কবি, গবেষক, লোকসংস্কৃতিবিদ ও অধ্যাপক
বাংলা সাহিত্যের সমকালীন স্রোতে তিনি এক বিরল শব্দ সৈনিক মোস্তাক আহমাদ দীন। তিনি কেবল একজন কবি নন; তিনি একাধারে লোকসংস্কৃতির সংগ্রাহক, চিন্তাবিদ, গবেষক, অনুবাদক এবং এক নিবিড় মননশীল শিক্ষক, যার জীবন ও কর্ম মিলেমিশে এক লোকজ-মননের সাংস্কৃতিক পুনরাবিষ্কারক। শিকড়, শব্দ আর সুরকে যিনি রূপান্তর করেছেন কাব্যভাষায়; পল্লিগাথা ও জীবনদর্শনের প্রাচীন তরঙ্গকে ফিরিয়ে এনেছেন আধুনিক পাঠকের কাছে, সাহিত্যিক পরিশ্রম ও মেধার দুর্লভ সংমিশ্রণে।
লোকগানের ঢেউ, শ্লোকের শব্দবৃষ্টি আর বাউল-বাউলিনী কণ্ঠের কান্না-হাসির ভিতর দিয়েই কবি মোস্তাক আহমাদ দীনের বেড়েওঠা। লোকায়ত বাংলার অন্তঃসলিলা যে স্রোত, যেখানে মাটি, মানুষ, গান ও গোপন আত্মার সুর একাকার হয়ে যায়, সেই স্রোতের এক নিবেদিত যাত্রী মোস্তাক আহমাদ দীন। তাঁর জীবন যেন এক দীর্ঘ নদীযাত্রা, যার উৎস সুনামগঞ্জের বাউল-ফকির-অধ্যুষিত জনপদে, আর যার মোহনা বিস্তৃত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বহুমাত্রিক জগতে।
জন্ম সুনামগঞ্জের সেই অঞ্চলে, যেখানে মেঘের নীচে বাজে দোতারা, আর লোকশিল্পের ঘ্রাণ লেগে থাকে হাওরের হাওয়ায়। শিক্ষক-দম্পতির সন্তান হিসেবে তাঁর শৈশব জ্ঞান আর শব্দের সাহচর্যে গড়ে ওঠেন। বাবার বইয়ের তাক, মায়ের খাতার পাতায় লেখা প্রবাদ-প্রবচন, লোককথা ও মহাজনপদ, এসবই ছিল তাঁর শৈশবের পাঠশালা।
লোকসংস্কৃতি ও কবিতার জলছবি আঁকা সৃজনসাধক কবি মোস্তাক আহমাদ দীন। ১৯৭৪ সালে সুনামগঞ্জ জেলার লোকায়ত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া মোস্তাক আহমাদ দীনের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এক বিশেষ সাংস্কৃতিক আবহে। এই ভূখণ্ডে নদী যেমন গান গায়, তেমনি মানুষও গানের মধ্যেই নিজের জীবনকে চিনে নেয়। হাওরের জলে প্রতিফলিত আকাশের মতোই তাঁর শৈশব ছিল উন্মুক্ত, অথচ গভীর।
তাঁর বাবা-মা দুজনেই ছিলেন শিক্ষক। শিক্ষার শৃঙ্খলা ও মানবিকতার যে মিশ্র রস, তা তিনি পেয়েছেন পারিবারিক পরিবেশ থেকেই। কিন্তু বাবার অকাল প্রয়াণ তাঁর জীবনে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে, যেন হঠাৎ কোনো বৃক্ষের মূল ছিঁড়ে গেলে যেমন মাটির ভেতরে এক অদৃশ্য কম্পন তৈরি হয়। সেই শূন্যতাকে পূরণ করে বাবার রেখে যাওয়া বইয়ের সংগ্রহ, যা তাঁর কাছে হয়ে ওঠে জ্ঞানের প্রথম তীর্থক্ষেত্র।
অন্যদিকে তাঁর মা ছিলেন এক নিভৃত সাধিকা। খাতায় খাতায় লিখে রাখতেন পল্লিবাংলার প্রবাদ, শ্লোক, লোকউক্তি, আর মহাজনদের পদাবলি। তাঁর কণ্ঠে ভেসে উঠত মরমি সাধকদের গান, যেখানে দেহতত্ত্ব, প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা একাকার হয়ে যায়। শিশুমনে এই গানগুলো যেন বীজের মতো বপিত হয়েছিল, যার অঙ্কুরোদ্গম পরবর্তীকালে দীনের সাহিত্যজগতে বিস্তৃত হয়ে ওঠে।
ছোটবেলা থেকেই তিনি শুনেছেন স্থানীয় লোকগায়কদের গান, কিচ্ছা, কাহিনি, যেখানে ইতিহাস নেই, অথচ আছে জীবনের গভীরতম সত্য। এইসব অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, লিখিত ইতিহাসের বাইরেও এক বিশাল জগৎ আছে, যা মানুষের স্মৃতি, গান ও কথনের ভেতর বেঁচে থাকে।
এই কারণেই আশৈশব কবিতামগ্ন থাকা সত্ত্বেও তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার শুরু হয় সম্পাদনার মধ্য দিয়ে। তাঁর প্রথম দুটি প্রকাশিত বই—‘পরার জমিন’ (মকদ্দস আলম উদাসী) এবং ‘নির্বাচিত গান’ (আবদুল গফ্ফার দত্তচৌধুরী) প্রকৃতপক্ষে লোকঐতিহ্যের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার প্রথম সাক্ষ্য।
এরপর তিনি একের পর এক সম্পাদনা করেছেন ফকিরি তত্ত্ব ও লোকসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ—মুন্সী আশ্রফউদ্দিনের ‘ফকির বিলাশ’, শাহ মজিরউদ্দিন আহমদের ‘ভেদ জহুর’, ফকির সমছুলের ‘আশিকের রত্নসমগ্র’ ইত্যাদি। এসব গ্রন্থ শুধু সম্পাদনা নয়; এগুলো উদ্ধারকাজ, যেন মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রাচীন শিলালিপি পুনরাবিষ্কার।
লোকসংস্কৃতিবিষয়ক তাঁর গ্রন্থ ‘আটকুঠুরি’ ও ‘মাটির রসে ভেজা গান’, এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক মানচিত্রকে নতুনভাবে চিনতে সাহায্য করে। তাঁর এই অবদানের জন্য তিনি শিল্পকলা একাডেমির লোকসংস্কৃতি পদকে ভূষিত হন, যা কেবল একটি সম্মান নয়, বরং তাঁর সাধনার সামাজিক
সেই শিকড় থেকেই জন্ম নিয়েছে তাঁর কবিতার দিগন্ত, গবেষণার গভীরতা। যদিও আশৈশব কবিতামগ্ন, প্রকাশিত প্রথম দুটি বই ছিল সম্পাদিত লোকগানের সংকলন—পরার জমিন এবং নির্বাচিত গা। তারপর একে একে প্রকাশিত হয় ফকিরি তত্ত্বের দুলর্ভ পুঁথি ফকির বিলাশ, ভেদ জহুর, আশিকের রত্নসমগ্রসহ আরও বহু গ্রন্থ। তাঁর সম্পাদিত ও প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ বাউল-ফকির সাহিত্য ও বাংলা লোকসংস্কৃতির অনন্য দলিল। এর স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন শিল্পকলা একাডেমির লোকসংস্কৃতি পদক।
২০০১ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘কথা ও হাড়ের বেদনা’ বাংলা কবিতায় এক নতুন সুরের আবির্ভাব ঘটায়। এই বই যেন শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের ভাষা, যেখানে শব্দ শুধু উচ্চারণ নয়, বরং অস্তিত্বের ব্যথা।
এই গ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই দুই বাংলায় সমাদৃত হয় এবং সে বছর এটি প্রথম আলো-র সেরা ১০ তরুণের নির্বাচিত বইয়ের তালিকায় স্থান পায়। যেন দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এক মেঘ হঠাৎ বৃষ্টি হয়ে নেমে এলো এবং পাঠকের মাটি ভিজিয়ে দিল।
তাঁর কবিতার ভাষা কখনো নদীর মতো প্রবাহমান, কখনো হাওরের জলের মতো স্থির অথচ গভীর। ‘জল ও ত্রিকালদর্শী’, ‘জল ও শ্রীমতী’, ‘ভিখিরিও রাজস্থানে যায়’, ‘বানপ্রস্থের আগে’, ‘স্ফটিকচূড়ার নিচে’ প্রতিটি গ্রন্থেই তিনি নতুনভাবে ভাষা, সময় ও অস্তিত্বকে অন্বেষণ করেছেন।
‘ভিখিরিও রাজস্থানে যায়’ গ্রন্থের জন্য তিনি ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার’ অর্জন করেন। এই বইয়ের শিরোনামই যেন এক রূপক, মানুষের ভেতরের যাত্রা, যেখানে দারিদ্র্যও এক ধরনের আধ্যাত্মিক ভ্রমণ।
২০০১ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ কথা ও হাড়ের বেদনা দিয়ে দুই বাংলায়ই সাহিত্যমহলে প্রশংসিত হন। কবিতায় নিরন্তর সাধনার ফলস্বরূপ তিনি পেয়েছেন এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার (ভিখিরিও রাজস্থানে যায় গ্রন্থের জন্য), ‘চিহ্ন পুরস্কার’, ‘লোকসাহিত্য পুরস্কার’, এবং পশ্চিমবঙ্গের ‘ঐহিক সম্মাননা’সহ একাধিক স্বীকৃতি।
কবিতার পাশাপাশি তিনি মননচর্চায়ও সমান দক্ষ। প্রবন্ধ, গবেষণা ও চিন্তামূলক রচনায় তাঁর লেখনী আলাদা স্বর ধারণ করে। কবিতাযাপন, মননচিন্তা ও বিবেচনা, কবিতা পড়ার পরে—এই সব বই বাংলা সাহিত্যে তাঁর চিন্তাশীল উপস্থিতির দৃষ্টান্ত। তাঁর গবেষণাগ্রন্থ কাজী আবদুল ওদুদের মননবিশ্ব—১৯২৬ সালের ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হওয়ার পর একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সহায়ক পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই কাজের জন্য তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে।
লোকসংস্কৃতি ও ইতিহাস অনুরাগে তিনি অনুবাদ করেছেন তারিখে জালালি, সিলেট ইতিহাসের প্রাচীনতম দলিল, এবং সম্পাদনা করেছেন দুর্লভ সরকারি দলিল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার সিলেট ও ঔপনিবেশিক সমাজবীক্ষার অনন্য দলিল বাঙ্গালা ও বাঙ্গালার বাহিরে…।
তিনি দীর্ঘদিন সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যপত্র বিকাশ এবং বর্তমানে সম্পাদনা করছেন গবেষণাভিত্তিক আলোচনাপত্র মুনাজেরা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
প্রকাশিত গ্রন্থের নির্বাচিত তালিকা:
কবিতা – কথা ও হাড়ের বেদনা, ভিখিরিও রাজস্থানে যায়, স্ফটিকচূড়ার নিচে, মাটির বইয়ের পাতা
প্রবন্ধ – কবিতাযাপন, মননচিন্তা ও বিবেচনা, কবিতা পড়ার পরে
গবেষণা – কাজী আবদুল ওদুদের মননবিশ্ব
অনুবাদ ও সম্পাদনা – তারিখে জালালি, ফকির বিলাশ, ভেদ জহুর, আশিকের রত্নসমগ্র, ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার, বাঙ্গালা ও বাঙ্গালার বাহিরে…
সম্পাদিত পত্রিকা – বিকাশ (১৯৯১–১৯৯৭), মুনাজেরা (২০০৮–বর্তমান)
নির্বাচিত পুরস্কার ও সম্মাননা:
- এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার (২০১২)
- লোক সাহিত্য পুরস্কার
- চিহ্ন পুরস্কার
- ঐহিক সম্মাননা (পশ্চিমবঙ্গ)
- বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি লোকসংস্কৃতি পদক
সাম্প্রতিক কবিতাগ্রন্থ:
- স্ফটিকচূড়ার নিচে (২০২০)
- কবিতাসংগ্রহ (২০২০)
- মাটির বইয়ের পাতা (২০২৩)
সৃজন ও সংকলনের এই প্রবাহে মোস্তাক আহমাদ দীন হয়ে উঠেছেন বাংলার লোকচিন্তা, সাহিত্য ও ইতিহাসের এক অনমনীয় নির্মাতা, যাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় অতীত, ভবিষ্যৎ এবং সমকালের সম্মিলিত বেদনা ও বোধ।
মোস্তাক আহমাদ দীন একটি নাম, যিনি বাংলা কবিতা ও লোকসাহিত্যের ভুবনে পরম্পরার ভিতর দিয়ে নির্মাণ করছেন ভবিষ্যতের আলো, ইতিহাসের মাটি ছুঁয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন মানুষের গভীরতম কণ্ঠস্বর পর্যন্ত। তাঁর লেখায় বাংলা ভাষা খুঁজে পায় আপন ঐতিহ্য ও নতুন সম্ভাবনার সেতুবন্ধন।
– ফারুক আহমেদ রনি
সম্পাদক, শিকড়
মোস্তাক আহমাদ দীনের কবিতা
বিষ
এত বিষ দেহকাণ্ডে, দেহে
আজ আমি সংলগ্নজনেরে বড়ো দূরে যেতে বলি
সকলেই একথা বোঝে আমি কভু ডুবি নাই জহরের জলে
দেহকাণ্ডে তবু এত বিষ…ভাবি তাই
প্রাণের মধ্যে কোন সর্প ঢুকে গেছে ঘুমে?
এ সন্দেহমুক্ত হতে বংশকাহিনি যারা পাঠ করে গেল
তারা দেখে, পিতা বা প্রপিতামহ আলস্য করেনি কেউ
মনসাপূজায়
তবে হই অভিশপ্ত কাহার সন্তান?
দেহকাণ্ডে যত বিষ, তার মর্মে নীল হয়ে যাবে বলে
সংলগ্নজনেরে বড়ো দূরে যেতে বলি
অথচ দূরবর্তী বন্ধুও বোঝে
গোপন ইচ্ছের জোরে সংলগ্নজনের মনে
কত বেশি মগ্ন হতে চাই
ময়ূর
জঙ্গলে ময়ূর পুড়ছে, তুমি তা জানো না
তুমি ক্লান্ত আর বহু দূরাগতা,
চুপে চুপে এসে মিশে গেছ
শান্ত আতরদানে, মর্জিমহলে
আমি এই ওষ্ঠলাঞ্ছিত সুরার ফ্যাসাদে
লিপ্ত হতে হতে কথার প্রকারে ডুবে যাই,
তোমাকে লক্ষ্য করত যদি অনুগায়িকারা
যদিও জেনেছি আমি,এ-ও এক নিদ্রাবিশেষ—
অন্য অছিলা নিয়ে, হাটে হাটে,
কারও কারও ছুড়ে-দেওয়া ফাঁদে
জঙ্গলে পালক পুড়ছে
আমি অতি নিরিবিলি তোমার জঙ্গলে ছেড়ে এসেছি ময়ূর—
কেউ তা জানে না।
ভিখিরিও রাজস্থানে যায়
ভিখিরিও রাজস্থানে যায়!
আমি সেই ভিখিরির মাথা ছুঁয়ে বুঝি
আমার ভূতের হাত ধীরে পৌঁছে গেছে
শীতকুয়াশায় ঘন-হয়ে-যাওয়া নির্জন রাতের কোনো মাঠে,
তার লাল-শাদা মাটি মৃতের কোর্তার মতো লেগে
রয়েছে শরীরে
এবার মনের সেই ভিখিরিকে ছুঁয়ে
গেরুয়া ছাড়াই দেখি নিষ্কাম ভিক্ষুর মতো লেগেছে নিজেকে
সামনে রয়েছে পড়ে দূরমহিলার শিরার মতন এক
দীর্ঘমুর্খ করুণ প্রহর
ভিখিরি তো রাজস্থানে যায়!
ভূতের শরীর নিয়ে শেষমেশ আমিও কি যাব?
হাবা
কোথাও যাব না বলে স্থির বসে আছি
একা একা, গঞ্জনার তীরে
বসে বসে পেছনের প্রতিও তাকাই
দূর থেকে ঘাড় নাড়ে বেগানা হিজল
তবু মনে হয়, তার পাশে, আড়ঠারে
সর্প পাখি কীটেরাও মন্দভাবে ডাকে
যেন আর যাবই না আমি
বেতের জঙ্গলখানি সাফ করে দিয়ে
পেছনের ঘুরপথও দশমুখে ডাকে
খরাজীর্ণ প্রত্মমেলা সামনে নিয়ে
যাব না ফিরব তার কিছুই জানি না
বসে আছি নিম্নস্রোত গঞ্জনার তীরে
মেঘ অথবা নিষিদ্ধ অংশ
ফিরে না আসতাম যদি এই পোড়োগৃহে, তবে
দূরে থেকে যেত প্রিয় মানুষের মুখ, তার গূঢ় প্রবাহ ছুঁয়ে
পরে ভালো লাগে প্রত্নমুখগুলি
অবশ্য আমি মানি জন্মগত রীতি :
আমার কোনও-কিছু ছুঁয়ে আছে মৃদুবিস্মরিত
মানুষের রক্ত কিংবা হাড়
তবু গুরুত্ব দেব প্রিয় মানুষের মুখ…
বিবিক্ত ভ্রমণ শেষে আগে আমি পেয়ে গেছি দুঃখ আর জরা
এইবার শুধু জাগে খননপিপাসা
কে কোন প্রিয় বোধ নিয়ে কেবলই দূরের কথা বলে
এই মর্মে বোধি খুঁড়ে দেখি
থরে থরে গৌণ কিছু মেঘ পড়ে আছে
গৌর
স্থির করে আনো সেই দূরলক্ষ্য গৌরপ্রতিমাটি;
আমার সকল বুঝি আজ ভেসে যায়—
কৃষ্ণসূর্যের পথে কিছু অশনাক্ত লণ্ঠনের বিন্দু বিন্দু
কান্নার স্মৃতি মঙ্গোচিত বৃষ্টিতে ভেজে
আমার এমন লব্ধি আজ কোন অর্থে যে ব্যথিত—
ষড় গোস্বামীরা সেসব জানে না (কিছু জানে জয়দেব রাজ)
তালিতাপ্পিতে-ন্যস্ত করুণ আঙুলগুলি দেখি
আর ভাবি আমার স্ত্রী-আঙুলটি যেন
স্পর্শ করছে রাজকাঁকড়ার দেহ
বিরহিনী
মনে হয় ঘিরিয়াছে জলদস্যু, জলের বণিক।
লাফে-লাফে, মেঘবর্ণ শরীরের বেড়ে-ওঠা দামে
চারপাশে নিলাজ গুঞ্জন—
এ-ও এক ঘূর্ণিনাচ, পয়মন্ত নদীটির তীরে,
কাঁচা পায়রার মাংস খেয়ে
আর পান করে করে তীরে মজলিসে ঢুলুঢুলু
এই চিত্র প্রাণবন্ত আরশিতে দেখি
গজলের রঙ নিয়ে গাঢ়
বিদ্রুপের ছাতা নিয়ে তবু
তীরে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়েছে ক্লান্ত
বিরহিনী
বিরহ
তারে কি বিরহ বলে? বিপরীতে কোন হাওয়া
জানি না তো মিলনের কোন কথা বলে
তবে যে আমের গাছে কামরাঙা পাতা জেগে আছে?
তাহার শরীর কেন পায়রার মতো কেঁপে ওঠে?
আমার সামান্য দেহ, তবু তার সব দিক ছুঁয়ে
দূর থেকে ডেকে যায় লিলাজ ডাহুক
টাঙ্গুয়া হাওরে যেন কবে কোন ফাঁদে পড়ে
হারিয়েছি আমার আঙুল?
আমার কোমরে দেওলা-বাঁচানো এক তাবিজ রয়েছে যদিও
হাওয়ায় হাওয়ায় এসে আরো বহু হাওয়া ছুঁয়ে যায়
জানি না তো এই হাওয়া
বিরহেরই অন্য নাম কি না, মিলনের কথা বলে কি না
জল ও শ্রীমতী
সমুদ্ররাজ্যের কথা ভেবে
কাতর শ্রীমতী আজ বাঘসিংহের থাবার মুখে
হেঁটে হেঁটে জঙ্গলের নীলবাড়ি যায়
কোনো অনসূয়া পাখিপরিবার পেলে কণ্ঠে তার
উজ্জ্বলন্ত গান তুলে নেবে—
যেখানে নাচে-নৃত্যে ভরা যে প্রহর
মাথা ও শরীরের চারপাশের হাওয়ার স্তব্ধতা ভেঙে অনাকার
একধ্যানী কাকও যার কিছুই জানে না
এই ঘটনার ফলে আমি দেখিয়েছি
রূপকথারঙিন রাজার মুকুট,
আর প্রজাপতিরাঙা ভাবীসময়ের
দ্রুতি ও বিস্তারে-কাঁপা হৃদয় তুলে
অনাপদ দূরত্বে থেকে শুনিয়েছি জলবৃন্দগান—
তাতে একটু-আধটু কেঁপেছে শ্রীমতী
দুই জন
হাওরের মুখোমুখি হয়ে মনে হলো,
এই মুখ সহনীয় নয়
দুঃখিত পাঁপড়ির রঙে মিলেমিশে
খুলে যাচ্ছে সমস্ত দুয়ার;
মনে হলো, এই চোখও বিষম দুঃসহ,
কতোয়ালের মতো দ-গভীর, কালো আর লাল,হয়ত-বা ধূসরহলুদ,
যার দৃষ্টি ঘুরতে ঘুরতে
উড়াল জালের মতো ঘিরে ধরে সমগ্র হৃদয়
যার চোখের আলোয় কখনও-কখনও
জিনকন্যার অচেনা বিস্ফার
পিঠ ফিরে বসে দুই জন;
দুই হাত দুই মুখ আর এক-পৃথিবীকে নিয়ে
নির্জন হাওরের পারে
মুখোমুখি : বিষম দুর্বহ
ফেরা
ফিরছি বাঁওর থেকে
একা একা
বৃষ্টি নামছে আর
পথে পথে শুনি
সাপেদের শ্বাস
বুঝি যে ঘরের মেয়ে
বসে বসে
কাঁদছে নিরলে
এমন রাতেও বুঝি
ভয় পায় কেউ?
মেঘে ও হাওয়ায় উড়ে
কেঁদে ওঠে কোনো নীলপরি?
ধুলো ভিজে যায় আর
কালি ও কলঙ্ক লেপে
বিশ্রী হয়
কারও কারও মুখ
আমিও অন্ধের মতো
সেই সব ছায়াভেজা
মুখ ছুঁয়ে ছুঁয়ে
কখনো-বা মন ছুঁয়ে ছুঁয়ে
জ্যোৎস্নার রূপে পুড়ে
কিছুটা নীলাভ আর
কিছু জলশাদা
বুঝি তো ঘরের মেয়ে
একা একা, বসে বসে
কাঁদছে নিরলে…
হিজল গাছ
দেখো ও হিজল গাছ
কেমন অন্যমনা লাগছে নদীকে।
অথচ ভর বর্ষাকাল
দশদিকে আষাঢ়শ্রাবণ।
ধৈবতে দু-পাড় ছুঁয়ে রোজ রোজ
গস্তি নৌকা, গয়না নৌকা যায়
ভাঙা সেতুর ছায়া পড়েছে ওই
খোয়াই নদীর পিঁজরায়।
ধীরে পানাঝোঁপ, ধীরে ধর্মহাঁস
বেঁকে-চুরে, হেলে-দুলে যায়
যেন কালগোধূলিরঙে রক্ত-ভেজা জল
সায়রে পৌঁছার আগে আর কোনো
পরিবর্ত মানবে না নদী
অথচ কাল-পরশু নৌকাবাইচ।
হেইয়া হো শাহনুরের সারি।
করতালের বাড়ি খেয়ে খলবল করবে না জল?
স্নানের জলের ভারে ভাঙবে না পাড়?
সেদিনও এমনভাবে অন্যমনা লাগবে নদীকে?
মধুরাকে?
লুলা গম্ভীরাকে?
বিল
তোমাকে নিরলে পেয়ে মনে হয়
আমার সমস্ত দিকে একলগি জল
তখন তীরের দিকে পাখি উড়ে যায়
ভীষণ অনাত্মীয় মনে হয় অন্ধকার বিল
তখন ইতর প্রাণী অন্যভাবে তুলছে গুঞ্জন
যেন-বা শিকারি আমি
প্রেমমত্ত পাখি ও পাখিনী দেখে
বিদ্ধ করে একা একা করেছি উল্লাস
অথবা সেই দস্যি আমি
অভোলা গেরামে গিয়ে করি ডাকাইতি
আমার হৃদয় ঘিরে তাহাদের এমন নিন্দন
তবু তো বেঁচেছি সখি, এই দেহ জারুলের গাছ
আপন লগির গুণে চারদিকে একলগি জল মনে করে
অশেষ বিলের দিকে উড়ে চলে যায়
স্ফটিকচূড়ার নিচে
আজ একই পাত্রে যখন আমাদের
দু-জনেরই পান করবার কথা ইঁদারার সবটুকু জল
তখনও বুঝতে পারছি না এই গহীন রাজ্যে
জলই কি সত্য
না কি এই জলপানই শেষ সত্য হয়ে আছে
এখনো জানি না আমি, এখানে কেমন আছে জল,
পাত্র কোন রঙ ধরে আছে
কোন রূপ ধরে আছে
আর কেমন আছে সেই খাস জলের প্রেমিক?
আজ একই পাত্রে যখন একই সঙ্গে
আমরা দু-জনেই পান করছি ইঁদারার সবটুকু জল
তখন আমার কালো ঠোঁটের পাশে
তাম্বুলরাঙা তোমার লাল ঠোঁট দেখে
গুঞ্জনে গুঞ্জনে জানি ভরে উঠবে জেনানামহল
পিতা
ঘুমেও শিহরিত ছেলে
মাটি ও ফেরেশতার সর্ববিধ আদর খেয়ে
নিকট-অতীতে শব্দ সঞ্চয়নে গেছে
গেছোভূত নিঃশব্দে দেখে
তার অন্যায্য পিতার চোখ
আর কান শুনে নেয়
অতলে বিস্তৃত এক সর্প-শিহরন
কখনও জগদমায়ায় এলে
দুইজনা এইরূপ ছন্দে মুখোমুখি…
বহুকাল পর,
আদিদর্শনের যোগছলে
দুই পথিকের ছাতা দুটি
মিথ্যে দুই ভাব নিয়ে ওড়ে
অঘ্রানী
অতনু ঘাসের ঘ্রাণ ফেলে রেখে
আমি আজ অঘ্রানের খোঁজে।
ওই মাঠ কতটা ভিজেছে দেখো
ধানের বৃষ্টিতে।
সোনার ক্ষেতের পাশে
কতটা পয়মন্ত হয় দেখি
অঘ্রানী, তোমার শরীর
শয়তান
মেহফিলে হাজির আজ দীর্ঘকণ্ঠ
স্মার্ত লুসিফার!
গজলের মজমা ছুঁয়ে আছে তথাপি অসুর আর
কঠিন ভূমির পত্রে বিরাজিত,
তবু মনে হয় পীন হাবশি রমণীকে
মনে ধরে করে তানালাপ
নাগামরিচের লাল প্রকৃতিকে ছুঁয়ে এসেছে তার আনোখা হৃদয়
তাকে দেখেও তো কারো কারো
হৃদয়ের ধুলোপথ ভেজা—
গোল জলাশয়ে যেতে বেফানা শরীর;
উচ্চণ্ড গোধূলিকে দেখে যেরকম কারো কারো
নিদ্রাহীন কাটে সারারাত—
সেই ছাঁদে ডুবে যেতে ফড়িঙের রূপ ধরে আছে
গ্রীষ্ম
নেমেছে শীতল ধারা
নালিতার পাঠ শেষ হলে,
তবু মুখ ভার করে আছে রাঙা মিনজিরি ফুল,
যেন সাপের ফণার ঢঙে বিষালো বৃষ্টি,
আর, পূর্বমেঘের রাগে
চিরপতনের নাম ধরে গর্জে উঠবে পুরাণশিঙাটি
মনে ক্ষারছায়া মেখে আজও
চুপ মেরে বসে আছে বাগানের কৃষ্ণচূড়া গাছ,
জলরাঙা রঙ্গন-গোলাপ;
ভেজা ভেজা ছিল ঘাস, ভেজা ভেজা ছিল কদম-জামির,
তবু মন আহাকারে হাহাজারে ভারী,
হুয়ারা গাছটি ধরে জারিদীর্ঘ বারোমাসি
গেয়ে ওঠে বাগানের প্রহরী ও মালী
যেন সারাটি বছরজুড়ে
খরাদাহ-স্মৃতি নিয়ে রয়ে যাবে এই গ্রীষ্মকাল!
স্বীকারোক্তি
নগর-টোলের ছাত্র, আজ বসে আছি লু-নিবিড়
অন্ধকারে একা—যেন চার প্রহরের এই রাত
উদযাপন করতে যাচ্ছি অজপাড়াগাঁয়, যেন
জোনাকবাতির নিচে পুথি পড়া যাবে সারারাত।
আমি তো এসেছি ফিরে, তবু, নাগরিক পাঁজি হেন
সিরিফ নাদান শিশু; ভয় লাগে হরফের ভিড়…
বলো কে বলবে পই, ছিলক, ডিঠান? তবু তাতে
নাগরিক চতুরালি থাকে; জারিতে ভরে না প্রাণ—
দষ্ট গ্রন্থ ঘেঁটে খুঁটে পেয়ে গেছি শত প্যাঁচে-ভরা
কালো ইষ্টকের বই : সারি নয়, ছাদ-পেটা গান
শীত বর্ষা ভেবে পাই ঘূর্ণিবাত্যা, বালিঝড়, খরা
ণত্ব, ষত্ব সব কিছু ভাসে শুনি ঘোর বৃষ্টিপাতে…
জেনেছি দেহাতি ছাত্রী, তবু তুমি বিদুষী, শ্রবণা
তেরচা রেফের নিচে নাগরের দ্বিত্ব মানবে না
মেঘ, মেঘ নয়
তোমার মাথার নিচু পথে তাকিয়েছি
অতি নিরিবিলি উঠে গেল কার্তিকের শাদা ছাতা;
জানো না জলের বিচ্ছেদ-ব্যথা ফোটে কি না,
নতুন ধানের ছায়া চোখে নিয়ে আসা নারীমুখে
ছড়িয়ে দিয়েছে কি না নাদান তুলির কোনও কবি
পায়ে পড়ে আছে শাদা ছায়া
কিছুই-না-বোঝা কোনো মাথার ওপর
ছাতাটিকে মনে হয় ভৌত উদ্দীপনা—ভ্রমজাল—
আমি তার নিচু পথে গিয়ে কঁকিয়েছি
চোখে-ব্যথা-পাওয়া কোনো মুরগির মতো মনে হয়েছে নিজেকে
প্রবাস
একলা প্রবাসে আছে,ঘরে কবে ফিরবে ধীবর?
এপারে করচ গাছ, অড়হর, সকলে একাকী;
বাকিরাও চুপচাপ, পথপাশে জননী ও জায়া
ফিরবে হিঙ্গুল রাতে, যদি পায় গোধূলির বর?
শিকারি ঘনিষ্ঠ হলে টের পায় তিত্না ও পুটি;
জাল ফেলা হয়ে গেলে, নিরুপায় মাছেদের ভিড়;
তবু তো সকলে সেই স্বর-অন্ধ, কিছুই শোনে না :
কোথায় মাৎস্যন্যায়, কোন স্থানে ধীবরের ত্রুটি।
জলদাসী খরাগ্রস্ত, ঘূর্ণিবাত্যা, হৃদয় বেহাল
নাগর-গঞ্জিত দেখে সধবাও হেলে-দুলে হাসে;
গুঞ্জরন, বিলপারে, কথা ওঠে ধীবরপাড়ায় :
ধীবর ফিরলে ঘরে, ফের সে কি হাতে নেবে জাল?
দর্শক
একটি আগুন তার দীন আকুলতা নিয়ে জানে
বিষম করুণ জলে ডুবে মরেছে যেজন, সেও
খুব নিচু বীজ-ভেদ-করে-ওঠা নীল কেয়াগাছ
অযথা প্রেরিত তাই তার ও ইমেল,
মান্দার বাগানে ফের ফিরে আসে কৃষ্ণভ্রমরের
লাল বর্ণমালা; এর ক্ষুদ্র দর্শক আমি দেখি—
তার প্রৌঢ় ব্যথা এক অচিন কুষ্ঠিনীর কাছে
চায় নিরাময়; চায়, অতি খলবল না-হলেও দেহ এসে
নিঃশব্দে বিদ্ধ করে যাক।
গৃহী মুসাফির
ঘরেই রয়েছি তবু, পথিকপথিক গন্ধ গেল না আমার : তিরি ও পুত্রের কাছে আমি
তাই আজও মুসাফির-যে-জন অছিলা পেলে যেতে পারে দূর বৈদেশে
আমার কি আগেও ছিল বাউলের বেশ? দেখার হাওরে গিয়ে যে-নারীর হৃদয়
পেয়েছি, সেও তবে আড়চোখে আমাকে দেখেছে!
রাতে ও বিরেতে হঠাৎ ঘরছাড়া হয়েছি যে ডাহুকীর ডাকে, সেই দোষে আজও
আমি পথিকপথিক—তিরি ও পুত্রের কাছে দু-দিনের গৃহী মুসাফির
নাইওর
আমাকে নাইওর নিও আগনের আগে এখন ধানের গন্ধে মনে লাগে ভয়,
এখন ধানের শব্দ, বুকে কেউ চিড়া-বারা কোটে; ধানের উয়ানি দেখে
চোখে লাগে ধুলোবালিকাচ
আমাকে নাইওর নিও কালবোশেখেরও আগে। এখন ভীষণ লাগে ঝড়-ঝঞ্ঝা,
মারি ও মড়ক। আউলা বাতাসে আগে উড়েছি যে বিজুলিরও আগে, মৃদুমন্দ
বাওয়ে আজ কেঁপে ওঠে বুকের পাঁজর
আমাকে নাইওর নিও নিদানের কালে : চৈতে ও কার্তিকে; আগনের-বোশেখেরও
আগে





Leave a Reply