আলোচনার কেন্দ্র হিসাবে কখনোই উপস্থাপিত নন; তাঁদের উপস্থিতি নীরব, প্রচারবিমুখ এবং আত্মসংযত। সাহিত্যজগতের বাহ্যিক কোলাহল, প্রতিষ্ঠা বা জনপ্রিয়তার আকাঙ্ক্ষা তাঁদের সৃজনপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে না। বরং তাঁদের কবিতায় ধীরে ধীরে নির্মিত হয় এক গভীর, অন্তর্মুখী শিল্পভুবন, যা পাঠকের সংবেদন ও চিন্তাকে আমূল নাড়া দেয়। কবি মাসুদ খান সেই দলভুক্ত। বাংলা কবিতার সমকালীন পরিসরে কবি মাসুদ খান এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, যাঁর কাব্যচর্চা নন্দনচেতনা ও পরাবাস্তবতার সূক্ষ্ম অনুসন্ধানে নিবদ্ধ। প্রচারমুখী সাহিত্যচর্চা বা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে অবস্থান করেও তিনি নির্মাণ করেছেন এক গভীর, অন্তর্মুখী কবিতাজগৎ। তাঁর কবিতায় বাস্তবতার সরল অনুকরণ অনুপস্থিত; বরং দৃশ্যমান জগত ভেঙে গিয়ে রূপ নেয় এক বিকল্প অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায়, যেখানে চেতনা, স্মৃতি ও কল্পনা পরস্পরের সঙ্গে জটিল সংলাপে প্রবৃত্ত হয়।
মাসুদ খানের নন্দনভাবনা মূলত অনুভূতির স্তরে ক্রিয়াশীল। তাঁর ভাষা সংযত অথচ বহুমাত্রিক; চিত্রকল্পে উপস্থিত থাকে স্বপ্ন, অবচেতন ও পরাবাস্তব অভিজ্ঞতার অনুরণন। এই পরাবাস্তবতা পাশ্চাত্য সুরিয়ালিজমের সরাসরি অনুকরণ নয়; বরং তা দেশজ অভিজ্ঞতা, অস্তিত্বগত প্রশ্ন ও ব্যক্তিমানসের ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে নির্মিত। ফলে তাঁর কবিতায় পাঠক এক ধরনের শূন্যতা ও বিস্তারের অনুভবের মুখোমুখি হন, যা একই সঙ্গে নান্দনিক ও দার্শনিক।
কবি মাসুদ খানের কবিতায় বিষয়বস্তুর পাশাপাশি কাঠামোগত নির্মাণও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাঁর কাব্যে বর্ণনামূলক সরলতা সচেতনভাবে পরিহৃত; পরিবর্তে তিনি খণ্ডিত বাক্য, নীরবতা ও অনুক্তির মাধ্যমে অর্থের বহুমাত্রিকতা নির্মাণ করেন। এই কৌশল পাঠককে একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যায় আবদ্ধ না রেখে ব্যাখ্যার সম্ভাবনাময় পরিসরে প্রবেশ করতে আহ্বান জানায়। সময়, স্মৃতি ও ব্যক্তিসত্তা তাঁর কবিতায় রৈখিক নয়; বরং তা ভেঙে যায়, পুনর্গঠিত হয় এবং এক ধরনের চক্রাকার চেতনার ভেতর আবর্তিত হতে থাকে। এর ফলে কবিতার পাঠ হয়ে ওঠে একটি অভিজ্ঞতামূলক প্রক্রিয়া, যেখানে অর্থ ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়।
বিশেষত নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতা, অস্তিত্বগত অনিশ্চয়তা ও আত্মপরিচয়ের সংকট তাঁর কবিতায় পরাবাস্তব রূপকে রূপান্তরিত হয়েছে। এই রূপকগুলো নিছক অলংকার নয়; এগুলো আধুনিক মানুষের অন্তর্গত ভাঙন ও উদ্বেগের প্রতীকী প্রকাশ। মাসুদ খানের কবিতায় নন্দনচেতনা তাই বাস্তব ও অবাস্তবের সীমারেখা মুছে দেয়, এবং পাঠককে এক এমন কাব্যভূমিতে নিয়ে যায় যেখানে অনুভূতি ও চিন্তার মধ্যবর্তী এক অনির্ধারিত পরিসর ক্রমাগত বিস্তৃত হতে থাকে।
এইভাবে কবি মাসুদ খান বাংলা কবিতায় এক নীরব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি তৈরি করেছেন। তাঁর কবিতা গভীর পাঠে প্রকাশ করে এক অন্তর্লীন শিল্পবোধ, যা সমকালীন কবিতার ভুবনে একটি স্বতন্ত্র নন্দনতাত্ত্বিক অবস্থান নির্দেশ করে।
বাংলা কবিতার আধুনিক-পরবর্তী পর্বে তাঁর কাব্যবোধ একটি অনন্য অন্তর্গত ঐশ্বর্য প্রকাশ করেছে, যেখানে নীরবতা, অন্ধকার, আলো, মহাকাশ, স্মৃতি, নদী, আর মানব-অস্তিত্বের অনুরণন মিলিত হয়ে তৈরি করেছে এক পরিশীলিত, গূঢ় ও পরাবাস্তব দিগন্ত।
প্রকৌশলবিদ্যা তাঁকে দিয়েছে শৃঙ্খলা, বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টি, কাঠামো নির্মাণের ক্ষমতা;
আর ব্যবসায় প্রশাসন ও বিদেশবাস তাঁকে দিয়েছে বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ, বহুসাংস্কৃতিক ভাবনা, আধুনিক নাগরিক সময়ের দুঃশ্চিন্তা, অভিবাসী জীবনের জটিলতা।
এই দুই অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে তাঁর কবিতায় একদিকে নীরব, প্রাদেশিক মানবতা, অন্যদিকে মহাকাশগত বিস্তৃতি ও আধুনিক প্রযুক্তির রূপকসমূহ গড়ে তোলে একটি কাব্যবিশ্ব, যা বাংলা কবিতায় একেবারেই ভিন্ন।
বাংলা ভাষা তাঁর হাতে এসে একটি স্থিত মঞ্চে দাঁড়ায় না, বরং প্রতিটি শব্দ যেন সার্কিটের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎতরঙ্গের মতো প্রবাহিত হয়। তাঁর শব্দচয়ন কখনো কঠোর, কখনো সুচারু, কখনো স্মৃতির জলীয়, কখনো আধুনিকতার ধাতব।
বেশিরভাগ সমকালীন কবিরা যেখানে ভাষাকে linear ধারাবাহিক রূপে ব্যবহার করেন, মাসুদ খানের ভাষা সেখানে মহাকর্ষহীন। শব্দ ভাসে, কখনো সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, কখনো ঘূর্ণি তৈরি করে। একটি তৎসম শব্দ হঠাৎই পাশের বাক্যে এসে মিশে যায় অতি স্থানীয় কোনো উপভাষিক ধ্বনির সঙ্গে; আবার একটি ইংরেজি টার্মিনোলজি সরে গিয়ে রূপক হয়ে ওঠে।
এ এক আভ্যন্তরীণ রসায়ন, যার সূত্রপাত হয় তাঁর প্রকৌশল-সচেতন মনে; কিন্তু পরিণতি পায় কবিতার মায়াবী অন্তর্লোকে। তাঁর কবিতায় একক শব্দের মধ্যেও বহুস্তরীয় অর্থজগত রয়েছে;কখনো ভাষা হয়ে ওঠে ঘন, অন্ধকারময়, কখনো আলোকের মতো স্বচ্ছ, কখনো দার্শনিক, আবার কখনো শিশুর মতো সহজ ও প্রবহমান।
এই বিস্তৃত শব্দমালাই তাঁকে সমকালীন কবিদের ভিড়ে আলাদা করে, এবং তাঁর কবিতাকে করে তোলে এক ধরনের innate polyphony, বহুরৈখিক উচ্চারণের সমবায়।
বহু কবিই চাকরি বা পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতাকে তাঁদের শিল্পে খুব গভীরভাবে ঢোকান না। কিন্তু মাসুদ খান, এই সাক্ষাৎ বিরল কবি। প্রকৌশলবিদ্যা ও প্রযুক্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতার ভিতর দিয়ে ছড়িয়ে দেন এক অতি সূক্ষ্ম কৌশলে। ইলেকট্রনিক সার্কিটের পরিমিত শৃঙ্খলা তাঁর কবিতায় গড়ে তোলে কাঠামোগত দৃঢ়তা। আবার সিগনাল-প্রসেসিংয়ের অনিশ্চয়তা তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিমালায় এনে দেয় অনির্দেশ্যতার ছায়া। বিজ্ঞান ও কবিতার এই মিলন বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে গেছে এক নতুন দিগন্তে, যেখানে কল্পনা কোনো সহজাত উদ্ভাস মাত্র নয়, বরং তা হয়ে ওঠে গণিতের মতোই সুনির্দিষ্ট, আবার স্বপ্নের মতোই তরল।
তাঁর কবিতার বাক্যগুলোকে পড়তে গেলে মনে হয় যেন কোনো অতি উন্নত পর্যায়ের যন্ত্রপাতির ভেতর দিয়ে শব্দগুলোও তাদের নিজস্ব সিগনাল পাঠিয়ে দিচ্ছে পাঠকের মনে।
এ যেন প্রযুক্তি ও মানবাত্মার দ্বৈত-আবেদন।
পরবাস্তবতা, আধুনিকতা ও পোস্টমর্ডান সংবেদন: কবি মাসুদ খানের কবিতার সময়-চেতনা:
কবি মাসুদ খানের কবিতার সময়-চেতন তাঁর কবিতা পড়লে সবচেয়ে আগে যে-অভিজ্ঞতাটি আসে তা হলো একধরনের পরবাস্তবতার (surreality) নৈর্ব্যক্তিক ও ব্যক্তিক-সংমিশ্রিত আবহ। এটি স্বপ্নের মতো, আবার স্বপ্ন নয়; বাস্তবের মতো, আবার বাস্তব নয়, একটি “অদ্ভুত-বাস্তবতা”(uncanny real) যা আধুনিকতার গুরুগম্ভীর আবেগ ও পোস্টমডার্ননিজম বিদ্রূপ, দুই-ই একসাথে বহন করে।
কবির প্রায় প্রতিটি কবিতায় দেখা যায় তিনটি সমান্তরাল প্রবাহ; মহাজাগতিকতা ও দৈনন্দিন বাস্তবের দ্বৈত জাল (নির্বাসন”, “আন্তর্জাগতিক”, কৌতুকবিলাস”, “অলুক, অনশ্বর”),
এখানে মহাশূন্য, অগ্ন্যুৎপাত, অ্যানালগ ভিক্ষামাপনযন্ত্র, ব্ল্যাকহোল, ভ্যাকুয়াম, এসব মহাজাগতিক চিহ্ন প্রতিনিয়ত লেপ্টে যাচ্ছে দৈনন্দিন আবেগ, প্রেম, দুঃখ, অনুপস্থিতি, বিচ্ছিন্নতা ও হাহাকারের সাথে। এই দ্বৈত কাঠামো পরবাস্তবতার একটি বিশেষ রূপ, যেখানে বিজ্ঞান-সংকেতিত পরিবেশও ব্যক্তিক আবেগের রূপক হয়ে ওঠে। যেমন, আখ্যানের ভাঙন, চিত্রকল্পের দ্রুত বদল—পোস্টমডার্ন রীতি (প্রলাপবচন”, “যোগসাজশ”, “চিত্রকল্প”, জ্বরের ঋতুতে”) তাঁর কবিতায় ঘটনা কখনো সরল ধারায় আসে না।
অপ্রত্যাশিতভাবে এক ইমেজ থেকে আরেক ইমেজে লাফ :
করলা-লতা, কোকিল, ব্লাস্ট ফার্নেস, হাহাকারী নদী, অশ্ব, হুদহুদ পাখি, ইত্যাদি একে অপরকে ঠেলে তৈরি করে ফ্র্যাকচারড ন্যারেটিভ, যা পোস্টমডার্ন কবিতায় দেখা যায়। এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে লজিকের অবসান ঘটে। অর্থ গঠিত হয় বিক্ষিপ্ত ইমেজের সম্মিলনে, কোনো একক রৈখিক ব্যাখ্যায় নয়।
‘আমি, তুমি ও বিশ্ব, এক অনবরত রূপান্তর প্রক্রিয়া (পারাপার”, তৃষ্ণা”, নাম”, আশ্রয়”)
এখানে “আমি” কখনো গ্রহে-রহস্যে-ঘেরা এক জীব, কখনো পিতৃহীন সন্তান, কখনো প্রেমিক, কখনো নিশিশাপগ্রস্ত যাত্রী। তুমি” কখনো প্রেয়সী, কখনো আন্তর্জাগতিক সত্তা, কখনো সময়, কখনো মৃত্যু, কখনো অনুপস্থিতির আরশি। এইসব রূপান্তর তাঁর কবিতাকে সত্তার বহুরূপী নাট্যমঞ্চ বানায়
যা পোস্টমডার্ন কবিতার fluid self ধারণার সঙ্গে একেবারে মিলে যায়।
পরবাস্তবতা (Surrealism) কিভাবে কাজ করছে:
কবির কবিতার পরবাস্তবতা কোনো ইউরোপীয় নকল নয়। তিনি গড়ে তুলেছেন এক বাংলা-ভাষাভিত্তিক মহাজাগতিক পরবাস্তবতা যেখানে; আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত শিশুদের পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারণ করে (“যোগসাজশ”), পৃথিবী আসলে ভগবানের ছোড়া ঢিল (“কৌতুকবিলাস”)থার্মোমিটার ভেঙে ব্রুমস্টিক হয়ে যায় (“জ্বরের ঋতুতে”),জ্বলন্ত নৌকা নদীকে জ্বালিয়ে তোলে (“চিত্রকল্প”), দূর গ্যালাক্সির মেয়ে তাঁর জানালার দিকে তাকিয়ে আছে” (“আন্তর্জাগতিক”)। এগুলি বাহুল্য অলংকার নয়; বরং বাস্তবকে অতিক্রম করে বাস্তবের গভীর সত্য প্রকাশের উপায়। এটাই স্যুররিয়ালিস্ট ভাবনার মূল অতিবাস্তব হয়ে প্রকাশিত হয় বাস্তবের ভেতরের আঘাত, আকাঙ্ক্ষা, হাহাকার ও বোধের মর্ম।
আধুনিকতার প্রয়াস:
আধুনিকতার প্রয়াস যদিও চিত্রকল্পগুলো পরবাস্তব, কবিতার মনোচেতনা গভীরভাবে আধুনিকতাবাদী, যেমন, বিচ্ছিন্নতা, অস্তিত্বের আতঙ্ক, নামহীনতা ও পরিচয়ের ভাঙন (“নাম”), প্রেমের অনুপস্থিতি ও অসম্পূর্ণতা, বৈশ্বিক বিপর্যয়বোধ, যন্ত্রণা, জ্বর, মৃত্যু, বেদনাবোধ।
পোস্টমডার্ন সংবেদন (Postmodern Sensibility):
মাসুদ খানের কবিতায় ভাষার খেলা, যেমন – ভাষা কখনো গুরুতর, কখনো নৈর্ব্যক্তিক, কখনো হালকা খুনসুটি, এটি একধরনের postmodern playfulness। মেটাফার-স্লিপেজ উপমা/রূপক কখনো একটি ইমেজে দাঁড়ায় না, একটানা সরে সরে যায়- যেমন “ঢিল, মিসাইল, লাটিম, নাটকীয় কক্ষপথ” অথবা “মরুসরীসৃপ, মুসাফিরের রক্ত, ক্রুদ্ধ মরীচিকা”। এটি ভাবনার দ্রুত বদল; পোস্টমডার্ন আখ্যানের বৈশিষ্ট্য।
এছাড়াও, মিথ, বিজ্ঞান, লোককথাকে একত্রে কবির কবিতায় যেমন দেখি:
মহাকাশবিদ্যা, ধর্মীয় মিথ, বেদুইন, মিকাইল, সৎকার, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল আকাশ, গেরুয়া ও রাজনীতি, কোয়ান্টাম ঘূর্ণন, গৃহস্থ-চোর-কুকুরের ত্রিভুজ। সব একসাথে একই ন্যারেটিভে দাঁড়ায়। এই মিশ্র-টেক্সচার পোস্টমডার্ন কবিতারই চিহ্ন।
সময়-চেতনা (Temporal Consciousness):
মাসুদ খানের কবিতার সময় তিনস্তরে কাজ করে; তারমধ্যে; মহাজাগতিক সময়, যেখানে কোটি কোটি বছরের অজ্ঞাত পরিক্রমা (“অলুক অনশ্বর”)।
মানব সভ্যতার সময়; যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, স্থানান্তর, অভিবাসন (“আবহমান”, স্বপ্নভূভাগ”, তুমি তোমার সরাইখানা…”) এবং ব্যক্তিগত সময়; মায়ের প্রেমিক, অনাথ নাম, প্রেমিক-প্রেমিকার জ্বর, দীক্ষা, ব্লিজার্ড এ সবই মানুষের সীমাবদ্ধ ব্যক্তিক সময়। এই তিন সময় একে অপরের ওপর স্লাইড করে যায়, যা তাঁর কবিতাকে একধরনের অনির্দিষ্ট, অনিঃশেষ সময়স্রোত বানায়।
মাসুদ খানের কবিতাকে একবাক্যে সংজ্ঞায়িত করলে বলা যায়: বাঙালি ভাষাবোধে নির্মিত এক মহাজাগতিক-পরবাস্তব, আধুনিকতার যন্ত্রণায় শাণিত, পোস্টমডার্ন চিত্রকল্পে ভরপুর কাব্যভুবন”। এখানে বিজ্ঞান ও মিথ একসাথে থাকে, মহাকাশ ও মায়ের প্রেমিক সমান্তরাল হয়ে দাঁড়ায়, গ্রহের অগ্ন্যুৎপাত আর মানুষের পরীক্ষার ফলাফল একই সূত্রে বাঁধা পড়ে, দূর গ্যালাক্সির প্রেমিকাকে প্রেমিক নিজের জানালায় দেখতে পায়।
এটাই তাঁর কবিতার প্রধান শক্তি, আশ্চর্যকে বাস্তব করে তোলা এবং বাস্তবকে আশ্চর্যময় করে পুনর্নির্মাণ। স্মৃতি, শিকড় ও প্রবাস : দুটো ভূগোলের মাঝখানে ঝুলে থাকা কবিতার দোলনা।
