চোখ, যা দেখেনি
স্বপন রায়
গান পড়ে আছে, দেখেছিলাম। ‘চিলমন’ বা চিক সরিয়ে এক বিমূর্ত শরীর।
‘ম্যায় নাদান থা
জো ওয়াফা কো তলাশ করতা রহা গালিব
ইহ না সোচা একদিন আপনি শ্বাঁস ভি বেওয়াফা হো জয়েগী…’
চরে বেড়াতাম। জামশেদপুরের তুলকালাম বিষ্টুপুর-বাজার বা সাঁকচির দিকে যেতে যেতে জুবিলি পার্কের দিকে চলে যাওয়াই ছিল যেন আমার নিয়তি।
মনে আছে, একটা গান ভাসছিল,
ইয়ে মুলাকাত এক বাহানা হ্যায়
প্যার কা সিলসিলা পুরানা হ্যায়..’
জুবিলি পার্কের বিহঙ্গাদৃতা সন্ধ্যার ঠিক আগে, আমি যখন একটু হেলান, পিঠ ঠেকানো রেলিং-এ, সে এল। আমায় দেখল কিছুক্ষণ। আরও একটু এগিয়ে এসে বলল, প্যান্ট কা ‘জিপ’ খুলা হুয়া হ্যায়, উসে ভি দেখা করো! চরম অপ্রস্তুত আমি একবার নিচে দেখি, একবার চাপাহাসির লচকদার চোখের মালকিনকে!
‘উও আয়ে ঘর পে হমারে
খুদা কি কুদরত হ্যায়
কভি হম উনকো, কভি আপনে ঘরকো দেখতে হ্যাঁয়’ (মির্জা গালিব),
আর আমার অবস্থা হল, কভি হম আপনে পাৎলুনকে ‘জিপ’ কো / কভি উনকো দেখতে হ্যাঁয়…
পরে লক্ষ্ণৌ-এর রুক্সানার সঙ্গে আমার বেশ একটা ইয়েমত হয়ে গেল। বন্ধুত্ব? হতে পারে। প্রেম? হবে, হবে এরকম একটা সময়ে একদিন রুক্সানা বলল, ও আগামীকাল লক্ষ্ণৌ যাচ্ছে, বড়ি ফুফি কি লড়কা কা শাদি কানপুরে, সেখানেও যাবে। রিগ্যাল ময়দানে বসেছিলাম। হাতে ফকিরা’র চানাচুর। রুক্সানা ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্রী। লক্ষ্ণৌ থেকে জামাশেদপুরের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে পড়তে এসেছে। আমি মামুলি একজন সাধারণ ছাত্র, কমার্সের। রুক্সানার মতো মেধাবী নয়। লক্ষ্ণৌ হলো ‘তেহজিব-পসন্দ’ শহর। রুচি আর সৌজন্যের শহর। রুক্সানার মধ্যেও রয়েছে সেসব। জামশেদপুর বা টাটা’র ছেলেদের ‘তেহজিব’ হল বেআদবি। আদব-কায়দা অত লব্জে নেই আমাদের। যখন রুক্সানা বলত;
‘এক নফরত হি নহি দুনিয়া মে দর্দ কা সবব ফরাজ
মোহব্বত ভি সকুঁ ওয়ালোঁকো বড়ি তকলিফ দেতি হ্যায়’,
বলে মৃদু হাসত, আমি মাইরি না বুঝেই হাসতাম। এখন জানি দেশজুড়ে ঘৃণার আবহে দাঁড়িয়ে কতটা আদবিয়ানা থেকে বলা যায়, শুধু ঘৃণাই এই দুনিয়ায় কষ্টের কারণ নয়, ফরাজ / ভালোবাসাও শান্ত মানুষদের কষ্ট দিয়ে যায়… ফরাজ, এখন জানি, আহমেদ ফরাজ। বিখ্যাত শায়র। সেদিন সেই অপার্থিব সন্ধ্যেয় আমি রুক্সানাকে মুসলিম লাইব্রেরির লাগোয়া রাস্তায় বলি, তুম কাল যাওগি, সচমুচ?
-জী, হাঁ। ফির আয়ুঙ্গি না, শাদি কা মামলা, মুঝে ডিগ্রি ভি তো লেনা হ্যায়। আমি ছায়ান্ধকারের রাস্তায় দেখি এক অনতিক্রম্য দূরত্বের ভেতরে হারিয়ে যাচ্ছে রুক্সানার মুখ। আমি মরীয়া তখন। কাছে টানি হঠাৎ, চুমু খাই। ও ঠোঁট না সরিয়ে বলে, ইয়ে কেয়া কর রহে হো? গান ভেসে আসে, উনসে মিলি নজর তো মেরে হোঁশ উড় গই…
রুক্সানা চলে যায়। আমি অপেক্ষা করি। ল্যান্ডলাইন ফোনের যুগ। মোবাইল তখনো আসে নি। ফেরার দিন পার হয়। ফেরে না ও। আমি রুক্সানার হোস্টেলে যাই, যেতে যেতে ভাবি সামান্য সময়েই আমরা দলমা ফুট, ডিমনা লেক, জুবিলি পার্ক, টেলকোর খাড়াংগাঝাড় বাজার চষে বেরিয়েছি। আলু টিকিয়া খেয়েছি ‘বম্বে সুইট মার্ট’-এ। ‘সোডা-ফাউন্টেন’-এ আইসক্রিম। জুবিলি পার্কের ঘাসে শুয়ে তাকিয়ে থেকেছি আকাশের দিকে। তারা গুনতে গুনতে গেয়ে উঠেছি, ও মেরে হম রাহি, মেরি বাহ থামে চলনা, বদলে দুনিয়া সারি, তুম না বদল না…
-রুক্সানা? আপ কৌন লাগতে হো রুক্সানা কি?-ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। কিসি কা শাদি মে গয়ি থি, ওয়াপস নহি আয়া অবতক?মেয়েটি অবাক হয়। বলে, আপনি বাঙালি?-হ্যাঁ-আপনি জানেন না কিছু? রুক্সানা ইজ নো মোর, শি লেফট আস… দু’মাস হলো।আমি হেসে ফেলি। বলি, মৃত্যু নিয়েও মজা?-কীসের মজা? শি ওয়াজ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড। রুক্সানা লক্ষ্ণৌ যায় প্রথমে, তারপর কানপুর। বিয়েতে। ওখানেই কমিউনাল ভায়োলেন্সে ও…
ফিরে এসেছিলাম। কে ছিল ওই মেয়েটি, রুক্সানা? ভেবেছি। আত্মা? দুত্তোর। একমাস ধরে একটা জলজ্যান্ত মেয়ে আমার সঙ্গে ঘুরে বেড়াল, আমরা তো এখানে, ওখানে, সবখানেই। এমনকি চুমুও… ভেতরে কিছু একটা হলো আমার। রুক্সানা তাহলে কে? সরকারি গোয়েন্দা? পালিয়ে বেড়ানো উগ্রপন্থী? তার-ছেঁড়া পাব্লিক? কে রুক্সানা?
আজ এত বছর ধরে আমি আর রুক্সানা, রুক্সানা আর আমি একটা বাঁচায় আছি। আছি হে! রুক্সানা জলখাবার বানায় তো আমি লাঞ্চ। ও কলেজে যায়, আমি ব্যাংকে। আমি ফুল আনি। ও নেয়। ও পারফিউম আনে। আমি হাসি। আমরা গানও গাই। আকাশে চাঁদ, তারা। রাতের পরতে পরতে আমরা ঘি ঢেলে আগুন লাগাই। নেবুলায় জন্ম নেয় তারার বাচ্চারা। রুক্সানা আর আমি তারপর ঘুমিয়ে পড়ি।
আজ ঠিক করেছি আর আমরা ঘুম থেকে উঠব না। মরে যাবো। আমি হিন্দু, ও মুসলমান। আমরা মরে যাবো। আজই।
‘তুম না জানে কিস জাহাঁ মে খো গয়ে
হম ভরি দুনিয়া মে তনহা হো গয়ে..’
এই গানটাও কিন্তু এখন আমরা শুনছি না।এমনিই জানালাম তোমাদের।আর কাল একটাই মৃতদেহ পাবে তোমরা। জানালাম, এমনিই…






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান