গুচ্ছ কবিতা

কবি রেহানা বীথি। শব্দের ভেতর দিয়ে জীবনের অনুচ্চারিত কথাগুলো খুঁজে ফেরেন রেহানা বীথি। জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫। পেশায় আইনজীবী, আর লেখালেখি তাঁর অন্তর্গত এক নেশা, এ যেন তাঁর নীরব ও পরম সাশ্রয়।

২০১৬ থেকে গল্প ও কবিতার পথে তাঁর নিরন্তর যাত্রা। মানুষের সম্পর্ক, নিঃসঙ্গতা, অনুভব ও জীবনের অদৃশ্য ক্ষত তাঁর লেখার অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।
প্রকাশিত চার গ্রন্থের মধ্যে গল্পগ্রন্থ ‘আলো আসে ওখানেও’ ও ‘বৃত্তের নিশিচারণ’,
এবং কবিতাগ্রন্থ ‘শূন্যতায় ঈশ্বরের ঠোঁট’ ও ‘নীল আগুনে পুড়ে গেছে বিশটি আঙুল’ উল্লেখযোগ্য।
আইনের কঠিন বাস্তবতার পাশে তাঁর কবিতা রেখে যায় কোমল অথচ গভীর এক আলো; আর তাঁর গল্প, জীবনের বৃত্তে ঘুরতে ঘুরতে হারিয়ে যাওয়া মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

তাঁর শব্দ কখনও ক্ষতচিহ্নের মতো নীরব, কখনও অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলে ওঠা শিখা। জীবনের যে সত্য উচ্চারণে অসম্ভব, তাঁর সাহিত্য সেখানে হয়ে ওঠে এক অন্তর্গত স্বীকারোক্তি। আর সেই স্বীকারোক্তির ভেতরেই তিনি খুঁজে নেন মানুষ ও সময়ের অনিবার্য মুখোমুখি দাঁড়ানোর মুহূর্ত।

১.
ইন্দ্রজাল

পৃথিবীর জন্মলগ্নে
শুধু দুটো চোখ নিয়ে জন্মেছিলাম
অতঃপর অন্ধকার
অতঃপর বিহঙ্গ-স্বভাব...

শুধু চোখ নিয়েই
ঘুরে বেড়িয়েছি অন্ধকারময়,  বহুদিন
হাতের সংজ্ঞা না জেনেই স্পর্শ নিয়ে জেনেছি -
কখনও কখনও হাত মানে হাহাকার দ্বীপ
বিবিধ ঐদ্রজালিক প্রক্রিয়ায় আটকে যাওয়া পাখির ডানা

২.
বিহঙ্গ-বেদন

দরজা খুলি,  দেখি ভোরফুল
মনে হল - আমি যেন জেগেছি কেবল

এমনভাবে জেগেছি কি আগে কখনও? 
কিংবা ঘুমের মতো ঘুমাবো বলে পাহারা দিয়েছি রাত?

একটি দেহ দেখেছিলাম বোধহয়  তন্দ্রাবেলায় -
দেহ তো দেহ নয়
যেন কুরে কুরে খেয়েছে ঘুণপোকা
যেন সেই দেহ এক খেচরের বেশে
উড়ে উড়ে ঘুম খাচ্ছে সচিত্র আকাশে

আহা,  আহা...
কী এক নিদারুণ ঘুমহীন-দৃশ্য
কী এক নিদারুণ দেহ-দৃশ্য
কী এক ক্ষুধাপূর্ণ ক্ষয়!

ঈশ্বরের পইথানে তবু মাথা খুঁটে মরে রোজ 
জীবন জীবিকা এবং কামাতুর ব্যাধী
বলে - চিরসখা হে
বিপন্ন মাথার চারপাশে
বৃত্তাকারে উড়িয়ে দাও মেরুন প্রজাপতি
দেখি,  দেখি,  শুধু দু'চোখ ভরে দেখি...


৩.
মধুনাম এবং নিশ্চুপ পাখি

ও-আমাকে ডেকেছিল
আমি বলেছি -
ক্রমশ কণ্ঠ রোধ হয়ে আসছে
হাঁটার গতিও ধীর 
দৃষ্টিবিভ্রম নাকি কুয়াশা ছেয়েছে চারপাশে
ঠাওর করতে কেটে যাচ্ছে দীর্ঘসময়

ও-বলল -
তবে যে পদ্ম ফুটছে দেখলে
আর গুনগুন করে কী যেন গাইলে

বললাম -
নিজের ভেতর কতকিছু ঘটে যায়, যাচ্ছে...
গাইছি
বিমর্ষ হচ্ছি বিমূর্ত ভাবনায়
পদ্ম ফোটার শব্দে ছুটে যাচ্ছি...

কিন্তু,  কারও ঘুমে তো আঘাত করছি না
কেড়েও নিচ্ছি না কারও রঙিন সীমানা... 

৪.
একটি রূপকথা

শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গিয়েছিল মাঘ মাস
তারপর থেকে আমি স্থির

খুব সম্ভবত তোমরা হল্লাগাড়ি চেপে
ছুটে যাচ্ছ কোনো সবুজ বাংলোয়
আনন্দরাত কাটাবে?
বেশ...

স্থির আমি
আমাকে ঘিরে থাকা কুয়াশাদের সরাতে পারছি না বলে
দৃশ্যের বাইরে ঘটে যাচ্ছে কতকিছু!

আমি কিন্তু ক্রমশ
রূপান্তরিত হচ্ছি পাথরে...

৫.
নিমজ্জিত হতে হতে

এবং আমি ক্রমশ
অন্ধকারের গর্ভে ঢুকে যাচ্ছি
আর ভাবছি তুমি ঘুমোচ্ছ

এভাবে ভাবতে
তুমিই আমাকে শিখিয়েছো,  প্রিয়...
বলে দিয়েছো - এই একটি ফুলই
উৎসর্গ করতে পারো ঈশ্বরের পায়ে
অথচ ফুলটি আমাকে দেখাওনি কখনও

কেমন যেন এলোমেলো সব
অন্ধকারে সাদা-কালো টি-শার্ট
আমার পরনে খয়েরি শাড়ি
খুঁজছি ফুল, নীল নীল মেঘবাড়ি...

ঘুমোচ্ছ?
অন্ধকার যে মুচড়ে উঠছে
আর আমি, আমরা তলিয়ে যাচ্ছি
গর্ভ থেকে আরও আরও গভীরে...

Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

2 responses to “রেহানা বীথি”

  1. কুয়াশা, অন্ধকার, পাথর ও গর্ভের প্রতীকে কবিতাগুলো এক গভীর অস্তিত্বসংকট ও আত্মরূপান্তরের অনুভূতি নির্মাণ করেছে।
    প্রেম, অনুপস্থিতি ও অপেক্ষা এখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ছাড়িয়ে এক অনির্দিষ্ট শূন্যতার দিকে তলিয়ে যাওয়ার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
    সব মিলিয়ে, এগুলো দৃশ্যের আড়ালে ঘটে যাওয়া এক অন্তর্গত বিপর্যয়ের কাব্যিক দলিল—যেখানে মানুষ ক্রমশ নিজেরই অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।

  2. মুগ্ধতা কবি। অভিনন্দন

মন্তব্য করুন

Trending