মাসুদ খান প্রবাসে বাস করলেও তাঁর সাহিত্যচেতনা বাংলাদেশের মাটি, নদী, মানুষের শব্দ-চলন ও ঋতুচক্রে নিবিষ্ট। প্রবাস তাকে দিয়েছে; আত্মগোপনের অন্তর্দৃষ্টি স্মৃতিকে নির্মমভাবে নিরীক্ষার দক্ষতা, দূরত্বের মধ্য দিয়ে শিকড়কে বেশি করে চিনে নেওয়ার সুযোগ।
ফলে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে দ্বিভূমিক বাস্তবতার আতরছায়া। কানাডার নির্মম শীত, পরদেশি ট্রেনের জানালার ধূসরতা, বরফগলা সন্ধ্যা, বৃষ্টি-ঝরা টরন্টোর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তাঁর মনে দাউ দাউ করে ওঠে বাংলার মাঠ-নদী-খেতের স্মৃতি।
এ দুই ভূগোল, উত্তর আমেরিকার কংক্রিট আর বাংলাদেশের কাদামাটির গ্রাম, তাঁর কবিতায় মিলিত হয়ে এক ধরনের দ্বৈত-সংবেদন সৃষ্টি করে। শহর আর নদী, তুষার আর নৌকা, প্রবাস আর শিকড়, সবই হয়ে ওঠে তাঁর কবিতার নক্ষত্র-সম্বল।
কবি মাসুদ খানের কাব্যগ্রন্থসমূহ:
একটি সংক্ষিপ্ত শিল্প-নকশা, যেমন; তাঁর গ্রন্থসমূহ ক্রমানুসারে তাকালে বোঝা যায়— এটি কেবল বইয়ের তালিকা নয়, বরং এক ধ্রুব বিবর্তনের ইতিহাস।
• পাখিতীর্থদিনে (১৯৯৩)— প্রথম স্বরপ্রকাশ, যেখানে প্রকৃতি ও মানবাবেগের আড়াল-আলো উন্মোচিত।
• নদীকূলে করি বাস (২০০১) নদীর পরিব্রাজকতা ও অস্তিত্বের তরঙ্গ।
• সরাইখানা ও হারানো মানুষ (২০০৬)— মানবজীবনের নিঃসঙ্গতা ও সামাজিক প্রতিস্বর।
• আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি (২০১১) — অন্ধকার ও আলোর তাত্ত্বিক মেলবন্ধন।
• এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায় (২০১৪)— গোধূলির মায়াময় সময়স্মৃতি।
• দেহ-অতিরিক্ত জ্বর (২০১৫)— গদ্য আলেখ্য; মানবসত্তার অন্তর্গত জ্বরের বৃত্তান্ত।
• প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান (২০১৬) — উপন্যাস; স্বপ্ন, প্রেম ও প্রকৃতির অন্তরাধার।
• প্রসন্ন দ্বীপদেশ (২০১৮)— নিস্তব্ধতা, আলো ও দ্বীপ-মেটাফর।
• গদ্যগুচ্ছ (২০১৮) সাহিত্যিক চিন্তার এক প্রখর নথি।
• শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১৮)— কাব্যজীবনের এক সংবদ্ধ মানচিত্র।
• পাখপাখালির গান পাগলাঝোরার তান (২০১৯)— শিশুমন, প্রকৃতি ও ছন্দের যৌথতা।
• ঊর্মিকুমার ঘাটে (২০২০)— জল, সময়, আত্মচেতনার অদৃশ্য প্রবাহ।
• দুঃস্বপ্নের মধ্যপর্ব (২০২২)— ভেঙে পড়া সময়, দুঃস্বপ্নের অন্তর্ভেদী দৃশ্য।
• কবিতাসংগ্রহ (২০২৫)— দীর্ঘ কাব্যজীবনের সমগ্র-নকশা।
এই সৃষ্টিকর্মের পরিসর আমাদের জানান দেয় তিনি এক ধরনের মহাযাত্রী, যিনি শব্দের মহাশূন্যে এক বই থেকে আরেক বইয়ে ভ্রমণ করে গেছেন নিরন্তর।
কবি মাসুদ খানের সাহিত্যিক শক্তি:
কেন তিনি সমকালীন বাংলা কবিতার একটি প্রধান নাম? বিশেষ করে উচ্চমাত্রার ভাষাগত পরীক্ষানিরীক্ষা বাংলা কবিতায় ভাষার নতুন পথ খুঁজেছেন অনেকেই, কিন্তু মাসুদ খানের ভাষায় রয়েছে; কাব্যিক গভীরতা, দার্শনিক কৌলিন্য, ভাষার দেহে সার্কিট-বিচ্ছুরণের মতো চমক, শব্দের পরিভাষায় এক ধরনের আবহমান মায়া।
কবির কাব্যে বিজ্ঞান-চিন্তার অনন্য উপস্থিতি, এটি বাংলা কবিতায় এক বিরল বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞান তাঁর কল্পনাকে সীমাবদ্ধ করেনি; বরং সমৃদ্ধ করেছে। দেশ-বিদেশের দ্বৈত অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতার ভেতরে মানুষের অস্থির সময়, যন্ত্রসভ্যতা এবং নস্টালজিয়ার নতুন ভাষা তৈরি করেছে।
প্রেম ও বিষাদ, কোনোটিই কৃত্রিম নয়, তাঁর আবেগ সংযত; কখনো রোমান্টিকতার অতিনাট্য নেই। ফলে তাঁর কবিতা থাকে গভীর ও চিন্তামগ্ন।
পুরস্কারসমূহ :
এক অবিচ্ছেদ্য কাব্যসম্মানঃ তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারগুলো;
• বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার (১৯৯৪)
• জীবনানন্দ সাহিত্য পুরস্কার (২০১৬)
• বাংলা একাডেমি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ পুরস্কার (২০১৭)
• প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার ১৪২৪ (২০১৯)
• বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০২৪)
• সংহতি সাহিত্য সম্মাননা পুরস্কার (২০১২)
এগুলো প্রত্যেকটি তাঁর অবস্থানকে দৃঢ় করে। এটি কেবল স্বীকৃতির তালিকা নয়; এটি তাঁর সাহিত্যজীবনের একেকটি দীপ্ত মাইলফলক। মাসুদ খানের কাব্যভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য মিতবাকতা। তিনি শব্দের বাহুল্যে বিশ্বাসী নন, বরং বিশ্বাসী, শব্দের আড়ালে থাকা নীরবতার শক্তিতে। তাঁর ভাষা; সংযত, দার্শনিক, ধীরগতি, অন্তর্লীন কাব্যময়ী। এই ভাষা কখনো রোমান্টিক নয়, আবার পুরোপুরি আধুনিকও নয়।
এটি পরিণত মননের আধুনিক-পরবর্তী ভাষা, যা চিত্রকল্পে তৈরি করে গভীরতম সুর। তাঁর কবিতায় চিত্রকল্প খুব বেশি, কিন্তু এলোমেলো নয়; এগুলো বীতশব্দের নান্দনিক গঠন তৈরি করে।
যেখানে নদী, আলো, ঘাট, সন্ধ্যা, অন্ধকার এই উপাদানগুলো বারবার ফিরে আসে নতুন অর্থ নিয়ে।
যেমন নন্দনচেতনা; স্বপ্ন, অন্ধকার ও আলোভিত্তিক স্থাপত্য হিসাবে দেখতে পাই
মাসুদ খান একজন চিত্র-নির্মাতা কবি। তাঁর কবিতা চিত্রকল্পে ভরা— কখনো মৃদু, কখনো তীক্ষ্ণ, কখনো স্যুররিয়াল। তাঁর নন্দনচেতনায় সে স্তরগুলো দেখা যায়, যেমন; অন্ধকারের নন্দন অন্ধকার তাঁর কাছে ভয় নয়; বরং এটি একটি সম্ভাবনার স্থান যেখানে বসে রয়েছে স্মৃতি, মায়া, অনুপস্থিতি, ইতিহাস, নিঃসঙ্গতা। যেমন নন্দনচেতনাকে অন্ধকার ভেঙে আলো জন্মায় এ আলো দার্শনিক; যেন জগত ও আত্মাকে এক মুহূর্তে স্পর্শ করে যায়।
স্বপ্নের নন্দন; স্বপ্ন তাঁর কবিতায় উপমা নয়; এটি এক অবচেতন নকশা, যা তৈরি করে অস্তিত্বের প্রতিমা। এই স্তরগুলো মিলিয়ে তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে দেখা-না-দেখার জগৎ। যেখানে বাস্তব ও পরাবাস্তব পাশাপাশি দাঁড়ায়।
পরাবাস্তবতা ও আধুনিক-পরবর্তী সংবেদন হিসাবে তাঁর কাব্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র মাত্রা হলো পরাবাস্তবতা। তবে এটি ইউরোপীয় স্যুররিয়ালিজমের অনুকরণ নয় বরং বাংলার লোকজ চেতনা, আধুনিক বিজ্ঞান, মানবঅন্তরের গভীরতা, এসবের সমন্বয়ে গঠিত এক বিশেষ পরাবাস্তব ভাষা। তাঁর অনেক কবিতায় দেখা যায়; নক্ষত্রলোকের সাথে জীবনের কথোপকথন, মানুষের শরীর ও মহাশূন্যের একীকরণ, সময়ের সঙ্গে ঝরে পড়া নদী, স্বপ্নে ঘেরা ঘাট, আলোকে ছুঁয়ে অন্ধকারের রূপ, স্মৃতির ভেতরে মহাবিশ্বের জ্যামিতি।
এইসব চিত্র এক পরাবাস্তব জগৎ নির্মাণ করে, যেখানে অমূর্তই হয়ে ওঠে বাস্তবের গভীর সত্য। আধুনিক কবিতার বিচ্ছিন্নতা ও অনিশ্চয়তার সাথে পোস্টমডার্ন ভাঙন ও অসীম ইমেজের খেলা মিলে তাঁর কবিতাকে দেয় এক তৃতীয় স্বর, যা বাংলা কবিতায় তুলনাহীন ও স্বনির্মিত।
প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও মানবসত্তার ভেতরের নদী বলতে প্রেম তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত নয়;
এটি সময়ের, অনুপস্থিতির, স্মৃতির, আলো-অন্ধকারের রূপ। সময়ের বহমানতা ও মানুষের অভ্যন্তরীণ শূন্যতা তাঁর প্রেমকে দেয় একধরনের মহাজাগতিক ব্যথা।
নিঃসঙ্গতা তাঁর কবিতায় দুঃখ নয়; বরং এটি আত্মাকে নির্মাণের শর্ত। মানুষ তাঁর কাছে এক অন্ধকার ঘাট যেখানে কখনো আলো নেমে আসে, আবার কখনো নদী শুকিয়ে যায়।
সময়, স্মৃতি ও অস্তিত্বের দার্শনিকতা বলতে সময়ের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গভীর ও দার্শনিক। সময় একটি নদী, যা বহমান, যা বহন করে; স্মৃতি, অনুপস্থিতি, হারানো মানুষ, প্রেম, দুঃস্বপ্ন এবং অস্তিত্ব। সময় একটি অন্তহীন মহাকাশ যেন যেখানে মানুষের উপস্থিতি ক্ষুদ্র, তবু মানুষের স্মৃতি বিশাল। সময় একটি নিঃসঙ্গতার গহ্বর যা মানুষকে ক্রমাগত নিজের দিকে ফেরত পাঠায়। এইভাবে সময় তাঁর কবিতায় এক চরিত্র, যা কখনো অনন্ত, কখনো ক্ষণস্থায়ী, কখনো মমতাময়, কখনো নিষ্ঠুর।
মাসুদ খানের গদ্য, উপন্যাস ও প্রবন্ধে বহুমাত্রিক উপস্থিতি, যা তাঁকে, সাহিত্যের জগতে করেছে সব্যসাচী। কবিতাই তাঁর মুখ্য শক্তি হলেও- দেহ-অতিরিক্ত জ্বর, গদ্যগুচ্ছ, এবং উপন্যাস- প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান এসব প্রমাণ করে তাঁর চিন্তার গভীরতা কেবল কবিতায় আবদ্ধ নয়।
বাংলা সাহিত্য তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান দিয়েছে; জীবনানন্দ পুরস্কার থেকে বাংলা একাডেমি পর্যন্ত বহু পুরস্কার তাঁর নীরব পথচলার স্বীকৃতি। তবে সবচেয়ে বড় সত্য হলো;
তিনি প্রকাশের জন্য লেখেন না; তিনি প্রকাশের ভেতরে থাকা অপ্রকাশকে খুঁজে লেখেন। বাংলা ভাষায় এমন পরাবাস্তব, সংযমী, মহাজাগতিক-চেতনার কবি বিরল।
তাঁর কবিতার অনন্যতা যেমন; নীরব চেতনার স্থায়িত্ব, অন্ধকারের রূপায়ণ, আলোর দার্শনিক ব্যবহার, মহাকাশগত রূপক, স্মৃতি ও সময়ের আন্তর্গত দৃষ্টি এবং চিত্রকল্পের বহুমাত্রিকতা।
কবি মাসুদ খানের কবিতাকে বাংলা আধুনিক-পরবর্তী কবিতার এক স্বতন্ত্র উচ্চতাশিখরে দাঁড় করিয়েছে।
কবি মাসুদ খান এমন এক কাব্যশক্তির স্রষ্টা, যাঁর কবিতা পাঠককে শব্দের বাইরে নিয়ে যায় অস্তিত্বের গভীরে, নীরবতার অন্তরে, সময়ের অনিশ্চিত ঘাটে, মহাজাগতিক অন্ধকারে। তাঁর কবিতা ভাষাকে অতিক্রম করে ফিরিয়ে আনে অন্তর্লীন মানবসত্তার স্পন্দন। বাংলা কবিতা তাঁকে স্মরণ করবে একজন নির্মোহ, সংযত, তবু মহাজাগতিক কাব্য-শ্ স্রষ্টা হিসেবে।
আমি যথাসম্ভব কবি মাসুদ খানের কাব্যভুবনকে কেন্দ্র করে একটি আলোচনা দাঁড় করানোর প্রয়াস গ্রহণ করেছি; যদিও তাঁর কবিতার বিস্তার, ভাষিক বৈচিত্র্য ও শিল্পচিন্তা গভীরতর গবেষণার দাবি রাখে। এই স্বল্প পরিসরে রচিত লেখাটি কতখানি তাঁর কবিসত্তা কিংবা সমকালীন বাংলা কবিতায় তাঁর কাব্যিক অবস্থানকে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করতে পেরেছে, সে বিষয়ে আমার নিজেরই সংশয় রয়েছে। তবু বিশ্বাস করি, এই আলোচনার মধ্য দিয়ে তাঁর কবিতার প্রতি আমার পাঠকসত্তার আন্তরিক অনুরাগ ও দায়বদ্ধতার একটি সত্য উচ্চারণ সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে আমার আরও দীর্ঘ, বিশদ ও মনোযোগী আলোচনায় প্রবেশ করার আগ্রহ রইল।
কবি মাসুদ খানের প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। ‘শিকড়’-এর পক্ষ থেকে তাঁর কাব্যভুবনের দীর্ঘযাত্রা, সৃজনশীল ধারাবাহিকতা এবং মঙ্গলময় জীবনের কামনা করি।
ফারুক আহমেদ রনি
সম্পাদক, শিকড়
মাসুদ খানের একগুচ্ছ কবিতা
নির্বাসন
অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে আকাশ ঢাকা
গায়ে তার জ্বলে কোটি-কোটি প্ল্যাংক্টন
তারই মাঝে একা একটি শ্যামলা মেঘে
সহসা তোমার মুখের উদ্ভাসন।
হয়তো এখন আকাশ নামছে ঝেঁপে
মেঘ ও মেঘনার ছেদরেখা বরাবর
ঝাপসা একটি আগুনের ছায়ারূপ
ঝিলিক দিয়েই মিলাচ্ছে অগোচর।
দূর গ্রহে বসে ভাবছি তোমার কথা
এতটা দূরে যে, ভাবাও যায় না ভালো
ভাবনারা হিম-নিঃসীম ভ্যাকুয়ামে
শোধনে-শোষণে হয়ে যায় অগোছালো।
অথচ এখানে তোমারই শাসন চালু
তোমার নামেই বায়ু হয়ে আমি বই
তোমারই আবেশে বিদ্যুৎ জাগে মেঘে
তোমার রূপেই ময়ূর ফুটেছে ওই।
মধুকর আজ ভুলে গিয়ে মাধুকরী
রূপ জপে তব কায়মনোগুঞ্জনে।
মনন করছে তোমারই বিম্বখানি
ধ্যানে ও শীলনে, স্মরণে, বিস্মরণে।
গন্ধকের এই গন্ধধারিণী গ্রহে
তটস্থ এক বিকল জীবের মনে
ক্ষার, নুন, চুন, অ্যাসিড-বাষ্প ফুঁড়ে
চমকিয়ে যাও থেকে-থেকে, ক্ষণে-ক্ষণে।
আবহমান
হে সর্বজনীন ডোম, হে অনন্ত অন্তেষ্ট্যিক্রিয়ার কারক,
সৎকার করবে আর কতটি শবের?
বংশবেগে বেড়েই চলেছে পঙ্গপাল। পঞ্চত্ব পাবার পরেও দ্যাখো
সবকিছু কেমন বহুগুণিত হয়ে ফিরে আসছে চক্রাকারে,
কোনোরূপ অডিট বা স্ক্রিনিং ছাড়াই।
অথচ ওম্ থেকে শুরু হয়ে ডোম অব্দি পৌঁছতে
কত কী যে পার হয়ে আসতে হয় বাস্তবিক–
দজ্জাল ঝড়ের রুক্ষ রোমশ মেজাজ, মরীচিকার মিথ্যাচার,
দুঃসহ বিয়োগব্যথা, সাধুর বকবৃত্তি, নিদারুণ আস্থা-ঘাটতি,
সিঁথিবদ্ধ সিঁদুর থেকে জেগে-ওঠা আভা…
মাঝখানে চন্দনের গাছে আগুন লেগেছে ওই সুগন্ধি আগুন।
ফাঁকতালে ব্যক্তিত্বকে একা ফেলে ভেগে গেছে ব্যক্তি
কখন যে ধরা পড়ে, সেই ভয়ে
এবং অচেনা এক অস্বস্তিতে কুঁকড়ে থাকে অনাথ ব্যক্তিত্ব।
আর এরই মাঝে ‘তুমি হইয়ো ফুল রে বন্ধু আমি হবো হাওয়া
দেশ-বিদেশে ঘুরবো আমি হইয়া মাতেলা।’
এরই মাঝে গো-বলয়ের গেরুয়ার সঙ্গে সমঝোতা
পুবদেশের ‘অহিংস’ গেরুয়ার।
বাঁকা কাস্তের সঙ্গে কী প্রকার বোঝাপড়া তবে
কথিত ‘শান্তি’র বাঁকা তলোয়ারের?
মাঝখান থেকে হবে রণক্ষেত্র স্থানান্তর, নিশ্চিত এশিয়া থেকে ক্রমশ ইউরোপে…
ইতিহাস জুড়ে এইসব গন্ধকৃতি আর চির-পক্ষপ্রীতি…
তবে আলো পড়বে যেই, সরে যাবে গন্ধ, মুছে যাবে পক্ষ, নেত্র, বাণ
যদিও এ কথা সর্বগত– ঘটনামাত্রই নিত্য ক্ষুরধার, খরসান
যেমন বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হলে ছিঁড়ে দু-ভাগ হয়ে যায় সন্তান।
কৌতুকবিলাস
ঈশ্বর ছুড়েছে ঢিল ঈশ্বরীর দিকে, কৌতুকবিলাসে।
গ্রহটিকে মাটির ঢেলা বানিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের এক প্রান্ত থেকে
ক্ষেপণ করেছে ভগবান, অন্য প্রান্তে থাকা ভগবতীর প্রতি।
মহাকাশ জুড়ে প্রসারিত মহাহিম শূন্যতা, লক্ষ-ডিগ্রি নিস্তব্ধতা–
তারই মধ্য দিয়ে একপিণ্ড ছোট্ট শ্যামল কোলাহল হয়ে
ধেয়ে যাচ্ছে এই ঢিল।
ঢিল নয়, মহামিসাইল–
মহাকাশের জোনাক-জ্বলা ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে
একের পর এক যমজাঙাল পেরিয়ে মিথ্যা-ইথারে অস্থির
ঢেউ তুলে ছুটছে ঢিল অহেতু আহ্লাদে
গোঁয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের মতো একদিকে টাল হয়ে চক্কর খেতে খেতে
ঘোর-লাগা লাটিমঘূর্ণনে
আহ্নিকে বার্ষিকে ধোঁয়াজট বেগব্যঞ্জনায়–
যে বেগ উদ্ভ্রান্ত, যেই গতি একইসঙ্গে ঋজুরেখ বক্র চক্রাকার
ঘূর্ণমান নাটকীয় একরোখা দুর্ধর্ষ ও ওলটপালট…
ছুটতে ছুটতে হয়রান ঢিলখানি।
ওদিকে ঈশ্বরী, ওই রাঘবরহস্যে-ঘেরা উত্তুঙ্গ রহস্যরাজ্ঞী,
সর্বনাশা এক ভাব-আলেয়ার ভাব ধ’রে অজ্ঞাত স্থানকালাঙ্কে ব’সে
থেকে-থেকে ছিনালি-হাতছানি একটু দিয়েই সরে যাচ্ছে দূরে।
মুহূর্তে মুহূর্তে ফুলে-ফেঁপে ওঠে মহাকাশ।
বেঁকে-যাওয়া, বাঁকতে-থাকা, ক্রমপ্রসারিত
এক দেশকালের ভেতর দিয়ে ঘটতে থাকে
ঢেলাটির উদ্ভ্রান্ত উন্মাদ ছুটে-চলা। আর
ছিটকে পড়ার ভয়ে ভয়ার্ত শিশুর মতো ছুটন্ত ঢেলার গা আঁকড়ে ধ’রে
চাম-উকুনের মতো চিমসা দিয়ে পড়ে থাকে প্রাণপণ
তটস্থ ও অসহায় প্রাণিকুল।
খেলা করে ভগবান ভগবতী— এ বিপজ্জনক ঢিল-ক্ষেপণের খেলা।
আর রোমাঞ্চে ও ত্রাসে শিউরে-শিউরে কেঁপে ওঠে তাদের শিশুরা।
পাখিতীর্থদিনে
আজ এই পাখিতীর্থদিনে, খোলা জানালাদিবসে
নিদারুণ এ অশনবসনের ক্লেশ।
দাউদাউ দুর্ভিক্ষের সামনে হা-দাঁড়ানো হতভম্ব মিকাইল।
হাতে কাঁপতে-থাকা ভিক্ষামাপনযন্ত্র–
মর্চেপড়া, অ্যানালগ; তদুপরি খসড়া, ক্যালিব্রেশনহীন।
এ-অঞ্চলে এমনিতেই কষ্ট।
পূর্বিনী, বিষণ্ন শৃগালিনী,
ভর্ৎসনাচিহ্নিত ভাঙা লণ্ঠনটি মুখে আঁকড়ে ধ’রে
ধীরে সরে পড়ো ক্রমপূর্বদেশে দুপুরের রোদে
কোনো এক গভীর অগ্রাহ্যজঙ্গলের সরু পথ দিয়ে চলা
স্নিগ্ধ মিথ্যাবাদিনীর মতো।
প্রবল, উজ্জ্বল বনকিরণের মাঝে, ততক্ষণে,
তোমার সমস্ত দেহে চিকচিক করতে থাক
মিহি মিথ্যা-মিথ্যা বালিপরাগ।
তোমার হ্রেষাকে, অতিরঙিন গতিকে
বারবারই অতিক্রম করে যাক
এইসব কিন্নরদিনের রিমঝিম
কিন্নরমুদ্রার হ্রী ও ধী-সমুদয়।
দিক-দিগন্তর থেকে, এখন, অখিল বুদ্ধিরাশি
ক্রমেই ধাবিত হোক ওই দিব্যদূতের মস্তিষ্ক অভিমুখে।
আন্তর্জাগতিক
ভিন গ্যালাক্সির মেয়ে তুমি, ভিন্ন গ্রহের মেয়ে
তোমায় আমি ফুটিয়ে তুলি ইচ্ছাশক্তি দিয়ে।
দেখতে কেমন, ভাষা কী তার, কেমন অবয়ব–
জড়বুদ্ধি জাহিল আমি, জানি না ওসব।
তার মন তৈরি রূপ তৈরি কেমন উপাদানে
কল্পভীরু এই কবি আর কীই-বা তার জানে!
জানি না তার অনুভূতি, আবেগ, স্বভাবগতি
স্রেফ অনুমানেই ফুটিয়ে তুলি, এমন প্রাণবতী!
ছায়াপথ ছাড়িয়ে, দূরের ওই সুরগঙ্গা, তারও ওইপারে, বহির্গোলকে,
শঙ্কু-আকৃতির এক মিটিমিটি আলো-জ্বলা ঘরে ব’সে
ভিন্ন ভুবনের মেয়ে তুমি
নির্নিমেষ চেয়ে আছো হে আমারই জানালার দিকে।
হৃদয়ের নেশা, এক আন্তর্জাগতিক নেশা…
একদিন ঘনিয়ে আসব ঠিকই দুইজনে, পরস্পরে।
তোমার আমার ঘনীভূত অভিকর্ষ দিয়ে
আস্তে-আস্তে বাঁকিয়ে ফেলব দেশকাল
দূর দুই জগতের মাঝখানে যে ব্যাকুল মহাশূন্য,
বেঁকে যাবে তা টানটান অশ্বক্ষুরাকার চুম্বকের মতো।
আলোকবর্ষের ওই মহাদূর দূরত্বই হয়ে যাবে
তুড়ি-মেরে-উড়িয়ে-দেওয়া ঘণ্টা কয়েকের পথ।
আর আমি ঠিকই সাঁতরে পাড়ি দেব ওইটুকু মহাকাশ।
জ্যামিতির ছুড়ে-দেওয়া এক জেদি অথচ লাজুক স্পর্শকের মতো
তোমাকেই ছুঁয়ে ছুঁয়ে বয়ে যাব আমি
পৃথিবী নামের গ্রহ থেকে ছোটা হেমন্তদিনের হাওয়া।
তৃষ্ণা
তেতে-ওঠা বালুর ওপর দিয়ে হাহাকার করে ধেয়ে আসে
এক মরুসরীসৃপ, মুসাফিরের দিকে।
“বিষ ঢালব না, ছিঁড়ে খাব না মাংস, শুধু একটু গলা ভেজাব রক্তরসে,
এমন ছাতিফাটা কহর তৃষ্ণায় প্রাণ যায়-যায়, এটুকু রহম করো হে বেদুইন”
ব’লে সেই গনগনে সরীসৃপ ঝাঁপ দিয়ে পড়ে বিদ্যুৎ গতিতে,
গোড়ালি কামড়ে ধরে রক্ত শুষে ভিজিয়ে নেয় জিহ্বা ও গলা,
তারপর নিমেষে উধাও, এক ক্ষমাহীন বিষুবীয় ক্রুদ্ধ মরীচিকার ভেতর।
নাম
তারপর চুপচাপ চলে যাব কোনো একদিন,
দূরসম্পর্কের সেই মাথানিচু লাজুক আত্মীয়টির মতো,
নিজের নামটিকেই ভুলে ফেলে রেখে, তোমাদের কাছে।
গিয়ে বার্তা পাঠাব– এসেছি তাড়াহুড়া করে,
ভুলে গেছি তাই।
পাঠিয়ে দিয়ো তো নামটিকে।
উত্তর পাব না কোনো।
কিছুদিন অনাথের মতো ঘুরে ফিরে
আমার সে-নামও নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে একদিন তোমাদের ছেড়ে।
আমিও বিলীন, আর নামও লুপ্ত, থাকবে শুধু তিলেক শূন্যতা।
আর তা পূরণ করতে এসে যাবে অন্য এক ভাবী বিলুপ্ততা।
পারাপার
কথা ছিল, দেব যৌথসাঁতার। অথচ কথা ভেঙে
একক ডুবসাঁতারে একা চলে এলাম এ-লোকান্তরে
তোমাকে ছাড়াই, ওগো সহসাঁতারিনী।
অনেক তো হলো পরলোকে!
এইবার সাঙ্গ করি পরপারলীলা
দিই আরো একটি অন্তিম ডুব।
ভেঙে দিয়ে এপার-ওপার ভুয়া ভেদরেখা
এক ডুবে ছুটে আসব পরলোক থেকে
সোজা ইহলোকেই আবার।
তোমাকে দেখার কী যে দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা আমার!
গিয়ে দেখে আসি– ওহে মুক্তকেশী,
আজ কোন লকলকে লাউডগা সাপে
বেঁধেছ তোমার
শিথিল চুলের রাশি।
প্রশান্তি
যখনই বাসায় আসে মায়ের পুরনো সেই প্রেমিক, শিশুটি বোঝে–
এ নিঃসীম নরকসংসারে
ওই স্নিগ্ধ সম্পর্কটুকুই যেন একপশলা মায়াবী শুশ্রূষা,
তার চিরবিষণ্ন মায়ের।
একখণ্ড নিরিবিলি রঙিন সুগন্ধদ্বীপ
মায়ের এ রং-জ্বলা নিষ্করুণ নিজস্ব ভুবনে।
স্রেফ, স্রেফ কিছুটা সময় হাসিখুশি দেখবে মাকে, শিশু তাই দ্রুত গিয়ে
সিডিতে চালিয়ে দেয় সেই গান,
যে-গান গেয়ে ওঠে চিরন্তন প্রেমিক-প্রেমিকা
চাঁদনি রাতে, প্রশান্ত নদীতে, দু-পা মেলে দিয়ে, ছইয়ের ওপর।
এইসব ছোট-ছোট মধুর মুহূর্ত,
প্রসন্ন নিমেষ
ধীরে ধীরে গিয়ে গেঁথে যায় এক বিষণ্নবিপুল অনন্তকালে।
সার্থক হয় মায়ের প্রণয়, মর্মী সন্তানের সহযোগ পেলে।
মা
এই ধূলি-ওড়া অপরাহ্ণে,
দূরে, দিগন্তের একেবারে কাছাকাছি
ওই যে খোলা আকাশের নিচে একা শয্যা পেতে শুয়ে আছেন–
তিনি আমার মা।
দূর্বা আর ডেটলের মিশ্র ঢেউয়ে, ঘ্রাণে রচিত সে-শয্যা।
নাকে নল, অক্সিজেন, বাহুতে স্যালাইন, ক্যাথেটার–
এভাবে প্লাস্টিক-পলিথিনের লতায় গুল্মে আস্তে-আস্তে
জড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।
শয্যা ঘিরে অনেকদূর পর্যন্ত ধোঁয়া-ধোঁয়া
মিথ্যা-মিথ্যা আবহাওয়া।
মনে হলো, বহুকাল পরে যেন গোধূলি নামছে
এইবার কিছু পাখি ও পতঙ্গ
তাদের উচ্ছল প্রগলভতা
অর্বাচীন সুরবোধ আর
অস্পষ্ট বিলাপরীতি নিয়ে
ভয়ে ভয়ে খুঁজছে আশ্রয় ওই প্লাস্টিকের ঝোপঝাড়ে,
দিগন্তের ধার ঘেঁষে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন মাতৃচ্ছায়ায়।
অনুপ্রবেশ
তখনই সফল হয় চৌর্যকৃত্য
যখন চোর ও গৃহস্থের মধ্যে গড়ে ওঠে সে-এক নিবিড় নৈশ-আত্মীয়তা।
জলকাদা মাড়িয়ে, প্রচুর কাঁটাগুল্ম পার হয়ে
গৃহস্থের উঠান পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে তস্কর।
সারা গায়ে তার স্পষ্ট বিছুটিপাতার অটোগ্রাফ
তবু খেঁকি কুকুরের মোক্ষম ফতোয়া শুনে আপাতত চুপ হয়ে আছে চোর।
এভাবেই, সারমেয়-র সশব্দ অনুশাসনবলে
চোরের অনুপ্রবেশ হয়ে ওঠে জটিল ও সুযোগসাপেক্ষ।
গৃহকর্তা ঘুমে, নিষ্ঠ তস্কর একাগ্র তপস্যায়–
কীভাবে যে গড়বে সেই উড়াল আত্মীয়সেতু, গৃহস্থে-তস্করে!
কুকুর, গৃহমালিক ও চোরের এই ধ্রুব সম্পর্কত্রিভুজ…
ডাহা আধ্যাত্মিক।
দীক্ষা
পথ চলতে আলো লাগে। আমি অন্ধ, আমার লাগে না কিছু।
আমি বাঁশপাতার লণ্ঠন হালকা দোলাতে দোলাতে চলে যাব চীনে, জেনমঠে
কিংবা চীন-চীনান্ত পেরিয়ে আরো দূরের ভূগোলে।
ফুলে-ফুলে উথলে-ওঠা স্নিগ্ধ চেরিগাছের তলায় বসে মৌমাছির গুঞ্জন শুনব
নিষ্ঠ শ্রাবকের মতো, দেশনার ফাঁকে ফাঁকে।
মন পড়ে রইবে দূরদেশে। সাধুর বেতের বাড়ি পড়বে পিঠে,
দাগ ফুটবে সোনালু ফুলের মঞ্জরির মতো শুদ্ধ সালংকার…
দীক্ষা নেব বটে মিতকথনের, কিন্তু
দিনে-দিনে হয়ে উঠব অমিতকথক,
নিরক্ষর হবার সাধনা করতে গিয়ে আমি হয়ে উঠব অক্ষরবহুল
এই হাসাহাসিভরা ভুঁড়িটি ভাসিয়ে গল্প বলে যাব
কখনো প্রেমের ফের কখনো ভাবের…
অথবা ধ্যানের, কিংবা নিবিড়-নিশীথে-ফোটা সুগভীরগন্ধা কোনো কামিনীফুলের।
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরবে মঠের মেঘলা আঙিনায়
ওদিকে অদূরে লালে-লাল-হয়ে-থাকা মাঠে পুড়তে থাকবে ঝাঁজালো মরিচ
সেই তথ্য এসে লাগবে ত্বকে ও ঝিল্লিতে।
আমি সেই মরিচ-পোড়ার গল্প বলব যখন–
ঝাঁজের ঝাপটায় উত্তেজিত হয়ে তেড়ে গিয়ে যুদ্ধে যাবে সবে, এমনকি বৃদ্ধরাও।
যখন প্রেমের গল্প– কমলায় রং ধরতে শুরু করবে সোনাঝরা নরম আলোয়।
আবার যখন গাইব সে-গন্ধকাহিনি, সেই ভেজা-ভেজা রাতজাগা কামিনীফুলের–
ঘ্রাণের উষ্ণতা লেগে গলতে থাকবে মধুফল দেহের ভেতর।
ব্লিজার্ড
আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দাপিয়ে ফিরে
সমগ্র নীলিমা তছনছ করে দিয়ে
কোটি-কোটি দুষ্ট দাপুটে শিশু খেলছে হুলুস্থুল বালিশ ছোড়ার খেলা।
অজস্র কার্পাস ঝরছে
লক্ষকোটি বালিশফাটানো তোলপাড়-করা অফুরন্ত তুলা।
যেন তুলারাশির জবুথবু জাতক হয়ে পড়ে আছে ধীরা ধরিত্রী, বিব্রত বেসামাল।
সাথে উল্টাপাল্টা ঝাড়ি একটানা বেপরোয়া বাবুরাম পাগলা পবনের।
আবার কোত্থেকে এক নির্দন্ত পাগলিনীর
আকাশ-চিরে-ফেলা ওলটপালট অট্টহাসি
মুহুর্মুহু অট্টালিকায় প্রতিহত হয়ে ছুটছে দিশাহারা দিগবিদিক
ঘরবাড়ি মিনার-ময়দান বাহন-বিপণী আড়ত-ইমারত গাছপালা বন বন্দর বিমান
সবকিছুর ওপর এলোপাথাড়ি থার্ড ডিগ্রি চালিয়ে বের করে আনছে
তুলকালাম গোপন তথ্য, তুলাজটিল শীৎকার।
ডালিম
যুগের যুগের বহু বিষণ্ণ বিবর্ণ মানুষের দীর্ঘনিশ্বাসের সাথে
নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড–
তা-ই থেকে তিলতিল কার্বন কুড়িয়ে
জমাট বাঁধিয়ে, কাষ্ঠীভূত হয়ে
তবে ওই সারি-সারি দিব্যোন্মাদ ডালিমের গাছ।
বৃক্ষের সংগতি যতটুকু, তারও বাইরে গিয়ে
তবেই-না ওই টানটান বেদানাবৃক্ষ, ব্যাকুল বেদনাকুঞ্জ,
মায়াতরু…রূপাঙ্কুর…রূপসনাতন…
পাতার আড়ালে ফাঁকে-ফাঁকে ফলোদয়
থোকা-থোকা গুপ্ত রক্তকুপিত উত্তপ্ত বিস্ফোরণ
রামধনুরঙে, মগ্নছন্দে
ফলিয়ে ফাটিয়ে তোলে ডালে-ডালে লালাভ ডালিম।
বসে আছি ম্রিয়মাণ…বেদনাবৃক্ষের নিচে, পড়ন্ত বেলায়।
সামনে খুলে মেলে-রাখা একটি ডালিমফল, তাতে
প্রভূত বেদানা-দানা, নিবিড় বেদনাকোষ…আর,
বেদানার দানারা তো আর কিছু নয়, জানি–
টলটলে করুণ চোখে রক্তজমা চাবুক-চাহনি…
ভাবছি,
এতসব ডালিমকোষের মধ্যে, ঠিক কোন কোষটি রচিত
আমারই সে ন্যুব্জ ব্যর্থ বিষণ্ণ পিতার বাষ্পঠাসা দীর্ঘশ্বাসের কার্বনে!
ঘনীভূত হয়ে ওই বায়ব অঙ্গার, তিলে-তিলে, অনেক বছর ধ’রে…
যোগসাজশ
যে-বছর জেগে ওঠে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি, ঘটায় তুমুল অগ্ন্যুৎপাত,
সে-বছর শিশুরা প্রফুল্ল থাকে, এবং ছাত্ররা
বিজ্ঞানে খারাপ করে, মানবিকে অসাধারণ।
যে-বছর অকারণ যুদ্ধ, সে-বছর অঙ্ক মেলাতে পারে না তারা পরীক্ষা-খাতায়।
বিকেলে বিষণ্ন-মনে ঘরে ফেরে নিঃস্ব হয়ে, ছোট ছোট গোল্লা-হাতে।
ওদিকে তখন বৃষ্টি হয় সাহারায়
এইদিকে দাবানলে কত একা-ফাঁকা মন পোড়ে
এ-সুদূর সাহারানপুরে।
জ্বরের ঋতুতে
তখন আমাদের ঋতুবদলের দিন। খোলসত্যাগের কাল। সুস্পষ্ট কোনো সর্বনাশের ভেতর ঢুকে পড়তে চেয়েছিলাম আমরা দুজন। তার আগেই তোমার জ্বর এল। ধস-নামানো জ্বর। তুমি থার্মোমিটারের পারদস্তম্ভ খিমচে ধরে ধরে উঠে যাচ্ছ সরসর করে একশো পাঁচ ছয় সাত আট… ডিগ্রির পর ডিগ্রি পেরিয়ে… সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী তাপের সহগ হয়ে উতরে উঠে যাচ্ছ তরতরিয়ে সেইখানে, যেখানে আর কোনো ডিগ্রি নেই, তাপাঙ্ক নেই… তাপের চূড়ান্ত লাস্যমাত্রায় উঠে ঠাস করে ফারেনহাইট ফাটিয়ে বেরিয়ে আসছে থার্মোমিটারের ফুটন্তঘন ফেনিল আগুন।
তীব্র, ধস-নামানো জ্বরেও নারীরা ধসে না। হয়তো কিছুটা কদাকার দেখায়… এবং কিছুটা করালী দেবীর মতো… যত রূপসী তত করালিনী, জ্বরে।
একসময় মাথা-ফেটে-যাওয়া থার্মোমিটারকে ব্রুমস্টিক বানিয়ে তাতে চড়ে উধাও উড়ালে অস্পষ্ট অঘটনের দিকে হারিয়ে যাচ্ছ হে তুমি, প্রিয়তরা পিশাচী আমার।
জীবনে প্রথম মুখোমুখি এরকম সরাসরি স্পষ্ট বিপর্যাস
থার্মোমিটারের জ্বালাখোড়ল থেকে ঝরছে তখনো টগবগ-করে-ফোটা ফোঁটা-ফোঁটা লাভানির্যাস।
তুমি, তোমার সরাইখানা এবং হারানো মানুষ
একটি দিকের দুয়ার থাকুক খোলা
যেইদিক থেকে হারানো মানুষ আসে।
মাংস-কষার ঘ্রাণ পেয়ে পথভোলা
থামুক তোমার সরাইখানার পাশে।
আজও দেশে দেশে কত লোক অভিমানে
ঘর ছেড়ে একা কোথায় যে চলে যায়!
কী যাতনা বিষে…, কিংবা কীসের টানে
লোকগুলি আহা ঘরছুট হয়ে যায়!
এ-মধুদিবসে আকাশে বাতাসে জাগে
ঘর ছাড়বার একটানা প্ররোচনা।
হারিয়ে পড়তে নদী মাঠ বায়ু ডাকে
ঘরে ঘরে তাই গোপন উন্মাদনা।
জগতের যত সংসারছাড়া লোক
ঘুরে ফিরে শেষে সরাইখানায় স্থিত।
এ-স্নেহবর্ষে তুমি কি চাও যে, হোক
ঘরছাড়া ফের ঘরেই প্রতিষ্ঠিত?
হারানো মানুষ সেই কত কাল ধ’রে
স্বজনের ভয়ে দেশ থেকে দেশে ঘোরে।
স্বজনেরা তবু নানান বাহানা ক’রে
বৃথাই খুঁজছে কালে ও কালান্তরে!
স্বজন যখন খোঁজে উত্তরাপথে
হারানো তখন দাক্ষিণাত্যে যায়।
স্বজন যখন নিরাশাদ্বীপের পথে
হারানো খুঁজছে নতুন এক অধ্যায়।
স্বপ্নভূভাগ
এবার বলো হে ফিরতিপথের নাবিক,
ওহে মাথা-মুড়িয়ে-ফেলা ভিনদেশি কাপ্তান,
সেই দ্বীপদেশের খবর বলো
যেইখানে মানিপ্ল্যান্ট ও সোলার প্ল্যান্টের পাতারা
একযোগে চিয়ার্স-ধ্বনি তুলে পাল্লা দিয়ে
পান করে রোদের শ্যাম্পেন।
কোন প্রজন্মের উদ্দেশে তাদের সেই স্বতঃস্বাস্থ্যপান?
সেই সে-দ্বীপের কথা বলো যেখানে নারীরা
সামান্য একটি কাঠের কুটিরে
সযত্নে ফুটিয়ে তোলে অন্তত বাষট্টি রকমের বাৎসল্য ও প্রীতি।
প্রীতিপরবশ সেই কুটিরের কথা বলো, সেই
একটানা মমতালোকের কথা বলে যাও হে কাপ্তান
যে-দেশে নিশুতি রাতে রাধিকাপুরের ঝিয়ারিরা
পথ চলে শিস দিয়ে, তুড়ি বাজাতে বাজাতে।
আর আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে
তালে-তালে পাল্টা তুড়ি বাজিয়ে সাড়া দেয়
নবীন উলটকম্বলের চটপটে পাতা ও পল্লব।
এবং হঠাৎই, টাশ-টাশ করে কথা বলে ওঠে
তরুণী বনবিড়ালিনীর সদ্য-বোল-ফোটা কনিষ্ঠা মেয়েটি।
তাক লাগিয়ে দেয় দ্বীপদেশের অরণ্য অধ্যায়ে।
নাবিক, অবাক সেই ভূভাগের কথা বলো
যেখানকার মাটি উষ্ণ, অপত্যবৎসল,
যেখানে মানুষ সোজা মাটিতে শুয়ে প’ড়ে
শুষে নেয় অষ্টাঙ্গে ভূতাপশক্তি সঞ্জীবন…
দেহ ও মাটিতে যোগাযোগ হয় একদম সরাসরি,
সোজা ও সহজ।
আমরাও তো চলেছি উজানে।
চলছি তো চলছিই অনিঃশেষ
উত্তর পেরিয়ে আরো দূর উত্তরোত্তর অঞ্চলে…
উগ্র লোনা বাতাসের সোহাগে, লেহনে
বিকল হয়েছে আমাদের সেক্সট্যান্ট
মর্চে ধরেছে কম্পাসে, দুরবিনে।
চলেছি তবুও।
বহু প্রত্যাশার, বহু সাধ-সাধ্য-সাধনার যোগ্য
স্বপ্নভূভাগ কি এরকমই দূর ও দুর্গম, যোগাযোগাযোগ্য?
অলুক, অনশ্বর
তোমরা কারা? কতদূর থেকে এলে?
মনোহরপুর? মধুপ্রস্থ? লীলাস্থলী? অবাকনগর?
কোন যুগেরই-বা তোমরা?
উপলীয়? তাম্র? প্রত্ন? নাকি নুহের আমল?
যে যেখান থেকে যে-যুগ থেকেই আসো-না-কেন
একই জাহাজের যাত্রী আমরা এ অকূল মহাকাশে।
সহযাত্রী, এবং সমবয়সী।
তোমাদের বয়স প্রায় চৌদ্দ শ কোটি বছর, আমাদেরও তা-ই।
যে-যে কণিকায় গড়া দেহ তোমাদের, আমাদেরও তা-ই–
অমরতা চাও? চাও অন্তহীন পরমায়ু?
বিলাপ থামাও, শোনো, আমরা যে যখনই আসি
অমরতা নিয়েই আসি হে অমৃতের সন্তান–
অলুক, অব্যয়, অনশ্বর, চির-আয়ুষ্মান।
জরা ব্যাধি মন্বন্তর মহামারি অনাহার অত্যাচার গুম খুন দুর্বিপাক দুর্ঘটনা
কোনো কিছুতেই হবে না কিছুই, ধস নেই, মৃত্যু নেই,
ক্ষয়ে যাওয়া ঝরে যাওয়া নেই
শুধু বয়ে চলা আছে, রূপ থেকে রূপান্তরে,
রূপক থেকে ক্রমশ রূপকথায়…
জলে স্থলে মহাশূন্যে অগ্নিকুণ্ডে…কোত্থাও মরণ নাই তোর কোনোকালে…
সাড়ে চার শ কোটি বছরের পুরনো এক সজল সবুজ
কমলা আকারের মহাকাশযানে চড়ে
চলেছি সবাই এক অনন্ত সফরে।
প্রলাপবচন
নদ এসে উপগত হবে ফের নদীর ওপর
দুই পারে জমে উঠবে কপট কাদার ঘুটঘুটে কেলেংকারি
মাঝখানে চোরাঘূর্ণি চোরাস্রোত
এলোমেলো এলোমেলো বাউরি ভাবনা এসে
পাক খেয়ে ঢুকে পড়বে বৃষ থেকে মিথুনের অধিক্ষেত্রে।
মাকাল ফলের মৃদু মনস্তাপ
করলা-লতার শ্যামলা আক্ষেপ
কোকিলস্য প্রবঞ্চনা, কাকের বাসায় উপঢৌকন
ভরা বিলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা ভেজা-ভেজা সুর
হুদহুদ পাখির অস্থিরতা, অসমাপিকার লঘু তঞ্চকতা
একরোখা অশ্বের অস্মিতা, উগ্রবসনা আগুনের চঞ্চল রসনা…
আলগোছে সবকিছু পাশ কেটে গিয়ে
ওইদিকে বর থাকবে কনের বশে
খলনায়কের দাঁতের নিচে পড়বে কট্টরপন্থি কাঁকর
চার্জ করা হবে পশ্চিমের ব্লাস্ট ফার্নেসে
আর ঝাপটা এসে লাগবে পূর্বেরটা থেকে
খামাখা দিওয়ানা হবে রঙিলা বিড়ালিনী
ঘনঘন গণ-হাইপ উঠবে মামুলি ঘটনা ঘিরে এমনি-এমনি
হিস্টিরিয়ায় কাঁপতে থাকবে দেশকাল
সাত সাধু এক হবে, এক শয়তান সাত
দোষযুক্ত আলু নামবে হিমাগারের শ্রোণিচক্র থেকে…
এবং হয়তো আমি একদিন ঠিকই
পড়ো-পড়ো ঘরকে যোগাতে পারব
গাঁট-অলা তিন-বাঁকা শালকাঠের সমর্থন
নিশ্চিহ্নকে দেখাতে পারব কিছু লুপ্তপ্রায় চিহ্নের ইশারা
বিশেষকে কোনো ভ্রান্তিকর নির্বিশেষের আভাস
বেদিশাকে দিশার বিভ্রম…
আর দুম করে লিখে ফেলব এমন এক কবিতা একদিন,
যা পড়ে ভৌতিক সুর তুলবে একসঙ্গে সাধু ও শয়তান
সাপ-আর-অভিশাপে-গড়া মতানৈক্যে-ভরা গামারিকাঠের গিটারে
আর ‘চলে আয়’ বলে স্বয়ং ঈশ্বর টুইট পাঠাবেন দিব্য টুইটারে।
আশ্রয়
যেইখানে তুমি নেই একেবারে, সেখানেও খুঁজে পাই
মাতাল যেমন রোদের মধ্যে মদিরার ঘ্রাণ পায়।
অনশনকারী কায়মনোদরে প্রতীক্ষা করে তাই
সেই লোকটির, যিনি এসে শেষে ভাঙাবেন অনশন।
আমিও তেমনই তোমার আবির্ভাবের প্রতীক্ষায়
নিবিষ্ট থাকি, মেলে রেখে ফুল-চন্দন আয়োজন।
হয়তো ভাববে সবকিছু মেকি, সবটাই প্রহসন।
প্রহার করবে, পকেটমারকে যেভাবে প্রহার করে।
ভয়ে, বিস্ময়ে, অভয়াশ্রয়ে তোমাকেই তবু আমি
জড়িয়ে ধরব। ভক্ত, তাই তো তীর্থেই এসে থামি।
ভক্তের মন সমস্ত ক্ষণ তীর্থ ঘিরেই ঘোরে
মা-র হাতে মার খেয়ে শিশু তবু মাকেই জড়িয়ে ধরে।
প্লবতা
সুঁইয়ের পুচ্ছে বাঁধা যে লম্বা সোনালি সুতাটি,
তারই এক অনিঃশেষ আঁকাবাঁকা ভ্রমণকাহিনি
সুরেলা হাতের সুরকুশলতায়
রূপকথা হয়ে বেজে ওঠে নকশিকাঁথায়।
আর সুঁইয়ের ডিএনএ-তেই আছে কারুশিল্প
যেমন চেয়ারের মর্মে লীন হয়ে থাকে তার প্লবতাশক্তি।
চেয়ারের ওই প্লবতাশক্তিই কেদারা-নশিনকে ভাসিয়ে রাখে
ক্রমপদোন্নতির পথে।
কোলাহল-বিষে দিগ্ধ দার্শনিক ওহে,
দ্রুত হয়ে ওঠো অতিদহনে বিদগ্ধ।
পুড়ে যাক কোলাহল, উবে যাক বিষ, রাতারাতি।
চিত্রকল্প
কেরোসিন খেয়ে মাতাল হয়েছে মাঝি
গলা ছেড়ে গান ধরেছে মাঝনদীতে
দাহ্য তরলে গোসল সেরেছে বউও
মেতেছে দুজনে নেশায়, নৈশ গীতে।
দুটি প্রাণী এই ঘোর অমাবস্যায়
জড়িয়ে ধরেছে যেই-না আশ্লেষায়,
উগ্র দাহ্য তরলের মৌতাতে
ঘর্ষ-আতশ জ্বলে ওঠে সাথে সাথে।
জ্বলে ওঠা ওই মাঝি-মাঝিনীর
মিথুনমূর্তি দেখে
ভীতবিহ্বল নৌকাখানিও
নিজেকে পোড়াতে শেখে।
জ্বলছে মাঝিটি, সেই সাথে মাঝিনীও
মধ্যনদীতে জ্বলছে নৌকাটিও।
নৌকা জ্বলছে, নদীও জ্বলছে,
জ্বলছে প্রতিমাযুগ
পালক পুড়ছে, খোলস পুড়ছে
আর যা পোড়ে পুড়ুক।
মাঝি ও মাঝিনী আর ডিঙাখানি
এই তিন বাহু আর
নদী ঢেউ স্রোত এই তিনে মিলে
চিতা ছয় মাত্রার।
জ্বলন্ত ওই যুগল মূর্তি
দাঁড়ানো লম্বাকার
ষড়ভুজ চিতা জ্বলছে নদীতে
হু-হু হাওয়া, হাহাকার।
বহুদূর থেকে কূটাগারে বসে
দৃশ্য দেখছি এই
অন্ধ ক্ষুব্ধ নদীকে হয়তো
মানায় এই রূপেই।
জ্বলন্ত ফুলে ফুটে-থাকা দুই
জ্বলন্ত মৌমাছি
বিস্ফোরিত এ চিত্রকল্পে
স্তম্ভিত হয়ে আছি।
দমকল
উন্মাদ উঠেছে গাছে, তরতর করে, ছাড়া পেয়ে পাগলাগারদ।
নামে না সে কিছুতেই, যতক্ষণ-না ওই বেঁটেখাটো নার্সটি এসে
মিনতি করে না-নামায় তাকে।
নার্স আসে দ্রুত, দমকলের মতন
কী-কী যেন বলে হাত নেড়ে নেড়ে,
তাতে খুশি হয়ে নেমে আসে উঁচু ডাল থেকে বিমুগ্ধ পাগল–
ঝোলের উল্লাসসহ নেমে আসে যেইভাবে কইমাছ পাতে
কানকো টেনে টেনে
ক্রমিক সংখ্যার মতো সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে।
ঝিলমিল করে বয়ে যায়, সেবিকার বোধে, পাগলের বিকল বিবেক।
উন্মাদ আবার ফিরে যাবে আজ উন্মাদ-আশ্রমে
ধর্মগণ্ডিকায় মাথা রেখে নির্বিকার নিয়ে নেবে
তেরোটি ইলেকট্রিক শক
তেরোবার স্বীকারোক্তি, স্বাস্থ্যযাজকের শান্ত সুধীর নির্দেশে।
বহুদিন পর আবার প্রেমের কবিতা
মেঘ থেকে মেঘে লাফ দেবার সময়
তুরীয় আহ্লাদে দ্রুত কেঁপে-বেঁকে
একটানে একাকার যখন বিজলিসূত্র, ওই ঊর্ধ্বতন
মেঘের আসনে এক ঝলক দেখা গেল তাকে
আলোকিত ঘনকের আকারে।
তাকে ডাক দেবো-দেবো, আহা কী বলে যে ডাক দিই!
জন্ম এক রুদ্ধভাষ জাতিতে আমার–
মুহূর্তে মিলিয়ে গেল অপর আকারে।
দূর মহাকাশে
ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফুটে আছে কত ফুয়েল-স্টেশন–
সেইসব এলোমেলো নৈশ নকশার মধ্যে তাকে, প্রিয় তোমাকেই,
ঘোর মধ্যরাতে
এইভাবে দেখে ফেলি আমিও প্রথম।
সর্ববায়ু আমার সুস্থির হয়ে যায়।
যেই দেখি আর ডাক দিতে যাই প্রিয়, অমনি
তোমার সমস্ত আলো, সকল উদ্ভাস
হঠাৎ নিভিয়ে নিয়ে চুপচাপ অন্ধকার হয়ে যাও।
আবার উদ্ভাস দাও ক্ষণকাল পরে–
এইরূপে খেলা করো, লুকোচুরি, আমার সহিত।
আমি থাকি সুদূর রূপতরঙ্গ গাঁয়, আর তোমার সহিত
তোমারই সাহিত্যে আহা এভাবে আমার বেলা বয়ে যায়।
এরপর থেকে একে একে এক উচ্চতর জীবের বিবেক
প্রথমে প্রয়োগ করে দেখি,
মিলিয়ে যাচ্ছেন তিনি আকারে ও নিরাকারে।
এক অতিকায় জট-পাকানো যন্ত্রের
আগ্রহ সাধন করে দেখি,
তা-ও তিনি ছড়িয়ে পড়েন সেই আকারে নিরাকার;
আকাশে আকাশে মেলে রাখা তার কী ব্যাপক কর্মাচার,
একটির পর একটি গ্রহ আর জ্বালানি-জংশন সব
অতর্কিতে নিভিয়ে নিভিয়ে প্রবাহিত হন তিনি।
একদা মণ্ডলাকার ছিলে জানি
আজ দেখি দৈবাৎ ধর্মান্তরিত, ঘনকের রূপে!
ঘনক তো গোলকেরই এক দুরারোগ্য সম্প্রসার।
তবুও তো ধর্ম রক্ষা পায়। রক্ষিত, সাধিত হয় তবু।
গোলকত্ব পরম আকার
গোলকতা যথা এক অপূর্ব বিহেভিয়ার,
প্রায়-নিরাকারসম এক নিখুঁত আকার।
শৈশবের কালে, এক আশ্চর্য মশলা-সুরভিত
গুহার গবাক্ষপথে আচম্বিতে ভেসে উঠেছিল মেঘ,
যার বাষ্পে বাষ্পে কূটাভাস।
কিছুতেই পড়তে পারি নাই সেই মেঘ
আমরা তখন।
বিব্রত বাতাস তাকে, মেঘে মেঘে সংগঠিত ক্ষণ-ক্ষণ-আকৃতিকে,
ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে যাচ্ছে কত বিভিন্ন প্রদেশে।
নিরাকৃত হতে হতে প্রায়, ওই তো ব্যক্ত হচ্ছেন ফের আকারে আকারে।
ধর্মচ্যুত হতে হতে প্রায়, ফের প্রচারিত হন ধর্মে ধর্মে।
আহা, ধর্ম হারালে কী আর থাকে তবে এ ভুবনে!
ঘনক যে গোলকেরই এক নিদারুণ তাপিত প্রসার।
বৃহৎ, অকল্পনীয় এক জড়সংকলন। বড় বালিপুস্তকের মতো–
তারই মধ্যে অকস্মাৎ একটু প্রাণের আভা। মাত্র তার একটি পৃষ্ঠায়।
এই সংকলনের ভূমিকাপত্রটিও নেই। ছিন্ন। সেই প্রধান সংঘর্ষে।
নিষ্ক্রান্তিদিবসে, অতঃপর, ওই গুহামুখে পড়ে থাকে
এ বিপুল জড়সংকলনের ছেঁড়া ভূমিকাপৃষ্ঠাটি,
অর্থাৎ সেই যে প্রথম ক্যাজুয়াল্টি, নিখিলের–
ওই গুহাপথে, নিষ্ক্রমণকালে।
একবার মাত্র দেখা হয়েছিল কায়ারূপে
ঝাপসা, ছায়া-ছায়া!
তা-ও বিজলির দিনে, তা-ও মেঘের ওপরে
উল্লম্ফকালীন।
এরপর থেকে শুধু ভাবমূর্তি…
যেদিকে তাকানো যায়
কেবলই, উপর্যুপরি ভাবমূর্তি ঝলকায়।
মাঠে মাঠে স্প্রিং স্ক্রু আর নাটবোল্ট ফলেছে এবার সব জং-ধরা।
সে-সব ভূমিতে হাঁটু গেড়ে গলবস্ত্র হয়ে পরিপূর্ণ দুই হাত তুলে
যাচ্ঞামগ্ন সারি সারি সম্প্রদায়– তারা অসবর্ণ, তারা
লঘিষ্ঠ– কলহরত বিড়ালের আধো-আলো-আঁধারি বাচন ও কণ্ঠস্বর
কেড়ে নিয়ে দ্রুত নিজ কণ্ঠে কণ্ঠে গুঁজে দিয়ে সারিতে দাঁড়িয়ে যায় তারা।
তেজের অধিক তেজ
বাক্-এর অধিক বাকস্ফূর্তি তুমি,
গোলকে স্ফুরিত হয়ে এসো পুনর্বার
পূর্বধর্ম ধারণ করে সরাসরি উত্তম পুরুষে।
আর
কত অর্থ যে নিহিত করে রাখো বীজাকারে
সেইসব ভাসমান বাক্যের অন্তরে,
দৃশ্যত যা অর্থহীন অতি-অর্বাচীনদের কাছে।
সংকটে সংকটে, সর্ব-আকারবিনাশী
দহন দলন আর দমনের দিনে
আদিগন্ত কুয়াশা-মোড়ানো সেই তৎকালীন রৌদ্রের মধ্যেই
চতুর্দিক থেকে একসঙ্গে আর
বৃক্ষে বৃক্ষে আর দ্রব্যে দ্রব্যে আর ভূতে ভূতে সর্বভূতে
মুহুর্মুহু উদ্ভাস তোমার, এক অবধানপূর্ব রহিমের রূপে।
ঘনক তো গোলকেরই এক অপূর্ব অপিনিহিতি।
এইরূপে লীলা করো, লুকোচুরি, আমার সহিত।
আমি থাকি দূরের রূপতরঙ্গ গাঁয়, আর তোমার সহিত
তোমার সাহিত্যে দ্যাখো এভাবে আমার বেলা বয়ে যায়।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান