হিমাদ্রী কুমার চ্যাটার্জ্জী
ভূমিকা: সাম্যবাদের শাশ্বত দর্শন ও মানবতার জয়ধ্বনি
“গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ–কাল–পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে–ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”
বাঙালি মননের বিশাল আকাশে যখনই ধর্মান্ধতা, জাতিভেদ এবং শ্রেণিবৈষম্যের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে, তখনই ধ্রুবতারার মতো প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে কাজী নজরুল ইসলামের এই অমর পঙ্ক্তিমালা। এই চরণগুলো কেবল নিছক কোনো কবিতার অংশ নয়, বরং এগুলো হলো বিশ্বমানবতার এক শাশ্বত ইশতেহার। এক অমোঘ সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে কবি ঘোষণা করেছেন যে, সৃষ্টির এই অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডে মানুষের চেয়ে পবিত্র, মহৎ এবং শ্রেষ্ঠ আর কিছুই হতে পারে না। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, দেশ বা কালের যে কৃত্রিম গণ্ডি মানুষ নিজে তৈরি করেছে, সেই গণ্ডিকে এক লহমায় চূর্ণ করে দিয়ে নজরুল মানবসত্তাকেই সর্বোচ্চ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর এই সাম্যবাদের দর্শন কেবল অর্থনৈতিক সমবণ্টনের তত্ত্ব নয়; এটি হলো আত্মিক, সামাজিক এবং মানবিক সমতার এক চূড়ান্ত রূপরেখা। যখন পৃথিবীর বুকে একদল মানুষ অন্যদল মানুষকে শোষণ করছে, ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করে ঈশ্বরকে নির্দিষ্ট উপাসনালয়ের চার দেওয়ালে বন্দি করার চেষ্টা চলছে, ঠিক সেই যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নজরুল বজ্রকণ্ঠে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সকল সৃষ্টির সেরা হলো মানুষ। মানুষের মাঝেই স্রষ্টার প্রকৃত বসবাস এবং মানুষকে অবজ্ঞা করে কোনো মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারে না। এই কবিতাটি তাই শুধু একটি সাহিত্যিক নিদর্শন নয়, এটি মানুষের হারানো অধিকার ও সম্মান পুনরুদ্ধারের এক অকৃত্রিম জয়ধ্বনি।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: পরাধীনতার শৃঙ্খল ও সমাজবিপ্লবের স্ফুরণ
নজরুলের এই যুগান্তকারী চিন্তাধারার জন্ম কোনো নির্জন কবির ভাববিলাস থেকে হয়নি; এর পেছনে রয়েছে এক জ্বলন্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। সময়টা উনিশ শত পঁচিশ সাল (তেরো শত বত্রিশ বঙ্গাব্দ)। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ভারতবর্ষ তখন কেবল বিদেশি ব্রিটিশ শাসকের দ্বারাই শোষিত নয়, বরং আপন সমাজের অভ্যন্তরে জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং অস্পৃশ্যতার বিষবাষ্পে মারাত্মকভাবে জর্জরিত। ঠিক সেই সময়ে, শ্রমিক ও কৃষকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কাজী নজরুল ইসলাম, হেমন্তকুমার সরকার এবং সাম্যবাদী নেতা কমরেড মুজাফফর আহমদের মতো কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘শ্রমিক স্বরাজ দল’। এই রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হিসেবেই উনিশ শত পঁচিশ সালের ডিসেম্বর মাসে আত্মপ্রকাশ করে সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘লাঙল’। এই পত্রিকার সম্পাদনার প্রায় সমস্ত গুরুভার নজরুল একাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। পত্রিকাটির প্রচ্ছদও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; সেখানে আঁকা থাকত লাঙল কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকা এক শোষিত কৃষকের ছবি। এই ‘লাঙল’ পত্রিকার পাতাতেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল নজরুলের অমর সৃষ্টি ‘সাম্যবাদী’ কবিতাগুচ্ছ। পরাধীন দেশে একদিকে বিদেশি শক্তির রক্তচক্ষু, অন্যদিকে দেশীয় জমিদার ও পুঁজিপতিদের নির্মম শোষণ—এই দ্বিমুখী আক্রমণের বিরুদ্ধে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জাগরণের জন্যই নজরুল তাঁর কলমকে তরবারিতে রূপান্তরিত করেছিলেন।
দার্শনিক উত্তরাধিকার: প্রাচীন উপনিষদ থেকে সুফি-বাউল সাধনা
নজরুলের এই সাম্যবাদের ধারণা শূন্য থেকে উদ্ভূত হয়নি। ভারতবর্ষের মৃত্তিকায় মানবতার যে বীজ প্রাচীন উপনিষদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের সন্ত ও সুফি সাধকদের মাধ্যমে প্রোথিত হয়েছিল, নজরুলের কণ্ঠে তারই চরম ও পরম স্ফুরণ ঘটে। প্রাচীন শাস্ত্রের ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ অর্থাৎ ‘আমিই ব্রহ্ম’ বা আমার মাঝেই স্রষ্টার বাস—এই দর্শনই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা রূপে আবর্তিত হয়েছে। চতুর্দশ শতকে মানবতাবাদী কবি চণ্ডীদাস গেয়েছিলেন, “শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।” পরবর্তীকালে বাংলার বাউল সাধক লালন সাঁই তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনায় জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে গেয়েছেন, “সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে…/ লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে।” এরপরে স্বামী বিবেকানন্দ বেদান্তের নির্যাস থেকে তুলে আনলেন সেই যুগান্তকারী সত্য, “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” কাজী নজরুল ইসলাম এই সুদীর্ঘ দার্শনিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করলেন তাঁর নিজস্ব বিদ্রোহী ও সাম্যবাদী চেতনায়। তবে পূর্বসূরিদের সঙ্গে নজরুলের একটি মৌলিক পার্থক্য ছিল। চণ্ডীদাসের কথায় ছিল নিবিড় প্রেম, বিবেকানন্দের বাণীতে ছিল আধ্যাত্মিক সেবা, কিন্তু নজরুলের কবিতায় ছিল এক জ্বলন্ত বিদ্রোহ ও শোষিতের অধিকার আদায়ের হুঙ্কার। তিনি কেবল মানুষকে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি বলে ক্ষান্ত হননি, তিনি সমাজকাঠামোর সেই গলিত রূপের মূলে আঘাত হেনেছেন, যা ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে চিরকাল অবদমিত করে রাখে।
ধর্মীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও প্রকৃত উপাসনালয়ের সন্ধান
মানুষ’ কবিতায় নজরুল এক তীক্ষ্ণ আখ্যানের অবতারণা করেছেন, যা আজও সমাজের প্রতিটি স্তরে সমভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম মানুষের মৌলিক চাহিদাকে অস্বীকার করে কেবল ইটের পর ইট সাজানো উপাসনালয়কেই সর্বস্ব জ্ঞান করে। স্রষ্টার নামে তৈরি মন্দির বা মসজিদে মানুষের প্রবেশাধিকার যখন তার সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে, তখন সেই উপাসনালয় তার পবিত্রতা হারায়। কবিতায় এক ক্ষুধার্ত মানুষের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। সে মন্দিরের পূজারীর কাছে গিয়ে খাবার চায়: “পূজারী দুয়ার খোল/ ক্ষুদার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হলো!” কিন্তু পূজারী যখন দেখল যে ভিখারিটি জীর্ণ, মলিন এবং ক্ষুধার্ত, তখন সে ভয়ে মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দেয়। একইভাবে মসজিদে এক ক্ষুধার্ত মুসাফির যখন মোল্লা সাহেবের কাছে রুটি চায়, মোল্লা তাকে প্রশ্ন করে, “নমাজ পড়িস বেটা?” মুসাফির ‘না’ বলায় তাকে ঈশ্বরের ঘর থেকে নিষ্ঠুরভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ক্ষুধার্ত, লাঞ্ছিত মানুষটির হাহাকারের মধ্য দিয়ে নজরুল এক চরম সত্যকে উন্মোচিত করেছেন: “হায় রে ভজনালয়,/ তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়!” এখানেই নজরুলের শ্রেষ্ঠত্ব। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, যে ধর্ম বা সমাজব্যবস্থা এক বেলার অন্ন থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে, সেই ধর্ম কখনও পরম করুণাময়ের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। মানুষের হৃদয়ই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ উপাসনালয়। “মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।” স্রষ্টাকে খুঁজতে কোনো তীর্থে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ মানুষের অন্তরের চেয়ে বড় কোনো তীর্থস্থান এই পৃথিবীতে নেই।
আন্তর্জাতিক সাম্যবাদ ও লাল ফৌজের অজানা ইতিহাস
নজরুলের সাম্যবাদী দর্শনের পূর্ণাঙ্গ রূপটি অনুধাবন করতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে ইতিহাসের এক ধূসর অধ্যায়ে, যেখানকার তথ্য আমাদের অবাক করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নজরুল উনপঞ্চাশতম বাঙালি সেনাদলের হাবিলদার হিসেবে অবিভক্ত ভারতের করাচির সেনাছাউনিতে নিযুক্ত ছিলেন। সেই সময় উনিশ শত সতেরো সালের রুশ বিপ্লবের ঢেউ সারা বিশ্বে আছড়ে পড়ছে। শোষিত শ্রমজীবী মানুষের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সেই ইতিহাস করাচির ব্যারাকে বসে তরুণ নজরুলের মনে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। নজরুল গোপনে জানতে পারেন যে, বিদেশি সেনাবাহিনীর কিছু ভারতীয় সেনা পালিয়ে গিয়ে শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক ‘লাল ফৌজ’-এ যোগ দিয়েছেন। এই ঘটনা তাঁকে এতটাই উদ্বেলিত করেছিল যে, তাঁর প্রারম্ভিক সাহিত্যকর্ম ‘ব্যথার দান’-এ তিনি সরাসরি লাল ফৌজের কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু বিদেশি শাসকদের গুপ্তচর বিভাগের কড়া নজরদারির হাত থেকে বাঁচার জন্য নজরুলের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা মুজাফফর আহমদ পত্রিকা প্রকাশের আগে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সেই শব্দটি পরিবর্তন করে দেন। নজরুলের এই সাম্যবাদ কোনো পুঁথিগত বিদ্যা ছিল না; এটি ছিল করাচির সেনাছাউনি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের বাস্তব অভিজ্ঞতায় পোড় খাওয়া এক নির্ভেজাল সত্য। তিনি কার্ল মার্ক্সের অর্থনৈতিক সাম্যবাদের সঙ্গে প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক মানবতাবাদের এক অপূর্ব সংশ্লেষ ঘটিয়েছিলেন, যা তাঁকে বিশ্বের অন্যান্য সাম্যবাদী কবিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও অনন্য এক উচ্চতায় স্থাপন করেছে।
সমকালীন বিশ্বে প্রাসঙ্গিকতা: বিভেদের প্রাচীর ও মানবতার সংকট
সেই উনিশ শত পঁচিশ সাল থেকে আজ আমরা চরম উৎকর্ষের এক যুগে উপনীত হয়েছি। বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি সমগ্র বিশ্বকে একটি অখণ্ড বিশ্বগ্রামে পরিণত করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সভ্যতার এই চরম শিখরে দাঁড়িয়েও আমরা মানসিকতার দিক থেকে সেই অন্ধকার যুগকেই যেন ধারণ করে আছি। আজকের বিশ্বে নজরুলের এই সাম্যবাদের গান আগের চেয়েও শতগুণ বেশি প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ধর্মের নামে হানাহানি, জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবাদ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের নগ্ন আস্ফালন। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে বর্ণবাদ, যুদ্ধ ও বৈষম্যের শিকার হওয়া মানুষের আর্তনাদ। রাষ্ট্রের সীমানা আর কাঁটাতারে আমরা আজ মানুষকে নির্মমভাবে খণ্ডিত করেছি। একদল মানুষ যখন সম্পদের পাহাড়ে বসে উদ্বৃত্ত খাদ্যের অপচয় করছে, তখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে লক্ষ লক্ষ শিশু অনাহারে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। এই চরম বৈষম্যের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পড়ি—“মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”, তখন তা আমাদের সভ্যতার ঘুমন্ত বিবেককে প্রচণ্ড আঘাত করে। আধুনিক সমাজকাঠামোতে যে কৃত্রিম বিভেদের প্রাচীর আমরা গড়ে তুলেছি, নজরুলের দর্শন সেই প্রাচীর ভেঙে ফেলার ডাক দেয়। একটি সত্যিকারের প্রগতিশীল ও বাসযোগ্য সমাজ কেবল তখনই গঠিত হতে পারে, যখন সেই সমাজের প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করবে যে মানবিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে আর কোনো পরিচয় নেই। সকল প্রকার খণ্ডিত পরিচয়ের বিলুপ্তি ঘটিয়ে যেদিন আমরা একে অপরকে কেবল ‘মানুষ’ হিসেবে আলিঙ্গন করতে পারব, সেদিনই সার্থক হবে আমাদের মানবজন্ম।
উপসংহার: মানবমুক্তির চিরন্তন ইশতেহার ও আগামীর পথনির্দেশ
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সৃজনশীল জীবনে যে সাম্যবাদের অগ্নিবীণা বাজিয়েছিলেন, তার ঝংকার যুগে যুগে শোষিত মানুষের মননে অনুরণিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। এই পঙ্ক্তিটি কেবল সাহিত্যের অমূল্য রত্ন নয়, এটি বিশ্বমানবতার এক শাশ্বত সংবিধান। সময়ের অমোঘ নিয়মে বহু সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে, সভ্যতার পরিবর্তন হয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন দর্শনের উদ্ভব ও বিলয় ঘটেছে। কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার যে চিরন্তন ধর্ম, তার কোনো বিকল্প আজও আবিষ্কৃত হয়নি এবং হবেও না। মহাকাল তার নিয়মে সবকিছু মুছে দিলেও নজরুলের এই সাম্যবাদী চেতনা কোনোদিন ম্লান হবে না। কারণ, যতদিন পৃথিবীতে একটি মানুষও বৈষম্যের শিকার হবে, যতদিন উপাসনালয়ের দরজা ক্ষুধার্তের মুখের ওপর বন্ধ হবে, ততদিন নজরুলের এই কবিতা অধিকার আদায়ের মন্ত্র হয়ে ধ্বনিত হবে। ভেদের মিথ্যা দেয়াল চিরতরে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে, সাম্য ও ভালোবাসার এক নতুন পৃথিবী গড়ার অবিচল স্বপ্নে আমরাও যেন নজরুলের সেই কালজয়ী কণ্ঠের সঙ্গে নিজেদের কণ্ঠ মিলিয়ে সগর্বে উচ্চারণ করতে পারি—
“তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখো নিজ প্রাণ!
তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,
তোমার হৃদয় বিশ্ব-দেউল সকলের দেবতার।”
নিজ প্রাণের এই অকৃত্রিম ও সাহসী উন্মোচন, অন্তরের বিশুদ্ধ আলোয় নিজেকে নতুনভাবে চেনা এবং অপরের প্রতি নিঃস্বার্থ, শর্তহীন ভালোবাসাই হোক আমাদের আগামী পৃথিবীর একমাত্র নির্ভরযোগ্য পাথেয়। সমস্ত বিভেদ ভুলে মানুষের জয়গান গাওয়াই হোক আমাদের চিরন্তন ধর্ম, কারণ সত্য, শিব ও সুন্দরের পথে মানুষের চেয়ে বড়ো এবং মানুষের চেয়ে মহীয়ান আর কিছুই হতে পারে না।






মন্তব্য করুন