নস্টালজিয়া

আমাদের নদী মরে গিয়ে লতা হলো।
জলাভূমি দালান বহুজাতিক ।
শিকল ছিড়ে ইট পাথর বুকে আমাদের গ্রাম হয়ে গেল শহর।
ঘাসের সমুদ্র ঢেকে গেল কালের অলংকার ।
আমরাও হয়ে গেলাম শহরীয় ।

লোডশিডিংয়ের রাতে মারবেলের বারান্দায়
গাঢ় অন্ধকার চোখে ঝলকে উঠে গ্রাম, গ্রামের বাড়ি ।
যেখান লেপ্টে আছে হলুদ সরষে ফুলে মত শৈশব ।
স্নিগ্ধতায় ভরা কৈশরের ভালবাসা ।
সোনালী প্রভাতের মত যৌবনের প্রেম ।

সবুজ শাড়ি পরা গ্রামের বাড়ি ।
সারিসারি আম,জাম,কাঠাল গাছ, বাঁশবাগান ।
দিনরাত জাগিয়ে রাখত অশ্বত্থের শাখায় পাখির কিচির্মিচির ।
জারুল গাছের ডালে মৌমাছিদের মেলা ।
ডুমুরের ফুল । আগুন লাগা শিমুল, কৃষ্ণচূড়া বন ।
দৃষ্টি রাঙিয়ে রাখত আষাড়ে বৃষ্টির মুদ্রায় পাতার নৃত্য ।
রঙধনু আকাশ । ।

ভাদ্রের তালপাকা গরম, পুকুর ঘাট, সারীসারী
নারকেল, সুপারি গাছ । পূবাল হাওয়া ।
জোনাকজ্বলা রাতে ঝিঝি পোকার আবহসংগীত ।
তালগাছে বাবুইর বাসা । অর্ধবৃত্ত চাঁদ ।

সোনালী অঘ্রান । শিউলি ঝরা উঠান ।
ভোরের রূপারোদে শিশির ভেজা ফসলের মাঠ ধান,
সরিষা, কলাই । মানঞ্জা দেওয়া সূতায় রঙিন ঘুড়ি ।
ধুলিমাখা মেঠোপথ । গরুর পাল, রাখালের বাঁশি ।
শেয়ালের শোরগোল, কুকুরের আর্তনাদ ।
কুয়াসার চাদরে ঢাকা বাউল নিশি ।

ঘরের কোনে চুড়ইয়ের ডাক।
টিনের চাল কবুতরের প্রেম বিলাস ।
ফড়িঙের ডানায় চোখ হারানো বিকেল ।
গ্রামের সামনে বিলে শাপলা ফোটাজলে হাঁসের মিছিল।
পোনামাছের ঝাক । ডিঙ্গি নায়ের তলায় জলের কলতান ।
কলমীলতার ফাঁকে বনোহাঁস লুকোচুরি ।
পানকৌড়ি ডুবসাঁতার ।

গ্রামের পশ্চিমে নদী । বর্ষায় কুল ভাঙা ঢেউ ।
দাঁড়ের ছলাৎ ছলাৎ । দূরন্ত ছেলেদের উল্লাস সাঁতার ।
পালতোলা নৌকায় মাইকে গান বাজিয়ে বিয়ের বৌ নিয়ে যেত বর।
চাঁদভাসা জলের খিলখিল হাসি ।
পূর্ণিমার জোস্না মেখে হাতছানি দিয়ে ডাকত তুষারের মত কাশবন ।
ঝাপসা হয়ে আসে চোখ ভারী কাঁচের চশমার ফাঁকে।

মারবেল বারান্দায় মেঘলা আকাশ। গুমোট বৃষ্টি ।
ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধের বদলে নাকে ধ্যান কাড়ে
পেট্রল পোড়া ঘ্রাণ ।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Trending