অগ্নিবীণার রক্তপলাশ

সে বাজায় বাঁশির কাঁথায় যুদ্ধের রাগিণী,
প্রতিটি সুরে বেজে ওঠে বৃষ্টির গুলির শব্দ।
গ্রামের পথ এখনো জানে তার ক্ষতের গল্প
মুক্তির সুরে মিশে আছে ধ্বংসের ছায়াছবি।

‘লোকে বলে ভিখারি ও,’
কিন্তু তার হাতের থালায় শুধু ভাত নয়
জমে আছে মনু নদীর জলের ক্রন্দন,
আর একা লাশের গন্ধে ভরা রাতের ডায়েরি।
বাঁশির গায়ে লেগে থাকা সুর ফি-মল্লারে
মাটিই জানে তার অর্থ: ফসফরাসের গান,
আর ভিজে মাটির স্বপ্নভঙ্গ।

মনে রেখো তাকে।
রাজাকারের ছেলেকে যখন মারে মুঠোয়,
মুষ্টি তখন যুদ্ধের শেষ প্রার্থনা
যে শিশুটিকে বাঁচাতে পারেনি ’৭১-এর চরে,
তারই প্রতিশোধ। জনতার হাসি? ভাঙা আয়না:
আগুন চায়, কিন্তু দগ্ধ হতে ভয়।

সন্ধ্যায় তার ছায়া দীর্ঘ হয় বন্দুকের প্রেত,
কুয়াশায় আটকে থাকা স্মৃতির গহ্বরে আঘাত হানে।
কাঁঠাল গাছের ডালে ডালে বাজায় সে সুর
যে গাছে লুকেছিলো তার দল, ’৭৫-এর আগস্টে
গুঁড়ি এখনো কালো রক্তে রাঙা।

কোনো রাতে ব্যান্ডেজ খোলে
মাংস নয়, পোকার খাওয়া পতাকা জড়ায় বুকে,
তারকাদের গুনগুনায় স্বাধীনতার গান,
যারা জ্বলে যেন অনাথ বেয়নেটের চোখ।

পাগলা ছেলেরা হাঁসে তার খোঁড়া পায়ে,
তখন সে বাঁশি ঠোঁটে তুলে
সুর ওঠে জ্বলে: ধোঁয়া, রক্ত, বেলির সুবাস…
হাসি থেমে যায় নদীর জলে,
যেখানে তার যৌবন ভাসে উল্টোমুখো।

চেয়ারম্যান ভাত দেয়, চায় গান
সে বাজায় ‘একলা চলো রে’ উল্টো সুরে,
ভবিষ্যতের জবানবন্দি। অফিসার কাঁপে,
যে স্বর শুনে মৃত্যুপুরীর দরজা খোলে।

তার বাঁশি, ভাঙা, এখনো জেগে থাকে স্মৃতিস্তম্ভের চেয়ে।
পর্যটকেরা তুলে ফোটো, ফিল্টারে সেপিয়া করে,
কিন্তু বাঁশির নল জানে সুরের শ্বাসে লেখা:
‘মুক্তিযোদ্ধার হৃদয় যুদ্ধ থামেনি কোনো যুদ্ধবিরতিতে।’

বর্ষায় সে বাঁশি ডুবায় কাদায়,
মাটিকে ফেরত দেয় যুদ্ধের বিষ।
প্রভাতেই সুর জাগে আগুনের ফিনিক্স
নিঃশব্দের বুকে অস্ত্র হয়ে ওঠে সুরের অস্ত্র।

মহাসড়কে নাম লেখা শহীদদের, তবু আমরা
চমকে উঠি তার চোখের দিকে যেন টানা বন্দুক,
প্রশ্ন ছোড়ে: ‘কে রাখবে আলো জ্বালিয়ে
যখন ছাইমানব নিজেই ছাই হয়ে যাবে?’


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading