আঁতকে উঠা ভোরে

-জাকিয়া রহমান

এমন একটি প্রভাত! যা কোনদিন ভুলতে পারিনি।

কয়েকটি শিশুর কলহাস্যের ধ্বনি শুনে, সেদিন ঘুম থেকে উঠেছিলাম। মনে হয়েছিল, এই নতুন দিনটি চিরকাল, স্মরণের অলিন্দে একটি ক্ষুদ্র ইটের মত স্মৃতি জমা জীবনের দেয়ালে গাঁথা থাকবে। অবসরে নিশ্চয়ই কখনো মনে করে হয়তো পুনরায় এমনি আনন্দে মন ভরে উঠবে। কিন্তু তা হয়নি! আনন্দের সাথে যোগ হয়েছিল অনাহুত নৃশংসতার এক স্মৃতি। যার তীব্রতা আজও লাঘব হয়নি।

আমরা দুজন প্রবাস পথের যাত্রী। এতোদূরে যাচ্ছি মনের আনন্দের পিছনে হঠাৎ করে কেমনে করে জানি বুকটা মোচড় দেয়- অভূতপূর্ব আশংকায়। সেখানে পথ ঘাট, আবহাওয়া, নতুন মানুষ, অজানা সভ্যতা… সব কিছু আজানা। কোন চেনাজানা মানুষ নেই। মুখের বুলি ইংরেজি। সেখানে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করব আজানা অচেনা ঘাটে বাটে, নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ব। অন্যের বুলিতে ঠোঁট মিলাতে হবে।

এসেছি ঢাকা থেকে খুলনায় চাচা চাচির কাছ থেকে বিদায় নিতে, আর একমাস পরেই আমরা বিলাতগামী হবো। উচ্চ শিক্ষার জন্যে যুক্তরাজ্যে যাব। সে যুগে বিলেত ভ্রমণটা খুবই দুর্লভ সুযোগ ছিল। সবাই যারা পিএইচডি করতে যেতেন, বেশিরভাগই বিদায় নিয়ে আসতেন তিন চার বছরের জন্যে। এর মাঝে বাংলাদেশে বেড়াতে আসার কথা চিন্তাই করতে পারতেন না, যতদিন না তাদের ডিগ্রিটা শেষ হয়ে দেশে ফিরেন। একটি বাড়তি লক্ষ্য থাকে, বেশ একটা ছোটখাটো গাড়ি নিয়ে ফিরবেন। খুব বেশি হলে ডাটসন!

চাচা মায়ের কাছে থেকেছে বার বছর বয়স থেকে। আমার সাথে বয়সের বেশ খানিক ব্যবধান সত্ত্বেও কিছুটা ভাইবোনের মত ঝগড়া বিবাদের সম্পর্ক ছিল। এখন অবশ্য সবকিছু একটু অন্য রকম, চাচা এখন একজন পিতা আর বেশ বড় এক কোম্পানীর কর্মকর্তা। তাই বলে নৈকট্য দূর হয়ে যায়নি।

বিদেশ গিয়ে গবেষণা করব আমারা দুজনেই। বিরাট এক পদক্ষেপ! একটি স্বপন গড়ার পদক্ষেপ। এই স্বপ্ন বলতে গেলে শৈশব থেকে মনে বুনতে শুরু করেছিলাম। যেখানে যাবার জন্যে কষ্ট সাধন করতে হয়েছে। মেধাবী হতে হবে। ভালো একটি বিষয়ে পান্ডিত্য সুনিপুণভাবে সিবন করতে হবে। কোথাও ফাঁক থাকা চলবেনা। কোন কিছুতেই না। কোন সময় নষ্ট নয়- এই ছিল ছাত্র জীবনের নিয়ম কানন। এতো কিছুর পর বিদেশের ইউনিভার্সিটিতে অফার পাওয়া, ভাগ্য লাভ নয়, অধ্যাবসায়ের ফল। না, ভাববেন না গালগপ্প করছি। বা নিজেকে নিয়ে অহমিকা দেখাচ্ছি, তা নয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে আমি। লেখাপড়া করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই আমাদের মত স্বল্প আয়ের পরিবারের ছেলেমেয়েদের।

যাক, এবার সেদিনের সকালে ফিরে যাওয়া যাক। বিছানায় আমাদের দুজনার মাঝের ফাঁকটুকু দখল করে ফেলেছে আমার দুই চাচাত বোন। সাত আর তিন বছেরের দুই মেয়ে শেফালী আর শাপলা। বড় জন ভাই, নাম শিমুল, বেশ বোঝে। তাই সে আর সেঁধিয়ে পরে আমাদের দুজনের একজনকে খাট থেকে উৎখাত করতে বিরত রয়েছে। দাঁড়িয়ে আছে পায়ের কাছে খাটের রেলিং ধরে। কেমন একটি ঘোর বাঁধা ভাব আমার। সদ্য বিবাহিত দম্পতি! কয় বছর প্রেম করে তারপর বিয়ে। সারা রাত কে কাকে আর ঘুমুতে দিয়েছি? শেষ রাতে একটু ঘুমিয়ে পড়েছি দুজন… তারপর হুট করে দরজা গেল খুলে, আর ছোট দুই জন লাফিয়ে বিছানায়, একদম আমাদের দুজনের মাঝে…

হঠাৎ করে ওদের খিল খিল হাসির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে, বুঝতে পারছিলাম না আমি কোথায় এসেছি। পরক্ষণেই মনে পড়ল, এটা খুলনায় চাচার বাড়ি। কলহাস্যে ছুটে আসা ছোট তিনটি ভাই বোনের খুশির সীমা নেই কারণ, আমরা বেড়াতে এসেছি সঙ্গে দুলাভাই, সিরাজ। তাদের ঐ একটি মাত্র দুলাভাই। খুব কম দেখা হয়েছে আগে তবুও, সিরাজ বাচ্চাদের সাথে এতো জমাতে পারে যে, একবার কেউ তার সংস্পর্শে আসলে তাকে ভোলা মুশকিল। কাজেই স্বল্প পরিচয় থাকলেও, সিরাজের কথা তারা ভোলেনি। তাদের মস্তিস্কে সে স্মৃতি গেড়ে বসে আছে। আনন্দের উচ্ছলতায় শেফালী আর শাপলা খাটের উপর জাম্প দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, ওরা ভুলে গেছে খাটখানি ট্রামপলিন নয়। সিরাজ ওদের নিয়ে মেতে উঠেছে। এই একজনা আমার অতি মহান মনের মানুষ। উনাকে না খুঁজে পেলে আমার কোনদিন বিয়ে করা হতোনা বোধহয়।

কত যুগ আগের গল্প জানেন- ১৯৭৫ সাল। সে যুগে মেয়েরা, কুড়িতে হতো বুড়ি। বিয়ের বাজারে আমি ছিলাম আইবুড়ো মেয়ে, বয়স সাতাশ। তার উপর, অল্প কামাইয়ের বাবা। আমি যদি কম শিক্ষিত হতাম তাহলে, কবে বিয়ে হয়ে যেত। বাবার এক বন্ধু তাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন,

– ‘তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে, মেয়ে বোর্ডে স্ট্যান্ড করেছে তা কি হয়েছে? উপযুক্ত বর কেনবার ক্ষমতা আছে তোর? আর আগাতে দিস না। এখনি ক্ষান্তি দে’।

বাবা-মা ব্যতিরেকে, আমরা অতি প্রিয় আর দুজন ব্যক্তি হলো আমার চাচা ও চাচী। দুজন আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। বাড়াবাড়িও চলছে খাওয়া দাওয়া নিয়ে। মাত্র তিনদিনের জন্যে এসেছি। অথচ মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের যত সুস্বাদু মিষ্টি, ফল-টল যা তারা পছন্দ করেন সব আমাদের এই সময়ের মধ্যে খাইয়ে সারবেন। ওদিক থেকে আসছে দারুণ সব রান্নার সুগন্ধ। চাচি খুব ভালো রান্নাবান্না জানেন। তার হাতের সেলাই-টেলাই, রান্নাবান্না আর ঘরকন্নায় যেন যাদু থাকে। রান্নাঘর থেকে আসা শব্দের ঝংকারে বোঝা যাচ্ছে বিরাট এক প্রাতরাশের আয়োজন হচ্ছে। জামাই এসেছে এসব তো হবেই তাইনা?

এর মাঝে আমাদের পরিবারের একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেছে বাবা হঠাৎ করে চলে গেছেন না জানার দেশে। পরিবারে হাহাকার, মায়ের মানসিক অস্তিত্ব একেবারে বাবার সাথে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। তবুও তাঁকে ফেলে আমাকে যেতেই হবে। আমার পরিবারে এখন আমিই একমাত্র উপার্জনক্ষম। সবাই আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে। কাজেই আমাকে যেতেই হবে বিদেশী বৃত্তি থেকে পরিবার চালানোর জন্যে, মা যতই অসুস্থ বা একাকী হোন না কেন? না হলে, পেটে আহার নেই, ভাইবোনদের লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে।

বছরটা ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাস, তারিখ পনের! সেই দিনের ভোরে হঠাৎ করে খোলা জানালার তাকিয়ে দেখি সবুজ গাছের সারিতে ঢাকা দিগন্ত। সামনে সতেজ সবুজ মাঠ। শ্রাবণ মাস তাই আমন ধানের চারা চাষ করা হচ্ছে। দূরে দেখা যায়, কিছু পাকা আউস ধানের মাঠ, কিছু অংশে ধান কাটা হয়েছে। খাল বিলে পানি জমা যদিও কদিন বৃষ্টি হয়নি। আমি বরাবর প্রকৃতির ভক্ত। বাবা সরকারি চাকুরে ছিলেন, আমার কিশোরকালে তিনি বদলী হয়ে ঢাকায় আসেন। সেই থেকে আমরা ঢাকার বাসিন্দা। ঢাকায় চলে আসার পর এমন মায়াবী সবুজের রূপ ছটা দেখতে পাইনি। নিদারুণভাবে একটি হাহাকার মনে পুষে ছিলাম। কোথাও যাবার সময় ও সুযোগ হয়নি। তাই এই নয়নাভিরাম দৃশ্যের দিকে চিত্রার্পিতের মত তাকিয়ে রইলাম।

আমার দিন এমনভাবেই শুরু হলো। আমার সাথে বিছানায় বসে আছে তখন সিরাজ, শিমুল, শেফালী আর শাপলা। সবাই একসাথে সবুজের ফাঁক দিয়ে রক্ত লাল সূর্য ওঠা দেখছি। চারদিকে রশ্মি ছড়িয়ে মনোহর ঐশ্বর্যশালী সূর্যটা গাছের সারির মাঝ দিয়ে আঁকছে উজ্জ্বল লাল একটি টিপ। ধীরে বড় হয়ে উঠছে সে টিপ এক উতপ্ত গোলোকে আর বাড়ছে ঔজ্জ্বল্য। হঠাৎ করে শিমুল চিৎকার করে বলে উঠল,

– দেখো! দেখো! একদম বাংলাদেশের পতাকার মত। সবুজের মাঝে লাল সূর্য!

ওদের সবার মুখখানি দারুণ আনন্দে উচ্ছ্বাসিত। আমার ভীষণ গর্ব হলো। শেফালী আর শাপলা দুজনেই সে দৃশ্য দেখে হাত তালি দিয়ে বলতে শুরু করল,

– দেখো বাংলাদেশের পতাকা! বাংলাদেশের পতাকা!

বলে দুজনেই মেঝেতে নাচতে শুরু করল।

বাংলাদেশ কত কষ্টের অর্জন। আমাদের দেশ, আমরা নিয়ে এসেছি। বাংলাদেশ কত দুঃসহ অশান্তি, কত যাতনা মধ্যে আমরা যুদ্ধ করে এনেছি। আমাদের সোনার এই বাংলাদেশ আমি কাজিনদের বললাম,

– তোমরা জানো এই পতাকার জন্য…

সাত বছরের শিশু শিউলি কল কল করে বলে উঠলো। বলতে বলতে বিছানার উপরে দাঁড়িয়ে, মাথার উপর হাতটা তুলে বললো,

– ‘জয় বাংলা! আমাদেরকে আব্বা বলেছেন যুদ্ধের সময় তোমরা সব কোথায় পালিয়ে গিয়েছিলে, অনেক কষ্ট করেছো। আমি জানি! জানি! আমি বুঝি তোমরা যুদ্ধ করে এনেছ এই বাংলাদেশ’।

তিন বছরের শিমুল ভাঙ্গা বুলিতে ওদিকে থেকে বলে উঠল,

– দেকো! দেকো! সূযযি মামা আরো বড় হচ্চে! এখন তত্যিকারে একটা বাংগাদেতের পতাকা তাইনা!

আমি দেখলাম মনে হল, যেন পৃথিবী জুড়ে সবুজের মোহ মায়ায় সেই লাল সূর্যের আগমন। এক আশ্চর্য প্রতিভাত বাংলাদেশের পতাকা সূর্য নিয়ে এসেছে। এই লাল সূর্য আমাদের দিয়েছে আমাদের অতি আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদশ। আমি একটু ভাবনায় হারিয়ে গিয়েছি, সেসব দিনের কথা চিন্তা করতে গিয়ে। সহসা শুনতে পেলাম চাচি ডাকছেন। বেশ জোরেই ডাকছেন। কারণ, তিনি কয়বার ডেকেও সাড়া পাননি। সবাই আমরা এত উৎফুল্ল মনে কথা বলছি আর হাসছি। ভক্ত পুঁচকে বাংলাদেশীরা পতাকার গর্বে উচ্ছল। ওদিকে শিমুল গান ধরে ফেলেছে,

– ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি…

সে শব্দটা ছাপিয়ে চাচির গলা শোনা গেল উনি শিমুলকে ডাকছেন,

– খোকন! খোকন! আয় তো এদিকে। তোকে একটু দোকানে যেতে হবে, আমার চিনি ফুরিয়ে গেছে আর আজকের পেপারটাও এনে দে। কাঁচাগোল্লাও নিয়ে আসিস’।

বাসার উল্টো দিকেই কিছু দোকানের রয়েছে সারি ধরে। সেখানে অনেক সকালেই হয়তো শুরু হয়ে গেছে বেচাকেনা। হয়তো শুরু হয়ে গেছে রোজকার মত নানা রকম ভাজি, পরোটা, হালুয়া বানিয়ে বিক্রির তারাহুড়ো। মিষ্টির দোকান আছে- একদম টাটকা রসগোল্লা সকালে আসে আর চাচীর ইচ্ছা আমাদের অসম্ভব সুস্বাদু কাঁচাগোল্লা খাওয়াবেন। গতরাতে গরুর মাংসের কাবাব তৈরি করে রেখেছেন। সঙ্গে রয়েছে বেগুন ভাজি আর আলুর দম। সেইসাথে কুড়মুড়ে পরোটা। তার হাতের রান্না অসম্ভব সুন্দর। মনে হল, ক্ষিদে এবার সত্যি চাড়া দিয়ে উঠছে।

মনে পড়ছিল তখন, আমাদের ’৭১ মুক্তি যুদ্ধের ক্রান্তি কালের কথা। বিস্তর দূরত্ব পায়ে হেঁটে আমরা শেষ পর্যন্ত আসতে পেরেছিলাম ভারতের সীমান্তে। সঙ্গে কোন খাবারই ছিল না। দিনাজপুর বসবাসকারী একদল শহুরে মানুষের কাফেলায়, আমরা রিফিউজি। অজানা একদল মানুষ শহর ছেড়ে এলো জান বাঁচানোর জন্য। হাঁটা শুরু অজানের উদ্দেশে। দীর্ঘ ঊনিশ দিন হাঁটতে হয়েছিল। কোথাও কাউকে চেনা জানা ছিল না। গ্রামবাসী অনেকে আমাদের উপর দয়া পরবশ হয়ে কিছু খেতে দিয়েছিল সময় সময়। সীমান্তে পৌঁছাতে প্রায় দুদিন হাঁটলাম। আমরা অনাহারে কাতর। দারুণ ক্ষুধায় জ্ঞান হারানোর মতো অনুভূতি। তখন মনে পড়ল, সেদিন যদি ওই কাবাবগুলোর একটা কাবাব খেতে পেতাম আর এক গ্লাস ঠাণ্ডা পরিস্কার পানি! দীর্ঘশ্বাস পড়ল আমার। মনে মনে ঠিক করে নিলাম, এসব কথা আর ভাববো না। বাবার কথা মনে করে নির্জনে চোখের জল ফেলব না। ইস! মা যদি আবার আগের মত করে হাসতো আর চমৎকার সব গল্প শোনাত!

মনে মনে ঠিক করলাম এসব কষ্টের কথা এই তিনদিন মনে করবো না। সবার সাথে আনন্দে মেতে থাকবো। বুক থকে জমাট বেদনাগুলি ছেড়ে ফেলার উদ্দেশ্য নিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালাম। ঢুকেই বললাম,

– চাচি, কোন হেল্প লাগবে?

চাচি বেশ মজা পেলেন মনে হয়, তার পড়ুয়া ভাতিজি একেবারে গিন্নির মত কথা বলছে,

– তুই আবার কি করবি এখানে? সব হয়ে গেছে, আমিনা টেবিল সাজাচ্ছে। শিমুল কাঁচাগোল্লাটা আনলেই সবাই বসে যাব।

খাবার ঘরের দিকে উঁকি মেরে দেখলাম, টেবিল ভরে গেছে। প্রাত ভোজনটা খুব জমে উঠবে সন্দেহ নেই।

আবার জানালার দিকে ফিরে দেখলাম সূর্য মাথার উপর উঠতে শুরু করেছে। সবুজের মাঝে বাংলাদেশের পতাকার মতন আর দেখা যাচ্ছে না। যে প্রকৃতি আর আকাশের মাঝে অনবদ্য এক ছবির মত বাংলার রূপশ্রী আমাদের গর্বের পতাকা দেখেছিলাম তা যেন মিলিয়ে গেছে। ওদিকে শিমুল দৌড়ালো দোকানের দিকে মায়ের ফরমাস মত চিনি আর কাঁচাগোল্লা কিনে আনতে। আমি কৌতুক করে বললাম,

– দেখিস শিমুল চিনি আনতে গিয়ে লবন আনিস না যেন! আর কি মনে আছে তো?

– বুবু! তুমি খালি জোক করো!

বলে দৌড় দিল দোকানের দিকে।

চাচি খাবারঘরে বসতে বললেন আমাদের দুজন, শিউলি আর শাপলাকে। অবশ্যই শাপলা আমার কোলে উঠে বসল আর শিউলি সিরাজের পাশে দাঁড়িয়ে, দুজনেরই বায়না তখনই গল্প বলতে হবে। আমি বললাম,

– ‘কিসের গল্প শুনতে চাও’?

শিউলি দারুণ উৎসাহ নিয়ে বলল,

– ‘বাংলাদেশ আনার কথা বলো না? তোমরা কত কষ্ট করেছো আব্বা বলেছেন। তোমার মুখে শুনতে চাই।

– দূর বোকা এখন আমরা নাস্তা খাব মজা করে। যা খুশবু আসছে! ক্ষিদে পায় না তোমাদের?

দুবোন একসাথে মাথা দুলিয়ে আমার কথায় সম্মতি দিল।

– বোকা মেয়ে তোমরা! গল্প পরে আগে পেট পুরে খেয়ে নাও। তোমরা খুব ছোট ছোট মানুষ এসব কথা পরে শুনবে। আর একটু বড় হয়ে নাও। তখন বুঝবে…

ওরা আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। আরেক জন বলে উঠলো,

– ‘তাহলে, ওই গানটি গেয়ে শোনাও না!

অবুঝ সব! ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বড় মায়া লাগল। এমন সময় দারুণ চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ভীষণ বেগে দৌড়ে শিমুল বাড়িতে ঢুকল। আমরা সবাই দৌড়ে এলাম। সে প্রায় ধারাস করে আঙিনায় পড়ে যাচ্ছিল। চাচা ধরে ফেললেন। ছেলের অবস্থা দেখে চাচির ফিট হবার যোগাড়। সিরাজ জোরে ওকে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

– ‘কি হয়েছে? কি হয়েছে? এতো ভয় কিসের? তুমি রীতিমত কাঁপছ…

হাতে ধরা সংবাদপত্র এগিয়ে দিয়ে বলল,

– ‘ওরা মেরে ফেলেছে সবাইকে… বঙ্গবন্ধুকে ওরা… দোকান আজ সব বন্ধ… একটি ছেলে কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল… সবাইকে দিয়ে দিচ্ছে… আম্মা তোমার চিনি, রস …

বলতে বলতে শিমুল জ্ঞান হারাল। আমরা স্থবির… মনে হল, আমরা সবাই অনাথ…


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড় (Shikor)

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading