অদিতী ফাল্গুনী


গ্রন্থঃ ওম

শামীম আজাদ

“তৃণের উচ্চতায় লেপ্টে আছে ক্ষণ
বৃক্ষ ও বধির বালিকণা
শিশিরের সভ্যতায়
নিদ্রার ভেতর,
অনুমুখী।

ভাবায় কি উপরের এই পংক্তিগুলো আমাদের? তৃণের উচ্চতায় ক্ষণ অর্থাৎ মূহুর্ত জড়িয়ে থাকে কি? কিভাবে ঠিক বৃক্ষের পাশেই বসবাস করে বধির বালিকণা!“শিশিরের সভ্যতা…এই রূপকল্পও আমাদের বহু প্রচলিত ও চর্চিত কাব্যজগতের মোটিফ সকলের হতে দূরবর্তী কোন ভিন্ন সৌন্দর্যের ইঙ্গিত করে। শিশিরের সভ্যতার পরপরই যখন উচ্চারিত হয় নিদ্রার ভেতর এবং অনুমুখী শব্দদ্বয়, তখন প্রশ্ন জাগে এই কবি কি ধ্যানস্থ হতে চাইছেন কোন দার্শনিক সততায়? দর্শন ও কবিতা পরষ্পরের শত্র“ বলেন অনেকে। প্লেটো কবিদের বিতাড়িত করতে চেয়েছেন তার আইডিয়াল রিপাব্লিক হতে। কবিদের পছন্দ করেন নি পৃথিবীর বহু ধর্মপ্রচারকও। আবার, কবিরা মনে করেন বিশুদ্ধ কবিতা স্বপ্ন ও ইন্দ্রিয়ঘোরের মতোই যুক্তি ও গদ্যের কাঠিন্য হতে বিচ্যূত হবে, হবে অরূপ মায়াবী। তবে, পৃথিবীতে বিরল কিছু কবিতাও পাওয়া যায় যেখানে হয়তো দার্শনিক স্বজ্ঞা কবিতার লাবণ্যময়ী রূপ পরিগ্রহ করতে পারে।

কবি শামীম আজাদ মোট ৫৬টি কবিতার শরীর সম্বলিত কাব্যগ্রন্থ ওম-এ নিজস্ব কিছু শব্দ ও চিত্রকল্প উপস্থাপনা করেছেন।

প্রথম কবিতা কর্পূর শরীর লক্ষ্য করুন: “স্ট্রবেরি অধরা/ ফলদেহে গাঁথা তূর্য/ সংযমের অমরা/ বাসন্তী ড্যাফোডিলে আমি বৃষ্টি পরবাসী/ ধানের সৈকতে লাল তুলসীমালা দাসী।” কিম্বা, দ্বিতীয় কবিতা অনিশ্চিত-এ “কখনো কি এসেছিলে/ চোরা পাতা ভুলে/ কাঁচা রোদ নতুন কার্বন/ পাটভাঙ্গা মেঘের কৌশলে/ দীর্ঘ দাঁড়িয়ে ছিলে/ বিরহবৃক্ষ নদে/ হে আমার তৃষ্ণাভঞ্জন!” খুব সরল অথচ খুব শান্ত উচ্চারণ। ধরুন না কেন তৃতীয় কবিতা আপেলবনে-র শেষ দুই পংক্তি-ই: “পাথর ফুলকিতে বিশুদ্ধ বচসা করি-/ দীর্ঘ আপেলবনে আমি শিল চর কৃষাণী।”

ইন্দ্রিয়চেতনা কবির মগ্নতার অনেকাংশ জুড়ে আছে: “তুমি তো ছুটে আসো ঘন তীর/ আগুন আকাঙ্খা/ হাওড়ের যৌনতায়/ বেড়ে ওঠা/আদিম। আতিথ্য বিস্তারে বেগবান ঢল/ গুটি অভ্যন্তরে পরিমল।” বিশেষতঃ গুটি অভ্যন্তরে পরিমল পংক্তিটি অপূর্ব! কেন অপূর্ব তা’ ব্যখ্যার সম্ভবতঃ অপেক্ষা রাখে না।

কিছু রাজনৈতিক কবিতা লিখেছেন কবি, যার প্রয়োজন ছিল না। যেমন, জ্বলন্ত শালুক কবিতাটি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি কবির শ্রদ্ধা এবং এই সেনাশাসিত বাংলাদেশের বর্তমান দুঃসময়ে এমন কথা সাহস করে বলাটা নিঃসন্দেহে কবির রাজনৈতিক সততার প্রতি আস্থাবান করে তোলে। কিন্তু, তার জন্য শামীম আজাদের বহুমাত্রিক সত্ত্বার যে অংশটি পত্র-পত্রিকায় চমৎকার বিশ্লেষণাত্মক ও আবেগী কলাম লেখেন, সেই কলামিস্ট শামীম আজাদ-ই তো যথেষ্ট ছিলেন। রাজনৈতিক কবিতা লেখা যাবে না, এমন নয়। তবে, এপ্রসঙ্গে রুশ কবি আন্না আখমাতোভার কবিতার অসম্ভব জনপ্রিয়তা বিষয়ে রুশদেশের সাহিত্য সমালোচকদের বিশ্লেষণ মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য: “আন্না শুধু প্রেমের কবিতাই লেখেন এবং তার কবিতা অসম্ভব জনপ্রিয়। কারণ, শেষপর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে মানুষ আত্মহত্যা করে না। অধিকাংশ মানুষই আত্মহত্যা করতে যায় প্রেমে ব্যর্থ হয়ে।…”

পৃথিবীতে সাহিত্যের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে কথাসাহিত্যে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের রাজনীতি-অর্থনীতি-ধর্মের নানা বিবেচনা যদিবা বিষয়বস হিসেবে স্বীকৃত (অবশ্য, শর্ত থাকে যে তারও প্রকাশ হতে হবে শিল্পিত), শ্লোগানধর্মী কবিতা শিল্পের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েছে বড়ই কম। ধরা যাক, কবি রফিক আজাদের চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময়ে লেখা কবিতা “ভাত দে হারামজাদা! নইলে মানচিত্র খাবো”-র চেয়ে পাঠক হিসেবে আমাদের পক্ষপাত ঢের বেশি চুনিয়া আমার আর্কেডিয়াকে কেন্দ্র করে। শামীম আজাদের ওম-এ রাজনৈতিক কবিতার সংখ্যা খুব বেশি নয়। অলিখিত চুক্তি বা তন্দ্রাচ্ছন্ন গণতন্ত্র-এর মতো দু/তিনটি কবিতার বাইরে রাজনৈতিক কবিতা এই গ্রন্থে তেমন নেই। বাংলাদেশে সত্তরের দশকের কবিতার শ্লোগানধর্মীতা উপেক্ষা করে আশি ও নব্বইয়ে কবিরা আবারো ফিরে গেছেন ব্যক্তিগত নির্বাসন ও বিচ্ছিন্নতা বোধে, একাকিত্ব ও চৈতন্যের লীনতায়! ঈশিতা আজাদের করা সুন্দর প্রচ্ছদে মোড়া কবিতাগুলোর জন্য শামীম ধন্যবাদার্হ এ কারণেই যে এই গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতাই আত্মমগ্ন; সামষ্টিক কোন রাজনৈতিক ইস্যুনির্ভরতার বিপ্রতীপে তারা খুঁজে ফিরেছে পরা ও অপরা প্রতীকরাজির পৃথিবী ও ছায়াময়তা। বেনিআসহকলা কবিতার কিছু পংক্তি লক্ষ্য করুন: “…ঠোঁটের ব্রহ্মাণ্ডে বসা মৌলিক মেঘ/ উষাকালে শস্যের কাণ্ডারী/ নিদ্রাতূণে সাবালক চাঁদ/ পাখি-পাড়া জাল নিয়ে/ নিত্য ব্যস্ত ব্যবসায়নে- দিনে/…আমাকে ছুঁয়ে যায় তার সাতরঙা হাত।” দয়িতের হাতকে সাতরঙা কল্পনা করা ও তার নামকরণ বিজ্ঞানের বেনিআসহকলা সূত্রের নামে…শামীম কিছু মজার চাতুরিও প্রয়োগ করেছেন তার কবিতায়।

আমাদের অগ্রজ কবিদের ভেতর অনেক সময়ই একটি প্রবণতা দেখা যায় যে একটি দশকের কবিতায় ব্যবহৃত মোটিফ, রূপ-প্রপঞ্চ বা শব্দভাণ্ডারের পর তাদের কাব্যভাষা যেন বুড়িয়ে যায়। হয়তো আমরা এই প্রজন্মে যারা কবিতা বা গল্প লিখছি, আমাদের নিয়েও একই অভিযোগ তুলবেন আমাদের পরের প্রজন্মের সাহিত্য কর্মীরা। আবার, যিনি প্রতিভাবান-মেধাবী-সৃজনশীল ও তরুণপ্রাণ, তিনি পরবর্তী প্রজন্মের আলোকছন্দও অবলীলায় গ্রহণ করতে পারেন। টেক্কা দিতে পারেন উল্টো তরুণ কবিদের সাথে। যে কারণে কবিতায় আল মাহমুদ বা গদ্যে ইলিয়াস কোনদিন বুড়ো হবেন না। মাহমুদুল হকের চেতনাপ্রবাহ রীতিতে লেখা বাংলা গদ্যের অভাবিত র‌্যাডিক্যাল অথচ শিল্পিত সিনট্যাক্স তৈরি করতে গিয়ে আমাদের সো-কলড বয়সে তরুণ অনেক লেখকেরই কলম ভেঙ্গে যাবে। আবার, বহু তরুণ কবি বা গল্পকার আছেন, যারা অমেধাবী ও প্রতিভাহীণ, সঙ্গত কারণেই তরুণ বয়সেই বুড়িয়ে যাওয়া ভাষায় লেখেন। আমাদের প্রজন্মের কবি ব্রাত্য রাইসু আমাদের প্রজন্মের অপর এক কবি আহমেদ নকীবের কাব্যভাষার নতুনত্ব নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, “নকীব তরুণ। তার ভাষাও নতুন। অবশ্য তরুণ হইলেই কিছু নতুন হয় না। অনেক তরুণই আছেন যারা হেগো আব্বাজানগো ভাষায় লেখেন।” আমি শামীম আজাদের কাছে কৃতজ্ঞ তাঁর কাব্যভাষা যে কোন নিরীক্ষাধর্মী ও সদা পরিশ্রমী তরুণ কবির সাথে পাল্লা দেবে। আব্বাজান বা আম্মাজানদের ভাষায় তিনি লেখেন না। একটু পড়ে শোনাই:

১. সতেরো বছর ধরে এ ধোঁয়ায় হাঁটিতেছি
উর্দ্ধমুখী বালিক্ষেতের তুমুল তুঙ্গে
প্রকৃতির বাঁধ মুখ ভেঙে
দেহকাঠে বানানো কফিনে- : ধুন।

২. জল ঝেঁপে আসিতেছে
মধুপ মাখন
সমান্তরাল হলোগ্রাম
রোদ-কাটা সফেদ বাতাস
বল্গাহীন অশ্বরাজির রেশম কেশর
পাঁচ ছুরি গ্রহের করাত
সবই আজ্ঞা বাহি- : গচ্ছিত।

৩. হে আমার ইচ্ছাপ্রজ বিরল ব্যবহার-
নিয়ে যাও আমার এ বর্তমান প্রাকৃত আচার
আমি তো রাখব না হাত
তোমার কয়লা কি স্ফটিকে: জিজ্ঞাসা।

৪. কেবল রাত্রি নামিয়াছো প্রচণ্ড বাচাল
গির্জার গাড়ল আর ট্রেনের ধাতব
সব কিছু ধিকি ধিকি লাল
তুমি বীজে ঢুকে আছো আমার আঁকড়।

: বাছাই পর্ব।

৫. পায়রার ঝাঁক
পেরোতে পারিনি সে পাহাড়
গাঢ় রোদ ঝলেছে
সমগ্র নাশ হলে পরে
আমি হয়েছি সর্বনাশী। : শোধ।

৬. ঋষি তুমিও বণিক হতে পারো
অথবা অসুস্থ তীর
অথবা বাড়িতে পারো দীর্ঘ মানুষের বকুল পাঠাগারে মরুখণ্ডে জলের সৌরভে…।

: প্রবৃদ্ধি।

৭. এইসব কংক্রিট ক্রিসমাস
আর বরফ পাখিদের রেখে
বারবার ফিরে আসি…
অনাদায়ে ওঠে না কোনো রাত্রির রোগ
অন্ধমতি নারী আমি
এখনি খুলে দিতে চাই
জানু ও জংঘা সহ সোনার সেমিজ। :অধিকোষ।

. ঋতুর আস্বাদ আর পরিতাপ নিতে
প্রচণ্ড লাল দ্বিপ্রহরে
কোথাও যেতে দিতে হয়
যে ভাবেই হোক
সর্প কিম্বা পুষ্প-পুরুষ সহযোগে।

: সম্ভাবনা।

৯. অমৃতের পুত্র, চিনি
পানকৌড়ি ফুল
অঙ্গায়নে এ কেবল ভুল আর ভুল।

: পানকৌড়ি ভুল।

১০. কাহ্নু চাখে না কফি
কবিতা কথকতা…।: রোগ।

কিছুটা বিনয় মজুমদার প্রভাবিত কি শামীম? প্রকৃতি বর্ণনা বা ভাষার মরমিপনায় বিনয়ের সাথে জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে মিল থাকলেও, বিনয়ের পুরুষ চৈতন্যের বিপরীতে শামীম ধারণ করেন একান্তই তাঁর নারীচৈতন্য। যা পুরুষের থেকে ভিন্ন ভাবে সংজ্ঞায়িত করে প্রেম ও শরীরবোধকে। হয়তো সেকারণেই একজন নারী হিসেবে এই কাব্যগ্রন্থের বোধলোকের সাথে নিজেকে অন্বিত করাটা একজন নারী হিসেবে এই সমালোচকের পক্ষে সহজতর হয়েছে।”

ওম
শামীম আজাদ
আগামী প্রকাশনী ফেব্রুয়ারি ২০০৭
প্রচ্ছদ ঈশিতা আজাদ মূল্য ৭০ টাকা
ISBN 984 70006 0053 1

অদিতী ফাল্গুনী গায়েন
কবি, লেখক, অনুবাদক


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড় (Shikor)

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading