স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা কবিতার দীর্ঘ পরিসরে প্রবালকুমার বসু একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর কবিতার জগৎ একই সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের অন্তর্লোক, নাগরিক জীবন, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সময়ের পরিবর্তন এবং বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আরেক বাস্তবতার অনুসন্ধানে নির্মিত। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি কবিতার পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, কাব্যনাট্য, অণু-নাটক, অনুবাদ ও সম্পাদনার ক্ষেত্রেও সক্রিয় থেকেছেন। ফলে তাঁকে কেবল একজন কবি হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টিশীল পরিসরের সম্পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না।

১৯৬০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন প্রবালকুমার বসু। আশির দশকের শুরুতে তাঁর কবিতার প্রকাশনা শুরু। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ তুমিই প্রথম তাঁকে বাংলা কবিতার পরিসরে স্বতন্ত্রভাবে পরিচিত করে এবং গ্রন্থটির জন্য তিনি লাভ করেন গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য স্মৃতি পুরস্কার। এরপর কয়েক দশক ধরে তাঁর কবিতার পথ বিস্তৃত হয়েছে নানা বিষয়, অভিজ্ঞতা ও ভাষাভঙ্গির মধ্য দিয়ে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত স্মৃতিস্তম্ভের পাশে, স্থায়ী আবাস অস্থায়ী ঠিকানা, জন্মবীজ, যাপনচিত্র, ঈশ্বরের মুখ, যেমন করে গাইছে আকাশ, মনোবাঞ্ছা এক বিন্দু জল, কোথা থেকে শুরু করব, আপনাকেই ঠিক করতে হবে গন্তব্য, নির্বাচিত দূরত্ব মেনে, এই যে আমি চলেছি, ভেবেছি এমনই ভাবে হয় এবং নভেম্বরের কবিতা প্রভৃতি। তাঁর কাব্যচর্চার বিস্তার ও বৈচিত্র্য থেকেই বোঝা যায়, তিনি কোনো একটি নির্দিষ্ট কাব্যভঙ্গিতে নিজেকে স্থির রাখেননি; বরং সময়ের সঙ্গে নিজের কবিতার ভাষা ও দৃষ্টিকে পরিবর্তিত ও পরিণত করেছেন।

২০০৫ সালে যেমন করে গাইছে আকাশ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষার গণ্ডি অতিক্রম করেও বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইংরেজিতে তাঁর একাধিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে—Of Lonely Rocks and Upright Trees, All About Umbrellas, As I Wander Along, A Fish without a Bicycle এবং In Search of Silence উল্লেখযোগ্য। তাঁর কবিতা জাপানি, আরবি, স্প্যানিশ, লিথুয়ানীয়সহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে; মেক্সিকো থেকেও স্প্যানিশ ভাষায় তাঁর কবিতার গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলা কবিতার সঙ্গে বিশ্বের কবিতার একটি সেতুবন্ধন তৈরির ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের বাংলা কবিতার ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে সম্পাদিত Signposts: Bengali Poetry Since Independence সেই প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। নিজের কবিতার পাশাপাশি অন্য কবিদের কবিতাকে বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াস তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

প্রবালকুমার বসুর কবিতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত তাঁর দেখার ভঙ্গি। তিনি খুব পরিচিত জীবন, মানুষ ও সম্পর্কের মধ্য থেকেই এমন কিছু তুলে আনেন, যা প্রথম দৃষ্টিতে আমাদের চোখে পড়ে না। তাঁর কবিতায় বাস্তবতা কখনো নিছক বাস্তব থাকে না; তার ভিতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে সংশয়, অস্বস্তি, রহস্য এবং কখনো পরাবাস্তবতার এক অদ্ভুত আবহ।
তাঁর কবিতার ভাষা তাই সংযত, কথোপকথনের কাছাকাছি, অথচ তার ভিতরে থাকে বহুস্তরীয় অর্থ। তিনি জটিল অনুভূতিকে জটিল অলংকারে ঢেকে রাখেন না; বরং সাধারণ দৃশ্য ও পরিচিত শব্দের ভিতর থেকেই তৈরি করেন অস্বাভাবিক এক প্রশ্ন। এই সংযম তাঁর কবিতার অন্যতম শক্তি।

কবিতার বাইরে প্রবালকুমার বসুর সাহিত্যকর্ম শুধু কবিতায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর গল্পগ্রন্থের মধ্যে মহাভোজ ও আমার সময় আমার গল্প উল্লেখযোগ্য। প্রবন্ধ, কাব্যনাট্য ও অণু-নাটকের ক্ষেত্রেও তাঁর কাজ রয়েছে। নাট্যচর্চা ও সাহিত্যসম্পাদনার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। যাপনচিত্র পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গেও তিনি দীর্ঘদিন যুক্ত।

সাহিত্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য-সংযোগেও তাঁর সক্রিয়তা রয়েছে। ভারত ও বিদেশের বিভিন্ন সাহিত্য-অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি কবিতা পাঠ করেছেন। ২০১৭ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের Writers and Artists in Residence Programme-এ আমন্ত্রিত হয়ে দুই সপ্তাহের আবাসিক সাহিত্যিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ তাঁর সাহিত্যজীবনের উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতিগুলোর একটি।

পেশাগত জীবনেও তিনি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল পদে কাজ করেছেন। এই বহুমাত্রিক জীবন-অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতার জগৎকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করেছে, কারণ তাঁর কবিতায় কেবল কবির কল্পনা নয়, একজন কর্মজীবী মানুষের দেখা সমাজ, সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠান, শহর এবং পরিবর্তিত সময়ও উপস্থিত।

বাংলা কবিতায় প্রবালকুমার বসুর অবস্থান বলতে প্রবালকুমার বসুর কবিতাকে কোনো একটি সহজ অভিধায় আবদ্ধ করা কঠিন। তিনি একদিকে নাগরিক জীবনের কবি, অন্যদিকে ব্যক্তিমানুষের অন্তর্গত সংশয়ের কবি; তিনি বাস্তবতার কবি, আবার সেই বাস্তবতার ভিতর লুকিয়ে থাকা পরাবাস্তবতারও অনুসন্ধানী। তাঁর কবিতায় প্রেম আছে, কিন্তু তা কেবল রোমান্টিক নয়; সমাজ আছে, কিন্তু তা স্লোগানে পরিণত হয় না; আত্মজিজ্ঞাসা আছে, কিন্তু তা আত্মমগ্নতায় আটকে থাকে না।
সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর কবিতায় নিশ্চিততার চেয়ে অনুসন্ধান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পাঠককে কোনো সহজ উত্তর দিয়ে বিদায় করেন না। বরং একটি পরিচিত দৃশ্যকে এমনভাবে সামনে আনেন যে পাঠক নিজেই নিজের দেখা, নিজের সম্পর্ক এবং নিজের বিশ্বাসকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হন।

এই কারণেই বাংলা কবিতার দীর্ঘ যাত্রায় প্রবালকুমার বসুর কবিতা একটি নিজস্ব স্বর তৈরি করেছে। তাঁর কবিতার পৃথিবী আমাদের চেনা পৃথিবী, কিন্তু কবিতার ভিতর দিয়ে সেই পৃথিবীকে দেখলে সেখানে আরেকটি পৃথিবী আবিষ্কৃত হয়। দৃশ্যমানের পাশে অদৃশ্য, বাস্তবের পাশে পরাবাস্তব, বলা কথার পাশে না-বলা কথা—এই দ্বৈততার মধ্যেই তাঁর কবিতার নিজস্ব আলো।

আর সেই আলোই তাঁকে সমকালীন বাংলা কবিতার এক স্বতন্ত্র, অনুসন্ধিৎসু ও গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ফারুক আহমেদ রনি

সম্পাদক , শিকড়।


শিকড়ের পাঠকের জন্য কবি প্রবালকুমার বসু-এর  একগুচ্ছ কবিতা


যে ছায়ার বিষয়ে সুতনু কিছু জানে না

সুতনুর সঙ্গে আমার কোনো সমস্যা নেই
কিন্তু ওর ছায়া দেখলে আমার শিরঃপীড়া শুরু হয়
লম্বাটে অভিব্যক্তিহীন একটা ছায়া
মাঝে মধ্যেই ঢুকে পড়ে সুতনু আর আমার মধ্যে
আমাদের গল্পে, আলোচনায়, তর্কে অংশগ্রহণ করে
পক্ষ নেয়, কখনো আমার কখনো সুতনুর
ফলে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়
যাতে বেঁফাস কিছু না বলে ফেলি

একদিন ছায়াটাকে দেখেছি অফিসে বসের সঙ্গে কথা বলছে
একদিন আমার স্ত্রীর সঙ্গে
দুদিনই আমাকে দেখে দ্রুত সরে যায়
আমাকে অনুসরণ করতে করতে
একদিন অমৃতাদের বাড়ি অবধি চলে এসেছিল

সুতনুকে জিজ্ঞাসা করে দেখেছি
ও এসবের কিছুই জানে না

এক এক সময় এরকম হয়
মাথাব্যাথার কারণ হয়ে ওঠে কারো কারো ছায়া
অথচ দেখেছি যাঁর ছায়া
তিনি এ বিষয়ে প্রায় কিছুই জানেন না


নির্বিকল্প

যে লেখা নিজের নয়, সেই লেখা প্রতিদিন লিখি
কার লেখা, কেন লিখি? প্রত্যহ ভোরের কিছু আগে
নির্দেশ পাঠায় কেউ, শূন্য থেকে গ্রহ তারা যত
ধেয়ে আসে বলে লেখ, আমার কি আছে কোনও ভাষার সম্ভার
সঞ্চয় বলতে শুধু শূন্যতা বিষাদ ভরা, ক্রমাগত অপসৃয়মান
নিরীহ আলোক রেখা, অন্ধকার অনতি দূরের
উপরন্তু সংগ্রহ করা উপাদান ভাষা শব্দ ধ্বনি
নদী থেকে নিয়ে লিখি, অরণ্য পাহাড় থেকে, সমুদ্রের বিবমিষা থেকে
যে লেখা সকলে পড়ে, সে লেখা নিজের কিন্তু নয়

যে লেখা নিজের নয়, প্রতিদিন সেই লেখা লিখে
নিয়ত সন্ধান করি ভাষা, শব্দ নিজ উচ্চারণ
ঋণ যত জমা হল শোধ করে দেব ঠিক হয়তো অসময়েই


খোঁজ

যতটা লিখেছি, মনে হয়
আরো একটু লিখলে হত

যতটা লিখেছি, মনে হয়
পুরোটা বলতে পারিনি
যা বলতে চাই

যতটা লিখেছি এর কোনোটাই
আসলে নিজের কথা নয়

যাদের কথা লিখেছি
তাদের ভালো করে চিনিই না

কোথাও কিছু না বলা কথা রয়ে গেছে
আমি কি জানি সেই কথাগুলো?

সেই কথাগুলো খুঁজতে গিয়েই তো
এই লেখালিখি, ক্রমাগত এই লেখালিখি


কী যেন বলব বলে

কী যেন বলব বলে প্রত্যহ তোমার কাছে আসি
তুমি কি তা টের পাও? কেন এই আসার অছিলা
নাকি ভাবো অহেতুক এই আসা, বলার যদি বা কিছু থাকে
শোনার আগ্রহ নেই, নেই কোনো অন্বেষণ স্পৃহা
এই নিস্পৃহতা থেকে অপরাধবোধ উঠে আসে
কী যেন বলব বলে প্রত্যহ তোমার কাছে আসি
কিছুই হয় না বলা, আবার আসব বলে দ্রুত সরে যাই
বৃষ্টির ঠিক আগে হাওয়া দিলে যেইভাবে সহসাই তাপমাত্রা কমে


দাম্পত্য ও রাজনীতি

তোমার শোবার ঘরে আমি ঢুকে পড়েছিলাম কিছু না বলেই
তোমার শোবার ঘরে সেই যে আলো নিভে গিয়েছিল
তা আবার জ্বলেছিল অনেক অনেক বছর পর
ততদিনে তিনবার বাড়ি পাল্টেছ
তোমার ধর্ম পাল্টে গিয়েছে, বিশ্বাস পাল্টে গিয়েছে
কিন্তু কখনোই আমাকে ঘর ছেড়ে যেতে বলনি

তোমার শোবার ঘর থেকে একদিন চলে গিয়েছিলে কিছু না বলেই
সেবারো আলো নিভে গিয়েছিল
যা আবার জ্বলে উঠতে সময় লেগেছিল অনেক অনেক বছর
ততদিনে অনেক কিছু বদলে গিয়েছে
জায়গা বদল করে জানলাগুলো দরজায়
আর দরজা জানলার খাপে মানিয়ে নিয়েছে নিজেদের
অতটা মানাতে পারব না জেনেই কি
একদিন কিছু না বলে চলে গিয়েছিলে?


দেখা

কাছ থেকে দেখলে একরকম
দূর থেকে দেখলে আর এক

ব্যালকনি থেকে দেখলে একরকম
চিলেকোঠা থেকে দেখলে আর এক

পাড়ার গলিতে দেখলে একরকম
হাইওয়েতে আর এক

গাড়ি থেকে দেখলে একরকম
বাস থেকে দেখলে আর এক

পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে দেখলে একরকম
সমুদ্র সৈকতে আর এক

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দেখা হলে একরকম
তুষারপাতে আর এক

এতবার এতভাবে দেখা হয়
তবু নিশ্চিত হতে পারি না
সত্যি কি তোমাকে দেখি
কোন দেখাটা সঠিক?

অথচ প্রতিকটা দেখাই আমার এত প্রিয়।


অন্ধ বিশ্বাসের মত

জল কি বৃত্ত মানে, জল কি সরল রেখা বোঝে
কী এমন অজুহাতে জলকে শিখন্ডি মনে করে
জলের আকার পেতে ক্রমাগত নিজে একা ভাঙো?

তাতেই যা কিছু ক্রুটি, জলের শৃঙ্খল খুঁজে খুঁজে 
দেখেছো ভাঙাই ধর্ম, ভোররাতে জল ভাঙে, পাড় ভাঙে
স্ফীত জল নিরুপায় ভেঙে ফেলে শৃঙ্খল পরিধি

জলের কাছেই তবু ঘুরে ফিরে বারবার কীসের উদ্দেশে
জলের ধর্মের খোঁজে সরল রেখার সূত্রে বৃত্ত করেছ নির্মাণ
অন্ধ বিশ্বাসের মত অনিবার্য জলের এই ধর্ম অকারণ এখনো ভাবায়?


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মন্তব্য করুন

Trending