বহমান

-সোমা দত্ত

তার নাম আহিরা কে রেখেছিল কে জানে। তার মনেও নেই কবে তাকে কেউ আহিরা বলে ডেকেছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে সে আহিরা হয়ে উঠেছে। একদিন স্বপ্নে আহিরা জয়দীপের সামনে দাঁড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়েছিল সে তার সঙ্গে থাকতে চায় না। জয়দীপ হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে ছিল। সময়টা স্বপ্নে ওভাবে ঠিক ধরে রাখতে পারে না। যেমন জয়দীপের হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে থাকা আর মোহনার সঙ্গে দেখা হওয়ার মধ্যে সময়ের পার্থক্য প্রায় নেই অথচ টেকনিক্যালি সেটা প্রায় অসম্ভব। মোহনার সঙ্গে দেখা হল কলেজের সামনে। মোহনা জাপান থেকে ফিরে এসে কলেজের সামনে ওর জন্য অপেক্ষা করছিল। আর জয়দীপও হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিল এবং মিলিয়ে গেল হয়তো। স্বপ্নের মেমোরিতে হয়তো ওটা স্টোরই হয়নি কখনো যে ওর উত্তরের সামনে জয়দীপ হতভম্ব হলে কী কনসিকোয়েন্স ঘটতে পারে। তাই সে জানে না। সে ওই পর্যন্ত রান করে, পরের মেমোরি বক্সে চলে গেল। সেখানে মোহনা ছিল। মোহনা জাপান থেকে চলে আসুক ভাবনাটা সেখানে ছিল। লোকেশনটা কলেজ কী করে হলো সে জানে না। মেমোরি নিজে নিজে নিয়ে নেয় অনেককিছু। পৃথিবীর কোনো স্থানই শূন্য থাকতে পারে না। মাথাও নয়। তাকে সবসময় কিছু দাও। ঠিকঠাক পরপর অর্ডার মেনে দিতে পারলে ভালো নাহয় সে এলোপাতারি তুলে নেবে নিজেই। তারপর স্বপ্ন হয়ে বারবার দেখাবে হার্ড ডিস্কের কতখানি ভরল। সে তার মতো দেখাতে থাকে। আহিরা কী ছাই জানে তার হার্ড ডিস্কের কতখানি জমির মালিক সে। তাই কতখানি ভরল বা আদৌ আর জায়গা রইল কিনা সে দায়িত্ব তার নয়। মাথার কাজ মাথা করুক। মেমোরি স্টোর করুক, মুছুক, ভরে যাক। বার্স্ট না করলেই হলো। আজকাল তার ওই বিস্ফোরণে বড় ভয়। প্রায়ই তার মনে হয় সে আর নিতে পারছে না। কেমন যেন পাগল পাগল অবস্থা। মাথার ভিতরটা দপদপ করে। বুকে বন্দে ভারতের স্পিডোমিটার ঘুরছে। তখন আর তার নাম আহিরা নয়। তখন সে সংঘমিত্রা। সংঘমিত্রা দে। তখন সে খুব ভয় পায়। মেয়েটা কাঁদতে শুরু করে। বাবা-মা প্লিজ তোমরা থামো এবারে। আমার পরীক্ষা। পাশের ঘরে বাতের ব্যথায় পঙ্গু শাশুড়ি বলতে থাকেন, বউমা জানে ছেলেটার মেজাজে সবসময় ধুনোর গন্ধ তাও যে কেন মাথা গরম করে। একটু শান্তিতে থাকতে দেবে না এরা আমাকে। ওদিকে বাসন মাজার মেয়েটা বলে, বৌদি পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে কিন্তু। তরকারিটা ধরে গেল বোধহয়। এদিকে ঘড়িতে প্রায় আটটা। সাড়ে আটটার মধ্যে তৈরি হয়ে সংঘমিত্রাকে বেরোতে হবে। একটি প্রাইভেট বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করে সে। সেখানেও অ্যাসাইনমেন্ট, হেন তেন এসবের চাপ তো আছেই। সংঘমিত্রা দে তরকারি বাঁচায়, মেয়েকে নিশ্চিন্ত করে তখনকার মতো। শাশুড়িকে শান্ত করে। আর জয়দীপের কথার উত্তর এড়িয়ে একথা সেকথা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। কারণ ঘড়ির কাঁটা এই মুহূর্তে প্রায়োরিটি। জয়দীপ তো ওয়ার্ক ফ্রম হোম। মেজর খরচা বাড়ির ও চালায়। দেখলে হবে? ইলেক্ট্রিক বিল আসে আজকাল পাঁচহাজার টাকা। বাজারদর যে পর্যায়ে পৌঁছেছে একার ওপর নির্ভর করলে সংসার চালাতে পুরো ফুরুত হয়ে যাবে। মেয়ের আবদারের ফিরিস্তি কম নাকি। মেয়ের যত আবদার মায়ের কাছে। এটা অবশ্য সংঘমিত্রার কিছুটা অহংকারও বটে। তার মাথায় দেড়শো কিলো বোঝা চেপে থাকলেও সে চায় মেয়ে তার কাছেই আবদার করুক, দাবী করুক। তখন সে নামহীন। মেয়ের কাছে থাকলে সে শুধুই মা হয়ে যায়। মায়ের নাম থাকে? তার মায়ের নাম আছে? আছে বটে একখানা। কুসুম সরকার। কিন্তু সে নাম এখন প্রায় বিস্মৃত। বাবা ডাকতেন মানি বলে। মানি মায়ের ডাক নাম। ছোটবেলায় মামাবাড়ি গেলেই বারান্দা থেকে দিদিমা চেঁচিয়ে বলত, মানি আইসে গো। দরোজা খোল তাড়াতাড়ি। তখন সকাল সন্ধে কটা দিন মানি মানি আর মানি কানের পাশে বাজত নুপুরের মতো। এই মামীমা ডাকছেন, এই মামা ডাকছেন, এই পিসী, আশেপাশের প্রতিবেশীরা কৌতূহলে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলছেন, মানি এলি নাকি রে! কতদিন পরে এলি রে এবার! কুসুম সরকার গুরুত্বপূর্ণ হতো ভোটের সময়। ব্যাঙ্কের কাজকর্মে, পোস্টঅফিসের এম আই এস তুলতে। ন’মাসে, ছ’মাসে। গুরুগম্ভীর কিছু স্বর জিজ্ঞেস করত, কুসুম সরকার আপনি? এখানে সই করুন।

এখন মা কে কেউ কুসুম নামে ডাকার নেই। মা এখন শুধুই মা বা দিদা বা ঠাম্মু। বাবা চলে যাওয়ার পরে, মানি বলে ডাকারও কেউ রইল না মা’কে। এইসব ঘটনা সব বাড়ির ভিতরেই নিত্য প্রবহমান। ফল্গুধারার মতো বয়ে যাওয়া সরু জলের রেখা। সে জলের রেখা কখনো সরু নদীর মতো, কখনো বা চোখের জলের মতো, কখনো বা পাহাড়ি চুনাপাথর ঘেঁষে পড়া কষটে জলধারা।

একবার ওর নাম হয়েছিল ইমন। তখন ইন্দ্রর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সেদিন বিকেলে গোলাপি রঙের মেঘ। চল্লিশ বছর বয়স হলে আর গোলাপি রঙের মেঘ দেখা যায় আকাশে? ইমন কতদিন পরে গান গেয়েছিল। গলাটা আগের মতো তেমন আর নেই হয়তো।পার্থ বলত, তোর সেই গলাটা আর নেই। শুনলেই কিছু একটা হয়ে যেত। পার্থ-ই বা কোথায় আর আগের মতো ছিল। সেও তো মধ্যবয়সী ইন্দ্র। সচেতন এক ছেলের বাবা। ছেলের বাবারা ছেলে হতে পারে না, তারা বাবা হয়ে যায়। বারবার ঘড়ি দেখে। ফোন আসলে উঠে গিয়ে কথা বলে। সচেতন দৃষ্টি থাকে চতুর্দিকে। তাই ইন্দ্র এসেছিল ঠিকই গোলাপি মেঘের আড়াল থেকে কিন্তু পার্থ হয়ে উঠতে পারেনি সে।

পার্থ-ই কি আর পার্থ আছে এখন? কোথায় সুদূর জার্মানিতে গিয়ে অন্য একটা ক্যানভাসের মধ্যে ছুটে বেড়াচ্ছে। সে খোঁজ ইমন আর রাখে না তেমন। কিন্তু ইমন খুব ভালো ছিল গোলাপি মেঘের সঙ্গে। মধ্য চল্লিশের বিছানায় মাঝরাতে একা অসহায় একটা ঘুম না আসা রাতের মধ্যে এপাশ ওপাশ করতে হতো না। তাও তো সেভাবে কখনো কাছে পায়নি ওকে। ইমনের ইচ্ছা করত। ওর বুকের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছা করত। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠলে ওকে কেমন দেখতে লাগে দেখতে ইচ্ছা করত। চরিত্রহীনের লিপি। এই তো বলবে কেউ শুনলে। কিন্তু ইমন সত্যি খুব ভালো ছিল ওই ক’টা দিন। না পাওয়াগুলোর সঙ্গেও। না পাওয়াগুলো তো এক একটা পাওয়ার সম্ভাবনা। একদিন চিকন বসন্তের বাতাস যে নিয়ম ভেঙে সব রসাতলে নিয়ে যাবে না কে বলতে পারে। তখন দিনের মধ্যেও ঘুম জড়িয়ে থাকত ওকে। গান ছুঁয়ে থাকত। বাগানের গাছগুলো কলবল করে কথা বলে উঠত। কচি তাজা নতুন পাতা ছুঁয়ে আঙুলের মধ্যে জড়িয়ে যেত কী যেন একটা নরম আনন্দ। এসব মধ্যবয়সী চপলতা হতেই পারে। কিন্তু ওই এক মুঠো মনের ভিতরে ইমন খুব খুব করে বেঁচে নিয়েছে কয়েকটা দিন।

কিন্তু ইন্দ্র থাকল না। ওর বউ খুব ভয়াল। হিন্দি সিনেমার সুন্দরী ভূতের মতো। পাতলা ফিনফিনে নাইটি পরে এসে তোমার কলজে উপড়ে নেয়। ইন্দ্র ভয় পায়! ইন্দ্র আর ভয়? গোলাপি মেঘ তছনছ হয়ে গেল? ভয়ের ভালোবাসা? কুমির তোমার জলকে নেমেছি বলেই টুক করে নাইটি পরা হ্যালোউইনের পাশে শান্ত ইয়েতি। না ইন্দ্র আর ইন্দ্র রইল না। সে ও পাড়ার সনাতন সামন্তর মতো হয়ে গেল। সনাতন সামন্ত ঘানিতে কাজ করে। গা দিয়ে সর্ষের তেলের গন্ধ বেরোয় সবসময়। ইন্দ্র সনাতন হয়ে গেল আর ইমন ফের সংঘমিত্রা। এভাবে বার বার রোল প্লে। কেউ ভিতু, কেউ তোমাকে চাবুকে সমঝে রাখবে। কেউ পার্টটাইম ডিউটির মতো ক্যাফেটেরিয়ায় সিগারেট খাবে, কেউ মেসেঞ্জারে ভেজা ভেজা কথা লিখে আর্টিফিসিয়াল বৃষ্টি তৈরি করার চেষ্টা করবে।

কবে যেন গান গাইত সে? কবে যেন গিটার? কবে সেই ট্রেকিং। এল আইসির দুটো প্রিমিয়াম বাকি পড়ে আছে এখনো।

উফ টাকা মাটি আর মাটি টাকা লোকটা কী করে যে বলেছিল!

জয়দীপকে এখন কেমন যেন সামন্ততান্ত্রিক জমিদারের মতো মনে হয়। শরীরে প্রবল মেদ জমেছে বলে শুধু নয় মনেও তার প্রবল ভারী বেজান জমি পড়ে আছে। কখনো কখনো ওকে দেখলে মনে হয় বানজর জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা একা একটি কাকতাড়ুয়া যেন। কী যে সামলাচ্ছে কে জানে কিন্তু যা সামলাচ্ছে সবটাই দাঁত মুখ বার করে খিঁচিয়ে সামলাচ্ছে। মধ্যবিত্ত জীবনের বিল, ই এম আই আর কয়েকটা রুট ক্যানাল ট্রিটমেন্ট জয়দীপের হাসিটাকেই বদলে দিল। কেমন কালচে ছোপ পড়া ধার বাকির হাসি। ইমন সংঘমিত্রা হয়ে ওঠে অমন হাসি দেখলে। তবু ওটাকেই আগলে গুছিয়ে চলতে হয়। বছরে এক আধবার বেড়ানো যায়, এদিক ওদিক টুকটাক ঘোরাঘুরি, শপিং এসবের জন্য একটা আপোস তৈরি করে চলতে হয়।

কিন্তু এসব ব্যাকগ্রাউন্ড পিছনে ফেলে রেখে এখন সে আহিরা। সে বেরিয়ে এসেছে আজ। প্রবল মাথা ব্যথা করছিল তার। দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে একটা যন্ত্রণার মধ্যে বেঁধে রাখতে রাখতে একটা অদ্ভুত অসুখ পেয়ে বসেছিল তাকে। সে অসুখ তৈরি করে ফেলত নিজের ভিতরে। সবসময় তার কিছু না কিছু না কিছু অসুখ হতো। ইন্দ্র চলে যাওয়ার পর যখন সেই গোলাপি মেঘের দিন সরে গেল তখন থেকেই তার ভিতরে কীভাবে যেন এই অসুখ তৈরি করার প্রবণতা জন্ম নিয়েছিল। প্রথম প্রথম সে ভাবত সে সত্যিই অসুস্থ। এই ডাক্তার, ওই ডাক্তার, এই টেস্ট ওই টেস্ট সবকিছু করেও অসুখ পাওয়া যেত না। কিন্তু সংঘমিত্রার অসুখ হতো। সংঘমিত্রা অসুস্থ হয়েই নিজেকে টেনে টেনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সংসারের ভিতরে এবং বাইরে যাতায়াত করত। জয়দীপ বলত প্যানিকগ্রস্ত মহিলা। মানসিক রোগী। শাশুড়ি বলতেন তুমি রোজ সাদা সর্ষে আর লবণ দিয়ে স্নান করো দেখি কেমন তোমার রোগ থাকে। কিন্তু মা আপনার বাতের সমস্যাটা সর্ষে আর লবণ ঠিক করতে পারল না কেন এতদিনে। শাশুড়ি তার মতো করে যুক্তি সাজান। দেখো বিশ্বাস হারাতে নেই। সব টোটকায় যে সবকিছু সারে তা নয়। হতে পারে কোনটাতেই কোনোকিছু সারে না। তবু বিশ্বাসটা রাখলে ক্ষতি নেই। বিশ্বাসে বিনা ওষুধেও রোগ সারে আর টোটকা ওষুধও সঞ্জীবনী হয়ে যায়। বুঝলে? তার শাশুড়ির নাম গার্গী। যদিও কেউ ডাকে না তাকে আর ও নামে। তিনিও এখন শুধুই মা, মাসিমা, কাকিমা, জেঠিমা, ঠাম্মি। তবুও একদিন ছিলেন তো গার্গী। সংঘমিত্রা সম্মান করে। একটু সর্ষে আর লবণ নিয়ে স্নানের বালতিতে ঢেলে দেয়।

কিন্তু আজ সে আহিরা। আজ সে সব বাধা ভেঙে চলে এসেছে। সব ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। তার দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে ওই জীবনে। স্বপ্নকে সত্যি করে দিয়ে জয়দীপকে জানিয়েছে সে আর নিতে পারছে না। নিতে পারছে না এটুকুই শেষ। অনেক অনেক যুক্তি দিয়ে এই না নিতে পারার বাঞ্ছনীয়তাকে প্রতিষ্ঠা করার কোনো ইচ্ছা তার নেই। এই যে তুমি এখন শুনছ এই কথা তুমিও শুনে টুনে একটা না ক্ষার না অ্যাসিড জাতীয় মুখ বানিয়ে বলবে, ঘুমাতে যা, রাত হয়েছে। এসব ভাবিস না। তাই তো? এসব আর নয়। সভ্য ভদ্র বন্ধু আত্মীয়রা ইন্সটিটিউশনাইলাইজড সম্পর্ককে ভয় পায়। এড়িয়ে চলে। ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে গাইলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও সাড়া দিতেন না। গান গেয়ে মৃদু হেসে মাথায় হাত রেখে বলতেন পাগলি। জয় তো লিখেই দিয়েছেন পাগলির জন্য তামাম দুনিয়া। পাগলির সঙ্গে বেরিয়ে পড়তে পেরেছেন কি? কবিদের মতো চামার খুব কম হয়। ব্যর্থতাকেও এনক্যাশ করে। প্রেম ছেড়ে গেল, একটা কবিতার বই প্রকাশ হয়ে গেল ঝুপ করে। তোমার তামাম ইমোশন ইজ ইকোয়াল টু একটি কবিতার বই। কবির সোস্যাল ইমেজ নেই নাকি? সবাই কী শোভন বৈশাখী ধরনের খেপচুরিয়াস হতে পারে?

নাঃ, নো মোর ভ্যালিডেশন। সে নিজের মতো বাঁচতে চায় এটুকু যথেষ্ট কারণ হতে পারে না কেন? সে সংসারে বেঁধে রাখতে চায় না নিজেকে এটুকুই যথেষ্ট কারণ হতে পারে না কেন? সে নিজের বাকি জীবন নিজের মতো করে কাটাতে চায় এটা অপরাধ কেন? দিনের পর দিন জয়দীপের বিছানায় নিজেকে ময়লা চাদরের মতো লাগে। তার ইচ্ছা করে না। জয়দীপ ছুঁলে ভালো লাগে না। মাঝে মধ্যে ঘেন্না পর্যন্ত হয়। বউ পুরনো হলে যৌনতার অভ্যাস অনেকটা ঢাকনা খোলা ম্যানহোলের মতো হয়ে যায়। তার মধ্যে যত শিল্প সব সৌধ হয়ে যায়। যা পড়ে থাকে সেগুলো কেমন নালা নর্দমা ধরনের। নিজের ঘরের নালা নর্দমা বলে কি তাকে গঙ্গোত্রী ভাবা সম্ভব? জয়দীপের যৌনতা বুড়ো বয়সে এসে অদ্ভুত কতগুলো নোংরা আবদার হয়ে উঠেছে। কুচকীর পাশে মাঝেমাঝে কী ভয়ঙ্কর বিশ্রী একটা গন্ধ। তার মধ্যে ও মাথাটাকে চুল সমেত ঠেসে ধরে। গা ঘিনঘিন করে ওঠের সংঘমিত্রার। তখন সংঘমিত্রা বলেও নিজেকে সম্বোধন করতে ইচ্ছা করে না তার। তখন সে যেন বুচিয়া কি মাই। ওই সোনাগাছির লাগোয়া কোনো বিহারি বস্তির একটা কোঠায় থাকা মহিলা, যে আজীবন বুচিয়া কি মাই হয়েই বাঁচবে আর মরবে। জয়দীপ শরীরের দখল নিলে সে বুচিয়া কি মাই হয়ে যায়। বুচিয়া কি মাই জয়দীপের মাংসল শরীরের চাপে, দাবিতে কেমন কেঁচো বাঁ কেন্নো ধরনের ব্যবহার করে। আসলে সে সবটাই ভাবনা। ওভাবেই ভাবনা তৈরি। আসলে তো সোনাগাছির লাগোয়া কোনো বিহারি বস্তির বুচিয়া কী মাইয়ের যৌন জীবন এর থেকে উন্নত হতে পারে। আসলে কেঁচো বাঁ কেন্নো বলতে যে গা ঘিনঘিনে ব্যাপারটা সে বোঝাতে চাইছে সেটা জাস্ট পারস্পেকটিভ। আসলে দুটো নির্দিষ্ট শ্রেণির প্রাণী তাদের – ভীষণভাবে তাদের মতো হয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে, দলা পাকাচ্ছে এবং জটিল একটা গঠন তৈরি করছে এর মধ্যে কোনো ধরনের কোনো নোংরামি নেই। বরং ওদের জীবনের কোনো নোংরা ঘটনার তুলনা দিতে ওরা সংঘমিত্রাকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কেউ জানে না তাই। এই সব জানাতে নেই।

স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে ঘেন্না পাচ্ছ? এ কেমন কথা?

– হ্যাঁ পাচ্ছি। কিছু কিছু শরীরের সঙ্গে সঙ্গম ঘিনঘিনে হয়ে যায়।

তাহলে উপায়? শরীর বদলে বদলে দেখবে?…

ছিঃ আপনি কথা বলতে শেখেননি?

ওই দেখো! শরীর বদলে বদলে দেখাও নোংরা লাগছে। তাহলে তুমি কী করবে? শরীর ছেড়ে যেতে পারবে? সে অনেক উচ্চমার্গ! তোমার ঘুমের সময় ইন্দ্র আসে তো শুনেছি। আসে কী আসে না? আসে তো… তাহলে? … চিটিংবাজ কোথাকার! পালা, শিগগির পালা। নাম পদবী খুলে ফেল। অন্তর্বাস খুলে ফেলার মতো খুলে ফেল ওসব। যা পালা, বেলেল্লাপানা কর। বাঁচ!

আহিরা তারপর বেরিয়ে পড়েছে। স্টেশনে এসে টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে পড়েছে। আঃ মুক্তি! মুক্তি পেতে গেলে টাকা লাগে কাজল বলত। কটা টাকা রোজগার করিস? সাকুল্যে তিরিশ হাজার! কী হয়! জয়দীপ হাত উঠিয়ে নিলে কী করবি! সব দায়িত্ব তোর ঘাড়েই তো দিয়ে যাবে। নিজের মায়ের আয়ার খরচটাও। চালাবি কী করে। পাগলামি করিস না। একটু অ্যাডজাস্ট করে নিলেই তো হয়। অন্য কারো মুখ ভেবে নিবি। সবই ভাবনার উপর। অন্য কারো মুখ ভাববে? কার? ইন্দ্রের? দু একবার চেষ্টা করেছিল। পরেরদিকে আর হল না। কেমন খেলনা মতো যেন ব্যাপারটা। খেলনা দিয়ে তুমি চল্লিশ বছরের দেহ ভুলাবে? হয় নাকি?

ট্রেনে ওঠার পর আহিরার বড় আরাম লাগল। সে পালিয়ে যেতে পেরেছে। একদিন অথবা দুদিনের জন্য কোথাও একটা আত্মগোপন করে থাকবে। কোনো একটা হোটেলে থেকে যাবে। ফোন করে বলে দেবে জরুরি কাজে বাইরে এসেছে কেউ যেন ফোন করে বিরক্ত না করে। তারপর সিমটা খুলে ফেলে দেবে। ক্রাইম থ্রিলারের মতো। কিন্তু কয়েকবার এরকম করলে জীবনে একটা গলিপথ তৈরি হয়ে যাবে হয়তো। একটা রুটম্যাপ স্বাধীন জীবনের দিকে। আমি আমার মতো লাফিয়ে বিছানায় পড়ে ঘুমাব। ছোট প্যান্ট আর গেঞ্জি পরে সোফায় উঠে লাফাব। দেরিতে ঘুম থেকে উঠব। একজন মাত্র সব জানে। টুপটাপ- মেয়ে। ওকেই সবার আগে বলেছিল। কী বুঝেছিল কে জানে। বলেছিল যাও তোমার যাওয়া দরকার নিজের জন্য। ক’দিন ঘুরে এসো নিজের মতো একা। কারো সঙ্গে যেও না। নিজেকে কিছুদিন সময় দিয়ে দেখো।

ট্রেন ছাড়ল। লেডিস কামরায় জানলার ধারের সিট। বেশ ফাঁকাই ট্রেন। দুই পা সিটের উপর তুলে বসল আহিরা। জানলা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে ছোটবেলা, কিশোরবেলা, যৌবন। ট্রেনের চাকার ছন্দের সঙ্গে সঙ্গে আহিরা নিজেকে মেলাতে চেস্টা করছে। হকার উঠছে ট্রেনে। শশা, দিলখুস, ছোলামাখা সব কিনে কিনে খেল আহিরা। পাশে বসে থাকা দু একজন মহিলা তাকে দেখছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। একেকটা স্টেশন আসছে আর আহিরা ভাবছে সেখানে নামবে কিনা। তারপর ভাবছে কাছাকাছি নয় আরও কিছুটা দূরের কোনো স্টেশনে নামবে। শেষমেষ ভাবল একদম শেষ স্টেশনে গিয়ে নামবে। সেখানে একটা হোটেল খুঁজে ক’দিন থাকবে একা। ট্রেন চলতে লাগল। এই লাইনে কবে শেষবার লোকাল ট্রেনে করে কোথাও গেছে মনে পড়ল না আহিরার। সে সিটে হেলান দিয়ে আরামে ঘুমিয়ে পড়ল। অনেকটা সময় পরে যখন ঘুম ভাঙল তখন যেন রোদ অনেকটা পড়ে এসেছে। বেলা ছোট হয়ে আসছে এখন। সন্ধের দিকে এগিয়ে চলেছে সময়। এরপর কোথাও একটা নামতে হবে তাকে। আশে পাশে সব মহিলাই হয় ঢুলছে নাহয় ঘুমাচ্ছে। কেউই প্রায় জেগে নেই। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে আহিরা পরবর্তী স্টেশনের অপেক্ষায়। ট্রেন চলতে থাকে স্টেশন আর আসে না। সন্ধে হয়। যারা ঘুমাচ্ছিল তাদের অনেকে জেগে ওঠে। সঙ্গে রাখা টিফিনবাটি বার করে খেতে বসে। হকার কয়েকজন খাবার দাবার নিয়ে কামরার মাঝখানে বসে থাকে। কেউ কেউ খাবার কিনে খায়। আহিরা পাশের জনকে জিজ্ঞেস করে এটা কোন জায়গা গো? পরের স্টেশন কী গো? সে মহিলা প্রথমে চুপ করে তাকিয়ে থাকে তারপর হাসতে হাসতে বলে পরের আবার কী স্টেশন? এখন তো আর কোনো স্টেশন নেই গো। মানে? আহিরা একটু গম্ভীর হয়ে ওঠে। মজা করছে তার সঙ্গে বউটা? সে আবার বলে আরে কোথাও না কোথাও থামবে তো। সেই স্টেশনের নাম কী বলো না। উলটোদিকের সিটে বসা বউটা বলে বৌদি ঠিকই বলছে দিদিভাই।

– মানে?

– মানে এই ট্রেন আর থামবে না গো

– সে আবার হয় নাকি? আমরা নামব কী করে তাহলে?

– নামব না তো। এই ট্রেনে যারা আছে তারা আর কেউ কখনো নামবে না। ট্রেনও থামবে না।

আহিরা এবার একটু ঘাবড়ে গেল। ব্যাগ থেকে ফোনটা বার করে দেখল, নেটওয়ার্ক শূন্য। সে উঠে দাঁড়াল। হ্যান্ডেল ধরে ধরে কামরার বাইরের দিকে দরজার কাছে এলো। সেখানেও দরজা আগলে কয়েকজন দাঁড়িয়ে। ওরাও ওর দিকে ঘুরে তাকাল। খুব ভয়ে ভয়ে এবার আহিরা জিজ্ঞেস ট্রেন থামবে না বলছে কেন সবাই? ওরা একযোগে হেসে ওঠে সকলে।

আহিরা আস্তে আস্তে যেন সংঘমিত্রা হয়ে পড়ে। তার চোখ ছলছল করতে থাকে। এ কোন ট্রেনে উঠে এমনভাবে ফেঁসে গেল সে। গেট থেকে একজন ওর দিকে এগিয়ে এলো। সে মহিলা নয়, পুরুষও নয় ট্রান্সমহিলা। সে বলল, আমরা যারা এই ট্রেনে রয়েছি তারা সবাই তোমার মতো। মুক্তির দিকে এগিয়ে চলেছি। স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য চলেছি। তাই এই ট্রেন থামে না। থামলেই আমাদের স্বাধীনতার খণ্ডন হয়ে যায়। মুক্তির আলো অন্ধকারে ঢেকে যায়। এই ট্রেনের গতির সঙ্গে আমরা সকলে মুক্তিকামী হয়ে বেঁচে থাকি গতির জীবনে।

আহিরা হাতের রুমাল দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে বলে, সে কী করে সম্ভব? ট্রেন কোনোদিন থামবে না? ট্রান্স মহিলাটি মৃদু হেসে বলে, – না। আমরা শুধু জীবনের দিকে চলব একসঙ্গে স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে। চলতেই থাকব।

আহিরা কীভাবে যেন একটু শান্ত হলো। জিজ্ঞেস করল তোমার নাম কী গো?

ট্রান্স মহিলাটি ওর চোখে চোখ রাখল। শান্ত স্থির কিন্তু দৃঢ় দৃষ্টি। বলল আমাদের সকলের নাম তো একটাই। – আহিরা!


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

2 responses to “সোমা দত্ত”

  1. বাহ… এতো তোমারি কথা, তোমার গল্পের সব চরিত্র গুলোকেই তোমার জীবন থেকে খুঁজে নিতে পারলাম।

  2. খুব ভাল গল্প। গদ্যটা বেশ ধরে রাখে। কিছু বানান ভুল আছে।

অজ্ঞাত এর জন্য একটি উত্তর রাখুন জবাব বাতিল

Trending