মিথিলার প্রথমপাঠ
-ফারুক আহমেদ রনি
লন্ডনের আকাশটা সেদিন অদ্ভুত রকম ধূসর ছিল। গ্রামের আকাশের মতো নয়, যেখানে সন্ধ্যায় তারারা জোনাক পোকার মতো আলো জ্বালিয়ে নেমে আসত, যেখানে সে বাবার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে আকাশ দেখত। এখানে আকাশ আছে, কিন্তু ছোঁয়া নেই। আলো আছে, উষ্ণতা নেই। বৃষ্টি নামেনি, অথচ মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে নামতে পারে। জানালার কাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে মিথিলা নিচের রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে ছিল। মানুষজন দ্রুত হাঁটছে, বাস আসছে-যাচ্ছে, কেউ কাউকে দেখছে না। এই শহরটা এমনই, সবাই নিজের মতো করে বেঁচে থাকে, কারো থেমে দাঁড়ানোর সময় নেই।
মনসুর আলীর বাড়িতে থাকার সময়গুলোতে সে বুঝতে শুরু করে যে মানুষ আসলে জায়গা দিয়ে নয়, মানুষের উপস্থিতি দিয়ে বাঁচে। এই ঘরে কেউ তার শরীর চায় না, কেউ তার দুর্বলতার হিসাব কষে না। আয়েশা খালার রান্নাঘরের গরম ভাতের ধোঁয়া, মনসুর আলীর ধীর কণ্ঠ, রাবিয়ার হাসি, এই ছোট ছোট জিনিসগুলো তার ভাঙা আত্মাকে জোড়া লাগাতে থাকে।
রাবিয়া একদিন তাকে বলেছিল, “জানো, মিথিলা, অনেক সময় আমরা ভাবি আমাদের জীবন কেউ চুরি করে নিয়েছে। আসলে জীবন কখনো চুরি হয় না। কেবল দেরিতে আমাদের কাছে ফিরে আসে।”এই কথাটা মিথিলার মনে গেঁথে যায়।
মনসুর আলীর বাড়ির ছোট অতিথি ঘরটায় দাঁড়িয়ে সে প্রথমবারের মতো নিজেকে একটু নিরাপদ মনে করল। ঘরটা খুব সাধারণ, একটা সিঙ্গেল বেড, পাশে ছোট আলমারি, জানালার ধারে একটা চেয়ার। কিন্তু এই ঘরের দরজাটা বন্ধ মানেই বন্দিত্ব নয়। এই পার্থক্যটাই তার বুকের ভেতর হালকা বাতাস ঢুকিয়ে দেয়।
রান্নাঘর থেকে আয়েশা খালার ভাত আর ডালের গন্ধ ভেসে আসছিল। রাবিয়া ফোনে কারো সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলছিল, হাসছিল। এই শব্দগুলো মিথিলার কাছে অচেনা নয়, আবার খুব আপনও নয়। সে জানে, সে এখানে অতিথি। কিন্তু এই আতিথ্যের ভেতরে কোনো ভয় নেই। তবু রাত নামলেই স্মৃতিরা এসে ভিড় করে। স্মৃতি কখনো দরজায় কড়া নাড়ে না। তারা জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে।
মিথিলার জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের এক মফস্বল শহরের পাশে ছোট্ট এক পল্লিগ্রামে। গ্রামের নাম খুব বেশি পরিচিত নয়, ম্যাপেও খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু মিথিলার কাছে সেই গ্রামটাই ছিল পৃথিবী। কাঁচা রাস্তা, দুই পাশে তাল-খেজুর গাছ, বর্ষায় কাদা আর শীতে ধুলোর রাজত্ব। এই গ্রামের শেষ মাথার ছোট টিনের ঘরটাতেই মিথিলার জন্ম। সব মিলিয়ে জীবনটা সহজ ছিল না, কিন্তু সোজা ছিল।
মিথিলা মইনুদ্দিনের একমাত্র মেয়ে। মইনুদ্দিন অটো রিকশা চালায়। ভোরে ফজরের আজানের আগেই বের হয়, রাতে ফিরে আসে ক্লান্ত শরীর আর ধুলো-মাখা জামা নিয়ে। শরীরটা শুকনো, রোদে পুড়ে কালচে। কিন্তু চোখে ছিল একরকম জেদ, জীবনের কাছে হার না মানার জেদ। তার সেই জেদের নাম ছিল মিথিলা। সারাদিনের আয় গুনে দেখে, কখনো পাঁচশো, কখনো তিনশো। কিন্তু চোখে তার হিসাব শুধু টাকার না, হিসাব থাকে একটাই যে মেয়েটাকে মানুষ করতেই হবে।
মিথিলা ছিল একমাত্র সন্তান। ছোটবেলা থেকেই তাকে নিয়ে বাবার স্বপ্ন ছিল বড়। গ্রামের মেয়েরা যখন উঠোনে পুতুল খেলত, মিথিলা তখন পুরোনো বইয়ের পাতা উল্টাত। সে বুঝত না সবকিছু, কিন্তু বুঝতে চাইত।সংসারে অভাব ছিল নিয়মিত অতিথি। কখনো চাল কম, কখনো তেল নেই। কিন্তু মইনুদ্দিন কখনো কার্পণ্য করেনি মেয়ের পড়াশুনায়।
মিথিলা ছোটবেলা থেকেই আলাদা ছিল। বই খুললে চোখ জ্বলে উঠতো। অন্য মেয়েরা যখন উঠোনে খেলত, সে তখন জানালার ধারে বসে পড়ত। মা বলতো, “এই মেয়ে বই খেয়ে ফেলবে একদিন!” মইনুদ্দিন হাসতো। মনে মনে স্বপ্ন দেখতো; একদিন তার মেয়ের পরিচয় হবে নিজের নামে, বাবার নামে না।গ্রামের লোকের কথা অবশ্য আলাদা ছিল। “মেয়ে মানুষ, এত পড়াশুনা শিখিয়ে কী হবে?”“বড় হলে তো পরের ঘরেই যাবে!” “অযথা টাকা নষ্ট করছো মইনুদ্দিন!” মইনুদ্দিন কারো কথায় কান দেয়নি। মইনুদ্দিন কিছু বলত না। সে জানতো- দারিদ্র্য সবচেয়ে বেশি ভয় পায় শিক্ষাকে। তাই উত্তর সময়ই দেবে।
মিথিলা হাইস্কুলে ভালো রেজাল্ট করল। তারপর শহরের কলেজে ভর্তি হলো। প্রতিদিন সকালে মইনুদ্দিন অটো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত বাড়ির সামনে। মেয়েকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে সে যাত্রী খুঁজতে বেরিয়ে পড়ত। বিকেলে আবার কলেজ গেটে এসে দাঁড়াত। এই যাওয়া-আসার পথেই মিথিলা বড় হয়ে উঠছিল। ডিগ্রি পরীক্ষার ফল যেদিন বের হলো, সেদিন ঘরে কোনো মিষ্টি ছিল না। কিন্তু সেদিন রাতে মিথিলার মা চোখের আনন্দের পানি লুকাতে পারেনি। মইনুদ্দিন শুধু বলেছিল, “আমার মেয়ে পারছে।”
একদিন যাত্রী তুলতে গিয়ে মইনুদ্দিনের অটোতে ওঠে পরিপাটি পোশাকের এক লোক। কথা বলার ভঙ্গি আলাদা। পুরো দিনের জন্য অটো বুকিং নেয়। পথে কথা বলতে বলতে জানা যায়, লোকটা লন্ডনে থাকে। কেয়ার কোম্পানির মালিক। মইনুদ্দিনের বুকের ভেতর কোথাও একটা দরজা খুলে যায়। সে মেয়ের কথা বলে। মাসুম আগ্রহ দেখায়। বলে, “ইংরেজি ভালো হলে সুযোগ আছে। আইএলটিএস দিতে পারলে হয়ে যাবে।”
তবে অনেক টাকা লাগবে। টাকার কথা শুনে মইনুদ্দিন থমকে যায়। এত টাকা তার কল্পনার বাইরে। মাসুম বলে, “মেয়েটাকে একবার দেখি, কথা বলি আগে।” তাই হলো, মাসুম মইনুদ্দিনের বাড়িতে আসে। যখন মিথিলার সঙ্গে কথা বলে, সে অবাক হয়। মেয়েটার ইংরেজি পরিস্কার, উচ্চারণ সুন্দর। চোখে আত্মবিশ্বাস। সে বলে, “তুমি চেষ্টা করো।” মিথিলা আইএলটিএস দেয় এবং ৬ ব্যান্ড পেয়ে পাস করে।
শেষ পর্যন্ত অনেক ধার-দেনা করে, অটো বিক্রি করে টাকা জোগাড় হয়। সব টাকা না, অর্ধেক। মাসুম বলে; “বাকি টাকা পরে দিলেও চলবে। তুমি আমার জিম্মায় থাকবে।” মিথিলা ভয় পায়, তবু ভাবে, “এটাই হয়তো একমাত্র সুযোগ।”
এখান থেকেই গল্পটা বাঁক নেয়। অনেক ধার-দেনা করে, অটো বিক্রি করে অর্ধেক টাকা জোগাড় হয়। মাসুম বলে, বাকি টাকা পরে দিলেও চলবে। তবে শর্ত একটাই, মিথিলাকে তার কথামতো চলতে হবে।মিথিলা আপত্তি করেছিল। কিন্তু বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গিয়েছিল। বাবার স্বপ্নের ওজন ছিল ভারী।
লন্ডনে পা রাখার দিনটাকে সে আজও ভুলতে পারে না। বিমানবন্দরের আলো, মানুষের ভিড়, ভাষার কোলাহল, সবকিছু তাকে একসঙ্গে উত্তেজিত আর ভয় পাইয়ে দিচ্ছিলো। বুক হাসপাস করছে, কেমন এক অন্যজগতে তার পদার্পণ। মাসুম নিজে এসেছিল তাকে রিসিভ করতে। হাসি দিয়ে বলেছিল, “Welcome to England.”
লন্ডনে নেমে প্রথম যে জিনিসটা সে অনুভব করে, তা হলো শীত। আর মাসুমের হাত, অপ্রত্যাশিতভাবে জড়িয়ে ধরা।
প্রথম কয়েক দিন সবকিছু স্বাভাবিকই লাগছিল। তারপর ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে দৃশ্যপট। মিথিলা খুব কমই বাইরে যেত। মাসুম তাকে কোথাও যেতে দিত না একা। দিনের পর দিন সেই ফ্ল্যাট, সেই জানালা, সেই নীরবতা, সব মিলিয়ে তার পৃথিবীটা ছোট হতে থাকে। বাসা। একলা ঘর। অপেক্ষা। চাকরির কোন খবর আসে না। মাসুম আসে, যায়। তার শরীর ব্যবহার হয়, তার মতামতের কোনো মূল্য নেই। সে প্রতিবাদ করতে পারে না। কারণ বাবার মুখ ভেসে ওঠে, মায়ের চোখ ভেসে ওঠে। কথা বলা, বাইরে যাওয়া, সব নিয়ন্ত্রণ। মিথিলা বোঝে; সে শুধু একটা মানুষ না, সে একটা দেনা। দিনের পর দিন সে ভেঙে পড়ে। কিন্তু মুখ খোলে না। কারণ দেশে বাবা-মা অপেক্ষা করছে। একদিন সে মাসুমের অফিসে যায়। দেখে অফিস বন্ধ। পাশের অফিসের একজন জানায়- কোম্পানির স্পন্সরশিপ লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত হয়েছে অনেক আগেই। তাই অফিস বুন্ধ হয়ে আছে অনেক দিন। সেদিন মিথিলার মাথার ভেতর সব শব্দ থেমে যায়। মাসুমের প্রতি তার অনুভূতি জটিল। সে জানে, এই মানুষটা না থাকলে সে কখনো লন্ডনের মাটিতে পা রাখতে পারত না। এই মানুষটাই তার স্বপ্নের দরজাটা খুলে দিয়েছিল। কিন্তু একই সাথে এই মানুষটাই তাকে শিখিয়েছে, স্বপ্নের দরজা খোলা থাকলেই ভেতরে আলো থাকে না। অনেক সময় ভেতরে অন্ধকার জমে থাকে, ছত্রাকের মতো। যেদিন মাসুম শেষবারের মতো তার সামনে দাঁড়িয়েছিল, মিথিলা তার চোখে কোনো রাগ দেখেনি। দেখেছিল ক্লান্তি। যেন সেও জানে। সে ভুল করেছে, কিন্তু সেই ভুল শুধরে নেওয়ার শক্তি তার নেই। মিথিলা সেদিন বুঝেছিল, প্রতিশোধ সব সময় চিৎকার করে আসে না। কখনো কখনো প্রতিশোধ হয় নীরব দূরত্ব।
সেই রাতেই সে সিদ্ধান্ত নেয়। খুব ধীরে ধীরে নিজের জিনিসপত্র গুছায়। খুব বেশি কিছু নেই, কয়েকটা কাপড়, কিছু কাগজ, আর ছোট একটা সুটকেস। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকায়। মুখ ক্লান্ত, চোখের নিচে কালো ছাপ। তবু চোখের গভীরে সে একটা দৃঢ়তা দেখে।
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার সময় তার মনে হয়নি সে কোথাও যাচ্ছে। বরং মনে হয়েছিল, সে কিছু থেকে বেরিয়ে আসছে। অচেনা শহর, অচেনা রাস্তা, সবকিছু এক মুহূর্তে তাকে গ্রাস করে। লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে তার মনে হয়, সে আবার শূন্যে ফিরে এসেছে। ঠিক যেমনটা অনেক বছর আগে বাবার অটোতে বসে শহরে প্রথম এসেছিল, ভয় আর আশা একসঙ্গে নিয়ে।
কোথায় যাবে, কাকে ডাকবে, কিছুই জানা ছিল না। শুধু পা চলে যায় সামনের দিকে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে পরিচিত একটা সাইনবোর্ড দেখে। বাঙালি গ্রোসারি শপ। সেই দোকান, যেখানে সে দুই-তিন দিন বাজার করতে এসেছিল। দোকানের ভেতর ঢুকতেই তার বুকটা হালকা হয়ে আসে, যেন পরিচিত কোনো গন্ধ তাকে ধরে ফেলেছে।
মনসুর আলী কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মিথিলাকে দেখে তিনি প্রথমে একটু অবাক হন। তারপর তার চোখে মেয়েটার ছোট সুটকেসটা পড়ে। মিথিলা আর কিছু বলতে পারে না। গলা কেঁপে ওঠে। কথাগুলো ভাঙতে ভাঙতে বেরিয়ে আসে। কোথা থেকে এসেছে, কেন এসেছে, কীভাবে আটকে পড়েছে, সব। কোনো সাজানো গল্প নয়, কোনো নাটক নয়, শুধু ক্লান্ত সত্য।
মনসুর আলী চুপ করে শোনেন। একবারও থামান না। মেয়েটার কথা শেষ হলে তিনি ধীরে বলেন,“ভয় পেয়ো না মা। আমারও একটা মেয়ে আছে।” এই কথাটুকু মিথিলার বুকের ভেতরের শক্ত বাঁধটা ভেঙে দেয়। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। সেদিন রাতেই সে মনসুর আলীর বাড়িতে ওঠে। ছোট, সাধারণ একটা বাড়ি। কিন্তু সেই ঘরের ভেতর ঢুকে তার মনে হয় অনেক দিন পর সে এমন একটা জায়গায় এসেছে, যেখানে দরজা বন্ধ মানেই বন্দি নয়।
বর্তমানে ফিরে আসে মিথিলা। জানালার বাইরে লন্ডনের আকাশ একটু পরিস্কার। সে জানে, সামনে পথ সহজ নয়। দেশে ফিরতে হবে, নতুন করে শুরু করতে হবে। বাবার মুখের দিকে তাকাতে হবে।
দু’মাস চলে যায় মনসুর আলীর ঘরে। এই দু’মাসে মিথিলার জীবন যেন প্রথমবারের মতো একটু নিঃশ্বাস নিতে শেখে। মনসুর আলীর স্ত্রী আয়েশা খালা ভোরে উঠে নাশতা বানান, মিথিলার দিকে তাকিয়ে বলেন,“মা, ভালো করে খাও। শরীর ভালো না থাকলে মনও ভালো থাকে না।” এই সাধারণ কথাগুলোই মিথিলার চোখ ভিজিয়ে দেয়। লন্ডনে আসার পর এই প্রথম কেউ তাকে কিছু চায় না, শুধু মানুষ হিসেবে দেখে।
রাবিয়ার সাথে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। রাবিয়া স্থানীয় কলেজে সোশ্যাল কেয়ার নিয়ে পড়ছে। একদিন বিকেলে চা খেতে খেতে সে হঠাৎ বলে “মিথিলা, তুমি জানো না, তোমার সাথে যা হয়েছে, এটা ক্রাইম। বড় ক্রাইম।” মিথিলা চমকে ওঠে। “আমি তো নিজের ইচ্ছায় এসেছি…”রাবিয়া মাথা নাড়ে।“ইচ্ছা থাকলেও যদি কাউকে মিথ্যা দেখিয়ে, আটকে রেখে, কাজে না লাগিয়ে শোষণ করা হয়, এটা হিউম্যান ট্রাফিকিং। তুমি ভিকটিম।”এই কথাটা মিথিলার বুকের ভেতর বজ্রের মতো পড়ে।ভিকটিম। এই শব্দটা সে কখনো নিজেকে দিতে সাহস করেনি। সেই রাতেই সে প্রথমবার বাবাকে ফোন করে সব খুলে বলে। মইনুদ্দিন ওপাশে চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর ভাঙা গলায় বলে,“মা… আমি তোকে মানুষ করেছিলাম মাথা উঁচু করে চলার জন্য। ভুল করেছি আমি। তুই দেশে ফিরে আয়। আমরা না খেয়ে থাকবো, তবু তুই ফিরে আয়।”
মিথিলা কাঁদে। কিন্তু এবার এই কান্না দুর্বলতার না, এই কান্না মুক্তির।আজ সে অনেক হালকা মনে করে নিজেকে, কারন বাবা, মাকে খুলে বলতে পেরেছে।
আজ, এই মুহূর্তে, সে জানে। সে আর একা নয়। রাবিয়া তার পাশে দাঁড়িয়েছে, বলেছে একটা ব্যবস্থা হবে। কি হবে সে তা জানেনা। তবে এইটুকু জানে সে আপাতত নিরাপদ। এই জানাটাই তার জীবনের নতুন শুরু। গল্প এখানেই থামে। কিন্তু মিথিলা, থামে না। এর ভেতরে ছিল ভয় কাটিয়ে ওঠার গল্প, অপমান সহ্য করার ইতিহাস, আর নিজের ভেতর আবার মানুষ হয়ে ওঠার সাহস।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মিথিলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখে। লন্ডনের আকাশ। আজ আর সেটা তাকে ভীত করে না। সে জানে, আকাশ যেখানেই হোক, নিজের পায়ের নিচে মাটি শক্ত থাকলেই মানুষ দাঁড়াতে পারে।
মিথিলা এখন আর শুধু কারো মেয়ে নয়, কারো দেনা নয়, কারো শিকারও নয়। সে একজন মানুষ, যে ভেঙেছে, কিন্তু ভেঙে গিয়েও নিজেকে নতুন করে গড়েছে।
আর জীবন, জীবন ঠিক এখানেই শুরু হয়। মিথিলা জানে, তার গল্প শেষ হয়নি। কিন্তু এখন সে আর গল্পের শিকার নয়। সে নিজেই নিজের গল্পের লেখক।






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান