টিং- এর জীবনকাল

এক পিঁপড়ে দম্পতির পাঁচ ছেলের পর একটি ফুটফুটে মেয়ে জন্মনিলো। ছেলেদের প্রত্যেকের জন্মের সময় বাবা-মার প্রত্যাশা ছিল মেয়ে হবে। কিন্তু প্রত্যেক বার তারা হতাশ হয়েছেন। এই হতাশা কাজ করত তাদের কথায়, আচরণে এবং আত্মীয়- স্বজনের মেয়েদের দেখে। এমনকি রাস্তায় কোনো মেয়েদের দলকে খেলা করতে দেখলেও বাবা মুগ্ধ হয়ে তাদের খেলা দেখতেন আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন।

ষষ্ঠবারে যখন দুশ্চিন্তা কেটে সত্যি সত্যিই মেয়ে হলো তখন বাবা-মার খুশি যেন আর ধরে না। পরিবারের অন্য সদস্য,আত্মীয়-স্বজন ও কলোনিতেও খুশির বন্যা বয়ে যায়। শীতের সঞ্চয় কিছু মিঠাই ভাড়ার ঘরে জমা ছিল। মেয়ের বাবা তার সবটুকু মিঠাই বিতরণ করে কলোনির সবাইকে মিষ্টি মুখ করালেন। সপ্তাহব্যাপী চলল খুশির আমেজ, আনন্দের বন্যা। ভাইয়েরা খেলার ফাঁকে একটু পর পর এসে দেখে যায় বোনকে। আহারে! কী সুন্দর মায়াময় চোখ, নাক, মুখ! পুরো পরিবার কয়েকদিন মেয়েকে নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিল যে কেউ বাড়ির বাইরে পর্যন্ত যায়নি। পাঁচ ভাইয়ের আদরের একটা মাত্র বোন। ছোট ভাই খুশির আবেশে বোনের নাম রাখলো টিং। টিং যেন সকলের নয়নমনি।

প্রায় এক সপ্তাহ পর বাবা মা সিদ্ধান্ত নিলেন আগামী সূর্য ওঠার পরেই তারা কাজে বের হবেন । সামনে শীতকাল। সংসারের এতগুলো সদস্যের জন্য অন্তত তিনমাসের খাবার সংগ্রহে রাখতে হবে। এর জন্য যদি দিন রাত পরিশ্রম করতে হয় তবুও করবেন। ছেলে-মেয়ে নিয়ে কয়েকটা মাস যেন কষ্ট করতে না হয়।

প্রতি বুধবার এখানে হাট বসে। মঙ্গলবার রাতে পিঁপড়া দম্পতি চিন্তা করলেন এই হাটবারে তারা ভোরের আলো ফোটার আগেই কাজে বেরিয়ে পড়বেন। ছেলেমেয়ের সারাদিনের খাবার রাতেই তৈরি করে রাখলেন তারা। তারপর ছেলেদের ডেকে নানা উপদেশ দিলেন,বিশেষ করে টিং যাতে কিছুতেই বাইরে না যায় | আর এ ব্যাপারে শুধু ভাইদের নয়, পরিবারের সকলকে মেয়েকে দেখে রাখার নির্দেশ দিলেন মা।। মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, কোনভাবেই ঘরের বাইরে না যেতে । তাদের আসার আগ পর্যন্ত যেন ভাইদের সাথে ঘরের ভেতর খেলা করে।

সকালবেলা যখন তারা কাজে যাবেন বলে রেডি হচ্ছিলেন তখন টিং ঘুমিয়ে ছিল। তাই তাকে না ডেকে ঘুমের মধ্যেই মাথায় হাত বুলিয়ে,গালে-মুখে আদর করে বেরিয়ে যান তারা।

ঐদিন ছিল বুধবার, হাটের দিন। কয়েক গ্রাম থেকে হাটুরেরা হাট করতে আসে। পিঁপড়ে দম্পতির ঘরের ঠিক উপরেই এক গুড় বিক্রেতা ঝোলা গুড়, খেজুরের গুড়, আখের গুড়, মধু আরো কিছু পণ্য নিয়ে প্রতিহাট বারে বিক্রির জন্য বসে যায়। সন্ধ্যা পর্যন্ত এগুলো বিক্রি করে বাড়ি ফেরে।
সেই গুড় বিক্রেতার সদ্য বানানো আখের গুড়ের মৌ মৌ গন্ধে ভরা চারিদিক। পিঁপড়ে টিং এর নাকেও এসে লাগে সে মধুর গন্ধ। এমনিতেই তারা অনেক দূরের খাবারের গন্ধ পেয়ে থাকে। আবার সকাল থেকে কিছু খাওয়াও নি। মা বারবার ঘুম থেকে উঠেই নাস্তা করতে বলেছেন। কিন্তু ঘুম থেকে উঠলেও আলসেমি করে এখনো নাস্তা করা হয়নি। যার কারণে এমন মধুময় গন্ধে টিং এর মাথা ঘুরে কেমন যেন পাগল পাগল অবস্থা হয়। কোথায় থেকে আসছে গন্ধ? পেটের ক্ষুধাটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। এদিক ওদিক তাকিয়ে অনুমান করার চেষ্টা করলো সে , কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারল না কোথা থেকে আসছে এমন পাগল করা সুবাস।

ঘরের বাইরে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখল ভাইয়েরা খেলছে। আস্তে বিছানা থেকে নামলো টিং। গন্ধটার সূত্র ধরে পা টিপে টিপে বেরিয়ে এল পথে। ধীরে ধীরে রাস্তা বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো সে। অনেক খাড়া পথ পেরিয়ে যখন উপরে উঠল তখন তো তার চোখ ছানাবরা। এত আলো সে জীবনে কোনদিন দেখেনি। প্রথমে তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল, এরপর ঠান্ডা শীতল বাতাসে জুড়িয়ে গেলো মন ও শরীর ।
আস্তে আস্তে গন্ধ শুকে সে পৌঁছালো গুড় বিক্রেতার নিকট। ঝুড়ি বেয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই অবাক হলো সে। এত মিষ্টি জিনিস! তার জিভে জল এসে গেল। সে আস্তে করে ঢুকে গেল একটি আখের গুড়ের ঢিমার ভিতর। প্রচন্ড খুশিতে পেট ভরে গুড় খেয়ে আরেকটা পেটে কিছু খাবার মায়ের জন্য জমিয়ে রাখলো। মনে মনে ভাবলো এমন মিঠাই পেলে মা নিশ্চয় অনেক খুশি হবেন।

পেটভরে খাওয়ার পর প্রচন্ড ঘুম পেল তার। কখন যে চোখ বন্ধ হয়ে ঘুমিয়ে গেছে বুঝতে পারেনি। দিন গড়িয়ে যখন ঘুম ভাঙলো তখন রাত। সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল এই জায়গা তার ঘরের উপরের জায়গা নয়। কেমন যেন অচেনা পরিবেশ। সে কোথায় এসেছে বুঝতে পারল না। হঠাৎ কাঁপতে লাগলো তার ছোট্ট বুক। বের হওয়ার জন্য এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগলো সে। কেমন যেন গোলকধাঁধা, কিছুতেই পথ বের করতে পারছেনা। হঠাৎ তার মায়ের কথা মনে হল খুব। মা নিষেধ করেছিলেন বাইরে না বের হতে। মায়ের কথা শুনলে আজ তার এমন অবস্থা হত না। মায়ের কথা মনে হতেই দু চোখ বেয়ে ক্রমাগত জল গড়াতে লাগলো তার । সে এখন কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না । চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আবারও ছুটতে লাগল এদিক ওদিক। অনেকক্ষণ ছোটাছুটি করার পরও বের হওয়ার কোনো পথ খুঁজে পেলো না সে। পথটা কেমন যেন ভোজবাজির মত হারিয়ে গেছে। এখন সে কি করবে? কোথায় যাবে ? কোথায় পাবে তার মাকে?

সন্ধ্যায় পিঁপড়া দম্পতি ঘরে ফিরে প্রথমেই গেলেন মেয়ের বিছানার নিকট। যে বিছানায় মেয়েকে ঘুমে রেখে বের হয়ে গিয়েছিলেন তারা। সেখানে মেয়েকে না দেখে ঘরের আশপাশে চোখ বুলালেন মা। কোথাও তিনি টিং কে দেখতে পেলেন না। অজানা আশঙ্কায় হঠাৎ মায়ের বুকটা কেমন ধক করে উঠলো। মা প্রথমে ক্ষীণস্বরে ডাকলেন, ‘টিং, টিং ! কোথায় তুমি?’
কিন্তু টিং এর কোন সাড়া পেলেন না তিনি । এবার মা জোরে জোরে ডাকতে লাগলেন। আরো কয়েক বার ডাকার পরও যখন কোনো সারা শব্দ পেলেন না তখন সত্যি সত্যিই মায়ের মনে কু- ডাক ডাকতে লাগলো। বুকের মধ্যে ব্যথা শুরু হলে মা বুকে হাত দিয়ে মেঝেতে ধপ করে বসে পড়লেন। বাবা চিৎকার করে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলেন । ভাইদের ডেকে তন্ন তন্ন করে প্রশ্ন করলেন তিনি। কয়েকটা চড়ও বসিয়ে দিলেন বড় দুজনের গালে। বোনকে রেখে তারা কেন খেলতে গিয়েছে বারবার একই প্রশ্ন করছেন আর মেয়েকে খুঁজতে এদিক ওদিক দৌড়াচ্ছেন তিনি। কিন্তু ঘরের আশপাশ, আঙিনা এবং কলোনির প্রতিটি ঘরে খোঁজ করেও টিং কে পাওয়া গেল না রাত অবধি।

বেশ রাতে ফিরলেন এক বয়োজ্যেষ্ঠ। মা বাবার কান্না, চেঁচামেচি শুনে এগিয়ে আসলেন তিনি। জানালেন সকালে ত্রিমুখী পথে টিংকে উপরে উঠতে দেখেছেন। ভেবেছেন হয়তো বাবা মার অনুমতি নিয়েই বাইরে এসেছে। তাই আর তাকে কিছু বলা হয়নি। শুনে বাবা-মা ত্রিমুখী পথে দৌড়ে গেলেন । পথ বেয়ে মেয়েকে ডাকতে ডাকতে উঠে গেলেন হাটের উপর।

বেশ রাত। পুরো হাট ফাঁকা। কোনো জন মানুষের চিহ্নটি পর্যন্ত নেই। পুরো হাটজুড়ে দৌড়ে পাগলের মত চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন বাবা-মা। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ পেলেন না। তাদের ঘরের উপর মাটিতে কয়েক ফোঁটা ঝোলা গুড়ের উপর কয়েকটা ঢাউস পিঁপড়ে বসে ছিলো তখনো। মা দৌড়ে এসে তাদের টিং এর বর্ণনা দিলেন প্রথমে। তারপর জিজ্ঞেস করলেন কোথাও তাকে দেখেছে কিনা। কিন্তু সকলেই একযোগে মাথা নেড়ে বলল তারা কেউই এমন কাউকে দেখেনি।
এবার মায়ের আর বুঝতে বাকি রইল না কি হতে পারে। নিশ্চয়ই কোন হাটুরে পণ্যের সাথে মেয়ে চলে গেছে দূর কোথাও। হঠাৎ মায়ের বুকফাটা কান্নায় আকাশ পাতাল ভারী হয়ে আসলো। সে জোরে জোরে চিৎকার করলো টিং টিং মা আমার , কোথায় তুই? বাবা যেন বোবা হয়ে গেছেন। একদম নিশ্চুপ…।

বাড়ি ভর্তি দাওয়াতি মানুষের হৈচৈ চিৎকার চেঁচামেচি , বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়ি শব্দ। সন্ধ্যার পর পিঠা তৈরীর আয়োজন। বউ ঝিরা লেগেগেছে পিঠা তৈরির কাজে। হঠাৎ টিং এর চোখে আলোর ঝলক লাগলো। কোনো মানুষের হাতের আঙুলের ছোঁয়ায় ভেঙে ফেলা হয়েছে গুড়ের ঢিমা। টিং যেন প্রাণ পেল মনে। বেঁচে থাকার আনন্দে মাথা বের করেছে তো অমনি দুটো আত্মঘাতা নখ ছুটে আসলো তার দিকে। সে তাড়াতাড়ি মাথা লুকাতে চাইলে ভিতরে। কিন্তু তার আগেই টেনে হিঁচড়ে বের করল তার দেহ। দুই আঙুলের চিপায় পিষে ফেলল অবলীলায়!
পিষে যাওয়ার আগে তার শেষবারের মত মনে পড়লো মায়ের কথা। বুকফাটা আত্মচিৎকার করে শুধু একবার বলল, ” মা .. মাগো …!”


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

One response to “আতিকা হাসান”

  1.  অ্যাভাটার
    অজ্ঞাতনামা

    ভাল লাগলো গল্পটি।

মন্তব্য করুন

Trending