অন্ধকার

তমোঘ্ন নস্কর

শালবনী থেকে সুদূর চল্লিশ কিঃমিঃ দূরে আড্ডাবাড়ি গ্রাম। সেই গ্রামের চারদিক সবুজ আর শান্ত ছায়ায় ঘেরা।
রসুল মিঞা একটা ছোটো মাটির দালানে বসে ঝিমোচ্ছে। শীতের সকাল তাও ভোর ভোর উঠে মাঠে যেতে হয়। বেলা হলে পেটে দানাপানির সাড়া জাগলে ধীর পায়ে ফিরে আসে।
এই গ্রামে শান্তির সাথে আছে দারিদ্রতার মায়াজাল।
মুখে হাসিটাও অনেক কষ্টে বেরোয় যখন শহরের বাবুরা ছবি করতে আসেন।
রসুল মিঞার শরীর অনেক ক্ষীণ হয়ে এসেছে।
বয়স অন্তত আশি ছুঁই ছুঁই। শরীরে জোর নেই তবু দিন রাত মেহনত করতেই হবে কেননা পেটের জ্বালা বয়স দেখে না।
সেই ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে সংসার দাঁড় করিয়েছে। কালে কালে মা ভাইকে হারিয়ে একা হয়ে গেলো যখন বয়স চল্লিশের ঘরে।
অগত্যা বিয়ে করতেই হলো। একা থাকার কষ্ট সহ্য হয় নি বোধ হয়।
তার পর বেশ কাটছিলো দিন রাত।
দুটো ছেলে হলো। তাদেরকে ভালোভাবে মানুষ করে বিয়ে দিলো। ব্যস তার এক বছর ঘুরতে না ঘুরতে ছেলেরা দেখাশোনা বন্ধ করে দিলো।
ভাগ্যের কি পরিহাস!
স্ত্রী এই চিন্তা ভাবনায় ডুবে একদিন হটাৎ ঘুমিয়ে পড়ল চির নিদ্রায়।
তখন আড্ডাবাড়ির একটা বাড়িতে একটা মানুষ সম্পূর্ণ একা হয়ে গেলো।
আসলে ভালো মানুষরা চিরকাল একা। দোসর হারানোর কষ্টে কয়েক ফোঁটা জল এসেছিলো সেদিন। আত্মীয় বিরহে যতটুকু ঝরে আর কি!
একটা চাপা যন্ত্রনা বুকের মধ্যে মাতলার ঢেউয়ের মতো উথাল পাথাল হলো তবু কেউ টের পেলো না।
সন্তানদের জন্য রসুল মিয়া এক কাপড়ে লজ্জা ঢেকেছে। গায়ের রক্ত মাটিতে মিশিয়েছে তবু আল্লাহ তাকে এমনই নাটকে অভিনয়ে পাঠিয়েছেন যে বোবার মতো বাঁচতে হচ্ছে।
মিঞাকে আল্লাহ মূকাভিনয়ে পাঠিয়েছে বলেই নীরবে চোখের জল নামাজে মিশিয়ে দিচ্ছে রোজ। শরীরে শিকড় বুনে মাটিতে হতাশা ছড়িয়ে একটা মানুষ আয়ুর সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে দিনরাত শালের জঙ্গলে।

যাই হোক এখন মিঞা জঙ্গলে যাবে। বস্তা রেখে এসেছে সক্কাল সক্কাল। লুঙ্গির ভাঁজে বিড়ি নিয়ে মাথায় গামছা ফেলে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে চলেছে শালের জঙ্গলে।
রোজ পাতা কুড়িয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছে।
একা একটা মানুষ সারাদিন সংসার ছেড়ে পালাতে চায়, তবু নিঃশ্বাস ফিরিয়ে আনে সন্ধ্যে হলেই। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া পালানোর রাস্তা যে নেই। পাতা কুড়োনোর আগে স্বভাব বসত বিড়িখানা ধরিয়ে অনেক কষ্ট করে টানতে টানতে বুকে হাফ ধরেছে কারণ গতকাল সন্ধে থেকে শুধু দু গ্লাস জল পড়েছে পেটে। বৃষ্টির জল, কান্নার জল আর পানীয় জল সবই এক শুধু আলাদা আলাদা হয়ে ফিরে আসে তার কাছে। এই বয়সে এটা শরীর সহ্য করেই বা কি করে!
যে সন্তানদের নিজের অন্ন তাদের মুখে তুলে দিয়ে পেটে খিদে নিয়েও মুখে হাসি পুষে ঘুমিয়েছে আজ তারা অন্ন তো দূর ঘরের চৌহোদ্দিতেও ঠাঁই দিলো না।
চোখের জল চোখেই শুকোয়। সাক্ষী থাকে সকালের রোদ, পড়ন্ত গোধূলি,রাতের অন্ধকার আর ভোরের শিশির।
প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকাটাই এখন তার কাছে মৃত্যুর চেয়েও কষ্টকর।
বস্তা ভরে এসেছে প্রায়। কিন্তু আজ বস্তা টানার ক্ষমতা নেই। চোখের সামনে ভোরের কুয়াশা নামছে। মাথায় ঝিম ধরে গেছে। এখন সন্ধ্যের মুখে জঙ্গল ফাঁকা হয়ে এসেছে।
নামাজের সময় হয়ে এসেছে তাই বস্তা টানতে টানতে এগোচ্ছে। হটাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলো সজোরে গাছে মাথা ঠুকে।

মুখ থেকে একটাই কথা অনেক যন্ত্রনায় বেরিয়ে এলো ——“আল্লাহু আকবর।”
বস্তা পড়ে রইলো। ভবের শিকড় কেটে চলে গেলো মিঞা ঘন জঙ্গলে।
এই জঙ্গল ই তার আত্মীয়। তাই নীরবে জঙ্গলের সন্ধ্যায় ডুব দিলেন।
গত জন্মের সমস্ত পাপ আর ইহ জন্মের সমস্ত স্বপ্ন এই শালের বুকে রেখে গেলো।
মিঞার মনের অন্ধকার আর জঙ্গলের অন্ধকার মিলমিশ হয়ে তাকে দিচ্ছে অনন্ত প্রশান্তি।
সব অন্ধকার ডুবে গেলো অন্ধকারেই।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

One response to “তমোঘ্ন নস্কর”

  1. সুন্দর লিখেছিস তমোঘ্ন 👌 নামকরণ স্বার্থক। গল্পের সঙ্গে মানানসই একেবারে। খুব ভালো লাগলো পড়ে।

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড় (Shikor)

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading