ধোঁয়া আর না-কান্নার গল্প

-লতিফ হোসেন

আমার ভেতর যতগুলি হ্যাঁ আছে, তার চাইতে অনেক বেশি না আছে। সেকারণেই আমি বরাবরই পেটমোটা। জন্মগত নয়, অভিযোজনে গড়ে ওঠা স্বভাবের কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ বললে ভুল হয় না।

–এ কী কথা রহমান সাহেব!

–কথা খানিকটা তেমনই সরকার মশাই।

–তাও ভালো। তবে আপনি ডিগবাজির দলে নন। এপাশ-ওপাশ করতে আপনাকে তেমন দেখি নি। অবশ্য সাদা শার্টখানি ওপর থেকেই ভালো লাগে। ভেতরের স্যান্ডো ফুটো কিনা, উঁকি দিয়ে দেখি নি।

–দেখতেই পারেন, ওতে আমার কিসসু যায় আসে না!

সরকার ঘর থেকে চলে যেতেই শীতের নিস্তব্ধতা ঝিঝির ডাকে এসে শরীর মেলাল। রহমান বুঝতেই পারে নি বাইরেটায় রাতের গভীরতা এত শক্তভাবে চেপে বসেছে অন্ধকারের গায়ে। ভাবনার স্রোতও গভীর না হয়ে পারে না। হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। যেভাবে দাম বেড়েছে কিন্তু মাইনে বাড়ে নি। ওপাশে বেকারত্বের গায়ে প্রলেপ এঁটে জৌলুস বেড়েছে কিন্তু ভেতরটা খাঁটি থাকে নি। গত দুদিনের চাইতে শীত আজ খানেকটা কম। একটা তারপর দুটো, তারপর পরপর আরও কটা গোনা সম্ভব হয় নি, শেয়ালগুলো করুণ স্বরে ডেকে উঠল। অন্ধকার ভেঙে সে আওয়াজ এসে বিঁধতে লাগল বাদামি রঙের লোহায় বাঁধানো জানালাগুলিতে। সেই ডাকের সূত্র ধরেই আরও আরও দূরের শেয়ালেরাও সুর মেলালে কলেজ স্কোয়ারের প্রতিবাদী মিছিল বলেই মনে হয়। তাই কী? কিন্তু অন্যদিন তো শেয়ালগুলো ডাকলেই রহমানের ভেতরটা কেমন শূন্য হয়ে যায়। ও দেখতে পায় বুভুক্ষু পৃথিবীর কান্না। বড়োরা ছোটোদের গিলছে। ধর্মের বাহ্যিক দেখনদারিতে আমি-তুমির দ্বন্দ্ব প্রকট। হাম বড়া– তুম ছোটার দ্বন্দ্ব। লঘু-গুরুর দ্বন্দ্ব। মন্দিরে–মসজিদে গা জোয়ারি। কিন্তু মানুষ কই? আজ হঠাৎ কেন বিপ্লবী সাজতে যাওয়া। না, লেনিনের বাচ্চা বলে গালি খাই নি কোনও দিন। মানুষ ভালোবাসি। অধিকারের প্রশ্নে মাথা ও পা ব্যথায় সমান গুরুত্ব দিই। দাঁত মাজিনি ব’লে সকালের ধোঁয়া ওঠা চায়ে না করি নি কখনো।

চা ভাবতেই বিশ্বাস দুটো নকশা আঁকা কাপে ঘরে এলো। রহমান, বিশ্বাস আর সরকার একই মেসের পাবলিক। পেশায় তিনজনই প্রভাষক। সরকারের বরাবরই চায়ে অনীহা, বিশ্বাস তা জানে বলেই তিনের জন্য দুই।

–মাঝ রাত্তিরে চা?

–একে শীত, তায় ধোঁয়া ওঠা। তোমার মেন্টাল ডিম্যান্ডকে বুঝি বস!

–থ্যাংকু!

বিশ্বাসের টি-শার্টে লাল কালিতে লেখা রবিনসন ক্রুশো। রহমানের মনে পড়ে বেকার অবস্থায় নিজেকে অ্যালেকজান্ডার সেলকার্ক হিসেবে মনে করত। ও যেন নিয়ান্ডারথালদের মুখোমুখি। নগ্ন শরীরটাকে লম্বা বাঁশে ঝুলিয়ে সামনে পেছনে দুদল মানুষ ক্রমশ এগোচ্ছে কালো ধোঁয়া ওঠা আগুনের দিকে। আগুন ক্রমশ আকাশমুখি। চারিদিকে জঙ্গল। মাঝে কিছু ক্ষুধার্ত মানুষের উল্লাস। ঠিক সেই মুহূর্তে ভাবনায় ছেদ টেনে গরম চায়ের কাপটি মুখের প্রায় কাছাকাছি নিয়ে এসে বিশ্বাস বলল- গ্রীন টি ভাই।

বিশ্বাসে আশ্বাস রেখে রহমান গরম চায়ে চুমুক দিল। এই ‘বিশ্বাস’ই ওর ভিত্তি। এই ‘বিশ্বাসে’র কাছেই ও আজীবন দুর্বল। এই ‘বিশ্বাস’কেই ও প্রাণের চাইতে বেশি ভালোবাসে। বাকি যেটুকু আগুন দেখা, বুঝবে আড়ালে কেউ কেউ কয়লা ঢালছে।

রহমান আর বিশ্বাস পরস্পর চটুল কথায় খিল-খিলিয়ে হেসে উঠল। ততক্ষণে শেয়ালের কান্নাগুলি অবশ্য থেমে গেছে।

না থেমে পারে?


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending