সম্পাদকীয়
নববর্ষ আবারও উপস্থিত—কিন্তু এই আগমনকে নিছক ‘উৎসব’ বলতে পারছি না কিছুতেই। সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই নতুন হতে পেরেছি? কতটা এগিয়েছি আমরা? এবারের নববর্ষ কেবল উদযাপনের নয়, বরং এক কঠিন আত্মোপলব্ধির। যখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কোনো শিশু ধ্বংসস্তূপের নিচে দাঁড়িয়ে তার কচি দুটি হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আকাশের দিকে, তার দুই চোখে ‘সভ্যতার’ দেওয়া কাতর কান্না—তখন আমাদের এই আনন্দ-আয়োজন ম্লান হয়ে যায়। জীবন ও সাহিত্যের দর্পণে এই রূঢ় বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া অপরাধের শামিল।
পৃথিবীর মানচিত্রে এই মুহূর্তে যে রেখাগুলি টানা হচ্ছে, সেগুলি কেবল ভৌগোলিক সীমানা নয়—সেগুলি রক্তের, দহনের এবং গভীর অমানবিকতার চিহ্ন। যুদ্ধ আজ আর কেবল রাষ্ট্রের কৌশল নয়, এক ধ্বংসাত্মক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই আজকের এই সম্পাদকীয় কোনো লঘু আনন্দের বার্তা বহন করতে অপারগ। যুদ্ধের আয়োজনে কেবল প্রাণহানি ঘটে না; বোমারু বিমান থেকে নির্গত বিষবাষ্প, মিসাইল আর গোলার আঘাতে ছারখার হওয়া বনভূমি এবং সমুদ্রের জলে মিশে যাওয়া রাসায়নিক আমাদের পরিবেশকে ঠেলে দিচ্ছে এক অনিবার্য বিনাশের দিকে। আজ আকাশ-বাতাস ছেয়ে গেছে যুদ্ধের কার্বন-পদচিহ্নে। বিস্ফোরণের শব্দ মিশে গেছে প্রকৃতির স্বরলিপিতে, যার প্রত্যাঘাত এসে পড়ছে আমাদের প্রতিদিনের নিঃশ্বাসে। বায়ু, জল, মাটি—সবই যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধে ক্লান্ত।
এই প্রেক্ষাপটে নববর্ষের উল্লাস উচ্চারণ করা মানে এক ধরনের দায় স্বীকার করা; আমরা উদযাপন করতে চাই, কিন্তু সাম্প্রতিক বিপত্তিকে ভুলে নয়, নৃশংস অতীতকে অস্বীকার করে নয়। কারণ, ভুলে যাওয়া মানেই তাকে মেনে নেওয়ার এক ধরনের মৌন সম্মতি। আমরা যারা কলম ধরি—কবিতা, গল্প ও গদ্যের শরীরে যারা সময়কে ধরে রাখতে চাই তাদের জন্য এই নববর্ষ নিছকই কোনো রঙিন পৃষ্ঠা নয়; এটি এক দায়বদ্ধতার শপথপত্র। শব্দ এখানে আর অলংকার নয়, শব্দ একেকটি অবস্থান, একেকটি প্রতিরোধ।
এই সংখ্যায় যারা লিখেছেন, আপনাদের প্রত্যেকের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। আপনারা যে শব্দগুলি রেখে গেছেন, সেগুলি কেবল সাহিত্য নয়, সময়ের দলিল। অস্থিরতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আপনারা যে সংবেদনশীলতার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন, তা নিছক সৃজন নয়, বরং এক নৈতিক সাহস। পাঠকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা; কারণ পড়া মানে কেবল গ্রহণ নয়, পড়া মানে অংশগ্রহণ। এই অশান্ত পৃথিবীতে যিনি আজও শব্দের দিকে ফিরে তাকান, আমার বিশ্বাস তিনি আসলে মানবিকতার পক্ষেই দাঁড়ান।
এই নববর্ষ একাধারে উল্লাসের এবং শোকের। আমরা বেঁচে আছি, কিন্তু এই বেঁচে থাকা নিঃশর্ত নয়। শুধুমাত্র দিনপঞ্জি না বদলে আপামর মানুষসমাজ বরং বদলে ফেলুক দৃষ্টিভঙ্গি; কাঁধে তুলে নিক পৃথিবীকে ভবিষ্যতের বাসযোগ্য করে তোলার দায়িত্ব। নতুন বছর আসুক আমাদের আরেকটু কঠোর হওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে—নিজের প্রতি, সমাজের প্রতি এবং সময়ের প্রতি। আমরা নতুন করে শিখে নেব আনন্দের মধ্যেও জেগে থাকা এবং দুঃখের মধ্যেও আলো বহন করার মন্ত্র।
নববর্ষ আসলে কোনো উল্লাসের শেষ কথা নয়; নববর্ষ হলো এমন এক সূচনা যখন আমাদের প্রত্যেককেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে হয়।
সকলকে জানাই শুভ নববর্ষ। মঙ্গলময় হোক আগামী।
পিয়াল রায়
সহ-সম্পাদক, শিকড়





এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান