সুজা মাহমুদ

স্বাধীনতার যুদ্ধে একটা গান ছিল, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।’ যদি এখন কেউ এই গানটির কয়েকটি লাইন পরিবর্তন করে, গেয়ে উঠে, ‘আসুন আমরা সেই শহীদদের স্মরণ করি, একটি করে বিজয়ফুল পরি।’ ছন্দে মিললো না বোধ হয়। তা নাই মিলুক, আমি তো আর কবি নই। কবিরা স্বপ্ন দেখে, দেখায়। সেই স্বপ্ন আমরা ধারন করি , লালন করি। কবি শামীম আজাদ স্বপ্ন দেখেছেন, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। বিজয়ফুল তাঁর স্বপ্নের বাস্তব রূপ।
মহা যুদ্ধে যে অসংখ্য যোদ্ধা যুদ্ধের ময়দানে প্রান হারিয়েছিল, পঙ্গু হয়েছিল, তাদের স্মরণে পপি ফুল বা পপি ফুলের প্রতীক। বিজয়ফুল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অর্জিত বিজয়ের প্রতীক।
দুটিতে পার্থক্য আছে। একটি বাজার দখলের যুদ্ধ, পারস্পরিক শক্তি প্রদর্শনের পাঞ্জা লড়াইয়ের যুদ্ধ, আর অন্যটি একটি ভাষার জন্য, একটি জাতির ভূখন্ডকে নিজেদের করার যুদ্ধ। এখানে যোদ্ধারা শুধু সৈনিক নয়, তারা মুক্তির সৈনিক। বড় ভয় ছিল শত্রুদের। পরাজিত হয়েও হাল ছাড়ে নাই পরাজিতরা। ফিরে এসেছে চোরাগুপ্ত পথে। রণক্লান্ত মুক্তির সৈনিকরা ধীরে ধীরে হাস্যকর হয়ে গেছে আপন প্রজন্মের কাছে। স্বপ্ন ভঙ্গ হলে যা হয়, ভয়াবহ সেই পরিণতিতে প্রজন্মান্তরের সামনে এক পাহাড় প্রমান মিথ্যার প্রাচীর।
সে প্রাচীর ভাঙার কাজটি করতে যে মানুষ এগিয়ে এলো, তাকে আমরা সবাই চিনি। তার হাতে উদ্ধত মারণাস্ত্র নাই। কোন তেজস্বি জোয়ানের মতো ‘কোনঠে কে সবাই’ বলে হাঁক ছাড়ে না সে। হাতুড়ি শাবল গাইতি ধরে না। হাতের আঙ্গুলে শাণিত অস্ত্রকে আবার তুলে নেয় না সে। অবাক বিস্ময়ে তার হাতে দেখি, রং আর তুলি। মকবুল ফিদা হোসেনের মতো বিরাট ক্যানভাসে গজগামিনীর ছবি তিনি আঁকেন না। একটুকরো কাগজে আঁচড় কেটে কেটে লাল সবুজের ফুল আঁকে তার কবিতার মতো আঙ্গুলগুলো। নতুন প্রজন্মের কচি কচি উৎসুক মুখ জড়ো হয় তার আশেপাশে। তারাও আঁকিবুকি করে। কি আশ্চর্য ! কখন এক মুহূর্তে সবার সাথে সাদা কাগজের জমিনে অঙ্কুরিত হয় অসামান্য একটি ফুলের ছবি। ফুল দিয়ে কি পাহাড় ভাঙা যায় ? আর সে পাহাড় যদি হয় একটি জাতির গৌরবের ইতিহাসকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে বিকৃতির জঞ্জাল দিয়ে বছরের পর বছর তৈরী করা।
শামীম আজাদ দুঃসাহস করে সে অসাধ্য সাধন করলেন। ষড়যন্ত্রের চক্রকে ভাঙ্গতে কতকগুলি চক্রকে আশ্রয় করে এমন এক ফুল তৈরী করলেন, যা বিকৃতির পাহাড়কে কেটে কেটে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া সত্যকে নিয়ে এলো আলোকের ঝর্ণা ধারায়। কেমন করে তিনি এই অসামান্য ফুল গড়লেন ? কেনইবা তার নাম দিলেন বিজয়ফুল ?
চেতনায় স্বাধীনতা, ভাবনায় গর্বিত স্বদেশ একজন দেশপ্রেমীর স্বত্বায় সদাই জাগ্রত থাকে। তাই প্রবাসে পথ চলতে যখন শামীম দেখেন, পপি ফুলের আবেদন, তিনি দোলায়িত হন স্বদেশ প্রেমে। মনের ভেতরে জন্ম নিতে থাকে তেমন কিছু সৃষ্টির, যা শুধু আবেদন নয়, ইতিহাস হয়ে কথা বলবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। কথক কবি বলেন, বিজয়ফুল শুধু তৈরী করে ধারণ করাতেই সীমাবদ্ধ থেকো না তোমরা। বৃত্তের ছবি আঁকতে আঁকতে, আমাদের গৌরবের যে স্বাধীনতা, যার অর্জনে বীর যোদ্ধারা লড়েছে অকুতভয়, সেই সব ইতিহাসের কথা বলো মানুষকে, শিশুকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। দেখবে, আর কেউ পারবে না সত্যকে চাপা দিতে।
বিজয়ফুল কবি শামীম আজাদের, না শামীম আজাদ বিজয়ফুলের সে ভাবনা তোলা রইলো ভবিষ্যতের ঐতিহাসিকদের জন্য।

সুজা মাহমুদ
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, কলামিস্ট


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading