আসাদ মান্নান

“সন্দ্বীপে প্রথম রাত। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আমাদের জানালায় কোন চাঁদ নেই, ঘরের ভেতরে নিঃশব্দে বিড়াল হাঁটছে, আমাদের কাছেই নিচে মেঝেতে একটি হ্যারিকেন সলতে গুটিয়ে মৃদু আলো দিয়ে দিয়ে অপেক্ষায় আছে কে কখন প্রকৃতির ডাকে তাকে উস্কে দিয়ে বাইরে নিয়ে যাবে।” অসাধারণ বর্ণনা! কথাগুলো আমার নয়, একজন দেশখ্যাত কবি ও কথাশিল্পী শামীম আজাদের। সিলেটের মেয়ে থেকে যিনি সন্দ্বীপের একজন বিখ্যাত কৃতি মানুষের সহধর্মিণী হয়ে তাঁর প্রথম সন্দ্বীপ ভ্রমণের স্মৃতি বর্ণনা করেছেন অপূর্ব কথার রস মিশিয়ে, যাকে বলা যায় স্মৃতি সাহিত্য। কবিতার মতো। এক ধরনের চুম্বকীয় শক্তির টান রয়েছে তাঁর ভাষায়। ভাষাকে শিল্প হিসেবে রূপান্তর করার যাদুবিদ্যা রপ্ত করেছেন দারুণ মুন্সিয়ানায়। এ গল্প-কথা বা স্মৃতি কথা যা-ই বলি না কেন,পড়তে পড়তে আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি মনে পড়ে গেলো।

আমারও তো বয়স কম হয়নি দেখতে দেখতে ! নভেম্বর মাসের ৩ তারিখে কাগজে কলমে উনসত্তর হলেও আমি কিন্তু তা বলি না, বাড়িয়ে বলি– সত্তর পেরিয়ে গেছি। বলতেই হবে বুড়ো হয়ে গেছি। বয়সের ঘড়ি চলতে চলতে একদিন থেমে যাবে– ক্ষতি নেই; কিন্তু আফসোস রয়ে গেলো, আমি তাঁর মতো করে আমার জন্মদ্বীপ সন্দ্বীপ নিয়ে কিছুই লিখিনি। শৈশব -কৈশোর সময়ের হিসেবে অনেক দূরের ব্যাপার। অবাক হয়ে গেছি, আমার জীবন বা জীবনের স্মৃতি নিয়ে আজও একটা লাইন লিখতে পারিনি। কেন? অন্তরঙ্গ কবি-লেখক বন্ধুদের কেউ কেউ আমাকে কতবার বলেছেন , আমি যেন একটু- গদ্য-টদ্য লিখি, নিদেন পক্ষে আমার বেড়ে ওটার গল্পটা জানাতে। কিন্তু আমি সাহস করিনি দুকলম স্মৃতি কথা লিখতে। আমার মনে হয়েছে এর জন্য দায়ী প্রধানত আমার আলস্য। কবিতার বাইরে গিয়ে নিজের লেখালেখি ও জীবন যাপনের প্রতি একধরনের অবহেলা ও উদাসীনতা।

কাজটা মোটেই ঠিক হয়নি, এখন বুঝতে পারছি কবি শামীম আজাদ আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। তাঁর দীর্ঘ স্মৃতি কথার কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে আমি রীতিমতো কবি শামীম আজাদের অনুরাগী পাঠক হয়ে গেছি। নিয়ত করেছি তাঁর এ রচনা পড়ে গদ্য লেখার কলা ও কৌশল আয়ত্ত করবো। অনেক হয়েছে বেলা! আমার নিজের জীবনের কথাগুলো কেউ বলবে না, আমাকেই বলতে হবে। শামীম আজাদ আমাকে সেই শক্তি ও সাহস যোগাচ্ছেন। দেরীতে হলেও তাঁর সঙ্গে আমার একটা আত্মীক সম্পর্ক, লেখক-পাঠক বন্ধন তৈরি হয়ে গেছে। ‘ শিকড়’ পরিবার এটা তৈরি করে দিয়েছে। এ জন্য প্রিয় দুই অনুজ কবি ফারুক আহমেদ রনি ও সাদিয়া নাজীবের কাছে ঋণী।


কবি ও কথাশিল্পী শামীম আজাদ নিরলস একজন সৃজনশীল মানুষ। সেই সাত দশকের শুরু থেকে এখনো পর্যন্ত কী ব্যক্তিত্বে ওভঙ্গিতে , কী চলনে-বলনে এবং অব্যাহত সৃজনশীলতায় নিরন্তর এগিয়ে থাকা একজন স্মার্ট কবি, কথাশিল্পী । একই সঙ্গে কবি ও কথাশিল্পী অনেকেই আছেন, তাঁর মতো কেউ কেউ থাকলেও থাকতে পারেন,এ মুহূর্তে তাঁদের নাম মনে পড়ছে না। লেখালেখির শুরুতে জনপ্রিয় ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে সেই সময়ের মিডিয়া জগতে তিনি আলোচিত একজন ছিলেন ; ঢাকার একটি নামকরা সরকারি কলেজে শিক্ষক হিসেবে কাজ কাজ করেছেন , বিলেত ফেরত আধুনিক ও চমৎকার একজন জীবনসঙ্গী পেয়েছিলেন,( প্রায় ১০ বছর আগে প্রয়াত আবুল কালাম আজাদ); তাঁর বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা; বাবার বদলির চাকরি। এ সুযোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর শৈশব -কৈশোর কেটেছে। দেশের মাটি ও মানুষকে ক্যামেরার মতো চোখ দিয়ে নিখুঁতভাবে তুলে আনার ঈর্ষনীয় শক্তি অর্জন করেছেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নান্দনিক সৃজনশীলতা, মেধা ও মনন। শামীম আজাদ স্বতন্ত্র স্বরের কবি, স্বতন্ত্র পথের কথাশিল্পী। কবিতায় অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একই প্রতিষ্ঠান থেকে কথা সাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন’ বাংলা একাডেমি সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার’। এ ছাড়াও কয়েকটি বিদেশি সংস্থা থেকে তাঁকে নানা পদকে ভূষিত করা হয়েছে। তাঁর শুভ জন্মদিনে (১১ নভেম্বর) কবি ও কথাশিল্পী শামীম আজাদকে আমার আন্তরিক অভিবাদন ও শুভেচ্ছা জানাই। জয়তু কবি শামীম আজাদ!


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড় (Shikor)

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading