আবু মকসুদ

সেই সব দিন এখন আর নেই; তবু মনে হয় যেন সেদিনও ছিল। এই লন্ডনের কুয়াশাভেজা দুপুরে বসে ভাবি, শামীম আপাকে প্রথম দেখি বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায়, ঈদের আনন্দমেলা, সে অনেক বছর আগের কথা। তখন আমি ছোট, বড় ভাই বলেছিলেন, ওই যে আমাদের পাশের গ্রামের মেয়ে, দিঘির জলের মতো চোখ, মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে কথা বলছেন। দূর থেকে মনে হচ্ছিল যেন ধানের শীষে সকালের শিশিরের ঝিলমিলে আলো।

আমাদের গ্রাম ঢেউ পাশা মৌলভীবাজার, সিলেটের সেই সবুজ ছায়াঘেরা জনপদ, যেখানে বৃষ্টির পরে মাটির গন্ধ ভেসে আসে, আমের ডালে কোকিল ডাকে, আর শ্যাওলা ধরা পুকুরঘাটে সন্ধ্যা নামে ধীরে। শামীম আপার গ্রাম আমাদের পাশের গ্রাম মমরুজপুর। সেই নাম শুনলেই এখনও মনে পড়ে, কেমন করে এক দৌড়ে আমাদের বাড়ি থেকে ফুফুর বাড়িতে পৌঁছে যেতাম, ফুফুর বিয়ে হয়েছিল মমরোজপুরে। পথে পড়ত কাঁচা রাস্তা, বটের ছায়া, ধানখেতের অবাধ সবুজ। শামীম আপা বাবার চাকরির সূত্রে দেশের নানা জেলায় থেকেছেন, তবু মাটির টান তাঁকে কখনও ছাড়েনি। তাঁর লেখায় ফিরে ফিরে এসেছে মমরুজপুর, গ্রামের বাড়ির উঠোন, বৃষ্টিতে ভেজা কাঁসার থালার মতো চাঁদ, আর শিমুল গাছের নিচে হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

লন্ডনে আমরা একসাথে অনেক দিন কাটিয়েছি। শীতের সন্ধ্যায় বাংলাদেশের কথা বলতাম, মৌলভীবাজারের বর্ষার কথা, কী করে নদীর জল উপচে পড়ত বাড়ির আঙিনায়, কী করে শালিকেরা সকালে ডাকত আমগাছের ডালে। শামীম আপা তখন আমাদের আশ্রয়, আমাদের দিশা, বিদেশের মাটিতে বাংলা ভাষার জন্য নিরব লড়াই করা এক উজ্জ্বল উপস্থিতি। তিনি শুধু সংগঠক নন, স্মৃতি ও সত্তার রক্ষক, যেন ভাষা ও মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধ।

তিনি বিশ্বজয় করেছেন বললে কম বলা হয়। একটি মেয়ে, পাশের গ্রামের, যে টেলিভিশনের পর্দায় হাজির হয়েছিল একদিন, সে আজ বাংলার মুখ, বাংলার পরিচয়, বিদেশের প্রবাসজীবনে। তাঁর জন্মদিনে মনে পড়ে সেই সব সকাল, যেখানে কুয়াশা এখনো কাটেনি, পাখিরা ডাকছে, আর শামীম আপা দাঁড়িয়ে আছেন মাইক্রোফোন হাতে। গভীর দিঘির মতো শান্ত, অথচ আশ্চর্য উজ্জ্বল, যাকে দেখলেই ভিতরের রুক্ষতা এক নিমিষে স্নিগ্ধ হয়ে যায়।

তবুও সময় বদলায়, লন্ডনের আকাশে মেঘ জমে, আলো কমে আসে, শীত বাড়ে। কিন্তু তাঁর কথা ভাবলে মনে হয় মৌলভীবাজারের সেই সবুজ, মমরুজপুরের মাটি, বাংলার নদী, সবই এখনও তাঁর মধ্যে জীবন্ত, জ্বলজ্বল করে। তিনি যেখানে থাকেন সেখানেই বাংলাদেশ একটু জেগে ওঠে। তাঁর চলন, উচ্চারণ, চোখের গভীরতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কোথা থেকে এসেছি, কত পথ পেরিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছি।

জন্মদিনে শুভেচ্ছা, অনেক ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading