শামীম আজাদ
লেখক হয়েছি কি হইনি সে কেবল আমার চলে যাবার পরের কাল বলতে পারবে। আমি শুধু সেই নিমিত্তে নিজের চেষ্টার, প্রেরণার ও অধ্যবসায়ের গল্পটাই বলতে পারি।
বয়স আমার ১৪ বা ১৫ হবে।আব্বার সরকারী চাকুরি সূত্রে আমরা তখন জামালপুরে থাকতাম। আম্মা, আনোয়ারা তরফদার– আব্বা আবু আহমদ মাহমুদ তরফদার। তাঁরা যুগলেই, আমাদের সবক’টা ভাইবোনকেই বয়সানুযায়ী প্রাপ্ত যে কোন সাংস্কৃতিক বা সাহিত্যিক কর্মকান্ডে যুক্ত করতে উন্মুখ হয়ে থাকতেন। পারি বা না পারি আমাদের চেষ্টা করতেই হত। বেশি দূরেও যেতে হত না। বাড়ির হিম সাগর আমগাছটা পেরিয়ে রাস্তার উল্টোদিকে গেলেই নরম এক নদী। এই স্থিত হয়ে যাওয়া নদীর পাড়েই পাবলিক লাইব্রেরী, টাউন হল ও নগর অফিস। সেখানে লাগাতার নাটক, বক্তৃতা, সাংস্কৃতিক বা সৃজনশীল অনুষ্ঠান বা কিছু না কিছু চলতোই। আর আমরা কিনা থাকি স্বরভঙ্গবিহীন মাইকের শব্দভ্রমণের প্রথম ষ্টেশনেই।
সে সময় নিয়মিত ভাবে বাসায় মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত দৈনিক আজাদ ও নূরজাহান বেগম সম্পাদিত সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকা আসতো। দৈনিক আজাদে ছোটদের সাপ্তাহিক বিভাগের নাম ছিল মুকুলের মাহফিল। এর সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ মোদাব্বের।তিনি বাগবান ভাই নামেই আমাদের সবার প্রিয় ছিলেন।কাগজ আসা মাত্র এই পাতা পড়ার জন্য আমাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি শুরু হতো।‘বেগম’কে ভাবতাম প্রাপ্ত বয়ষ্কদের বিশেষ করে নারীদের পত্রিকা. বলেই জানতাম। মুকুলের মাহফিলে ছোটদের হাতে আঁকা ছবি ও লেখা ছাপা হত। আব্বা মহা উৎসাহের সঙ্গে আয়োজন করে আমাদের লেখাতে বসতেন। তারপর তার বানান টানান দেখে আবার লিখিয়ে খামে ভরে ডাক দিতেন সম্পাদক বাগবান ভাইকে চিঠি লেখার জন্য। আমরা লিখতাম। ছাপা হলে নিজেদের স্টার ভাবতাম। এ সময় আমি অল পাকিস্তান গার্লস গাইডের ক্যাম্পিংয়ে মাড়ি গেলাম। ফেরত আঁশটেই আব্বা কাগজ আর কলম হাতে ধরিয়ে বললেন, শামীম, মনে থাকতেই মারির ডায়েরী লেকিলা মা। মাত্র তিনখানা ছবি নিয়ে এসেছিলাম। আব্বা তিন পর্বের “মারীর ডায়েরী” লিখিয়ে সেগুলো সহ বাগবান ভাইর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।=অবাক কাণ্ড এই যে দুসপ্তাহের মধ্যেই ধারাবাহিক হিসেবে তা ছাপা হতে লাগলো।স্কুলে আমার দাম গেল বেড়ে। আমি আমি মহা খুশি হয়ে গেলাম আমার হারানো ছবিগুলোই যে ছাপা হচ্ছে! যে কোন লেখা ছাপা হলে চা খেতে খেতে আম্মা-আব্বা উচ্চস্বরে হাঁক দেন শামীম নতুন লেখাটা লইয়া আয়, পড়, আমরা হুনি’। আমি কেন যেন আর বিড়ম্বিত হই না, খুশিই হই।এমনকি ওঁদের বন্ধুরা এলেও পড়ে শোনাই।
ছোটদের বিভাগে লিখে লিখে তখন আমার খালি প্রেমের গল্প লিখতে ইচ্ছা হত। মনে হত কবে বড় হব! এদিকে আব্বা জানেনই না আমি ক্লাস সেভেনেই লুকিয়ে কপাল কুন্ডলা পড়ে ফেলেছি। পাবলিক লাইব্রেরি থেকে মন্টি আর আমি মাসিমা ও আম্মার জন্য বই আনতে গেলে নদীর পাড়ে আগে আমরাই পড়ে নিচ্ছি এক চ্যাপ্টার মেমসাহেব, নটি। কপালকুন্ডলা পড়ে তার মত হবার জন্য আম্মাকে আর চুল কাটতেই দিতে চাই না। কড়ি দিয়ে কিনলাম লেপের ভেতরে লুকিয়ে শেষ করে তখন সঞ্চয়িতা পড়ে রবীন্দ্রনাথ নকল করছি দিনরাত। ভাবা যায়!
এসএসসি পাশ করার আগে থেকেই সরকারি চাকুরে আব্বা আমার রাজনীতি সচেতনতা, বক্তৃতা নিয়ে আশংকায় পড়ে গেলেন। আইয়ূবসাহীর সরকারী গোয়েন্দাগিরি তার তার কারন।তাই দু’জনেই সিদ্ধান্ত নিলেন যে এমন কোন উচ্চমাধ্যমিক কলেজে, যেখানে রাজনীতির সুযোগ কম কিন্তু সাংস্কৃতিক সুযোগ রয়েছে সেখানেই ভর্তি করাতে হবে। কারন আমার এ উদ্যম এ চাঞ্চল্য কোথাও না কোথাও তো রাখতে হবে!
স্কলারশিপ সহ সুযোগ পেয়ে গেলাম শহীদ দানবীর রনদা প্রসাদ সাহার সুনামধারী কুমুদিনী মহিলা কলেজে। কাচগাঁথা সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা নিরাপত্তা, ভেতরে শাপলা ফোটা পুকুর, জলপাই গাছ ঘেরা টিনশেড হোস্টেল, ঘরে বিদ্যুতবিহীন হ্যারিকেনে পড়াশোনা ও এক ঘরে আট বা ছজন শিক্ষার্থীর ব্যবস্থা আর স্বাস্থ্যসম্মত আহার সবই তাঁদের খুব পছন্দ হল। আর আমি সেখানে প্রবেশের পরই স্বাধীনতা পেয়ে গেলাম। ভাবলাম প্যারেন্টাল গাইডেন্স ছাড়া লেখা যাক দু’একটি প্রেমের গল্প এবার। আব্বা জানতেই পারবেন না আমি কোথায় কি পাঠাচ্ছি! বড় হবার মজাই আলাদা!
প্রথমেই মনে হল সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকার কথা। সেখানে সুফিয়া কামাল থেকে কত কত নারী যে লেখেন! ঈদ সংখ্যায় কতজনের ছবি ওঠে! আম্মাকে দেখেছি নিয়মিত সংখ্যা থেকে সেলাইর ডিজাইন কার্বণ কপি করে আমার হলুদ জামার বুকে লেইজি ডেইজী প্যাটার্ণ তুলে নিতে। রান্না দেখে একবার আম্মা কি অসাধারণ সব রান্না রাঁধতে। গল্প গুলর যা সুন্দর অলংকরণ! বাপরে বাপ!
তো স্কুল শেষ করে কুমিদিনীতেই আব্বার ভাষায় ‘এ্যারেস্টেড’ হয়েই পেলাম মুক্তি। স্বাধীনতা! আহ , সেখানে রাতে টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনে শুনে লিখলাম ‘এক পশলা বৃষ্টি’র মত ক্লিশে নামেই আমার প্রথম প্রেমের গল্প। সাধারণ সংখ্যায় তা যেদিন ছাপা হল সেদিন হোস্টেলের জলপাই গাছের নিচে কমন রুমের সামনে খোকনা, হেনা, রুবি পারুল সবাই ঘিরে ধরলো।মাই গড, বিখ্যাত শিল্পী হাশেম খান করেছেন আমার গল্পের অলংকরণ। সোজা কথা!
এদিকে জামালপুর থেকে আব্বার বদলী হয়ে গেল। পুরো পরিবার চলে গেল নারানগঞ্জে। তখন কায়দে আজম রোডের বালুর মাঠের উল্টোদিকে তারা থাকেন। দারোগা চাচার গাড়ি না হলে কলেজ ছুটিতে আড়াইশ মাইল বাসে করে যেতাম আসতাম কলেজে। “এক পশলা বৃষ্টি”ছাপা হবার পর প্রথম ছুটিতে যেবার নারায়নগঞ্জে গেলাম আমি সারাদিন পদ্মফুলের ব্যল্কনিতে দাঁড়িয়ে জুলিয়েটের মত আমার রোমিওদের জন্য অপেক্ষা করি। এদিকে ড্রইং রুমে আব্বার বন্ধুরা করেন চায়ের অপেক্ষা। তাদের সালাম জানিয়ে ভেতরে গিয়ে আগের মত চা ও পেঁয়াজু রেডি করে আমি চিনি দিয়ে দিয়ে চা নাড়তে থাকলাম। সব কথা শোনা যায়। হঠাৎ শুনি আব্বা অনেক গর্ব ভরে তার বন্ধুকে বলছেন, ‘আমার ফুরি (কন্যা) অখন বড় অই গেছে। বেগমো লেখে… ‘। বিখ্যাত বেগম পত্রিকায় লেখা ছাপা হওয়া যে তাঁর মেয়েকে লেখকের সম্মান দিয়েছে তাতেই তাঁর গর্ব। লিখতে থাকলা একের পর এক গল্প।
এবার বলি আমার কবিতা লেখার গল্প। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওপার বাংলায় ছাপা হয়ে এপার বাংলায় গোপনে বিলি করার জন্য যৎসামান্য কিছু কবিতা লিখতে হয়েছে যা ঠিক কবিতা নয় তা কবিতা-শ্লোগানই, ধার দরকার- ভারের সময় কোথায়? যুদ্ধ শেষে মনোযোগ গেঁথে থাকলো গল্পে ও সাংবাদিকতায় কিন্তু প্রাণ ঝুলে গেল কবি ও কবিতায়। বুঝলাম আমি কবি হতে চাই।
সময়টা আশির দশকের শুরুর দিক।টাঙাইল গুণী গ্রামের গুণী সন্তান কবি রফিক আজাদ উত্তরাধিকার সম্পাদক। বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদত ভাইর বন্ধু, দু’জনই মুক্তিযোদ্ধা।তিনি যে আমার গল্প ও গদ্য পড়েছেন তা বুঝি নি। সে সময় তিনি বাংলা একাডেমির এক অন্যতম আধিকারিকও। বর্ধমান হাউসের পেছনে সে সময়ের প্রায় নতুন দালানের তিন তলার কোনার দিকে দুইদিক খোলা তাঁর দপ্তর। জানালায় বহেরা বা আমগাছ। তিনি পদাবলী কবিতা সংগঠনের তিনি অন্যতম একজন।আমি তখন কবিতার-কর্মী। মাঝে মাঝে বাংলা একাডেমীতে যাই। গেলেই অসীম দা (অসীম সাহা), বেলাল ভাই (বেলাল চৌধুরী), আসাদ ভাই (আসাদ চৌধুরী) তো থাকেনই পাশের ঘর থেকে কখনো সেলিনা আপাও (সেলিনা হোসেন)আদায় যোগ দেন।মাঝে মাঝে ঝড়ের মত আবু হেনা স্যারও (আবু হেনা মোস্তফা কামাল) এসে সবাইকে হাসিয়ে মাতিয়ে বেরিয়ে চলে যান। আমি ধান শালিকের দেশে’র লেখার বিল ওঠাতে গিয়ে আটকে যাই সৃষ্টিশীল আড্ডায়।
একদিন রফিক ভাই বললেন ‘শামীম তোমার গদ্য অনেক লিরিক্যাল, সিরিয়াসলি কবিতা লেখোতো’। সেই আমি কবিতায় পূর্ণ মনোযোগ দিলাম। শুধু আমি না আমাদের এক গুচ্ছ। আমি, দিলারা হাফিজ, শাহজাদী আঞ্জুমান আরাও আর তিনি গুণ টেনে রাখলেন। আমরা লিখতে থাকলাম, দেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে পদাবলীর কবিতানুষ্ঠানে গেটে দাঁড়িয়ে কবিতার অতিথিদের হাতে লাল গোলাপ তুলে দিতে দিতে একদিন সেই দুচারটা কবিতা যা কিনা দৈনিক বা সাপ্তাহিকে উঠছে তাই নিয়ে সাহস করে একদিন মহিলা সমিতির ‘পদাবলী’ মঞ্চেও উঠলাম। শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্, সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ, সৈয়দ হক, বেলাল চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ এদের সঙ্গে কবিতা পারফর্ম করলাম! সে অল্প কয়েক কবিতা থেকেই রফিক ভাই ১৫ খানা কবিতা বাছাই করে বেলাল ভাইর সঙ্গে বেঁধে ‘যুগল বন্দী’ প্রকাশনা থেকে বাংলাদেশে প্রথম আট নারী ও পুরুষ কবির এক প্যাকেটে, এক মলাটের খোপে চার খানা ‘প্রেমের কবিতা’ বেরুলো। হৈ চৈ পড়ে গেলো কবিতা পাড়ায়।
আমার সত্তর দশকের কবিদের সঙ্গে হাঁটা শুরু করেছিলাম বলে বেশি ভাগ পাঠকই আমাকে সত্তর দশকের কবি জ্ঞান করেন। বস্তুত আমি গ্রন্থবদ্ধ হলাম, কবি হিসেবে নজরে পড়লাম রফিক আজাদের কারনে আশির দশকেই।মজার কথা হল সে সময় বাংলাদেশের সাহিত্যে আজাদদের জয় জয়কার চলছে এবং সবাই পুরুষ। এঁরা আলাউদ্দিন আল আজাদ, হুমায়ুন আজাদ, আবিদ আজাদ, হালিম আজাদ এবং এক ও অনন্য রফিক আজাদ। এমন যখন অবস্থা, এ নতুন কবির নাম দিয়ে বোঝা যায় না সে পুরুষ না নারী! সেদিন প্রবেশ করতেই বললেন, এসো ভ্রাতোঃ। কি ব্যাপার! সবাই হাসছেন। ‘শোনো শামীম তোমার কবিতা পড়ে লোকজন আমাকে ফোন করে জানতে চেয়েছিল আজিকার এই নতুন কবিটা কে? সে আমার আত্মীয় কিনা? আমি বলে দিয়েছি শামীম আজাদ আমার ছোট ভাই হা হা হা…’। সেদিন সে হাসিতে ভেঙে পড়লাম আমি আর দিলারাও।আজ আর বলতে হয় না শামীম আজাদ নামের কবি যেজন সে নারী হলেও আনাড়ি নয়।






Leave a Reply