“দেখতাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বেগম সারা তাইফুর লিখছেন। কবিতা লিখছেন বেগম মোতাহেরা বানু। মনে হল ওরা লিখছেন আমিও কি লিখতে পারি না? শুরু হল লেখা লেখা খেলা। কী গোপনে, কত কুন্ঠায়, ভীষণ লজ্জার সেই হিজিবিজি লেখা ছড়া, গল্প। কিন্তু কোনোটাই কী মনের মতো হয়! কেউ জানবে, কেউ দেখে ফেলবে বলে ভয়ে ভাবনায় সে লেখা কত লুকিয়ে রেখে আবার দেখে দেখে নিজেই শরমে সংকুচিত হয়ে উঠি।”
যে বাচ্চা মেয়েটি লেখা লেখা খেলা দিয়ে শুরু করেছিলেন তাঁর লেখিকা জীবনের সুদীর্ঘ পথ তিনি আর কেউ নন, বেগম সুফিয়া কামাল। যাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’র মুখবন্ধ লেখেন স্বয়ং কবি নজরুল ইসলাম এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভূয়সী প্রশংসা করেন। বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা থেকে প্রানীত বেগম সুফিয়া যে তৎকালীন মুসলিম সমাজে একটি নতুন মাইলস্টোন হয়ে উঠবেন এতে আর আশ্চর্য কী? কারণ যে সময়ে এবং সমাজে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই সময় এবং সমাজ নারীমুক্তির পক্ষে বিপরীত ধারনাই পোষণ করত। ফলে তাঁকে সংঘর্ষ করতে হয় স্বাধীন চিন্তা ব্যক্ত করার জন্য। প্রথাগত বিদ্যা শিক্ষার অবকাশ সে যুগে না থাকলেও তিনি নানাবাড়িতে বড় হওয়ার দরুন বাড়িতে বসে বিদ্যা আয়ত্ত করার সুযোগ পান। তাঁর মাতৃকূল শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবার হওয়ার সূত্রে পারিবারিক গ্রন্থাগারটি ব্যবহার করেছেন স্বাধীনভাবেই। বলা ভালো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তিনি না পেলেও নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজেকে তিনি উপযুক্ত করে তোলেন।
সৈয়দ আব্দুল বারী ও সৈয়দা সাবেরা খাতুনের কন্যা সুফিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯১১ সালের ২০ জুন। যে সময়ে তিনি জন্ম গ্রহন করেন সে সময়ে বাঙালি মুসলিম নারীকে অন্দরমহলে বন্দি জীবন কাটাতে হত। বিদ্যালয়ে গিয়ে পড়ার কোনো সুযোগই ছিল না। তার ওপর পরিবারে বাংলা ভাষার প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। এমন প্রতিকূল পরিবেশও দমিয়ে দিতে পারেনি ছোট্ট সুফিয়াকে। নানাবাড়ির গ্রন্থাগার থেকে উর্দু,আরবি, ফারসি শিখলেও আক্ষরিকভাবেই মাতৃভাষা শিখেছিলেন মায়ের কাছেই।
সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য রচনাও শুরু করেন যার বিস্তারিত বিবরণ লেখার গোড়াতেই উল্লেখ করেছি। প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ প্রকাশিত হয় তৎকালীন প্রভাবশালী সাময়িকী সওগাতে। পরবর্তীকালে তিনি বাংলা সাহিত্যের বিবিধ উজ্জ্বল নক্ষত্র যেমন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল, শরতচন্দ্র প্রমুখের সান্নিধ্যে আসেন কলকাতা থাকাকালীন। বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’এ যোগ দিয়ে মুসলিম নারী স্বাধীনতার সপক্ষে নিজের মতামত গড়ে তোলেন। বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা তাঁর মধ্যে সঞ্চালিত হয়ে পরবর্তী কালে তা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।
দেশ ভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় এক উজ্জ্বল চিহ্ন রেখে গেছে। এই আন্দোলনে নারীকে তিনি সরাসরিভাবে যোগদানের জন্য অনুপ্রাণিত করেন। ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের প্রথম মহিলা আবাসনকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবী জানান। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক প্রদত্ত তমঘা-ই-ইমতিয়াজ পদক বর্জন করেন। ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ গঠন করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। স্বাধীন বাংলাদেশে নারীজাগরণ ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে কখনোই আপোষ করেননি। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই ছিল আমৃত্যু। বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম মৃত্যুর পর যাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হয়।
পরিশেষে বলা যায় বেগম সুফিয়া কামালের জীবন ও সংগ্রাম কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ড বা সময়ে সীমিত ছিল না। যে লড়াই শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের নারী অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কালক্রমে তা হয়ে উঠেছিল বিশ্বজনীন। বিশ্বের যে কোনো নারীর ওপর নেমে আসা শোষণ, বৈষম্য ও পুরুষতান্ত্রিক কূপমন্ডুকতা বিরুদ্ধে তাঁর আদর্শ হয়ে উঠেছে তীব্র প্রতিবাদ। তাঁর প্রগতিশীল চেতনা, অদম্য সাহস, মানবিক মূল্যবোধ নারীমুক্তি আন্দোলনে আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
জননীসমা কবি সুফিয়া কামালের ১১৫ তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে শিকড় পরিবারের পক্ষ থেকে রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা। তাঁর প্রগতিশীল চেতনা ও বৈশ্বিক নারী জাগরণের আদর্শ ঘরে ঘরে প্রচারিত হয়ে এগিয়ে চলুক অনির্বাণ দীপ্ত আলোর অভিমুখে।
পিয়াল রায়
সহসম্পাদক শিকড়






Leave a Reply