(একটি কল্পগদ্য)

ছোট্ট চোখে নভোমন্ডল মধুমিতা দত্ত

পনেরোর দোরগোড়ায় সদ্য পা রাখা অয়ন্তীর মনে নিরন্তর ভেসে বেড়ায় প্রশ্নের মেঘ–কখনো তারা কৌতূহলের আলো হয়ে জ্বলে, কখনো নিঃশব্দে জমে ওঠে অচেনা অস্থিরতায়। প্রতিদিন সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে অয়ন্তী। দিগন্তে  অসীম নীলাকাশ, কিন্তু তার চোখ আটকে থাকে ছোট্ট স্ক্রিনে। সেখানে পৃথিবী অনেক বড়–কিন্তু নিজের জীবনটা যেন ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। সে লক্ষ্য করে, এই শহরে এখন আর কেউ কাউকে “দেখে” না–সবাই শুধু “স্ক্রল” করে।

একদিন রাতে, অয়ন্তী ঘুমোতে গিয়ে ভাবলো, “আমি যদি একদিন অন্য কোনো সুন্দর দেশে যেতে পারতাম…”, ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়লো । স্বপ্নে সে পৌঁছালো এক নীরব, আলোয় ভরা স্থানে।নক্ষত্র যেন হাতছানি দিচ্ছে , চারদিকে নরম আলো, গাছগুলো হাওয়ায় দুলছে,  নদীর জল ঝলমল করছে,  কোনো কোলাহল নেই, তবুও সবকিছু যেন জীবন্ত। সে হাঁটতে হাঁটতে দেখল–সেখানে কেউ  তাড়াহুড়ো করে না, কেউ মোবাইল হাতে নিয়ে বসে নেই, কেউ একা নয়। সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছে,কথা বলছে,শুনছে।

একটি নক্ষত্র ধীরে ধীরে নেমে এসে তার সামনে দাঁড়াল–মানুষের মতো, কিন্তু পুরো শরীর জুড়ে আলো। নক্ষত্রটি মৃদু হেসে বলল, “স্বাগতম, অয়ন্তী। এটা নক্ষত্রের দেশ।” অয়ন্তী অবাক হয়ে চারদিকে তাকাল। সে জিজ্ঞেস করলো,“তোমাদের এখানে কেউ ব্যস্ত থাকে না?” আলো-মানুষটি একটু হেসে বলল, “আমরা ব্যস্ত থাকি, কিন্তু সবাইকে সঙ্গ দেই।”

অয়ন্তীর মনে পড়ে গেল নিজের পৃথিবীর কথা। সকালে ঘুম ভাঙে অ্যালার্মে, মা-বাবা ব্যস্ত, সবাই যেন কোথাও ছুটছে–কিন্তু কোথায়, সেটা কেউ ঠিক করে বলতে পারে না।শহরটা এখন আর খুব বেশি শব্দ করে না। আগে ভোর মানেই ছিল চায়ের দোকানে তর্ক, পাড়ার মোড়ে হাসির ঝড় আর সুপ্রভাতের পালাবদল, প্রাতঃভ্রমণের ব্যস্ততা । এখন সেসব যেন ইতিহাসের পাতায় আটকে গেছে।

এখনকার শহরে শব্দ আছে, কিন্তু তা মানুষের নয়–মোবাইলের নোটিফিকেশন, ভার্চুয়াল হাসির ইমোজি, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মসৃণ কণ্ঠস্বর। সে ধীরে ধীরে বলল, “আমাদের ওখানে… সবাই খুব ব্যস্ত। কেউ কারও সঙ্গে ঠিক করে কথা বলে না।”

নক্ষত্র-মানুষটি তার চোখের দিকে তাকাল–“তোমরা কি একদম সময় পাও না ?”

অয়ন্তী একটু চুপ করে থেকে বলল, “সময় আছে…কিন্তু আমরা সেটা অন্য কোথাও  দেই ।”  

হঠাৎ একটি নরম আলো তার হাত ছুঁয়ে গেল। নক্ষত্র-মানুষটি বলল, “তুমি ফিরে যাবে, কিন্তু এই অনুভূতিটা সঙ্গে নিয়ে যেও। নক্ষত্রের দেশ তোমাদের ভেতরেই লুকিয়ে আছে;  শুধু হৃদয় ও সময়ের মূল্য খুঁজে পাওয়ার সূচনা করো সবাই মিলে ।”

সকালে ঘুম ভেঙে অয়ন্তী নিজের ঘরেই নিজেকে খুঁজে পেল।সবকিছু আগের মতোই– মায়ের ফোন, বাবার তাড়া, ঘড়ির কাঁটার শব্দ।

কিন্তু অয়ন্তী  আজ একটু অন্যরকম ভাবে শুরু করলো দিন । সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল, আকাশের দিকে তাকাল- মনে হলো, একটা নরম নক্ষত্র  তার দিকে তাকিয়ে  মৃদু হাসছে। সে চুপিচুপি  বলল, “আমি ভুলব না।”  

স্কুল বন্ধ ছিল।তাই সে মায়ের কাছে গিয়ে বলল,–“মা, আজ একটু গল্প করো না..” সেই ছোট্ট চাওয়ায় পৃথিবী বদলায় না, কিন্তু একটা নতুন শুরু হয়–নীরবে, ধীরে, একটি শিশু/ কিশোরের হৃদয় থেকে।  

অয়ন্তী এখন শিখছে–প্রযুক্তি আমাদের পৃথিবীকে বড় করতে পারে, কিন্তু মানুষকে কাছে আনতে হলে হৃদয়ের দরজা খুলতেই হয়। ব্যস্ত  চলমান জীবনের  মধ্যেই  মাঝে মাঝে  ভোরের নীরবতায়, সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখে। এই বিস্তীর্ণ নভোমণ্ডলের নিচে সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক হলো মানুষের সাথে মানুষের সংযোগ।

আজকের পৃথিবী যেন আয়নার শহর–সবাই মুখ দেখতে চায়, কিন্তু প্রতিফলনে ভেসে ওঠে অন্য কারও ছায়া। মানুষ এখন আর একা নয়, তবু একাকীত্ব বেড়েছে। রাস্তার মোড়ে গল্প জমে না, কথাগুলো থমকে যায়। চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠে ঠিকই, কিন্তু কথাগুলো যেন ঠোঁটের কাছে এসে থমকে যায়–কারণ সবাই ব্যস্ত নিজের অদৃশ্য জগতে।  

তবুও, এই কোলাহলের মাঝেই কোথাও একটা নরম আলো রয়ে গেছে–

হয়তো কোনো বৃদ্ধা বারান্দায় বসে এখনও আকাশ  দেখেন ,হয়তো কোনো শিশু মাটির গন্ধে খুঁজে  পায় অজানা সুখ,হয়তো কেউ  এখনও শব্দের মধ্যে খুঁজে ফেরে মানুষের হারানো আত্মা।  তাই  এই আলো, এই সংযোগ, এই মন খোলার মুহূর্তেই লুকিয়ে আছে নতুন বছরের বার্তা–প্রতিটি দিন নতুন সূচনা, প্রতিটি মুহূর্ত নতুন সুযোগ, এবং প্রতিটি হৃদয় নতুনভাবে মানুষকে “দেখার” সম্ভাবনা।

বর্তমান সময় তাই পুরোপুরি অন্ধকার নয়–বরং এটি এক সন্ধ্যা, যেখানে আলো আর ছায়া একসঙ্গে মিশে তৈরি করছে নতুন এক পৃথিবী। এই পৃথিবীতে বাঁচতে গেলে আবার শিখতে হবে নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়ার পথ, শব্দের বাইরে অনুভবের ক্ষমতা, আর মানুষের দিকে মানুষ হয়ে তাকানোর সত্যতা ।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending