কাজল রশীদ

শব্দেরও একটি আত্মা আছে।
সে আত্মা কখনো কাগজের ভাঁজে নিঃশব্দে শুয়ে থাকে, কখনো পাঠকের হৃদয়ে আলো জ্বালায়। সাহিত্য সেই আত্মারই আরেক নাম,যেখানে শব্দ কেবল বাক্য নয়, হয়ে ওঠে সময়ের সাক্ষী, মানুষের অভিজ্ঞতার সঞ্চয়, আর এক গভীর মানবিকতার নিরবধি নদী।

এক সময় ছিল, যখন বই প্রকাশ মানেই ছিল এক ধরনের তপস্যা। একটি বই বের হওয়ার আগে লেখক দীর্ঘদিন ধরে শব্দকে ঘষে মেজে পরিশুদ্ধ করতেন। প্রতিটি পঙ্‌ক্তি, প্রতিটি বাক্য যেন আত্মার ভেতর থেকে উঠে আসা সত্যের মতো নির্মল হয়ে উঠত। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও সেই তপস্যার অংশীদার হতো। বই ছাপা হতো যত্নে, শ্রদ্ধায়, এবং পাঠকের প্রতি এক ধরনের দায়বোধ নিয়ে।
প্রবাস প্রকাশনীর মতো কিছু প্রতিষ্ঠান সেই পথেই দীর্ঘদিন হেঁটেছে। তারা বই প্রকাশকে ব্যবসার চোখে দেখেনি; বরং দেখেছে একটি সাংস্কৃতিক দায়িত্ব হিসেবে। শতাধিক বই প্রকাশ করেও কখনো বিক্রির তাগিদ অনুভব করেনি। লেখকদের লেখা ছাপিয়ে, কাগজের সুবাসে ভরে, তা বিনামূল্যে পৌঁছে দিয়েছে সাহিত্যপ্রেমীদের হাতে। যেন একটি বৃক্ষ নিজের ফল নিজে খায় না,মানুষকে দেয়, পথিককে দেয়, ভবিষ্যৎকে দেয়।

সেই দিনগুলোতে নতুন বই বের হলে লেখকের প্রথম আকাঙ্ক্ষা ছিল,কীভাবে একজন প্রবীণ লেখকের হাতে বইটি তুলে দেওয়া যায়। কারণ, সেই অভিজ্ঞ মানুষের একটি মন্তব্য, একটি আশীর্বাদ, একটি সত্যিকারের সমালোচনা,নতুন লেখকের জন্য ছিল অমূল্য সম্পদ। সাহিত্য তখন ছিল এক ধরনের উত্তরাধিকার; যেখানে প্রবীণরা পথ দেখাতেন, আর নবীনরা বিনয়ের সাথে সেই পথে হাঁটতে শিখত।কিন্তু সময়ের স্রোত অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। এখন প্রায়ই দেখা যায়, নতুন কোনো লেখকের বই প্রকাশিত হওয়ার পর প্রথম অনুরোধটি হয় “দয়া করে বইটি কিনবেন।” বইমেলায় সেই বইগুলো এমনভাবে সাজানো থাকে, যেন তারা বহুদিনের প্রতিষ্ঠিত কোনো সাহিত্যিকের সৃষ্টি। প্রচ্ছদ ঝলমলে, স্টল ভরপুর, প্রচার প্রবল কিন্তু কখনো কখনো সেই ঝলকের ভেতরে শব্দের গভীরতা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে- কেন একজন প্রবীণ সাহিত্যিক একটি নবীন লেখকের বই কিনবেন?
সাহিত্যের ইতিহাসে প্রবীণরা নবীনদের বই কিনে নয়, বরং তাদের লেখা পড়ে, মূল্যায়ন করে, পরামর্শ দিয়ে পথ দেখিয়েছেন। একজন পাঠক যখন বই কেনেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি বই বেছে নিতে চান যা তাকে চিন্তার খোরাক দেবে, নান্দনিক আনন্দ দেবে, অথবা জীবনের কোনো নতুন সত্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। সেই জায়গায় একজন বিখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের বই কেনা অনেক সময় পাঠকের কাছে বেশি অর্থবহ মনে হয়।
এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।
আরেকটি বিষয়ও আজকাল স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে,বছরের পর বছর অসংখ্য বই প্রকাশের প্রবণতা। বিশেষ করে কিছু প্রবাসী কবি বা লেখক বছরে অনেকগুলো বই প্রকাশ করেন। কখনো কখনো মনে হয়, সাহিত্যিক প্রয়োজনের চেয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা কিংবা ব্যক্তিগত পরিচিতির তাগিদেই বইগুলো বের হচ্ছে। শব্দ যেন তখন আর আত্মার ভাষা থাকে না; হয়ে ওঠে কেবল মুদ্রিত অক্ষরের ভিড়। কিন্তু সাহিত্য কখনো সংখ্যার খেলায় বড় হয় না।
একটি সত্যিকারের সমৃদ্ধ বই,যেখানে চিন্তার গভীরতা আছে, ভাষার সৌন্দর্য আছে, মানবিকতার স্পর্শ আছে,সেই একটি বইই একজন লেখককে সাহিত্যজগতে স্থায়ী আসন দিতে পারে। ইতিহাসের দিকে তাকালেই আমরা তা দেখি। অনেক মহান লেখকের বইয়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু তাদের একটি মাত্র বইই যুগের পর যুগ পাঠকের হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে রেখেছে।
কারণ, সাহিত্য মূলত সময়ের সাথে একটি সংলাপ।

যে লেখা সময়কে ছুঁতে পারে না, মানুষকে ভাবাতে পারে না, হৃদয়ে আলোড়ন তুলতে পারে না,সেই লেখা কাগজে থাকলেও ইতিহাসে থাকে না।
নবীন লেখকদের জন্য তাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত ধৈর্য।
বই বের করাই লক্ষ্য নয়; বরং এমন একটি বই সৃষ্টি করা, যা পাঠকের মনে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেবে। শব্দের প্রতি শ্রদ্ধা, ভাষার প্রতি দায়িত্ব, এবং সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা,এই তিনটি বিষয়ই একজন প্রকৃত লেখকের পথনির্দেশ।
প্রবীণদের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার চেয়ে বড় বিষয় হলো তাদের কাছ থেকে সত্যিকারের সমালোচনা পাওয়া। সেই সমালোচনাই লেখাকে পরিশুদ্ধ করে, চিন্তাকে গভীর করে, আর একজন লেখককে পরিণত করে তোলে।
সাহিত্য আসলে একটি বৃক্ষের মতো। তার শিকড় অতীতে, তার কাণ্ড বর্তমানের অভিজ্ঞতায়, আর তার ডালপালা ভবিষ্যতের দিকে প্রসারিত। যদি শিকড় দুর্বল হয়, যদি মাটি পুষ্টিহীন হয়, তাহলে সেই বৃক্ষ যতই দ্রুত বড় হোক, তার স্থায়িত্ব থাকে না।
তাই আজকের লেখকদের কাছে একটি বিনীত আহ্বান, বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর আগে শব্দের গভীরতা বাড়ান। প্রচারের ঝলকানির আগে ভাবনার আলো জ্বালান। কারণ শেষ পর্যন্ত পাঠক বইয়ের মলাট নয়, বইয়ের ভেতরের সত্যটিই খুঁজে বেড়ায়।
একটি সত্যিকারের ভালো বই কখনো তাড়াহুড়ো করে জন্ম নেয় না। সে ধীরে ধীরে জন্মায়—অনুভবের ভিতর, নীরবতার ভিতর, আর দীর্ঘ চিন্তার অন্তরালে। আর যখন সে জন্ম নেয়, তখন তাকে আর বিক্রি করতে হয় না, পাঠক নিজেই তাকে খুঁজে নেয়।
সেই দিনই একজন লেখকের সত্যিকারের প্রাপ্তি ঘটে। সেই দিনই শব্দ তার প্রকৃত মর্যাদা ফিরে পায়।

কাজল রশীদ।
কবি, লেখক ও সম্পাদক


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড় (Shikor)

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading