যখন উদাস দুপুরে সোনালী ডানার চিল পার হয়ে যায় জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার সবুজ করুণ ডাঙা। কিংবা যখন দেখি নক্ষত্রময় স্তব্ধ এক নি:সঙ্গ আকাশ! তখন যাকে মনে পড়ে তিনি সকলের কাছে পরিচিত রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ।
যদিও কাব্যের প্রতিটি পরতে পরতে যিনি ছাপ রেখে গেছেন স্বপ্ন আর বাস্তবতার ঘোর।তাঁর কবিতাকে অনেক সময়ই সাহিত্যে surrealism বা পরাবাস্তববাদী লেখা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জীবনের গহীনে যে অন্তহীণতা যেখানে রয়েছে প্রগাঢ় অন্ধকার সেই অচেনা অন্ধকারকে কবি তুলে এনেছেন পরাবস্তবতার আদলে। জীবনানন্দ দাশ তাই কখনো কখনো দুর্বোধ্য এক অস্পষ্টতার নাম।
একটা প্রচ্ছায়া, কিংবা মনের এমন একটা অবস্থা যা ধরা যায়না ছোঁয়া যায় না শুধু চতুর আলোর মতো পিছলে পিছলে যায় হৃদয়ে বিষণ্ণতার ছাপ ফেলে। তাঁর এই মায়াবী কুয়াশা, এই ধূসরতা পাঠককে বিভ্রান্ত করে দেয়, বিষাদ ক্লিষ্ট করে দেয়।এই পারঙ্গমতায় কবি জীবনানন্দ দাশ তুঙ্গে আরোহী। আসলে প্রকৃতি প্রেম বিরহ প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির মিশেলে এক দ্বৈততার নাম জীবনানন্দ দাশ। একদিকে তাঁর নিত্য কোলাহলের দাম্পত্য অন্যদিকে অধরা প্রেমের এক অসম্পূর্ণতা তাঁকে টেনে নিয়ে গেছে বিষাদের গুপ্ত কুঠুরিতে।তিনি লিখলেন,’ যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ, মরিবার হল তার সাধ।’
তবুও জীবন থেকে প্রেমকে নির্বাসনে পাঠাননি, আবার আঁকড়ে ও ধরেননি বা ধরতে চাননি বুঝি! পথের দুটো দিকে দাঁড়িয়েই তিনি বুকের ভেতর বিদর্ভ নগরীর দীর্ঘশ্বাস শ্রবণ করেন, মনো কথনে মাতেন বনলতা সেনের সাথে।
প্রেমিকা শোভনা ঘুরে ফিরে বারবার কলমে চলে আসেন জীবন থেকে। পাওয়া না পাওয়ার দোলাচালে বিষণ্ণতা ঘিরে ধরে মনোজগৎ। কবিতায় সেই দু:খবোধ প্রকাশিত হয়, আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি!
জীবনানন্দ দাশ খুব কাছের থেকে দেখেছেন শহুরে মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপন। দেখেছেন দারিদ্র্য দুর্দশা আর হতাশাগ্রস্ত মানুষের কোলাহল। অন্যদিকে হৃদয় জুড়ে ছিল গ্রামীণ জীবনের কোমলতা, প্রকৃতির মায়াময় পরিবেশের ছাপ।তাই সমাজ সংসার নিয়ে বীতশ্রদ্ধ একজন মানুষ আশ্রয় খুঁজেছিলেন হিজলের ছায়ায় নেমে আসা গাঢ় সন্ধ্যার কাছে। নিজেকে আবৃত করতে চেয়েছেন দূরের ছায়া ছায়া কুয়াশার চাদরে।
বাংলার প্রকৃতি তাঁর সৃষ্টিকর্মে একাকার হয়ে তৈরি করেছে একটি চিরকালীন কল্পলোক, যা অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে গেলেও জীবনানন্দের কবিতায় বেঁচে থাকবে চিরকাল। তিনি শঙ্খচিলে বেশে নয়তো হাঁস হয়ে কুয়াশার বুকে ভেসে ভেসে এই বাংলায়ই ফিরে ফিরে আসতে চেয়েছেন আবার।
এমনকি জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ বাংলা কবিতায় মানুষের অস্তিত্বসংকট ও অন্তর্লীন বেদনার এক অনন্য দলিল। এখানে মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, জীবনেরই এক অমোঘ, অন্ধকার প্রতিচ্ছবি।
কবির উচ্চারণে ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা অতিক্রম করে ধরা পড়ে সমগ্র মানবসত্তার বিপন্নতা।
“তবুও তো পেঁচা জাগে”, এই পঙ্ক্তিতে রাত্রির গভীরেও টিকে থাকে জীবনের রহস্যময় স্পন্দন।
নৈঃশব্দ্য, স্মৃতি ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে কবি আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করান অস্তিত্বের কঠিন প্রশ্নগুলোর।
সময়ের ব্যবধান পেরিয়েও তাঁর কবিতা আমাদের বিবেক, অনুভব ও আত্মজিজ্ঞাসাকে আলোড়িত করে। কারণ জীবনানন্দের অন্ধকার নিছক হতাশা নয়, তা মানুষের অন্তর্জগতকে চিনে নেওয়ার এক গভীর অন্বেষা।
আজ রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের প্রয়াণ দিনে শ্রদ্ধাভরে তাঁকে স্মরণ করছি। কবির শ্রীচরণে পুস্পাঞ্জলি অর্পণ করে নিবেদন করছি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
সাদিয়া নাজিব
সহ সম্পাদক, শিকড়





মন্তব্য করুন