মিলটন রহমান


মিলটন রহমান- কবি, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক।
বাংলা কবিতার সমকালীন পরিসরে মিলটন রহমান এমন এক সাহিত্যসত্তা, যাঁর লেখকজীবন কবিতা, কথাসাহিত্য, সাংবাদিকতা ও গবেষণার বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। বাংলাদেশ থেকে লন্ডন, এই স্থানান্তরের পরিবর্তন তাঁর সাহিত্যিক পরিসরকে যেমন বিস্তৃত করেছে, তেমনি বাংলা ভাষা ও বিশ্বসাহিত্যের মধ্যে সংলাপের নতুন সম্ভাবনাও উন্মোচন করেছে।
নব্বইয়ের দশকে বাংলা সাহিত্যের যে প্রজন্ম নিজস্ব ভাষাভঙ্গি, বিষয়বৈচিত্র্য ও সময়-অন্বেষণের মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছিল, মিলটন রহমান সেই সময়ের আলোচিত কবি ও গল্পকারদের একজন। তাঁর সাহিত্যযাত্রার সূচনা গল্পলেখার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ক্রমে কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও গবেষণায় বিস্তৃত হয়েছে তাঁর সৃজনশীল অভিযাত্রা। এই বহুমুখিতা কেবল বিষয় পরিবর্তনের পরিচয় নয়; বরং সাহিত্যকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার এবং প্রকাশ করার একটি নিরন্তর প্রয়াস।
তাঁর প্রথম দিকের কথাসাহিত্যগ্রন্থ ব্রুটাস পর্ব ও কর্তার শারীরিক অবনতি (২০০২) লেখক হিসেবে তাঁর প্রাথমিক পরিচয়ের সাক্ষ্য বহন করে। পরবর্তী সময়ে চূর্ণকাল (২০১০), নিঃসঙ্গ (২০১২), নকশাপুরাণ (২০১৫), ভবদীয় পাখোয়াজ, স্নোড্রপ চুম্বনেরা ও চূর্ণপক্ষ তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের বিভিন্ন দিককে সামনে নিয়ে আসে। কবিতা ও গল্পের পাশাপাশি তাঁর প্রবন্ধ এবং গবেষণাগ্রন্থও লেখকসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একজন সাহিত্যিকের বহুমুখিতা তখনই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন প্রতিটি মাধ্যম তাঁর অভিজ্ঞতার পৃথক স্তরকে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। মিলটন রহমানের গ্রন্থসম্ভার সেই বহুমাত্রিকতার একটি প্রাথমিক মানচিত্র নির্মাণ করে। তাঁর রচনার সামগ্রিক মূল্যায়নে তাই কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও গবেষক—এই পরিচয়গুলোকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
মিলটন রহমানের কাব্যভুবন নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে প্রথমেই আসে তাঁর কাব্যভাষার স্বাতন্ত্র্য এবং জীবনকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন। কবিতা শুধু অনুভূতির সরল বিবরণ নয়; অনুভূতিকে এমন এক শিল্পরূপে রূপান্তর করা, যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অতিক্রম করে পাঠকের নিজস্ব জীবনবোধের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হয়। এই রূপান্তরেই কবির শিল্পসত্তার পরিচয়।

অবশ্য গ্রন্থনাম থেকে কবির সমগ্র কাব্যদর্শন নির্ধারণ করা যায় না। এগুলো তাঁর কবিতার সম্ভাব্য পাঠদ্বার। সম্পূর্ণ মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন কবিতার পঙ্‌ক্তি, চিত্রকল্প, ছন্দ, শব্দপ্রয়োগ ও অন্তর্নিহিত বক্তব্যের নিবিড় পাঠ। তবু শিরোনামগুলোর মধ্য দিয়ে যে ভাঙন, নিঃসঙ্গতা, অনুভূতি ও অস্তিত্বের প্রশ্ন উঁকি দেয়, তা তাঁর কবিতার দিকে অনুসন্ধিৎসু পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
তাঁর কাব্যকলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভাষার নিজস্বতা। কবি যখন প্রচলিত অভিব্যক্তির বাইরে গিয়ে শব্দের নতুন সম্পর্ক তৈরি করেন, তখনই তাঁর ভাষা স্বতন্ত্র হয়ে ওঠার সুযোগ পায়। মিলটন রহমানের কবিতা নিয়ে প্রকাশিত সমালোচনাতেও তাঁর ভাষা ও ভাবনার নবীনতার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। সমালোচক মলয় দত্ত তাঁর নিঃসঙ্গ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনায় কবির নিজস্ব কাব্যভাষা, বিষয়বস্তুর সহজবোধ্যতা এবং বাস্তব ও কল্পনার মিশ্রণের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন।

আধুনিক কবিতার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিমানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর সময় ও সমাজকে আবিষ্কার করা। এখানে ব্যক্তিগত বিষাদ কেবল ব্যক্তিগত থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি প্রজন্মের সংকট, একটি সমাজের পরিবর্তন কিংবা সভ্যতার অন্তর্গত অস্থিরতার প্রতীক। মিলটন রহমানের কাব্যগ্রন্থগুলোর নাম ও তাঁর সাহিত্যচর্চার বিস্তৃতি বিবেচনায় তাঁর কবিতাকে এই বৃহত্তর আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে পাঠ করার সুযোগ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভাঙন, স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত, ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে সমাজের দূরত্ব এবং পরিচিত পৃথিবীর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা। আধুনিক কবি এই অভিজ্ঞতাগুলোকে কেবল বর্ণনা করেন না; শব্দ, প্রতীক ও চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে তাদের অর্থ অনুসন্ধান করেন।
তবে মিলটন রহমানের কবিতাকে কেবল নিঃসঙ্গতা বা ভাঙনের কবিতা হিসেবে চিহ্নিত করা যথেষ্ট হবে না। তাঁর সমগ্র কাব্যজগতের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য প্রেম, প্রকৃতি, স্মৃতি, অস্তিত্ব, সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিমানুষের আত্মজিজ্ঞাসার মতো বিষয়গুলোও পৃথকভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কবির স্বাতন্ত্র্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তাঁর বিষয় নির্বাচনের চেয়ে সেই বিষয়কে উপলব্ধি ও প্রকাশ করার নিজস্ব পদ্ধতিতে।

মিলটন রহমানের সাহিত্যিক পরিচয় নির্মাণে সাংবাদিকতার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সাংবাদিকতা শুরু করে তিনি দৈনিক আজাদী, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, দৈনিক রূপালী, দৈনিক মুক্তকণ্ঠ, দৈনিক আজকের কাগজ ও দৈনিক ভোরের কাগজসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ে লন্ডনে এসেও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। বাংলা টিভিতে বার্তাপ্রধানের দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে চ্যানেল এস-এ বার্তাপ্রধান হিসেবে কর্মরত। সাংবাদিকতা মানুষকে প্রতিদিনের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। সংবাদ, ঘটনা, ক্ষমতা, সংঘাত ও সাধারণ মানুষের জীবন, সবকিছুর মধ্য দিয়ে সাংবাদিকের অভিজ্ঞতার পরিসর বিস্তৃত হয়। অন্যদিকে সাহিত্য সেই অভিজ্ঞতার অন্তর্গত অর্থ, মনস্তত্ত্ব ও মানবিক অভিঘাতকে অনুসন্ধান করে। দুটি ক্ষেত্রের পদ্ধতি এক নয়, কিন্তু মানুষের জীবনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে তাদের একটি মৌলিক সাদৃশ্য রয়েছে।
মিলটন রহমানের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার এই সহাবস্থান তাঁর বহুমুখী পরিচয়কে ব্যাখ্যা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। সাংবাদিকতার বাস্তববোধ এবং সাহিত্যের কল্পনাশক্তি পরস্পরকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করে। বিশেষত কথাসাহিত্যে সমকালীন সমাজ ও মানুষের জীবনকে ধারণ করার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।

২০০৬ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে আগমন মিলটন রহমানের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস থেকে এমবিএ সম্পন্ন করার পাশাপাশি তিনি প্রবাসে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন। ২০০৭ সাল থেকে ব্রিটিশ ন্যাশনাল পোয়েট্রি লাইব্রেরির সঙ্গে গবেষণায় যুক্ত হওয়া এবং গ্রিনউইচ ইউনিভার্সিটি, কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি ও Exiled Writers Ink-এর সঙ্গে কবিতাবিষয়ক কাজ তাঁর সাহিত্যিক পরিসরকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বর্তমানে তিনি ব্রিটিশ বাইলিঙ্গুয়াল পোয়েট্রি কালেক্টিভের (BBPC)আবাসিক কবি হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য বহুভাষিক কবিতার মাধ্যমে ব্যক্তিগত প্রকাশ, সাংস্কৃতিক সংযোগ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া।

এই পরিসরে বাংলা ভাষায় কবিতা লেখা মানে কেবল মাতৃভাষার চর্চা নয়; বরং বহুভাষিক সমাজে নিজের ভাষা ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর পাঠকসমাজের সামনে উপস্থিত করা। প্রবাসী কবির অভিজ্ঞতায় জন্মভূমির স্মৃতি এবং নতুন ভূগোলের বাস্তবতা প্রায়ই পাশাপাশি অবস্থান করে। পরিচিত ভাষার ভেতরেও তখন নতুন অর্থ তৈরি হয়; অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে নিজের সাহিত্যিক ঐতিহ্যকেও নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ জন্মায়।

মিলটন রহমানের কবিতা ২০১৭ সালে প্রকাশিত British Bangladeshi Poetry Collective Anthology-তে স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি লন্ডনের পিয়ার গ্যালারি থেকে প্রকাশিত স্টিফেন ওয়াটস সম্পাদিত Swirl of Words নামের ৯৪ ভাষার কাব্যসংকলনেও তাঁর কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই অংশগ্রহণ তাঁর কবিতার বহুভাষিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরের সঙ্গে সংযোগের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

লিটলম্যাগ বা ছোটকাগজের ইতিহাস আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক রুচি ও প্রকাশব্যবস্থার বাইরে নতুন লেখক, নতুন ভাষা, নতুন নন্দনতত্ত্ব এবং বিকল্প চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে ছোটকাগজ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। বহু সাহিত্য আন্দোলনের প্রাথমিক প্রকাশভূমি হিসেবে ছোটকাগজ সাহিত্যের প্রচলিত কাঠামোকে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করেছে।
ইউরোপের বিশ শতকের লিটলম্যাগ আন্দোলন নিয়ে বাংলায় গবেষণা করার তাৎপর্য এখানেই যে, এটি বাংলা ভাষার পাঠককে আন্তর্জাতিক সাহিত্য-ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দেয়। গবেষক হিসেবে মিলটন রহমানের এই প্রয়াস তাঁর সৃজনশীল লেখকসত্তার পাশাপাশি সাহিত্য-ইতিহাসের প্রতিও আগ্রহের পরিচয় বহন করে।
তাঁর কবি শহীদ কাদরী ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০১৭) গ্রন্থেও বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন লেখককে নিয়ে আলোচনার পরিসর রয়েছে। গ্রন্থটির প্রকাশনা-পরিচিতিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হুমায়ুন আজাদ, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, টেড হিউজ ও সিলভিয়া প্লাথের মতো লেখকদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তাঁর সাহিত্যচর্চায় দেশীয় সাহিত্য-ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধের পাশাপাশি অবস্থানের একটি পরিচয় পাওয়া যায়।

মিলটন রহমানের প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা বারো। কবিতার পাশাপাশি তাঁর কথাসাহিত্য ও গবেষণার ক্ষেত্রও বিস্তৃত। নকশাপুরাণ (২০১৫) ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প (২০১৯) তাঁর গল্পকার পরিচয়কে সামনে আনে। অগ্নি সারসেরা (২০২২) তাঁর উপন্যাসচর্চার পরিচায়ক। অন্যদিকে মাতালগন্ধ (২০২৪) প্রবন্ধকার হিসেবে তাঁর সাহিত্যিক পরিসরের আরেকটি সংযোজন।
এই বৈচিত্র্য তাঁর সাহিত্যজীবনকে একটি মাত্র পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না। কবিতায় ভাষা ও অনুভূতির অনুসন্ধান, গল্পে মানুষ ও বাস্তবতার বিন্যাস, উপন্যাসে বৃহত্তর আখ্যান নির্মাণ এবং গবেষণায় সাহিত্য-ইতিহাসের অনুসন্ধান—এসবের সম্মিলনে তাঁর লেখকসত্তা ক্রমাগত বিস্তৃত হয়েছে।

মিলটন রহমানকে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁকে শুধু নব্বইয়ের দশকের একজন কবি বা গল্পকার হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় গড়ে উঠেছে কবিতা, কথাসাহিত্য, সাংবাদিকতা, গবেষণা এবং বহুভাষিক সাহিত্যপরিসরের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশে তাঁর সাহিত্যযাত্রার সূচনা এবং লন্ডনে তার বিস্তার তাঁকে দুটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সংযোগস্থলে দাঁড় করিয়েছে। তাঁর কাব্যকলা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে কবিতার নিবিড় পাঠ, চিত্রকল্পের বিশ্লেষণ, ভাষার গঠন, ছন্দের ব্যবহার এবং বিষয়ভাবনার বিবর্তন নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু তাঁর গ্রন্থসম্ভার, সাহিত্যবিষয়ক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক কবিতাচর্চায় অংশগ্রহণ থেকে এটুকু বলা যায়, তিনি সাহিত্যকে একক কোনো মাধ্যমের মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি।
একজন কবির প্রকৃত পরিচয় কেবল তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যায় নয়, বরং তাঁর ভাষা পাঠকের চিন্তায় কতখানি নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করে, তার মধ্যেই নিহিত। মিলটন রহমানের সাহিত্যযাত্রার মূল্যায়নও সেই বিবেচনার দাবি রাখে। বাংলা ভাষার সৃজনশীল চর্চাকে আন্তর্জাতিক সাহিত্যপরিসরের সঙ্গে যুক্ত করার যে প্রয়াস তাঁর জীবন ও কর্মে প্রতিফলিত, সেটিই তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।

ফারুক আহমেদ রনি
সম্পাদক, শিকড়


মিলটন রহমান-এর কবিতা


অহংকার

আমি কোন পাহাড় কিনতে চাই না
পাহাড় কেনার ক্ষমতা অন্য রকম,
সমুদ্র কিংবা দ্বীপের বদলে আস্ত একটা
পাহাড় কিনতে চাওয়া
শৈশব এবং কৈশোর ভুলে যাওয়া
আমার পক্ষে সম্ভব নয়,
আমি যার অবস্থান যেখানে দেখেছি
তাকে সেখানেই দেখতে চাই,
সমুদ্রকে পাহাড়ে নয় কিংবা ফেলে আসা
কোন দ্বীপকে দেখতে চাই না সমুদ্রে
জানি কেউ কখনো পিছনে ফিরতে পারে না
কিন্তু পিছনে রেখে আসা রেণু রেণু সুখ দুঃখ
একদিন হীরের মতো জ্বলে ওঠে
কেউ কেউ সমতল ছাড়িয়ে পাহাড় চূড়োয় উঠে
যদি বলে সব মানুষের মধ্যেই আছে অহংকার
আমি মানতে নারাজ
পাহাড় চূড়োয় উঠে নিজেকে শেরপা ভাবা যায় না
বরং আকাশের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে
নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্ব টের পেয়ে আমি বহুবার
নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি,
আমি এভাবেই হেরেছি
হেরে যাওয়ার কোন কৌশল আমার রপ্ত ছিলো না,
আমি ঈশ্বরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে বারবার বলেছি
জীবনের কোন কিছুই অবহেলায় দাও নি তুমি
দাও নি পাহাড় গিলে ফেলার একচ্ছত্র ক্ষমতা
বলি-
তুমি ক্ষান্ত হও হে সর্বগ্রাসী দানব
অন্তত একবার হেরে যাওয়ার সুযোগ দাও।


চোখ

এই শহরে দু‘টো চোখ নাচছে
অচেনা শহরে নতুন আগন্তুক
এ শহর কখনো এমন উচ্ছল ছিলো না
ছিলো না দু‘টো চোখের মার্বেল বিশাখা
চাঁদহীন আকাশে বসেছে আলোর মচ্ছব
কে যেনো চায়ের কাপ উঁচু করে
চেয়ে নিচ্ছে চোখাগ্নির উত্তাপ।

আমি বিশাল পানপাত্র হাতে বসে আছি
গেলাশে গেলাশে নেচে উঠছে দু‘টো চোখ
বহুকাল পর জেগে উঠছে বিষন্ন রাত
রাতের মিউজিকে ভেঙে যাচ্ছে রাত
ভোরের আলোর সাথে নেচে উঠছে চোখ
বহুকাল না দেখা অবিকল চোখের মতো।

ঢালু তরবারীতে হেলান দেয়া চোখ দু‘টো
নেমে আসছে তৃণভূমিতে
নেমে আসছে আমার গ্রীবা বেয়ে আরেকটু নীচে
যেখানে তাকে রেখে দিতে চেয়েছিলাম
দীর্ঘ ছায়ায়।

আমি এক গ্রীন ম্যান বনে বাদাড়ে হন্যে
হয়ে খুঁজি সেই চোখ।


খোয়াব

একবার তুমি জানতে চেয়েছিলে
চেনা মানুষগুলোর সাথে দেখা হয় না কেনো?
তারা কোথায় চলে গেছে, কোন পরগনায়?

কিছু কিছু মানুষের পাখি জীবন হয়
সেই জীবনে কেউ কেউ
উড়তে
উড়তে
শত সহস্র মাইল দূরে শূন্যে আর পথ খুঁজে না পেয়ে
পাখা পুড়ে তপ্ত বাতাসের সাথে
গলতে
গলতে

মেঘ গহ্বরে আশ্চর্য সমাধি হয়ে ফোটে
একবার তুমি জানতে চেয়েছিলে
দূরের ওই মেঘগুলো এতো নিকষ কালো কেনো?
ওটাই তোমার চেনা মানুষগুলোকে না দেখার কারণ!
যারা তোমার মতো নিজেকে বোধহীন না ভেবে
একদিন দূর্দান্ত খোয়াবে ছুটতে শুরু করেছিলো
তারাই মেঘ হয়ে অশ্ব বেগে
ছুটতে
ছুটতে
ভুলে গেছে ঠিকানা।
এখন তোমার মতো আমারও জানতে ইচ্ছে করে
আমি কেনো মেঘ হয়ে গেলাম?
কখন আমি হয়ে উঠেছি দূর্দান্ত খোয়াবী?

বহুদিন হলো তোমাকে দেখি না!


স্বাধীনতা

আমাদের সেই ছোট্ট গ্রামে এখনো দাঁড়িয়ে আছে বুড়ো বটবৃক্ষ
বাকল ওঠা শরীরে নাভীর মতো গর্তগুলোতে জমে থাকা জল
মাঝে মাঝে অশ্রæজল ভেবে ভ্রম হয়
এখনো সেই বটবৃক্ষের ছায়ায় জেগে আছে ফিনিক্স পাখিরা
বার বার ওড়ার পাখা পুড়ে, জেগে ওঠে প্রলেতারিয়েত
একটা জীবন জেগে উঠবে, গান গাইবে ব² ফাটা গান
বাতাসে বাজবে গ্রামের দস্যি মেয়েটির নূপুরের তান
তার ঠোঁট জোড়ায় জমা মিহি ঘাম অবলীলায় মুছে দেবে বলে
সহস্র বুলেটে বুক ঝাঁঝরা করেও যে যুবক এখনো জেগে আছে
তার নামই কি স্বাধীনতা?


চোখ

গ্রামের এক কোনে আমাকে খুন করে
রেখে গেছো তুমি ও তোমার প্রেমিকেরা
প্রতিদিন পাহাড় থেকে নেমে আসা
নেকড়েরা তোমার নাম জানতে চায়
এখনো যেটুকু হাড় মজ্জা অবশিষ্ট
তারাই তোমার নাম নেকড়ের চোখে
এঁকে দিয়েছে শূঁচালো হাঁড়ের কলমে
দাঁতাল গুঁইশাপের চামড়া দিয়ে আমার
চোখ জোড়া বাঁধিয়ে রেখেছি পাথর চাপায়
যদি কোনদিন এই পথে ফের আসো
চোখের কর্ণিয়া জোড়া তোমার হাতে তুলে দেবো
এ চোখ তোমাকে দেখতে চাইতো বলেই
আমাকে হত্যা করে মাটি চাপা দিয়েছিলে!


মানুষ

এক ভর পূর্ণিমা রাতে আমার ছায়া দু‘ভাগ হয়ে গেলো!
হঠাৎ মেঘের কার্তুজের আঘাতে দু‘ভাগ হয়ে গেলো চাঁদ
কালো রক্তে তড়পাতে তড়পাতে আমার দ্বিখন্ডিত ছায়ারা
তারার থুতনিতে ঝুলে, ইতিহাসের পাতা খুলে বসেছে
এসব কোন খোয়াবি কিংবা চটুল গল্পের আখ্যান নয়
দেখলাম প্রপিতামহ জলের সাম্পান বেয়ে বসেছে পাশে
আমার মগজে কইছালি করতে করতে তীরন্দাজ তিনি
জিজ্ঞেস করলেন- আমায় চিনতে পেরেছিস তুই?
আমার দ্বিখন্ডিত ছায়া ততক্ষণে প্রপিতামহের গল্প শেষে
আঠা দিয়ে ভেঙে যাওয়া চাঁদের শরীর জোড়া দিতে ব্যস্ত
আমাদের এমন ব্যস্ততা দেখে বললেন, তোরা বড় অস্থির
চতুর্দিকে কেবল কঙ্কাল, কোথাও রক্ত-মাংসের মানুষ নেই।
কোথাওতো কিছু ভাঙা নেই, ভেঙেছিস তোরা!


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মন্তব্য করুন

Trending

Discover more from শিকড়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading