গল্প

মণিকা চক্রবর্তী

জল চুইয়ে পড়া ছাদের সিলিংয়ের গায়ে যে ছোপ ছোপ দাগ হয়েছে সেই দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে শুয়ে শুয়ে আগামীদিনের কথা ভাবছিল শবনম। গত দুবছর ধরে নানারকম তাবিজ শরীরে বেঁধে রাখার পর,আজ সকালে সে একটা নতুন মাদুলি কিনেছে এক ফকিরের কাছ থেকে। গত বছরটায় মসজিদে মসজিদে দিন-রাত্রি চোখের জল ফেলেছে সে। তারপরেও আজ সকালে যখন মসজিদে যাচ্ছিল সে পথে এই ফকিরটাকে দেখে একটু থমকে দাঁড়িয়েছিল সে। ফকিরটি তখন তার ঝুলি থেকে কি যেন বার করছিল উবু হয়ে বসে। শবনমের চোখে চোখ পড়তেই ডাকল এদিকে আয়। সম্মোহনী স্বরটাকে এড়াতে পারে না সে। পা টিপে টিপে কাছে এগোলেই ,ফকিরটি তাকে ডেকে বলল, নে এটা ধর! শক্ত করে ধর! শবনম অবাক হয়, ভয়ে তার হাতের আঙ্গুলগুলি কাঁপতে থাকে। নিজের হাতের ভিতর সে বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করে একটি ছোট্ট মাদুলি। কোনো এক বাইরের ইচ্ছেশক্তি যেন তাকে প্রাণপনে মাদুলিটিকে নিজের শরীরে ধারণ করতে বলে।
ফকিরটি হঠাৎ তার কাঁচা-পাকা দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলে, ভয় করিস না,ভাল হবে তোর। তারপর মাটিতে হাত ঠেকিয়ে গলার রঙিন মালাগুলোর পুঁতি গুনতে গুনতে বিচিত্র ভঙ্গিতে ফকিরটি উঠে পড়ে আর চোখের পলকেই অদৃশ্য হয়ে যায়।
বিছানায় শুয়ে আজ রাতে ঘুম আসছেনা শবনমের। সারাক্ষণ ছটফটাচ্ছে সে । তার জীবনের গল্পটার যেরকম শুরু তা কোথায় যেয়ে শেষ হতে পারে , সে বিষয়ে কিছুই আঁচ করতে পারে না সে। সকাল থেকেই ফকিরের বিষয়টা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আর ওই যে কথাটা! ‘ভাল হবে তোর’ সত্যিই ভাল হবে! কে জানে, আগামীকাল তার জন্য কি সংবাদ অপেক্ষা করছে! সত্যিই চমৎকার বেহায়া সে। এত কিছু ঘটে যাবার পরও সে অপেক্ষা করে ভাল কিছু ঘটবে তার সাথে। সে জানে আর বিশ্বাস করে, সে শুধু ভালবেসেছিল । আজও সেই জায়গাটিকে আঁকড়ে ধরেই তার সবটুকু লড়াই। ভালবাসাই কি তবে ভাল থাকবার মূলমন্ত্র!

২
সেই যে মংলা পোর্টে তার দেখা হয়েছিল সেলিমের সাথে। জায়গাটি অচেনাই ছিল,ওখানে যাবার কথাও তার নয়। নিয়তির খেলা। হঠাৎ এক খালাতো বোনের বিয়ে ওই এলাকায় হওয়াতে ঢাকা থেকে খালাতো বোনের সঙ্গেই বেড়াতে গিয়েছিল সে। দুলাভাই চাকরী করত মংলা পোর্টে। সেলিম হঠাৎ একদিন এসেছিল তার দুলাভাইয়ের বাসায়। ব্যবসায়িক কোনো উদ্দেশ্যেই হয়তো। সেখানেই শবনমের সঙ্গে প্রথম দেখা। প্রথম দেখার মুহূর্তটি তার এখন ঠিকঠাক মনে পড়ে না। তারপর আরেকদিন,মংলা পোর্টের রাস্তায় পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষের কথাবার্তার ভিতর দিয়ে সেলিমের মুখটি চোখে পড়ে। হুম, এই দৃশ্যটিই যেন এক নিমিষেই বালির ঘরের মতো ভেঙে দিতে থাকে তার বাকী সব অতীতকে। এখন তার প্রায়ই মনে পড়ে ,সেসব সময়ের কথা। সে সময় কেমন করে অবলীলায় সেলিমের মুখটি ছাড়া আর সব কিছুই যেন ঠিক সেই মুহূর্তেই রাস্তার নাম, দোকানের সাইনবোর্ডের লেখা , সবকিছুই যেন দুর্বোধ্য মনে হচ্ছিল তার কাছে! সেলিম ছাড়া আর সবকিছুই তখন দুর্বোধ্য আর ক্লিশে। তখন যে সে সত্যি সত্যি প্রেমে পড়ে গিয়েছিল! আর খুব প্রবলভাবেই।
তারপর দু-এক দিন পার না হতেই একদিন সেলিমই এল তার বোনের বাড়িতে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে।
‘ছেলে দেখতে শুনতে মাশাল্লা। শবনমেরও চয়েস হইছে, তাইলে আর দেরী ক্যান!। ’ খালাতো বোন খুব খুিশ হয়েই জানাল বড়ভাইকে।
‘মাত্র এসএসসি পাশ করল শবনম। এখনই বিয়ে! ভাল করে খোঁজ খবর করা দরকার।’
মৃদু আপত্তি ছিল বড় ভাই আব্বাসের। পুরান ঢাকায় খাবার হোটেলের জমজমাট ব্যবসা আছে আব্বাসের। আর্থিকভাবে খুবই স্বচ্ছল আব্বাস ও তার পরিবার। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে কবেই। ছোট বোন শবনম বড় আদরের। বোনটাকে ভাল ঘরে শাদি দিতে পারলেই আর ভাবনা নেই। আব্বাসের বউ আর ছেলে-মেয়ে দুটোও শবনমকে চোখের আড়াল করতে চায় না। কিন্তু পড়াশোনাটা শেষ করার আগে বিয়ে দেয়ার ইচ্ছে তার একেবারেই নেই। খালাতো বোনকে সেই কথা সে স্পষ্ট করেই বলল, ‘ আব্বু-আম্মু আমার কাছে শবনমরে রাইখা গেছে, ওর লেখাপড়া শেষ করাটা খুব দরকার।’
‘লেখাপড়ার কী সমস্যা! করবে! তাছাড়া সেলিমতো চাকরী করে জাহাজে। তিনমাস, ছয়মাস পরে আসবে। শবনমের পড়ালেখার কোনো অসুবিধা হবে না। সেলিম তো এক বাপের এক ছেলে।ওদের পরিবারটাও ভাল,ছিমছাম।ওর বাবা,ওর মা আমাকে বার বার বলছে,বিয়ের ব্যাপারে। সেলিম নিজেও এসেছিল। মনে হয়, ছেলেটা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না’।
শবনমের আপন বড় বোন ও তার স্বামী এই প্রস্তাবে খুবই খুশি ছিল। ছেলে দেখতে সুন্দর, জাহাজে চাকরী করে, টাকার অভাব নেই। তাই বিয়েটাও খুব দ্রুতই হয়ে গেল পারিবারিক ভাবে,সবার মিলিত সিদ্ধান্তে, আনন্দে -উত্তেজনায়। শর্ত একটাই, শবনম ইন্টার পাশ করার পর সংসার করবে।

বিয়ের পর তিনটি মাস শবনম ছিল আনন্দে আত্মহারা। কয়েকদিন ঢাকা, কয়েকদিন শ্বশুরবাড়ি, কয়েকদিন এবাড়ি-ওবাড়ি আর নানা রিসোর্টে ঘুরে-ফিরে তিন মাস কেটে গেল চোখের পলকে।
সেলিম তিন-চার মাস পর-পর আসে। তবে তার আসার সময়ের তেমন ঠিক থাকে না। আবার যাবার সময়েরও ঠিক সময় থাকে না। হঠাৎ করেই তার আসা-যাওয়া। বিষয়টা নির্ভর করে জাহাজের গতির উপর। জাহাজের মালপত্রগুলির সুপারভিশন করে সে। আসার সময় নিয়ে আসে প্রচুর টাকা, মোবাইল ফোন, আরও অনেক কিছু। শবনমকে সে অনেক দূরের সমুদ্রের গল্প শোনায়। ঢেউ কেমন করে ছড়িয়ে ছড়িয়ে উজ্জ্বল সাদা হয়। কেমন রুপালী আলোতে চকচক করে রুপালি ঢেউ। বলে অচেনা শহর আর বন্দরের গল্প। গাঢ় কুয়াশায় ঢাকা অনেক দ্বীপের গল্প। সমুদ্রের ঘন কুয়াশার নীচে যেমন করে বয়ে যায় কালো জলেরা তার গল্প। কখনও বা নীল রঙের উজ্জ্বল সমুদ্রের গল্প। এসব গল্প শুনতে শুনতে শবনমের হৃৎপিন্ডের স্পন্দন মিলিয়ে যায় সেলিমের হৃৎপিন্ডের স্পন্দনের সঙ্গে। গল্পগুলি স্থান ,কাল ও পাত্র নিয়ে তার স্মৃতিতে মিশে যেতে থাকে, কখনও জীর্ণ হবে না এমন প্রতিজ্ঞায়।শবনমের এই দিনগুলি দারুন রঙিন। তার আকাশে তখন কেবলই শরৎকাল, চারপাশে বসন্তের হাওয়া গুনগুন। বড় ভাইয়ের যাত্রাবাড়ির বাসার ছাদের ঘরটাই তাকে দেয়া হয়েছিল। শবনম চাইলে অন্য জায়গায় একটা ঝকঝকে ফ্ল্যাট নিতেই পারতো। কিন্তু যেহেতু সেলিম সবসময় থাকে না,তাই ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে একইবাসায় থাকাটাই নিরাপদ ও যুক্তিযুক্ত ছিল। সঙ্গে চেষ্টা করছিল ভালোভাবে পড়াশোনাটা চালিয়ে নিতে।

বিয়ের দেড় বছরের মাথায় তার ইন্টার পরীক্ষার আর কয়েকদিন বাকি। পরীক্ষা সামনে বলে সেলিমের এবারের আসাটা অনেকটা পিছিয়ে যায়। কিছুটা ব্যবধান তৈরি হয়। কিন্তু এর মধ্যেই হঠাৎ একদিন রাতে সেলিম আসে, আর মাত্র একটিদিন থেকেই সে চলে যায়। বলছিল, চট্টগ্রাম বন্দরে একটা জাহাজ লোড হতে সময় নিচ্ছে, তাই সে একদিনের জন্যই প্লেইনের টিকিট কেটে এসেছে। তারপর শবনমের ইন্টার পরীক্ষা শেষ হবার কয়েকদিন পর, সবমিলেয়ে পাক্কা চার মাস পর সেলিম আসে। কথা ছিল পরীক্ষা শেষের পর ওরা কিছুদিন মংলায় যেয়ে থাকবে, সেলিমের বাবা -মায়ের সঙ্গে।
কিন্তু চার মাস পর হঠাৎ এক গভীর রাত্রে মাইক্রোবাস নিয়ে সেলিম আসে।সঙ্গে কয়েকজন লোকও থাকে। বিষয়টি অন্যবারের মতো নয়। লোকগুলো সেলিমকে খুব যত্ন করে নামিয়ে দিয়ে তখনি মাইক্রোবাসে চড়ে চলে যায়। মাঝরাতে, সঙ্গে আরও কয়েকজন নিয়ে আসার বিষয়টা ভাবতে ভাবতেও ভাবনাটা উড়ে য়ায় শবনমের। সে তখন বিষয়টি তখন আর ভালভাবে খেয়ালই করে না হঠাৎ আনন্দে ও উত্তেজনায়। কিন্তু ঘরে ফেরার পর সেলিমকে দেখে সে আৎকে উঠে। এই মানুষটি কি সেই মানুষ! একি চেহারা হয়েছে সেই দীর্ঘদেহের স্বাস্থ্যবান মানুষটির! তার পাঁজরের হাড়গুলি বেরিয়ে পড়েছে। চোয়াল ভাঙা। গায়ে বন মানুষের মতো লোম। সময়ে-অসময়ে যে মানুষটি এসে পড়তো, সে গত কয়েকটি মাস আসেনি কেন! সেকি অসুস্থ! নানা প্রশ্নে শবনমের ভিতরটা জ্বালাপোড়া করতে থাকে। যে লোকগুলো ওর সঙ্গে এসেছিল, ওরা কারা! এসব ভাবনা তাকে সারারাত ধরে তোলপাড় করে, কিন্তু সে মুখে টু শব্দটিও করে না। জানালার লাল ভারী পর্দাটা টেনে দিয়ে সেলিমকে জড়িয়ে ধরে রাখে আগের মতোই। মানতেই পারেনা যে, কোথাও একটা বড় রকমের পরিবর্তন ঘটে গেছে। মনে মনে ভাবে, হয়তো বেশ কিছুদিন মাটির দেখা না পেয়ে সমুদ্রে থাকার কারণে শরীর খারাপ হয়ে গেছে। সে তার ভালবাসা দিয়ে ,দুদিনেই সেলিমকে ঠিক করে ফেলবে।

দু-চারদিন পর সেলিম সেবাযত্নে একটু সুস্থ হয়। কিন্তু সুস্থ হবার তিন-চার দিন পর হঠাৎ একদিন শবনম দেখে ,সেলিম বাথরুম থেকে দীর্ঘক্ষণ বেরুচ্ছেনা। দীর্ঘক্ষণ পর বাথরুম থেকে বের হয়েই সে অজ্ঞান হয়ে যায়। শবনম একটু পরে বাথরুমে যেয়ে আবিষ্কার করে কমোড ভরে আছে রক্তে। দিশাহারা হয়ে যায় শবনম। ভাই বোনকে ডেকে বলে। তারপর এ ডাক্তার ও ডাক্তার খুঁজে খুঁজে যতই সময় পার হতে থাকে সে দেখতে পায় সেলিমের শরীরের সব কল-কব্জা যেন বিগড়ে যাচ্ছে।এত দূর্বল! শরীর একেবারেই ভেঙে পড়ছে ক্রমশ। সেলিমের বাবা-মা বিষয়টা জানার পর ডাক্তারের পাশাপাশি কবিরাজী ওৗষধ খাওয়াবার চেষ্টা করে। এদিকে নিজের শরীরে শবনম টের পেতে থাকে আরেকটি প্রাণের অস্তিত্ব। কখন যে এটি ঘটে গেছে ঠিক মনে করতে পারে না। সেলিমের কি মনে আছে, সেই যে লম্বা সময়ের বিচ্ছেদের ভিতর একদিন যে সে হঠাৎ এসেছিল কাউকে না জানিয়ে! সে সময়ের তারিখটা স্মৃতির ভিতর জেগে উঠতেই তার নিজের শরীরের ভ্রূণটি নড়ে ওঠে। প্রথম সন্তান ,কিন্তু তার এই আনন্দের খবর সে কাকে বলবে! সেলিমের রক্ত যেতে যেতে এমন অবস্থা যে তার চোখ নিস্প্রভ, ঠোঁট সাদাটে আর শরীর যেন বরফের মতো ঠান্ডা। একটা বিষম আতঙ্ক যেন জড়িয়ে রেখেছে চারপাশ।
শেষ পর্যন্ত নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেল ,সেলিম এইচ আই ভি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। রিপোর্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের চেম্বারেই জ্ঞান হারিয়েছিল শবনমের বড় ভাই। মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল বড়বোন। অসহ্য দুঃখের ভিতর বীভৎসভাবে সেলিমের মৃত্যুর আশঙ্কা ক্রমেই তাড়িয়ে বেড়াতো তাকে। সেলিমের পুরো শরীরে তখন পচন ধরছিল ক্রমে ক্রমে। হাসপাতালে ভর্তির পর ভয়ে নার্সরা রুমে আসতেই চাইতোনা। সমস্ত ড্রেসিং শবনম নিজেই করেেতা। সবারই ধারণা ছিল এইডস রোগ ছোঁয়াছে। আপনজনেরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ডাক্তাররা সেলিমের আয়ু নির্ধারণ করেছে বড় জোর এক সপ্তাহ।
শবনম এই অবস্থায় হাসেও না কাঁদেও না। সেলিমের উপার্জিত টাকাগুলি জলের মতো চলে যাচ্ছে হাসপাতালের চিকিৎসায়। ডাক্তার খুবই চিন্তিত শবনমের বিষয়ে ও তার সন্তানের বিষয়ে। এখন শবনমের অ্যাবরশনের কোনো সুযোগ নেই। বিস্ফারিত দৃষ্টি মেলে শবনম সবার কথা শোনে, যন্ত্রণার নির্মম দৃশ্যগুলি দেখে। একদিন ডাক্তারের রিপোর্টে জানতে পারে , তার নিজের শরীরেও ছড়িয়েছে এইচ, আই, ভি। তবু যেহেতু সময়মতো তাকে ওষুধ দেয়া হচ্ছে, তাই শবনম হয়তো বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারবে। তবে আশঙ্কা আছে তার গর্ভস্থ শিশুর ক্ষেত্রেও। শবনম নিজের দিকে তাকায়। চুর্ণ-বিচুর্ণ স্মৃতিগুলির দিকে অবশমনে বসে থাকে। কি করবে ভেবে পায় না। শুধু ধৈর্য্য ধরে ডাক্তারের পরামর্শ মতো ওৗষুধ খেতে থাকে। ওৗষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পড়ে যেতে থাকে তার চুল, খসে পড়ে চামড়া, শরীরের ভয়ংকর ব্যথারা জেগে থাকে রাত দিন। তলপেটের ভিতরে গর্ভস্থ শিশুর ওজন কমে যায়। তবু সে টের পায় ভ্রূণের অস্তিত্ব। আর অন্ধকার ঘরে শুয়ে শুয়ে তার গর্ভে হাত রেখে বলে, ‘আল্লার দোহাই লাগে, তুই মরে যাইস না’। যেন এই শব্দকয়টির বিড়বিড় করা উচ্চারণ তার ভালবাসার মন্ত্র। শব্দগুলি যেন ভালবাসার তাবিজ।
শবনম এই রকম শরীর নিয়েও মৃদু বেঁচে থাকা স্বামীর সেবা করে যায়। এমনকি তার রাগও হয় না। না, তার একেবারেই রাগ হয় না ,এমন জীবন্মৃত মানুষটির প্রতি। সে কি তাকে জেনেশুনে ঠকিয়েছে! না, না, সেলিম তাকে ভালইবাসতো। সেলিম নয়, নিয়তিই তাকে ঠকিয়েছে। মনে পড়ে, সমুদ্রের গল্প বলতে বলতে সেলিম তাকে থাইল্যান্ডের এক নারীর কথা বলতো। মাঝে মাঝে সব অনুভুতিগুলি পাথরের মতো ভারী মগজের ভিতর জমে থাকে। ডাক্তারের কথা অনুযায়ী সাতদিনের মাথায়ই সেলিমের মৃত্যু হলে ,দু-এক জন আপন জন আসে। তবে তারা তখনও মেনে নিতে চায় না, এই মরদেহের অসুখের বিভীষিকাকে। যদিও পারিবারিক কবরস্থানেই তাকে দাফন করা হয়,কিন্তু তা নিয়ে আত্মীয় জনদের বাক-বিতন্ডার অন্ত থাকে না।

৩
গত তিন বছর ধরে ডাক্তারের পরামর্শমতো প্রতিটি নির্দেশ মেনে চলেছে শবনম। ওষুধের প্রভাবে পড়ে গেছে তার অসাধারণ সুন্দর লম্বা রেশমের মতো চুলগুলো। সেলিম তার ঘন গাঢ় চুলে নাক ডুবিয়ে আদর করত। সেসব দিনের ঘোর সারা মনে ভরে থাকে শবনমের। এত যে বিপরীত দৃশ্যের ভিতর দিয়ে তাকে যেতে হচ্ছে, শবনম কিন্তু কিছুতেই ভয় পায় না। ডাক্তাররা ওর মানসিক শক্তি দেখে অবাক হয়। সঙ্গে নার্সরাও আশ্চর্য দৃষ্টিতে তাকায়। কয়েকটি এনজিও প্রতিষ্ঠান আসে তার সঙ্গে কথা বলতে। যদিও ওৗষুধের প্রভাবে এখন তার দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ। তবু বিদেশি কয়েকজন ডাক্তারের একটি গ্রুপ নিয়মিত তাকে পর্যবেক্ষণে রাখছে। তাদের একটাই উদ্দেশ্য, রোগীকে সুস্থ করে তার শিশুটিকেও বাঁচানো। শবনমের কেইসটা তাদের কাছে অনেক স্পেশাল আর গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের মানুষরা শবনমকে এখনও পুরোপুরি এড়িয়ে চলে। ডাক্তার ও এনজিওকর্মীরা চারপাশের মানুষদের বোঝাতে চায়, এটি কোনো ছোঁয়াছে রোগ নয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা! কখনও কখনও শবনমের ভাইবোনেরা আসে ঠিকই খোঁজখবর নিতে কিন্তু কিছু টাকাপয়সা দিয়ে যায় হাসপাতালে ডাক্তারদের কাছে বা নার্সের কাছে। ভয়ে ওরা শবনমের কাছে আসে না। অস্পৃশ্য ছোঁয়াচে রোগে বড় ভয়।

নানা জটিলতা অতিক্রম করে শেষপর্যন্ত শবনমের একটি ছেলে শিশু হয়। শিশুটির ওজন খুবই কম, তবে সুস্থ। ডাক্তার বিনীত অনুরোধ করে শবনমের বোনকে। বাচ্চাটা দুইবছর মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকবে। মায়ের দুধ খেতে পারবে না। দু- বছর পর শিশুটিকে টেস্ট করে জানা যাবে, তার এইচ-আই-ভি আছে কিনা! শবনমের বোনের কাছে বাচ্চাটির দায়িত্ব দেন ডাক্তার।

৪
গত দুদিন আগে শিশুটির দুবছর পূর্ণ হয়েছে। শবনম শিশুটির জন্মমুহূর্তটিকে স্মরণ করতে করতে দুচোখের জলে ভাসে আরেকবার। কী ভয়ানক যন্ত্রণা! রক্তক্ষরণে সে তখন বিবর্ণ। শিশুটির কান্না থামছে না। সে এইডস রোগী বলে তার কাছে শুধু একজন নার্স। অনেকটাই অবহেলিত ভাবে রয়েছে শিশুটি ও সে। বাচ্চাটা খুব জোরে কাঁদছিল! তারপর একসময় কোনো এক অদৃশ্য বন্ধনের কারণে শিশুটি নিজে নিজেই কান্না থামায়। সে তার মুখটি দেখে,শিশুটিও যেন তাকায় । সে দুহাত তুলে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বলে,‘আল্লার দোহাই ,বেঁচে থাকুক আমার বাচ্চাটা’ আর কাঁদতে থাকে। সারা শরীরে অস্বাভাবিক ব্যথার মধ্যেও টের পায় তার স্তনে উষ্ণ প্রসবনের ধারা। স্তন থেকে ঝরছিল পাতলা হলুদ তরল, তারপর সাদা দুধ। ঠিক সেই সময় শিশুটিকে একটি কাপড়ে মুড়িয়ে তার কাছ থেকে দুরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ঝরছিল হলুদ তরল, না, শিশুটি কখনোই তার দুধ পান করেনি। এইডসে আক্রান্ত মা কখনও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে না। বরং সে খালার কাছে গরুর দুধ আর চালের জাউ খেয়ে বড় হয়েছে। হ্যাঁ, এখন সে পূর্ণ করেছে দুবছর। শবনমের পুরো জীবনটাই একটা অসম্ভব জীবন। আহা ! গত দু বছর! মোবাইল ফোন আঁকড়ে থেকে দেখেছে শিশুর প্রথম ভাত খাওয়া, ছোট্ট নীচের পাটিতে একটি দাঁত ওঠা, হামাগুড়ি,হাঁটি-হাঁটি পা, কথা বলা । সামনে থেকে যা পায়নি, তাকে পেয়েছে অন্য অনুভবে।এই অসম্ভব জীবন নিয়েও এখন সে কিছুটা সুস্থ। তার পড়ে যাওয়া মাথার সবচুলগুলো আবার গজিয়েছে। চামড়াটাও মসৃন হয়ে ফিরে এসেছে গায়ে। সঙ্গে ফিরেছে অদম্য মানসিক শক্তি। কিছু ওৗষধ এখনও তাকে খেতে হয়,আর তা বিনামূল্যে দিয়ে থাকে নানা এনজিও। এমন একটি এনজিওতে কাজ করে সে কিছু টাকা আয়ও করে। তার কাজ হল মানুষকে বোঝানো যে ,‘এই রোগটি ছোঁয়াছে নয়, আর প্রথম অবস্থায় রোগ সনাক্ত হলে ওৗষধ খেয়ে পুরোপুরিই সুস্থ হওয়া যায়।’

দুদিন পর তার শিশুটির এইচ আইভির পরীক্ষাটি হবে। বড় বোন শিশুটিকে নিয়ে এসেছে ঢাকায়। পুরো পরিবার উদগ্রীব হয়ে আছে এই বিষয়টিতে। দীর্ঘবছর ধরে বিচ্ছেদ,দুঃখ, আঘাত, অপমান ,সম্পর্ক, উপেক্ষা, সবকিছুই তার অস্তিত্বকে বিপন্ন করেছে। তবু তার আস্থা ভালবাসায়। মৃত্যুর গলায় পা রেখেতো সে বেঁচেছে! সে যেন জেনেই নিয়েছে শিশুটির এইচ আই ভি পজিটিভ রিপোর্ট আসবে না। আর যদি আসেও, তবে দ্রুত চিকিৎসাতো আছেই।
ঘোরের মধ্যে সে যাচ্ছে, হাসপাতালের পথে নির্দিষ্ট বাসটিকে ধরবে বলে। একটা বাসকে টপকে দ্রুত চলে যাচ্ছে আরেকটি বাস। শবনম মরিয়া হয়ে ছুটছে সমস্ত হাহাকারকে অতিক্রম করে। হঠাৎ গলার কাছ থেকে খসে পড়ে ফকিরের কাছ থেকে পাওয়া গতকালের মাদুলিটি। সে বিচলিত হয়ে চারপাশের খোলা জায়গায় মুখ ঘুরিয়ে তাকায়,না কোথাও নেই।
নিজের অন্তঃশক্তি নিয়ে ক্লান্তিহীনভাবে শবনম সামনের দিকে পা চালিয়ে জোরে হাঁটতে থাকে।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

One response to “আধখানা শীতল চাঁদ”

  1. ভালো লেগেছে গল্পটা।

মন্তব্য করুন

Trending