মিলটন রহমান


ক.
“এই জগতের যে কোন বস্তুই কৃষ্ণগহ্বর হয়ে উঠতে পারে। আবার এই মহাজগৎটাই কৃষ্ণগহ্বরের অভ্যন্তরে অবস্থিত”।

স্টিফেন হকিং-এর এ কথায় কবিতার আলোচনা শুরু করা যাক। দৃশ্যতঃ কৃষ্ণগহবরে বসেই আমরা নিয়ত খুঁজছি দূরের কৃষ্ণগহ্বরের ইঙ্গিত। যেখানে শূন্যতাও একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। জগতের গতি শক্তি যতই মন্থর হয়ে আসে ততই ভারী হয় শূন্যতা। তবে অনুসন্ধানে শূন্যতা-ঝামর-স্থান নির্মাণ করে অর্থদ্যোতনা। বাজে শঙ্ক-নিনাদ। শূন্যতার আয়োজনে জেগে ওঠে মোহন সময়; স্বক্ষমতায়। কৃষ্ণমোহন কিংবা গ্রহণকালের একজন কবি যখন বলেন-
“আর এখন উড়ছে কেবল বালিহাঁস, পাতিহাঁস
রন্ধ্রে রন্ধ্রে সজারুর মোহন কাঁটা
জ্বলে চিত্ত জ্বলে রাগ
জ্বলে সুগন্ধ বরাত
অংগার ভেঙে ঢলে পড়েছে গুল্ম নির্যাস।”(জিয়ল জখম/নওবত-৭০ পৃষ্ঠা/শামীম আজাদ)

মিহিগন্ধ প্রকাশের ভেতর কবিকে আবার পড়ে নিই দগ্ধতার ফ্রেমে। যেখানে জেগে ওঠে আত্ম্যাভিমান এবং সান্ধ্যকথা-

“পূর্ণ আপেলের গ্রামে ঝুলিতেছি
প্রমত্ত ঝিনুকে জল কাটিতেছি
শ’য়ে শ’য়ে পাথর গলে
হয়ে গেছে পৌরাণিক মানব
সেই থেকে
বসে আছি মেঘের ওপর
দেহগত নুনে আর পলির ফাগুনে!”(চিহ্ন-৬২ পৃষ্ঠা)

‘জিয়ল জখম’-এর কবি শামীম আজাদ। ছত্রে ছত্রে ছড়িয়েছেন নিকট এবং দূরগামী সূর্যাস্তের তীব্র অথচ ক্ষয়িষ্ণু রেখা, প্রত্ন সময়ের প্রতিভাষ, খন্ডের সাথে অখন্ডের এবং প্রকল্পতায় আলো-অন্ধকারে এঁকেছেন বিপরীত-জ্যোতির্ময় কোরাস।

এখন কবিতার পাঁজর খুলে দেখার সময়। অন্যজন কি রচনা করেছেন সে তুলনায় না গিয়ে বরং কবি এবং তাঁর কবিতার পোষ্টমর্টেম হওয়াই জরুরী মনে করি। কেননা এখন বিজ্ঞান- কবিতা-দর্শনের সম্পর্ক পরস্পরলগ্ন। কবির চিন্তা-দর্শন বিচারে বিজ্ঞান পরীক্ষাগার হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় বিচার্য্য কবি এবং কবিতা। যদিও একজন কবি দার্শনিক নন, তাঁর পরিচয় ’কবি’। কবিতার ‘রস’ চিহ্নিতকরণে বিজ্ঞান এবং দর্শনোপনীত হওয়া দরকার বলে আমি ভাবতে চাই ।

খ.
গ্রন্থের ত্রিশ পৃষ্ঠা থেকে তেত্রিশ পৃষ্ঠায় ব্যাপ্ত ‘ছায়াগুচ্ছ’ আলাদা আলোচনা করতে চাই। গুচ্ছ পরম্পরায় প্রেমপ্রবর্তনা এবং সময় নিপাতনে সিদ্ধ হয়ে নির্মিত হয়েছে কবিতা। প্রায় সব ক’টি তে জ্ব’লে উঠেছে সুনীল-রঙিন কাতরতা । এভাবে-

অচিরেই হবো মীন
ঘুমাবো জলের নগর
পিঠ ভরা চুল খুলে
রঙধনু আঁশ মেলে
জলের তপস্যা কলরব।

উঠান পিড়িতে দাঁড়াবে
এসো পূর্ণিমা কিশোর।’(ছায়াগুচ্ছ-৩)

স্মৃতি উগরে দেবার প্রবণতা কবিতার মজ্জায় চির ধরায়। ভেঙে ফেলে যাবতীয় করণ-কৌশল। কবিতার জাত শত্রু বলে আধুনিক কবিতায় স্মৃতি-ভ্রমণ-বৃত্তান্ত অত্যাল্প। অথচ কবি সে পথ পদ-চিহ্ন হীন রাখেন নি। এখানে কবি এবং কবিতা দর্শণ মসৃণ সুতোয় বুনেছেন প্রত্মতাত্বিক ভ‚মি। ‘জিয়ল জখম’ এর শিরায় যে সুর বেজেছে নিরন্তর।

‘মানুষ চলে গেলে
পালক ফেলে যায়
জ্ঞাতি চিহ্ন খুঁড়ে খুঁড়ে
পরশ বুলায়।'( ছায়াগুচ্ছ-৪)

অথবা ছায়াগুচ্ছের বাইরে থেকে যদি পড়ি-
‘বিভার ছুরিতে শানে শৈশব
জীবন, জামালপুর
তুলট কাগজ স্বাদ
আর প্রথম মতিচর….’(সোনার সেমিজ/২৬ পৃষ্ঠা)

কবি এখানে নৃতাত্ত্বিক। মৃত্তিকার সন্তানেরা ক্রম-বিবর্তনে নিজের অবস্থানে স্মৃতি চিহ্ন খুঁড়ে এভাবে দাঁড়ায়। স্মৃতি-বর্ণিত এ ক্যানভাস কাব্য-নন্দন বর্জিত নয়। বরং আধুনিক বাংলা কাব্যে ভিন্ন আঙ্গিক নির্মাণে এটিকে উন্নততর সংযোগ বলা যায়। কবিতার পাঠক এখন কবিকে বুঝতে চান প্রথমে, তারপর যান কবিতা চিন্তায়। কবি শামীম আজাদ এর মুন্সিয়ানা বোধকরি এই, তিনি আত্ম-আবিষ্কারের ভেতর দিয়েই পাঠকের কাছে নিজেকে তুলে দেন। ফলে আলাদা করে তাঁকে আর পাঠ করার দরকার পড়ে না।
‘ছুঁয়ে দেখো সৃষ্ট ওম প্রতিজ্ঞা
আমার, কবোষ্ণ মন্দিরা
ছোঁয়া পেলে শানিত হবো
কলঙ্ক অভিধা’(জিয়ল জখম/ ছায়াগুচ্ছ-১৪)

ছায়াগুচ্ছের রক্তে উন্মত্ত-সঞ্চারী প্রেমনাদ এভাবে গীতলতায় অভিষিত হলো। কলঙ্ক অভিধা জেনেও জানালো নিজের মনস্তাপ। কবি কে আরো পড়ি এভাবে-‘ক্লান্ত পিপড়েরা কি রতিক্রিয়া করে/এক জনমে ওষ্ঠাধর কত জখম ধরে? অথবা, ’ আধো রাত সরে গেলে/খোঁজো কার লতিকায় দুল?’ এভাবে বেজে উঠেছে ছায়াগুচ্ছের শরীরে বিরাজিত ক্ষয়, মৃত্যু, প্রেম এবং প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সুর। ‘জিয়ল জখম’ এর সর্বাঙ্গে লিক্যুইডের মতো বিস্তার করেছে ক্ষয়িষ্ণু সময়। ছায়াগুচ্ছের খন্ডায়মান প্রকাশে তারই প্রভাব তীব্রতর হয়ে উঠেছে।

গ.
কবি শামীম আজাদ কবিতায় অবস্থান চিহ্নিত করেছেন দৃষ্টি সীমার বাইরে অসীমতায়। বৃত্তে আবর্তিত ঘূর্ণায়ন কেন্দ্র থেকে নিরুদ্দেশমুখী নিজেকে তিনি আবিষ্কার করেন। সম্ভবত অনাবাসী বলেই কবি কখনো কখনো নিজের শেকড় খোঁজেন। এ গ্রন্থে বারবার দেখি তিনি এখনো একটি বীজ বুনে রেখেছেন শৈশবের মাটিতে। আত্ম-আবিষ্কারে সেখানেই ফিরে যান বার বার। তারপরও কখনো ঘরহীন ঘরের খোঁজে ব্যগ্র খড়ি কাটেন কবিতার খাতায়। শৈশবের প্রথমে অবস্থান প্রশ্ন বোধক হলেও-

‘তবেই সিদ্ধান্ত নেবো
কোথায় গ্রথিত হবো
বাতাসে না নদে
না চৌষট্টি চারুকলা দলে
জলিষ্ণু জামালপুরে…..(জিয়ল জখম/১৬ পৃষ্ঠা)

ঠিক কিছু কাল পরে কবি জেনে যান কোন নিরুদ্দেশে মেলেছেন পেখম। এখানে এসে কবি নিজের অস্তিত্বের কোন আকার আবিষ্কার করতে পারেন না। তখন প্রতিবেশ-প্রতিজনকেও তাঁর অচেনা মনে হয়। তিনি প্রবাহমান সময় কিংবা অসীমের সাথে নিজেকে ভাসিয়ে দেন। নিজেকে উপস্থিত করতে চান এভাবে-

‘তুই মধ্যম
আমি মধ্যমা
আমি এন্তার গঙ্গা সিন্ধু
তুই নর্মদা বিশুদ্ধ রক্তকণা
কেউ কি জেনেছে এই অত্যাশ্চর্য খবর
এই অসম্ভব!’

অসীমের পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে, জানিয়ে দেন নিজের পূর্বতন অবস্থান। ক্যানভাসে ভেসে ওঠে অতীত চিহ্ন এভাবে-

‘কখনো কি জানিবে কেহ
একদিন আমাদের সুগন্ধ করেছিলো
হাইবারনেশনে ভেগে আসা
একদল বেহুশ কবিতা
গোলাপী বকুল কথকতা।’ ( অবস্থান/৫৬ পৃষ্ঠা)

‘আমি সমগ্রের অংশ নই, সমগ্রের সঙ্গে সম্মিলিত নই, সমগ্রের মধ্যে গৃহীত নই।’ স্কেন্ডিনেভিয়ান দার্শনিক সোরেন কিয়ের্কেগার্দ এভাবে বন্ধনহীন অসীম এর কথা বলেছিলেন। সেই থেকে বোধ করি আধুনিক বিচ্ছিন্নতা বোধের আরম্ভ। যে বোধ রোমান্টিকতা, বাস্তবতার বীজ বুনে দেয় চিন্তন ভূমিতে। সেই ভূমিচিন্তার কবি শামীম আজাদ অলৌকিক ডানায় বয়ে ’জিয়ল জখম’-এ জানিয়ে দেন নিজের ’অবস্থান’।

ঘ.
একজন কবি’র জন্য সময় খন্ডিত করা জরুরী বলে জানি। তারও চেয়ে জরুরী খন্ডিত সময়ের খোল-নলচে খুলে খচিত সুবর্ণ তিলক এবং দগদগে ক্ষত চিহ্নিত করা। এ প্রক্রিয়ায় কাব্যচিত্রক মনন উৎসারিত যে ভাষিক জমিন তৈরী করেন তা হয়ে ওঠে কবিসময়ের বিস্তারিত ইলাস্ট্রেশন। কবি যখন বলেন-
‘পূর্ণিমার বাগান খুঁড়ে তুলে নেবো মুঠো পাপ…
পাথর বগলে গাঁথা দুই হাত
হায়! এই নিদয়া চক্ষুর ঘোড়া
তবু তুলে নিতে চায় ঘনবদ্ধ
কলিজার থোড়।’(আকাঙ্খা/৩৪ পৃষ্ঠা)

এভাবে আজকের পৃথিবী, নাগরিকতা, সময় এবং ব্যক্তি দহনের কথা বলতে গিয়ে কবি মিশেল ফুকোর পাগলা গারদের মত ঘিরে রাখেন পাঠককে। ’জিয়ল জখম’- এর পুরো শরীরে পোড়া রক্তের ছাপ। মাটির উপরে সচল যে ক্রিয়া; তার আমূলে নিয়ত বিঁধে যাওয়া তীরের ফলা, যা কিনা তীব্র আকাঙ্খায় কুড়িয়ে নেয়া। অনবরত খসে খসে শূন্যে মিশে যেতে ধ্যানস্থ কবিকে আরেকবার পড়ে নিই-

‘হাড় ও কলিজা চেরা
উত্তরীয় উজান
কখনো নিই না তার নাম
তবু, কন্টক মন্দিরা বাজে
মৃত্যু সমান।’(স্থপতির স্তুতি/১৭ পৃষ্ঠা)

অথবা,
‘তাহারে কি করে
বাগানে প্রতঃরাশ সেরে
তীব্র দ্বিপ্রহরের ঠোঁট দিয়ে চেড়ো!’(অবিশ্বাস/২০ পৃষ্ঠা)

এ কবিতাগুলোর সাথে প্রায় সমান্তরাল পড়ে নেয়া যায় ‘থেরাপিউটিক’, ‘চন্দ্রভাষ্য’, ‘হতাশা’, ‘চলাচল’, ‘প্রবাহ’ ‘খুদের নগর’, ‘লন্ডিনিয়াম’, ‘দিকভ্রান্তি’ ‘নাই’, এবং ‘পোকা ও পাখোয়াজ’ ও অন্যান্য। কবি বেদনা-রস মিশ্রিত চোখ ফেলেছেন প্রতিভাষ পৃথিবীতে। আবিষ্কার করেছেন কৃষ্ণগহ্বর অভ্যন্তরে শূন্য অন্ধকার, জগতের বহুমাত্রিক ছন্দ-রূপ। কবি এসব অনুসন্ধান করেছেন খন্ড খন্ড সময়ের মধ্যে। তাই কবিতাগুলো আধুনিকান্তিকতারই চোখে হয়ে উঠেছে নানা ভাবে অর্থবহ। আমি তাঁর অনুরক্ত পাঠক হিসেবে বলতে পারি, শুধূু ভাষার আধুনিকত্বের কারণে নয়, বরং দর্শন, চিন্তা এবং কবিতার সম্মিলিত সঙ্গীতে কবিতাগুলো পাঠকের সঙ্গে দীর্ঘ সহবাসের দাবী রাখে।

ঙ.
আবেগ কবিতার প্রাচীনতম সহযাত্রী। ফলতঃ আবেগ কবিতার প্রধানতম রসায়ন। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে রসদ মিশ্রনে ত্রুটি ঘটলেই সৃষ্টি ব্যহত হয়। কবিতারসদ-এর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম বলে মনে করি। বিশ্বসাহিত্যে অনেক কবিতা এই মিশ্রন ত্রুটির কারণে পাঠক প্রিয় হয়েও মহাকালীন হতে পারেনি। একজন শিল্পীকে তাই রাশ টেনে ধরতে হয় আবেগের। ’জিয়ল জখম’-এ রসদ ব্যবহারে শুনতে পাই কষ্টকল্পের পদধ্বনি। কবি কখনো কখনো আবেগাপ্লুত হলেও তাঁর বোধ ও গভীরতা থেকে একটি একটি হিরক তুলে এনে গেঁথেছেন মালা। এক একটি হিরক টুকরো ধারণ করেছে কবির ক্ষন মৈথুনে উঠে আসা ফ্যাকাশে হলদেটে পাতা, আকাঙ্খা,শোক,দুঃখ এবং বিস্ময়। সুরে বাঁধা যন্ত্র যেমন প্রতিক্ষা করে সুরের জন্য, আলোচ্য কবিও তেমনি এখানে প্রতিক্ষারত কাঙ্খিত বেদনার জন্য। এ অভিযাত্রায় বৃহৎ ও ক্ষুদ্রের এবং রূপ ও অরূপের সন্ধানে প্রায় আত্মবিলাপে মগ্ন তিনি। মৃত্যুতে ব্যক্তির আত্মবিলোপ ঘটে। তাই বোধ করি ‘জিয়লজখম’-এর উৎসর্গে দেখি-’ভোঁ ভোঁ শবের বিছানায়/ পরাজিত মানুষেরা/মাছি হয়ে যায়…।’ প্রেম ও ভালবাসায় আত্মবিলোপ ঘটে সত্বার। আর এরই মাধ্যমে সৃষ্টি হয় দ্যুতিময় আত্মসমাহিত হীরক। আসুন ক’টি কবিতা পড়ে চিহ্নিত করি কবির আবেগ-দগ্ধ-ফলন হীরক-

‘ঠোঁটের সেগুন দেবো
কবির ভূগোল দেবো…
দহনের দোহাই লাগে, থাকো
উজানের দেশে নেবো
পক্ষির পালক পাবে
সানকির ওম পাবে
নফল প্রার্থনা হবে
আমারে বিশ্বাস করো
এ মুগ্ধ বিপাকে
তোমারেই দেবো গো আমি এ পূর্ণিমা সকাল’( শুশ্রূষা/২৪ পৃষ্ঠা)

‘তোমারে শুইয়ে দিবো ইঙ্গল মন্দির ঘরে রে বন্ধু
আর না ঢুকিবে সূতানলী রাইতরে….( অনুরোধ/৩৭ পৃষ্ঠা)

‘মনা, কাঁদিবার সবটুকু ক্ষণ নিয়া
সূর্যগত রাতে
তরল নিঃশ্বাসে চাঁদ ভাঙ্গিয়া দিয়া
সুশক্ত শীতের পিঠে
গেছো যে চলিয়া রে……’(……নিঠুর কালিয়ারে/৫৭ পৃষ্ঠা)

কবিতার শুরুতে আবেগ উদ্বেল কবি-‘এখানেই পাখির ছায়ার নিচে/ঘ্রান ছিলো/চিনিচর চম্পা/ রজবের চাঁদ আর রাজা শাইল স্বাদ’ বলে শেষে নিজেকে টেনে ধরেন এভাবে-‘কিন্তু/দুধের নহর ছাড়া/বাদ বাকি সবই ছিলো মেদ’(কোমল কঙ্কাল)। অঘ্রানের অন্ধকারে হেঁটে যাওয়া কবির মনোভূমি শামুকচর দহনে পুড়তে পুড়তে যখন কবির মনভূমি দীর্ঘ দাঁড়ায়, তখন তাঁকে আমরা চিনে নিই। যিনি মহাকাশকে, বাতাসকে শুনিয়ে যান পাঁজর খোলার দেহলিজ-দহন আলাপ। তখন আর কবির দৃষ্টি থির থাকেনা। আকাশ ফুঁড়ে চলে মহাকাশের দিকে। সে যাত্রা কখনো স্বস্তি দেয় না, ফেলে না শীতল ছায়া। শুধু জানিয়ে দেয় একজন কবির মহাযাত্রা। যে কবি মৃত্যুর পরেও কবিতা তৈরী করবেন!

চ.
শূন্যতা, ক্ষয়, বিরহ, রিরংসা এবং তেজ জগতে অস্তিত্ব সঞ্চার করে। যে শূন্যতা আমি এবং আমরা বহন করি তা-ই অনন্তের অক্ষয় সম্ভাবনা এবং আশংকার চিহ্ন। কবি শামীম আজাদ নিজের সঙ্গে বয়ে যাওয়া গহ্বরের ভিতর কখনো শুনেছেন মোহন-সান্ধ্য বাঁশি, কখনো চিহ্নিত করেছেন নিজের ভেতর হিংস্র নখরে কাটা দগদগে ক্ষত। মোহান্ধ সময়ের করাত কিভাবে চিরে সুবর্ণ সুর। কত ত্যাগিলেও পাওয়া হয় না স্বর্ণালী ভোর, তা কবি ফোটা ফোটা রক্তে এঁকেছেন ‘জিয়ল জখম’-এ। আলোচনা শেষ করার আগে আরো ক’টি কবিতা পড়ে নেয়া যাক-

‘রক্ত তুফান তোলা পাখি
ঠোঁট রাখো ঘ্রানের ওপর
নাভীমূল থেকে সেঁচে নাও বনাঞ্চল
হাত থেকে ফেলে দাও লবঙ্গের লাল
পাড়ি দাও দাউ দাউ উঠান’(পাথর পরাগ/৭১ পৃষ্ঠা)

‘তুমি হাঁটো উত্তরে আর
আমি যে নৈঋতে
জানিয়ো তবুরে বন্ধু
কখোনই কোনো কিরিচ ছিলো না
আমার পিরিতে।’(মধু শয়তান/৬৯ পৃষ্ঠা)

এক টানে ’জিয়ল জখম’-এর কবিতাগুলো পড়া যায়। কবি চিন্তার মত বাক্যরাও ক্ষিপ্র গতির। তাই কিছু কবিতা উদ্ধৃত হল। মোট চুয়ান্নটি কবিতা এ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত। আলোচ্য কবিতা বাদ দিয়ে অবশিষ্টগুলোও ব্যাখ্যাত হতে পারে। অতএব ‘জিয়ল জখম’ বিষয়ে যে কোন সময় বিস্তারিত গদ্য লেখার ইচ্ছে রাখি। এ গ্রন্থের অন্যান্য কবিতাগুলো হলো- ‘অনুপান’, ‘অশ্লীল’, ‘চৌষট্টি চারুলতা’, ‘অনিদ্রা’, ‘মনোবাঞ্জা’, ‘মূল’, ‘পছন্দ’, ‘অধিবাস’, ‘বন পোড়ে আগে’, ‘অবশিষ্ট’, ‘দিকভ্রান্তি’, ‘নাই’, ‘জল-শুশ্রুষা’, ‘পোকা ও পাখোয়াজ’, ‘অভিলাষ’, ‘অঙ্গ সংস্থান’, ‘উপলব্দি’, ‘কিশোরী আমানকার’, ‘সাম্প্রতিক’,’অতসী’,’দেহতত্ব’,’বিরহকণা’,’লন্ডিনিয়াম’,’খুদের নগর’, ‘রাত্রিরাগ’, ‘জ্বলন্ত বর্ষা’, ‘আশংকা’, ‘প্রবাহ’, ‘চলাচল’, ‘হতাশা,’ ‘হলদে পাখি’ এবং ‘চন্দ্রভাষ্য’।

ছ.
মেদহীন ’জিয়ল জখম’-এর কবিতার শরীর। বাহুল্য বর্জিত বক্র-রৈখিক কাঠামো কবি ভাবনা ধারণ করেছে প্রতিটি আঁশে। কবিতার নামকরণ হয়ে উঠেছে অনুকথায় পুরোকথা। কবিতার শিরোনাম একজন পাঠকের নাকে গন্ধ তুলে দেয় মিশেল মশলার। চূর্ণ চূর্ণ সময়ের ভেতর,কখনো উঠে আসেনি জীবনের পুরো উচ্ছ্বাস। আমাদের সাহিত্য যে ভূমিতে দাঁড়িয়ে তাকে আমি একটি ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ বলতেই পছন্দ করি। এর প্রধান কারণ আত্ম-সামাজিক, রাষ্ট্রীক এবং মানসিক বৈকল্য। যা অবশ্য অনুকূল হয়েছে কবিতা সাহিত্যের জন্য। ‘জিয়ল জখম’ এর কবিকে আমরা সে হিসেবে সফল কিষাণী হিসেবে পাই, কেননা তিনি অনাবাসে থেকেও মাটি ছেড়ে যান নি কোথাও। এ বিরান ভূমির উত্তরাধীকারী তিনি। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন খন্ড খন্ড সূর্য্য পোড়া ছাইয়ের সাথে ক্রমে গলে যাওয়া আত্ম-দগ্ধতার কাল।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড় (Shikor)

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading