যেসব নারীচরিত্র আমার দেখা হয়নি কোনোদিন

কণাদ মুখোপাধ্যায়

দিনভর রোদ্দুর ছেনে সন্ধ্যায় দু’হাত ভরে নুড়িপাথর তুলে বাড়ি ফিরত আমার বাবা। মা সেগুলি শিউলি ফুল করে তুলত হাতের ছোঁয়ায়, গোপনে। এক একটা থালায় নক্ষত্রের মতো ফুটে থাকা শিউলি ফুল বেড়ে মা এগিয়ে দিত আমাদের দুই ভাই-বোনের দিকে, আসন পেতে বাবু হয়ে বসে থাকা বাবার সামনে। হাঁড়িতে আর শিউলি ফুল আছে কি না সে বরাবর রহস্য থাকত আমাদের কাছে। কিন্তু বাড়তি দু-এক হাতা চাইলেই সেই রহস্য ভেঙে যেত। হাঁড়িতে হাতা ডুবিয়ে অনন্ত নক্ষত্রবীথি থেকে আমার মা তুলে আনত ধবধবে সাদা অন্ন। আমাদের থালা আবার ভরে যেত। মা খেত সকলের শেষে। মায়ের জন্য কতটা থাকত ভাত?
খেয়েদেয়ে আঁচিয়ে আমরা ভাইবোনে ততক্ষণে দৌড়ে উঠে যেতাম তক্তাপোশে। মা রোজ কতটা ভাত খেতে পেত তা দেখা হয়নি কোনোদিন।
যৌথ সংসারের বাড়িতে সন্ধ্যায় যখন আমরা ভাইয়েরা মিলে বইখাতা নিয়ে বসে পড়তাম, তখন আমাদের দিদি-বোনেরা বসত হারমোনিয়াম নিয়ে। তারা সরগম অভ্যাস করত। খেয়াল-টেয়াল গাইত। অভ্যাসের বশে দিদি-বোনেরা কেউ রবীন্দ্রসঙ্গীতে, কেউ নাচে পারদর্শী হয়ে উঠল। আমরাও কালক্রমে কলেজ-ইউনিভার্সিটি পেরোলাম। অভ্যাসের বশে কেউ ভালো, কেউ মোটামুটি ছাত্র হলাম।
কিন্তু দিদি-বোনেদের কেউ কেউ বা সকলেই যদি মন দিয়ে শুধুমাত্র পড়াশোনাটা করতে পারত, তা হলে তারা কতদূর যেতে পারত? এসব আমাদের জানা হয়নি কোনোদিন।
বাবা আমার বিয়ের ঠিক করেছে এক অধ্যাপকের সঙ্গে। তিনি ইঞ্জিনিয়র। বাবা বলেছে, তুই আর্টসের ছাত্রী। আর তোর বর হবে বিজ্ঞানের। এতে তোদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনেক নিরাপদ হবে। কেরিয়ার নিয়ে ওদের কোনোদিন ভাবতেই হবে না। আমাকে সেই ছেলেকেই বিয়ে করতে হবে। তোমার আর আমার দেখা হবে না কোনোদিন। এই দেখাই শেষ দেখা। এই বলে চোখের জল লুকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল আমার প্রেমিকা। আমি তখন কাঠবেকার। এখন ভাবি, আমার আর তার সন্তান পৃথিবীতে যদি আসত তারা কী হত? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়র, কবি, ঔপন্যাসিক, কৃষক, শ্রমিক, না কি শুধুমাত্র একজন মানুষ? এসব আমার জানা হবে না কোনোদিন।
একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। বিয়ে করেছি। সারাদিন খেটেখুটে বাড়ি ফিরি। কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় মনে অনেক উচ্চাশা ছিল। তার পর বছর দশেক নানা ঘাত-প্রতিঘাতে কেটেছে। কিছুটা জীবন চিনেছি। এখনও অনেকটা জীবন অদেখা থেকে গিয়েছে। রহস্যে মোড়াও রয়ে গিয়েছে। আর মনের মধ্যে পোষা উচ্চাশাটাও এখনও পুরোপুরি মরেনি। মাঝে মাঝেই বীজ থেকে অঙ্কুর বেরনোর মতো করে মাথা তোলে। আমি তার বড় হওয়ার খিদে মেটাতে না পেরে হতাশায় ডুবে যাই।
অফিসে সহকর্মী পিয়ালীকে নিয়ে চা খেতে যায় বিক্রম। ওরা সিনেমা দেখে। ও অ্যাকাউন্ট্যান্ট। অনেক টাকা বেতন পায় বিক্রম। আমিও পিয়ালীকে নিয়ে চা খেতে যেতে চাই। সিনেমা দেখতে যেতে চাই। ও চাইলে দু-এক দিন মন্দারমণি বেড়াতে যেতে পারি বা শান্তিনিকেতনে দোল খেলতে যেতেও পারি। কিন্তু অর্থ ছাড়া এসব সম্ভব নয়। বিক্রমের টাকা আছে। তাই ও সেটা করতে পারে। আর আমি ঈর্ষায় দাউদাউ করে পুড়ি। মাথার ভিতর চিতার আগুন জ্বলে। পিয়ালী কি আমাকে নিয়ে কিছু ভাবে? এসব আমার জানা হয়নি কোনোদিন।

অফিসের সব হিসাব মিলিয়ে বসকে বুঝিয়ে দিয়ে রাতে হাওড়া থেকে বাড়ি ফেরার ট্রেন
ধরি। স্টেশনের বাইরে থেকে সস্তার হুইস্কি কিনি। দশ টাকার জলের বোতল অর্ধেক খালি করে তাতে হুইস্কিটা মিশিয়ে দিয়ে লোকাল ট্রেনের ভেন্ডর কামরায় উঠে পড়ি। বাদাম-চানাচুরওলার থেকে দুটো প্যাকেট কিনি। তারপর বোতলের মদ একটু একটু করে গলায় ঢালি। দু-চারটে করে বাদাম মুখে ভরি। আবার মদ খাই। পকেট থেকে সিগারেট বার করে জ্বালিয়ে বড় করে টান দিই। গলগল করে ধোঁয়া ছাড়ি। নেশার ঘোরে বুঝতে পারি, ধোঁয়ার সঙ্গে বাতাসে মিশে যাচ্ছে আমার বিসর্পিল হতাশা। আমার মধ্যে থেকে যাচ্ছে সেই হতাশার কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা ছাঁচটা।

রাতে স্টেশনে টলমল পায়ে হাঁটি। বাড়ির দরজায় পৌঁছে কলিং বেল বাজাই। আমার স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়েছিল। সারাদিন সংসারের জন্য খাটাখাটনি করে। ওকে পরিচারিকার মতো মাস গেলে টাকা দিতে হলে আমি ফতুর হয়ে যেতাম। আমার সামান্য বেতনে কুলোত না কিছুতেই। এই সময়টায় ও অঘোরে ঘুমোয়। তাই দরজা খুলতে দেরি করে ফেলে। আমি ঘরে ঢুকে চোখ লাল করে ওর সঙ্গে আগের দিনের মতো অশান্তি শুরু করে দিই। ও দুটো একটা কথা বলার চেষ্টা করে। আমার মাথাটা আচমকা গরম হয়ে যায়। অফিসের ব্যাগটা বাঁহাতে টেবলে রাখতে রাখতে আমি ডানহাত তুলে ওকে সজোরে চড় মারি। ওর মুখটা ডানদিক থেকে বাঁদিকে ঘুরে যায়। ডান গাল নয়, ওর মুখের বাঁদিকে কত আলপনা তৈরি হয়েছে তা আমার দেখাই হয়নি কোনোদিন। বাড়িতে চেঁচামেচি শুনে আমার বছর পাঁচেকের মেয়েটায় ঘুম ভেঙে যায়। ও অবাক হয়ে সবকিছু দেখতে থাকে। বড়বড় চোখ করে ও কী দেখছে? তাও আমার জানা হবে না কোনোদিন। মুখ লুকোতে আমি বাথরুমে ঢুকে পড়ি।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড় (Shikor)

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading