মহালয়ার সেই ভোর

আজও শরতের আকাশে তুলোর মতো মেঘ ভেসে উঠলে আমার মনে পড়ে যায় ছোটবেলার সেই দিনগুলো। পাঁচ বছরের আমি—পাপু—অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি নীল আকাশের দিকে। তখনো জীবন এত জটিল হয়নি, চোখে শুধু বিস্ময়ের রঙ। কল্পনায় দেখি, সিংহের পিঠে চেপে অসুরদলনী মা দুর্গা এগিয়ে যাচ্ছেন মেঘেদের প্রাসাদ ভেদ করে। বাতাসে ভাসছে তাঁর আগমনের বার্তা। সেই সময় গ্রামে কোনো বাড়িতে টিভি ছিল না। দুর্গাপুজোর শুরু মানে ছিল একটাই জিনিস—মহালয়ার ভোরে আকাশবাণী কেন্দ্র থেকে ভেসে আসা মহিষাসুর মর্দিনী। তার আগে রাতভর অপেক্ষা, ঘুমহীন চোখ। ঠাকুরমার পাশে শুয়ে আমরা দুই ভাইবোন শুনতাম দেবী-দেবতাদের গল্প—কেমন করে তাঁরা সবাই মিলে অস্ত্র দিয়েছিলেন দেবীকে, কেমন করে তিনি মহিষাসুর বধ করতে পৃথিবীতে এসেছিলেন। চোখ বুজলেই মনে হতো, দেবী যেন ঠিক এই গ্রামেই নামবেন, কাশফুলের দোলায় ভেসে আসবেন সোনালি আলোয়। আমাদের মাথার কাছে রাখা থাকত ছোট্ট একটা রেডিও। নতুন ব্যাটারি লাগানো, যেন ভোরে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। হঠাৎই মনে পড়ে—সেই ভোরে দিদি আমায় ঝাঁকুনি দিয়ে তুলেছিল। “ওঠ পাপু, মহালয়া শুরু হয়ে গেছে!” ধড়ফড় করে উঠে বসেছিলাম। রেডিও থেকে ভেসে আসছিল সেই চেনা ভোঁ-ভোঁ শব্দ। তারপরই—বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মন্ত্রমুগ্ধ কণ্ঠ। মনে হলো, ঘরটা ভরে উঠল এক অদ্ভুত আবেশে। দিদি আমায় জাপ্টে ধরেছিল, ঠাকুরমা চোখ বন্ধ করে সেই মেঘমন্দ্রিত কন্ঠের পাঠ শুনতে শুনতে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি কেবল তাকিয়ে ছিলাম খোলা জানালার বাইরে—মেঘেদের ভেতর দেবীর আবির্ভাব যেন সত্যি সত্যি দেখা যাচ্ছে। পাঠ শেষ হতেই দিদি আমায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। ভোরের আলো, স্নিগ্ধ শরতের হাওয়া, কাশবনের দোল—সব মিলিয়ে গ্রামটা যেন অন্য এক জগৎ হয়ে উঠেছিল। অথচ সেই অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝেই আমার মনে হঠাৎই প্রশ্ন জেগে উঠল— “দিদি, এবছর আমাদের নতুন জামা হবে না?” দিদি একটু থেমে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। “জানি না রে ভাই। বাবা কবে কিনবে কে জানে! মেজমাসি নাকি কলকাতা থেকে পাঠাবে বলেছে।” আজও মনে পড়ে, সেই কথা বলার সময় দিদির চোখে দুঃখ লুকানো ছিল। আমরা অভাবী পরিবারের মানুষ। 'নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। তবু শিশুমন মানতে চায় না। আমি জানতাম, আমার স্কুলের বন্ধুদের প্রায় সবার নতুন জামা এসে গেছে। চকচকে নতুন কাপড়ের গন্ধে তারা মাতোয়ারা, আর আমার বুকের ভেতর হাহাকার। তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেছিলাম—একটা মেঘ সিংহের মতো থাবা উঁচিয়ে আসছে। ভয় পেয়ে চোখ বুঁজে ফেলেছিলাম। মনে মনে প্রার্থনা করেছিলাম—মা দুর্গা যদি সত্যিই পৃথিবীতে নামেন, তবে এবারের পুজোয় আমাদের অন্তত একটা করে নতুন জামা দিক। আজ এত বছর পরও মনে হয়, সেই ভোরের উত্তেজনা, সেই রেডিওর মন্ত্রমুগ্ধ সুর, ঠাকুরমার গল্প, দিদির স্নেহ—এসবের সঙ্গে মিশে আছে এক অব্যক্ত অভাব, এক অদম্য প্রত্যাশা। হয়তো তখন নতুন জামাটা পাইনি ঠিকই, কিন্তু যে স্মৃতি পেয়েছি, তা আজীবন থেকে গেছে। এখন সব বদলে গেছে। আজ গ্রামে প্রতিটি বাড়িতেই টিভি আছে, ইউটিউবে মুহূর্তে বাজে মহিষাসুর মর্দিনী। কিন্তু বিশ্বাস করো, সেই এক ভোরে রেডিওর শব্দে কেঁপে ওঠা হৃদস্পন্দন, খোলা মাঠে শরতের আলোয় দেবীর আগমন অনুভব করার আবেগ—এসব আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যায় না। মহালয়ার সেই সকাল তাই শুধু উৎসবের শুরু নয়, আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল শৈশবস্মৃতির এক বেদনাময় সোনালী টুকরো।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

6 responses to “জয় গঙ্গোপাধ্যায়”

  1. খুবই ভাল লাগল।

    মণীষ চক্রবর্তী

    1. মন্তব্যের জন্য অশেষ ধন্যবাদ 🙏

  2. খুবই মনোগ্রাহী লেখনী, নিজের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেলো।।

    1. ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য, দেবীপক্ষের শুরুতে আপনাকে জানাই আমার অশেষ শুভেচ্ছা 🙏

  3. সত্যিই তাই👍👍👍তোর লেখা পড়ে ফিরে পেলাম সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশব,,,,,,ঠাকুমার স্মৃতি ❤️

    যদিও আজ ভোর বেলা মহালয়া যখন রেডিওতে শুরু হল,,, শুধু মা দুর্গা না,,,সাথে ঠাকুমা কেও (যদিও আমি আর তুই মা বলেই ডেকেছি)অনুভব করলাম আরও একবার।

    1. যেহেতু স্মৃতিগুলো আমাদের তাই তোর মন্তব্য টা খুব জরুরী ছিল। 🙏

      –জয় গঙ্গোপাধ্যায়

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading