সাহিত্য বার্তার সৌজন্যে- আরিফুল রহমান

১.আরিফুল রহমানঃ কবিতা আসলে কী?

শামীম আজাদঃ পাঠকের জন্য এমনকি নিজের জন্যও কবিতা সৃষ্টিশীল মানুষের এক অত্যাশ্চর্য দৈবিক উপহার উপাচার। তথ্য উপাত্ত ও কাহিনী নিয়ে গদ্য সৃষ্টি করা যায় – কবিতা লেখা যায় না। কবিতা অনেকটা প্রেমের মতই। কবিতা হয়, কবিতা হওয়ানো যায় না। সফল কবিতা পাঠকের সাথে যুগলবন্দী হয়ে গীত হয় – মনে, প্রাণে, উচ্চারণে।

আমি কবিতার সঙ্গে চিত্রকর্মের একটা মিল পাই। উভয় মাধ্যমই উপভোগের জন্য এর কোনটির বিষয়েরই কারুকার তাঁর স্রষ্টা ব্যাখ্যা করেন না।করতে বাধ্য নন। দর্শক বা পাঠক তা থেকে নিজেদের মেধা, মনন, অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজের মত করে রস আস্বাদন করেন। কবি তাঁর নিজস্ব ধারণা, আবেগ, অনুভূতি, গল্প ভাগ করে নেওয়ার জন্য শব্দ ব্যবহার করেন। সেই শব্দগুলো এক একটি তারার মত নিজেদের মত ঝিকমিক করে। সবই মিলে কবির আলোকমালা বানী রচনা করে। কবিতা, অনিবার্য শব্দগুচ্ছের এক সার্থক প্রয়োগের এক ছান্দসিক প্রমাণ। কবির আবেগ-অনুভূতি, উপলব্ধি ও চিন্তা ও তাঁর শিল্পকৌশলের এক সংক্ষিপ্ত রূপই সে কবির কবিতা যা পাঠকের ধারণে ও মননে দীর্ঘায়িত হয়। ছবির ব্যাপারেও তাই।
অমিল শুধু এখানেই যে ছবি বা চিত্রকর্ম আপনি যে কোন দূরত্ব, দিক ও অবস্থা থেকে দর্শন করে উপভোগ পারবেন – কিন্তু কবিতা রসাস্বাদনের ভ্রমণ ভিন্ন। কবিতা উপর থেকে প্রতিটি চরণ পাঠ করে করে শেষে একটা বোঝাপড়ার পর সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

২. আরিফুল রহমানঃ :কবি হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেয়েছেন? কার কাছ থেকে পেয়েছেন?

শামীম আজাদঃ আমার পরিবারের কেউ কবি ছিলেন না। এমনকি বর্ধিত পরিবারেও কেউ কবি ছিলেন বলে জানি না। তবে আবৃত্তির জন্য কঠোর অনুশাসনে বড়ো কবিদের কবিতা মুখস্ত করেছি বিস্তর।
জ্ঞানের বিষয়ের সঙ্গে সৃজনশীল বিষয়ের তফাৎটা এই যে, এর অনুপ্রেরণা উদ্রেক করা যায় না। মানবশিশুকে সে রকম একটি প্রেরণাদায়ী পরিবেশে বেড়ে উঠতে হয়। নারায়নগঞ্জ ও জামালপুরে আমার শৈশব-কৈশোর ছিল সেরকম। তখন বাবা-মায়ের শিল্প-সাংস্কৃতিক বোঝাপড়াটা দেখেছি। রবীন্দ্র-নজরুল-সুকুমার মুখস্ত করা ছাড়াও নদীর পাড় ধরে দৌড়ে নাচ শিখতে গেছি। তিন ভাইবোনকে দিয়ে গল্প লিখিয়ে আব্বা নিজে এনভেলাপের উপর ঠিকানা লিখে দৈনিক আজাদের ‘মুকুলের মহফিলে’র জন্য বাগবান ভাইর কাছে পাঠাতেন। ছুটির দিনে ভোর বেলা ফজরের নামাজ শেষ করে বাধ্যতামূলক জার্মান রিডের একটি পুরানো হারমোনিয়ামে গলা সাধতে হতো। কিন্তু ‘গাইবার গলা নেই বলে’ কোরাসের শিল্পীর চাইতে বেশি কিছু হতে পারিনি।
উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার জন্য আবাসিক ছাত্রী হিসেবে টাঙ্গাইল কুমুদিনী কলেজে সুযোগ পেতেই আমার মনে যে সাংস্কৃতিক আবহের উপ্তবীজ ছিল তার গাইয়ে জল পড়ল। দানবীর ও একাত্তরের শহীদ রণদাপ্রসাদ সাহা প্রতিষ্ঠিত তাঁর অন‍্যান‍্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতই কুমুদিনী আবাসিক কলেজের সকাল বিকাল ছিল শিল্পের স্বাদ, শব্দ, বর্ণ, গন্ধে ভরপুর। তাতে আমি নৃত্য, বিতর্ক, নাটক করার সাথে ক্লাসের পরা বাদ দিয়ে সিরিয়াসলি আউট বই পড়তে ও ছোট গল্প লিখতে লাগলাম। গল্প ছাপা হতে লাগলো বেগম, ইত্তেফাক, চিত্রালীতে…।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক বাংলা সম্মান পড়তে গিয়ে পেয়ে গেলাম মাতৃভাষারূপ মুক্তাভান্ডারের দিশা। কলেজে ‘এ্যাডভান্স বেঙ্গলী’তে এতদিন যাঁদের বই পড়েছি তাঁরাই এখন ক্লাসে সামনে দাঁড়িয়ে পড়াচ্ছেন আর অবিশ্বাস্য ভাবে আমি বেঞ্চে বসে তা শুনছি।শহীদ মুনীর চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সৈয়দ আকরম হোসেন, নীলিমা ইব্রাহীম, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার। পেলাম তাঁদের সাহচর্য্য, শিক্ষকতা ও দিকনির্দেশনা; সে এক অবিস্মরণীয় কাল।বাংলা সাহিত্যের মধুর হাঁড়িতে আমি যেন এক নগণ্য পিঁপড়ে। মাথা তোলার অবকাশ নেই। পাগলের মত পয়ার লেখার চেষ্টা করেছি, সনেটও। কিন্তু মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যারের ক্লাসে ছন্দ শিক্ষা পেয়ে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার ব্যকরণ নিয়ে পড়ে আমার হয়ে গেল ‘নাপিতের ফোঁড়াকাটা’ গল্পের মত অবস্থা।কিছুতেই আর কবিতা লেখা এগোয় না। পত্র পত্রিকায় কবিতা পাঠানো বন্ধ হয়ে গেল।সত্তুরের মাঝামাঝি আবার সাপ্তাহিক বিচিত্রা, দৈনিক বাংলা, সচিত্র সন্ধানী ও সাপ্তাহিক রোববারে কবিতা পাঠাতে শুরু করলাম। কবি রফিক আজাদ তখন বাংলা একাডেমিতে অন্যতম এক আধিকারিক ও রোববারের সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। ততদিনে কবিদের সংগঠন ‘পদাবলী’ সূত্রে অগ্রজ কবি রুবি রহমান, আসাদ চৌধুরী, বেলাল চৌধুরী, অসীম সাহা এঁদের সঙ্গেও হৃদ্যতা হয়ে গেছে। কবি শামসুর রাহমান ও সিনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত প্রথম এপার বাংলা ওপার বাংলার কবিতা সংকলনে কবিতা ছাপা হ’ল। আমার স্পষ্ট মনে আছে তখন একদিন রফিক ভাই বল্লেন, ‘শামীম তোমার গদ‍্য খুবই লিরিক‍্যাল। সিরিয়াসলি কবিতা লেখো তো !’ শুনে ভড়কে গেলাম। তাঁর মত প্রকাণ্ড কবি আমাকে বলছেন কবিতা লিখতে! এই প্রেরণা কি ভোলা যায়? এ যে রীতিমত সনদপ্রাপ্তি!

৩. আরিফুল রহমানঃ  কবিতা কখন অকবিতা হয়?

শামীম আজাদঃ ‘কবিতা’ শব্দের মাথায় ’অ’ বসিয়ে দিলেই… হা হা হা।
এবার সিরিয়াসলি এ শিল্প নিয়ে একটি কথা বলি।কবিতা বা পোয়েম শব্দটি গ্রীক শব্দ ‘পোয়েসিস’ থেকে এসেছে। যার অর্থ হল ‘তৈরি করা’। কবিতা, সাহিত্য-শিল্পের এমন একটি রূপ যাতে আক্ষরিকভাবেই ‘নির্মান’ ব্যাপারটি গুরুত্ব নিয়ে গেঁথে আছে। তাই কবিতা পাঠে কবিতায় দৃষ্ট স্তবকে স্তবকে লিপিবদ্ধ শব্দের অর্থগুচ্ছের পাশাপাশি বা পরিবর্তে বা তার ভিন্ন অর্থ বা নবতর ব্যঞ্জনার সৃষ্টি সঙ্ঘটিত হয়। কবিতা, ভাষার নান্দনিক এবং ছন্দোময় গুণাবলী তৈরী করে। উৎকৃষ্ট কবিতা পাঠ করলে মনে হয় এর ঐ শব্দগুলো অপরিহার্য। কবিতার ব্যাখ্যা যেমন দীর্ঘ করা সম্ভব তেমনি তা চট করে খাটোও করা যায়। এসব গুণাবলীর কিছু না কিছু থাকলেও তাই হবে ‘অকবিতা’।

৪.আরিফুল রহমানঃ প্রথম কোন্ কবিতা লিখে কাব্য জগতে প্রবেশ?

শামীম আজাদঃ সে এক গল্প! আমার প্রথম কবিতা কোথাও ছাপা হয়নি। কিন্তু ঘুরেছে এক বিখ্যাত কবির পকেটে।
মুক্তিযুদ্ধের আগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একদিন রোকেয়া হোল থেকে বেরিয়ে দেখি যথারীতি বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির বারান্দায় নির্মলদা (কবি নির্মলেন্দু গুণ)। আড্ডা দিচ্ছেন। আমি আমার একটি কবিতা তাঁর পরিচিত কোন সম্পাদককে দেবার জন‍্য দিই। কিন্তু দিন যায় রাত যায় এমন কি যুদ্ধও শেষ হয় কিন্তু কবিতা আর ছাপা হয় না।হয়নি। কিন্তু যুদ্ধ চলার সময় ওপার থেকে প্রচারের জন্য কবিতা লিখি।সেসব শ্লোগানধর্মী কবিতা বিষয়গুনে উৎরে গেলে বস্তুগুণে কবিতা হয়ে উঠেছিল বলে মনে করি না।তো কবি হবার ইচ্ছেটা মরে না।
অনুজ কবি বন্ধুদের মধ্যে রুদ্র (রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ), ত্রিদিব (ত্রিদিব দস্তিদার), মোহন (মোহন রায়হান), কামাল (কামাল চৌধুরী)তখন তরুন কবি। শাহনূর খান, রফিক নওশাদ, বাবলী হক আমার সহপাঠী ও বন্ধু। এত কবি পরিবৃত হয়ে আমার কবিত্বের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হতে থাকে। লিখতে থাকি। কিন্তু প্রথম কবিতার কথা মনে নেই।

৫.আরিফুল রহমানঃ আপনার অধিকাংশ কাব্যগ্রন্থের নামে বৈপরীত্য। কিন্তু কেনো?

শামীম আজাদঃ আমি বৈপরীত‍্য মনে করিনা। বরং নামগুলো একটু ভাবনার অবকাশ দেয় না?
প্রথম বই “স্পর্শের অপেক্ষা ” আশির দশকে প্রকাশিত হয়। এ নামটি এই গ্রন্থভুক্ত একটি কবিতার। তার পরের গ্রন্থ “হে যুবক, তোমার ভবিষ‍্যৎ”। সেও ছিল গ্রন্থেরই আরো একটি কবিতার শিরোনাম। কিন্তু প্রতিটি কবিতা শেষ হোলে নামকরণ করতে গেলেই একটা দ্বন্দ্বে পড়ে যেতাম। সে সময় একদিন ঢাকায় বেঙ্গল গ‍্যালারিতে একটি আর্ট প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখি শিল্পীর দেয়া তাঁর শিল্পকর্মের শিরোনামগুলো ভিন্ন রকম। উপস্থাপিত শিল্পের এক একটি মানসিক অবস্থার নাম। সেই থেকে আমি আমার কবিতার বা কবিতা গ্রন্থের নামকরণ করতে আর বেগ পাইনি। আমার কবিতার নাম – আমার কবিতার পালস। সেখানে হাত ছোঁয়ালে কবিতার বা গ্রন্থের উত্তাপ আঁচ করা যায়।
জন্মান্ধ জুপিটার, জিয়ল জখম, দেহখাঁজ খঞ্জর, নদীতে হেলান দিয়ে ইত‍্যাদি গ্রন্থের মলাটের ভেতরের কবিতাগুলোও তাই। তেমনি গদ্য গ্রন্থও। যেমন বংশবীজ, পকেট ভরা পাপড়ি, শূন্যস্থানে চুম্বন ইত্যাদি।

৬.আরিফুল রহমানঃ প্রথম কবিতা ও সম্প্রতি লেখা কবিতার মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পান কী? একটু খুলে বলুন …

শামীম আজাদঃ কবি হিসেবে সত্তুরে উঁকি দিয়ে ১৯৮২ তে প্রথম প্রকাশিত হলাম – ১৫টা কবিতা নিয়ে। আটজন কবি, রফিক আজাদ-দিলারা হাফিজ, রুবি রহমান-আসাদ চৌধুরী, বেলাল চৌধুরী-শামীম আজাদ ও অসীম সাহা- শাহাজাদী আঞ্জুমান আরার প্রতিজনের ১৫ খানা কবিতা নিয়ে এক শোভন প্যাকেটে যুগল ভাবে বন্দী। প্রকাশনার সংস্থারও নাম যুগলবন্দী। দেখলেই হাতে নিয়ে পড়তে ইচ্ছা হয়। ভালোবাসার কবিতার এপিঠ-ওপিঠ করে চারখানা গ্রন্থের এক সুদৃশ্য মোড়ক। তরুণ প্রোট্রেট ফটোগ্রাফার নাসির আলী মামুনের তোলা সবার পোর্ট্রেট গেল কভারে।আধখানা হলেও এ আমার প্রথম বই! এতজন মহাতারকার সঙ্গে সে ছিল আমারও এক মহাপ্রবেশ।আমি যে তাঁর আগে এতদিন যে সাহিত্য জমিনের আলে আলে জুতো ক্ষয় করে ঘুরেছি তা বৃথা যায়নি।
দেশে কুড়ি বছরের লেখক জীবন আর দেশান্তরী হবার পর বিদেশে আরো ত্রিশের অধিক বছর মিলিয়ে অর্ধ শতাব্দী ধরে লেখা নিয়ে টিকে আছি, বেঁচে আছি। মেঘে মেঘে বরফে বরফে শুধু পদ্মা মেঘনায় নয় টেমসেও জল ও তুষার গড়িয়েছে বহুদূর আর আমি কবিতা লিখেই যাচ্ছি… লিখেই যাচ্ছি. নিরন্তর। এ দীর্ঘ সময়ে আমার কবিতা শুধু বাঁক বদল করেনি, আমি হয়েছি সৃষ্টিশীল লেখার প্রশিক্ষকও। তাই ব্যপার গুলো আমার কাছে আরো স্পষ্ট। কবিতা নিজের জন্য তো অবশ্যই, কিন্তু যেহেতু তা প্রকশিত করছি, তাই কাদের জন্য লিখছি সেটাও কথা। পাঠক এখন আর হাতে ধরে পড়ার মধ্যে সীমিত নেই। আমার পাঠক বৈশ্বিক, তরুণ ও অনুসন্ধিৎসু। দেশের ঘ্রাণ আর প্রাণ থেকে আমি বহু দূরে। বিলেতের চেস্টনাট ফুলের স্থাপনায় দেখি বেগুনি জারুল, টকটকে লাল চেরিতে মাছের লাল চোখ, ডকল্যান্ডস ফুঁড়ে শুনি ডাহুকের ডাক। টেড হিউজের থটফক্স হয়ে যায় আমার ভাবনা-ভালুক।বটগাছ বনসাঁই হয়ে ছাতা হয়ে যায়। আমার পাঠকদের জন্য এভাবে না দেখাকে দেখা করে তোলার খেলা খেলছি। প্রকরণ, পরিবেশ, প্রক্রিয়া ও প্রভাবে আমার কবিতা এখন ইংরাজি ও বাংলা উভয় ভাষায়ই ডায়াস্পোরার কবিতা হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশের কবিতায় আমাদের মত বিভিন্ন দেশের অভিবাসী বাংলাদেশী কবিদের এসব চনমনে কবিতা এক নতুন ঋদ্ধ সংযোজন।
তবু আমি এখনো বোঁদলেয়ারের সেই আশ্চর্য রহস্যময় মেঘদল আমি কবিতাতেই খুঁজি—বিলেতের আকাশেই। সিলভার লাইনিংটা আমার জন্মভূমির।প্রথম দিকের লেখালেখি থেকে একে পরিবর্তন না বলে আমি বলবো বিবর্তন।

৭.আরিফুল রহমানঃ আপনার মতে, আজকের দুনিয়ায় একজন কবির জন্য বিশ্বসাহিত্য জানা কতটা জরুরি?

শামীম আজাদঃ জরুরী তবে নিজদেশের ও নিজভাষার সাহিত্য জানার চেয়ে কম।প্রথমে তো নিজেকে জানা। নিজেরটা ভালভাবে জ্ঞাত হলে সারা বিশ্বের কবিতা ও সাহিত্য তার কাছে সুগম্য হয়ে আসার সম্ভাবনা। বর্ত্মানের নানান মাধ্যমে তা জানার সুযোগ থাকলেও একতা পড়্রযায়ে ইংরাজী ভাষারই মুখাপেক্ষী হতে হয়। পৃথিবীর সাহিত্য জানা দরকার কিন্তু পৃথিবীরও আমার দেশের সাহিত্য জানার দায়িত্ব আছে। নিজ অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।ব্যাপারটা সেই ‘দেবে আর নেবে, মিলিবে মেলাবেই’ … তবেই আদান প্রদান না হলে সে গ্রহণটা সম্মানের হয় না।
৮.আরিফুল: একজন কবি সব থেকে মহৎ! এতে আপনার প্রতিক্তিয়া কি ?
শা.আ. এই ‘মহৎ’ শব্দটি আপেক্ষিক। আর কবিতা মহৎ হতে পারে কিন্তু কবিতার জন্মদানকারী মহৎ না হয়ে একজন তস্করও হতে পারেন। আমি বহুজাতিক কিছু উত্তম কবির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, যূথবদ্ধ হয়ে ফলিয়েছি ফল তাদের সবাই মহৎ ছিলেন না। আমি কি নিজেই মহৎ? কাউ প্রতি আঙুল তোলার আগে নিজের দিকে আঙুল ঘুরিয়ে দিয়ে ভাবতে চাই।
তবে ভাল কবিতা লেখেন এবং মানুষ হিসেবে মহৎ সে সংখ্যাই বেশি বলে হয়তো আপনি তাঁর উল্লেখ করলেন। সে একটা ব্যাপারটা তো আছে। সাধারণত কবিতা চর্চাকারী কবি এমন এক ঘোরের ভেতর থাকেন যে তাঁর জাগতিক জীবনের চাওয়া পাওয়াটা বড় হয়ে ওঠে না। তাই তাদের মহৎ বলা যায় বই কি।

৯.আরিফুল রহমানঃ কবি চরিত্রটি সমাজের চোখে রহস্যময়, এই রহস্যময়তার গোপন রহস্যটা আসলে কি?

শামীম আজাদঃ কবিতা এমন এক ধরণের সাহিত্য আইটেম, যেখানে পাঠকের আবেগ এবং কল্পনাকে উস্কে, জাগিয়ে, মাতিয়ে, লাফিয়ে, শুয়ে, বসে নানাবিধ অবস্থার সৃষ্টি করে কবি তাকে এক অলিক জগতে নিয়ে যান। যা সমাজের সাধারণ মানুষের পক্ষে তৈরি করা কঠিন। রূপক, ভাষা, উপমা, উৎপ্রেক্ষার জন্য কবি হয়ে ওঠেন সবার কাছে এক রহস্যের বালতি। সে জল মাথার উপর পড়লে কাব্যরসিকের কবিকে রহস্যমানবী মনেই হতে পারে।
অনেক সময় কবি নিজে তাঁর সৃষ্ট জগত ও বাইরের সাধারণ সমাজ দুই ভুবনেরই সমান্তরাল বাসিন্দা হতে সক্ষম। সে সময় এক জগতের বিধি অন্য জগতে স্থানান্তর করলেই তিনি হয়তো সবার কাছে হয়ে ওঠেন রহস্যময়। আসলে কবির নিজস্ব জগতটা তাঁর নিজস্ব এক রিজার্ভয়ার। সেখানে তিনি নিত্য মাছ ধরেন আবার ছাড়েন। সাধারণের ভাবনা চিন্তায় তখন সৃজনের উদ্যোক্তাকে বাস্তব থেকে আলাদা করে তাঁর সৃজিত বিষয়ের সঙ্গের সম্পর্কতাকেই প্রধান ধরে নেয়াটাই সেই রহস্যময়তা।

১০.আরিফুল রহমানঃকবি হিসেবে আপনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কতটা দায়বদ্ধ বোধ করেন?

রাজনীতির সঙ্গে কবিতার সংঘাত এবং সহাবস্থান আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? আপনি কি কখনো রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে সাহিত্যজগতে বাধার মুখে পড়েছেন?

শামীম আজাদঃ আমি শুধু বর্তমান নয় সব সময়ই একটা দায়বদ্ধতা নিয়ে চলি। আর ব্যক্তিগতভাবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিষ্কারভাবে আমাদের প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ক্রম বর্ধমান অর্থকেন্দ্রিকতা, আত্মপ্রেম, ক্ষমতায় বসে কর্তৃত্ববাদীতা, ইত্যাদিকে নিয়ে প্রচন্ডভাবে দায়বদ্ধ বোধ করি। দেশের সীমানার ভেতরে পুরো বছর থাকি না বলে সে বোধ আরও তীব্র । তাই কবি হিসেবে বহির্বিশ্বে যে কোন সম্মেলনে হাজির হবার আমন্ত্রণ পেলে কবিতায় এবং কবিতায় না হলেও একজন একাত্তরের যুদ্ধকরা প্রজন্ম বলে সে দায় মেটাবার সুযোগগুলো নিই। সেখানে তা কেউ তা কবির সততা, কেউ তা ব্যক্তির মতামত হিসেবে নেতেই পারেন। যার যা ইচ্ছে…
রাজনীতির সঙ্গে সে সহাবস্থানটা ব্যক্তিগত জীবনে সঙ্কট টেনে আনে। আমার না হলেও তা আমাদের দেশে হয়, হয়েছে। বাংলাদেশে সবকিছুই রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক এভাবেই দেখা হয়। হয় সাদা নয় কাল। ক্ষমতাবাদীরা সবসময় এ দুই রঙেই দুনিয়া দেখেন। তাদের কাছে দলের না হয়ে দেশের চিন্তাধারী মানুষ যে হতে পারেন, সে জ্ঞানের অভাব। তাই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকলেও কবিগণকে চিহ্নিতকরণে বলি হতে হয়।নিরাপত্তার কথা ভেবে কবিতা লেখা বন্ধ করতে হয়।

১১.আরিফুল রহমানঃ কবিতার মাধ্যমে আপনি কোন ধরনের পরিবর্তন আনতে চান সমাজে?

শামীম আজাদঃ কবি হিসেবে, আমার নিজস্ব দর্শন যাই থাকুক, নিজের কি সীমাবদ্ধতা তা সনাক্ত করেছি বহু আগে।সমাজ পরিবর্তনের জন্য বিশেষ ভাবে লিখতে হয়। আমি তেমন কবি নই বলেই আমার ধারনা।

১২.আরিফুল রহমানঃ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন বা সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো কি আপনার কবিতায় প্রভাব ফেলেছে?

শামীম আজাদঃ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তো ইতিহাস, তাই তথ্য হিসেবে তা গুরুত্বপূর্ণ। কোথা থেকে যাত্রা শুরু তা জ্ঞাত না হলে কোথায় গন্তব্য তা স্থির করা যায় না। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে।আমরা স্বাধীন হয়েছি। এর প্রভাব শুধু নয় ওটাই লেখায়-জোখায় আমার একমাত্র অভিজ্ঞান- আমার পরিচয়।
সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোর সমিল আন্দোলন অতীতে আরো হয়েছে।কিন্তু তারপর পরই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ব্যক্তিস্বার্থপরতার। প্রভাব শব্দটি ইতিবাচক। সুতরাং বলতে পারি এর প্রভাব নয় বরং প্রতিফলের প্রভাব আমার কবিতাকে ভারাক্রান্ত করছে, ক্ষতবিক্ষত করেছে। উত্তীর্ণ সময়ে তা অবশ্যই সনাক্ত করা যাবে বলে ধারণা করি।

১৩.আরিফুল রহমানঃবাংলা সাহিত্যের কোন যুগ বা কবি আপনার লেখায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে?

শামীম আজাদঃ আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসের ছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুবার পরও বাংলাভাষার যে সব কবির প্রভাব এখন অবধি রয়েছে, তার মধ্যে মধ্যযুগ এবং ত্রিশোত্তর কবিদের স্মরণ করতে পারি। আশি দশকে মন্দাক্রান্তা লয়ের ঘোরেই পড়েছিলাম বেশ কিছু দিন।
কবিতা পাঠকের আবেগ এবং কল্পনাকে জাগিয়ে তোলার জন্য রূপক, ভাষা এবং যত্ন সহকারে একটি সফল নির্মান। কবিতাভাবনার নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য থাকে না। সে অবারিত। আমার কবিতা লেখার উন্মেষ কালে যাঁদের কবিতার দৈর্ঘ্য আমার প্রেরণার কারণ হয়েছে তাঁরা হলেন; শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শক্তি চট্টপাধাযায়, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে শার্ল বোদলেয়ার…

১৪.আরিফুল রহমানঃ রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পরবর্তীতে বাংলাকবিতা কোন দিকে এগিয়েছে বলে মনে করেন?

শামীম আজাদঃ রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলামকে এক সঙ্গে এনে তা সূচক হিসেবে দেখবার বা দেখাবার ব্যাপারটিই সমীচীন নয় । তা থেকে এগুনো বা পেছানো বলে তুলনা করারও কোন পরিসর নেই। বিষয় বস্তু একটা বড়ো ব্যাপার, তবে সু ও কু চিহ্নিত করণ তারচেয়েও বড়ো। তাঁরা সব সময় সম্প্রীতির কথা বলেছেন, তারজন্য কাজ করেছেন। আমরা কবির পরিচয়ে ধর্ম যুক্ত করে তাঁদের সৃষ্টির প্রতি অন্যায় করেই চলেছি। শতবর্ষ পরেও তাঁরা যে এখনো বর্তমানের কবি ও পাঠকদের কাছে এখনো প্রাসঙ্গিক সেটাই এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা।
এখন বিশ্বটাই বদলে গেছে। আমাদের সময় স্কুল কলেজে আমাদের শুভবুদ্ধি জাগ্রত করার জন্য সিলেবাসভুক্ত যে ধরনের কবিতা পড়ে বেড়ে উঠেছি রাজনৈতিক প্রভাবে তার বদল হচ্ছে বা হয়েছে। এ অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি এখানে বিলেতের স্কুলে শিক্ষকতা করেছি বহু বছর। এখানে পড়ানোর পদ্ধতি বদলেছে কিন্তু রাজা বদলের সঙ্গে সাহিত্যে বা ইতিহাসে তা হয় নি বা হয় না। নতুন কবির কবিতা যুক্ত হচ্ছে এবং সত্যিকার দেশপ্রেম বেড়েই চলেছে এবং তা কোন ব্যক্তিপ্রেম লক্ষ্য করে নয়।

১৫.আরিফুল রহমানঃ আপনি কি মনে করেন যে আজকের বাংলা কবিতা সমাজবাস্তবতা তুলে ধরতে পারছে?

শামীম আজাদঃ বাংলাদেশের বাংলা কবিতা নিয়ে বললে বলি তা পারছে আবার নাও। বিদ্রোহাত্মক কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে লেখার দায়ে, প্রলয়শিখা কাব্য গ্রন্থের জন্য কবি কাজী নজরুল ইসলাম কারা ভোগ করেন। সেই শুরু। তাঁরই ধারাবাহিকতায় কবি সাহিত্যিকগন উভয় বঙ্গে নানান সময়ে দণ্ড ভোগ করেই চলেছেন। তাই এখানে বাস্তবতা তুলে ধরা কঠিন।
‘ধর্ম’ বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নাম ও কাজের সমালোচনা করায় দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন দাউদ হায়দার, তসলিমা নাসরিন। কারা ভোগ করেছেন মোহাম্মদ রফিক। সুবিধা বঞ্চিত হয়েছেন বহু কবি। কেউ কেউ সামালোচিত এখনও হচ্ছেন।
আবার আজ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী বাংলা ভাষার কবিগন যে যেখানে আছেন, তাঁরা সেখানকার বাস্তবতা তুলে ধরছেন। সামগ্রিকভাবে বাংলা ভাষায় লেখা কবিতায় ডায়াস্পোরা কবিতা যোগ হওয়াতে পৃথিবীর বাস্তবতা আগের চেয়ে বেশি উঠে আসছে। বলতে গেলে প্রতিটি দেশের মধ্যে এবং ইন্টারনেটে এত বেশি সাহিত্যের কাগজ আগে ছিলনা। তাছাড়া সামাজিক মাধ্যমেও কবিতার প্রচেষ্টা এত তীব্র যে তা থেকেও একটা বাস্তবতা তো উঠে আসছে তা ভাল কি মন্দ নিয়ে কথা নয় – কবিতাকেই অনেকে নিজ নিজ বাস্তবতা ও চাহিদা তুলে ধরার একান্ত মাধ্যম বলে মনে করছেন।

১৬.আরিফুল রহমানঃ আপনি কি মনে করেন বাংলা সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে যথেষ্ট সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছে?

শামীম আজাদঃ জি না। এমন কি বাংলা ভাষার জায়েন্ট লেখকদের লেখাও গুণগত মানে সমমানের বা উচ্চ পর্যায়ের হলেও সে সংযোগএর জন্য প্রতিযোগিতা সম্পন্ন করতে পারেনি। সাহিত্য জগতের বাজারেও আমাদের দেশের কাঁচা বাজারের মত সিন্ডেকেট আছে। এখানে কতৃত্ববাদী ভাষার মাফিয়ারাই প্রধান। মাত্র ক’বছর হ’ল শুরু হয়েছে অনুবাদের প্রতি দৃষ্টিপাত ও তাঁর স্বীকৃতি। এ বাবদে ইউরোপিয়ান ভাষাগুলোই এগিয়ে আছে।
আমাদের যে অনুবাদ হচ্ছে না তা নয়। সে অনুবাদ কোন পাঠক কেন্দ্রিক, কোন ভাষাভাষীরা তাঁর লক্ষ্য সেটাও কথা। এ যাবত তা মূলত ইউরোপ কেন্দ্রিক ইংরাজিই যার একমাত্র উদ্ধার। অথচ বিশ্বসাহিত্য ফলছে নানাদেশে নানান ভাষায়- প্রতিনিয়ত। তারজন্য ভাষা ১ থেকে ভাষা ২ এ রূপান্তর কে বা কারা করছেন সেটাও বিষয়।এ ক্ষেত্রে হয় দুটো ভাষার পারঙ্গমতা ছাড়াও সে দুটো ভাষার সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ধারণাও আবশ্যক। একজন বাংলা জানা ইংরেজ তার সে জ্ঞানের উপর নির্ভর করে ইংরাজি কবিতা থেকে বাংলা ভাষায় যথাযথ অনুবাদ করতে পারবে কি? আরেকটি কথা। গদ্য অনুবাদ করা গেলেও কবিতা অনুবাদের ক্ষেত্রে ভাষা ২ এর একজন মৌলিক কবিই হতে পারেন সে অনুবাদক। তবেই পাঠকের সঙ্গে হবে সেই অত্যাশ্চর্য ও পার্থিত সংযোগ।

১৭.আরিফুল রহমানঃআপনার মতে, বিশ্ব সাহিত্যে বর্তমানে কোন প্রবণতাগুলো বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে?

শামীম আজাদঃ বিশ্বসাহিত্যের সাহিত্যের পরিবেশনা প্রক্রিয়া, নির্মান পদ্ধতি, দৃষ্টিকোণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু সবগুলোদিকের প্রবণতা পরিমাপ কী করে করি? আমি জানি মোটে দুটি ভাষা, বাংলা ও ইংরাজি।ইংরাজি ও বাংলায় লেখা ও অনুদিত বিশ্বসাহিত্যের মূল্যায়নে যতোটাই পথ যাওয়া যায় ততটাকেও কিন্তু সমগ্র বিশ্বসাহিত্য বলা যায় না। এখানে মূল ইংরাজি ভাষায় লিখিত সাহিত্য ও সমালোচনা সবই ইউরো সেন্ট্রিক । এতে ইংরাজি ভাষার দাপটে পৃথিবীর অন্যন্য ভাষার সাহিত্য যাচাই বাছাইয়ে কোন স্থান করে নিতে পারেনি এখনো। এ ব্যাপারে আমরা এখনো পোস্ট কলোনিয়াল অবস্থাই কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
আমি আমার নিজের লাইব্রেরিরই সব বইই পড়ে শেষ করতে পারিনি। গত পাঁচ বছরের পুরষ্কারপ্রাপ্ত লেখক বা কবির গ্রন্থও পড়া হয়নি। তবে আমার ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আমি এঁদের কারো কারো গ্রন্থ বা সাহিত্য সমালোচকদের বক্তব্য ও বিতর্ক শুনেছি। মাঝে মাঝে সাহিত্য উৎসব ও সাক্ষাৎকার দেখারও সৌভাগ্য হয়। এছাড়াও নিজে যেহেতু বিলেতে পড়াই, লেখাই, কবিতা পড়ি, শুনি- বহুজাতিক সৃষ্টিশীল কবি লেখক নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আড্ডা আলোচনায় যে ধারণা হয়েছে তা হ’ল, বিষয় হিসেবে-আন্তঃসমাজের জটিলতা, পরিবেশ ভারসাম্যতা, লৈঙ্গিক অসাম্য, প্রক্রিয়া হিসেবে- অডিও বহি, কমিক বুক, গ্রাফিক নভেল, কবিতার পরিবেশনা হিসেবে- স্পোকেন ওয়ার্ডস এসবই প্রাধান্য পাচ্ছে। এখনে যথাক্রমে হ্যান কাঙ, এ্যালান মুর, বেঞ্জামিন জেফানায়ার জনপ্রিয়তার কথা মনে আসছে।

১৮.আরিফুল রহমানঃ একজন কবির লেখালেখির পূর্ব প্রস্তুতি কি হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন ?

শামীম আজাদঃ স্বদেশী-বিদেশী আলোকিত কবিদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনায় দেখেছি তাদেরও এ ব্যাপারটি সমিল হলেও এক নয়। আমি নিজের কথা বলছি।
কবি হয়ে টিকে থাকার জন্য এ আমার এক বহমান, চলমান, বিদ্যমান অবস্থা ও প্রক্রিয়া। আজ থেকে বহু বছর আগে, কবি হবার ঈপ্সা জন্ম নেবার পর থেকেই যখনই কোন ব্যতিক্রম অথবা আটপৌরে অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়তাম সঙ্গে সঙ্গে ‘দেখা, শোনা,ছোঁয়া, পড়া, শোঁকা’র বিষয়কে থাবা দিয়ে ধরে ধরে মনে মনে নানান ভাবে আমার কল্পিত পাঠকের জন্য মূর্ত করে তোলার একটা খেলা খেলতাম। তরুণ সময়ে তা অনেকটা জোর করেই সে খেলাটা করলেও, পরে তা অনেকটা ‘হোম টাস্কের’ মত করলে একসময় দেখি তা কখন অভ্যাস হয়ে গেছে! তাঁরও পরে অভ্যাস হয়েছে অনায়াস। বারংবার পাঠকের কথা মাথায় রাখার সে প্রস্তুতি আর লাগে না মূল সূত্র পেয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই। লেখালেখি নিয়ে লেখকের পরিবেশনা নিয়ে তিনিই কোথাও লিখেছিলেন, এ হচ্ছে ‘আপনার করিয়া পরের করিয়া তোলা’। এ বড় সহজ নয়। পরিশ্রম করে তবে তা আয়ত্বে আসে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই পাঠকভেদেও কিন্তু থাকে কবিতা রসাস্বাদনের বিবিধ প্রস্তুতি।চা যেমন প্রথম চুমুকেই ভাল লাগবেই এমন কথা নেই। পান করতে করতে এক সময় তা নেশা ধরায়।আর আগেই বলেছি কাব্য রসিক ও কাব্য নির্মাতার প্রস্তুতি থাকলেই তাঁদের যুগলবন্দীটা জমে সরের উপর মধুর মত।
তবে কবিতা বা আমার আর যা সৃষ্টিশীল পরিবেশনা বা লেখা তার জন্য একটি বিষয়কে খুব গুরুত্ব দিই- তা হোল ‘পড়া’ এবং পড়া। না পড়লে কোন লেখাই শুরু করতে পারি না। সে গদ্য, পদ্য, গবেষণা, প্রবন্ধ যাই হোক এবং সঙ্গে গান শোনা। পড়তে পড়তেই মাথাটা ক্রমশ একটা ধন্দে পড়ে যায়।যাকে বলা যায় ঘোর। তাই দিয়েই প্রস্তুতির শুরু।


১৯ .আরিফুল রহমানঃ নতুন যারা লিখছেন তাদের সম্পর্কে কিছু বলুন।

শামীম আজাদঃ নতুন কবিদের কি বলব, বলবার কি যোগ্যতা আছে! আমি নিজেই তো প্রতিবারই প্রতিটি কবিতা মাথায় থেকে লিখতে বা নামাতে গেলে নিজেই নবীন কবি হয়ে যাই।কবিতার কিচেনে আমি সেফ হবার আগে নবীন কিচেন পোর্টার হয়ে যাই। উপকরণের সঙ্গে পরিমাণ এবং তারসঙ্গে তাপ, এখানে হবে মনের উত্তাপ বা ভাবাবেগ- সব কিছুর সামগ্রিক ও যথার্থ প্রয়োগ কৌশল আমাকে ভাবায়। কী ভাবে যে কবিতার বানীর সঙ্গে দেহ সংস্থান মেলাবো বা তাদের বিবাহ ঘটাবো সে নিয়ে ভাবনা তো আছেই তার সঙ্গে আরেক যাতনায় পড়ি, তা হ’ল আমি কি নতুন কিছু লিখতে পারলাম? ক্লিশেগুলো ডিঙিয়ে যেতে পেরেছি কি? কোন কিছুই কি আমার স্বকীয় বলে আমার পাঠক সনাক্ত করতে পারবেন? একি আমার একান্তই আমার শুদ্ধস্বর? সে উপমা, বিষয়, ভাব, ভাবনা যেদিক থেকেই হোক. এসবের উত্তর ইতিবাচক না হলে এ আবর্জনা আমদানী না করলে কি হয়! কোন কি ক্ষতি হয়? হয় না।এখানে ঐশ্বরিকভাবে যারা কবি তাদের কথা বাদ দিয়ে বলছি, তারা পঠনা পাঠন ছাড়া অন্য লাইনে কিছু কর্মশালায় প্রশিক্ষণ নিতে পারেন।নবীনরা নিজেকে নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ করে প্রস্তুতি অব্যাহত রাখলেই মোক্ষলাভের সম্ভাবনা।  


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড় (Shikor)

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading