তিব্বত স্নো: মায়ের রূপচর্চা


বাংলাদেশ বিমানে করে লন্ডন ফিরে আসছিলাম । বিমান ছাড়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই জানালায় দেখি কোমল মেদের মত মেঘের পরত। এক সময় সব সাদা হয়ে গেল আর উঁচু নিচু পাহাড় জেগে উঠলো।
ছোট বেলায় দেখা কোহিনূর ক্যামিকেলের স্নো’র ডিবেতে দেখা তুষার পাহাড়ের মত।মনে হয় যেন খাই!

আম্মা মুখে তিব্বত স্নো মাখতেন। পন্ডস এসেছে আরো পরে। স্নো, কাজল অথবা সুরমা আর গরমের কালে পাউডার দিতেন। এই ছিলো মায়ের মুখ্য মেকাপ। স্নো’র বাক্স থেকে ডিবেটা বের করে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্যাঁচ মুক্ত করে রূপালী ঢাকনাটা টেবিলে রাখতেন। আর তক্ষুনি বাইরে লাফিয়ে পড়তো এক পরাবাস্তব সুগন্ধ। বারো তেরো বছরের আমি, কিশোরী কৌতূহলে গালে হাত দিয়ে তার সাজ দেখতাম। স্নোবাক্সের একদিকে এক ধবধবে বরফ পাহাড়ের ছবি। বরফ তো ইংরাজিতে স্নো।
ভাবতাম ওই পাহাড় থেকে স্নো এনে বানানো হয়েছে ঐ ক্রিম। না হলে কি করে তা হুবহু ঐ ছবির মত সাদা!

আমি তিব্বত কৌটোর তুষার পাহাড়ের ছবি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম আর আম্মা ঘি তোলার মত আঙুল বাঁকিয়ে সেই স্নো তুলে নিয়ে আসতেন নির্দেশিকার মাথায়। তারপর সেই সাদা নরম থিকথিকে পরম ময়েশ্চারাইজার সারা মুখায়বের বিশেষ বিশেষ স্থানে ফোঁটা ফোঁটা করে লাগাতেন। প্রথমে নাকের মাথায় এবং তারপর যথাক্রমে তার গোলাপি দু’গাল, থুতনি এবং কপালে। এরপর দু’করতল দিয়ে
ঘষে ঘষে তা ছড়িয়ে দিতেন সারা মুখায়বে। তখন আবার ছড়িয়ে পড়তো আরেক প্রস্থ সুগন্ধ।

যেদিন আমার নাচ থাকতো, সেদিন গ্রীন রুমে আম্মা আমাকে স্নো দিয়ে সাজাতেন। যেমন করে তখন বিয়ের কনের মুখে কাঠি দিয়ে স্নো তুলে তুলে মুখে আল্পনা আঁকা হোত। ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যেই তা শক্ত সুন্দর নকশা হয়ে বসে থাকতো।

রোজার ছুটিতে সিলেট গেলে পথে পাহাড় দেখেছি, তার সবইতো সবুজ। আব্বা বলেছেন তিব্বত নামে যে জায়গা সেখানের পাহাড় ওভাবেই দুধসাদা বরফেই ঢেকে থাকে সারা বছর। আর বিলেতেও যেখানে
আমার তিন মামা -মায়া মামা, সোনা মামা ও মনি মামা থাকেন সেখানেও শীতে অনেক বরফ পড়ে। যা আমি এখন নিজেই দেখি।

তখন আমাদের কোন ড্রেসিং টেবিল ছিলো না ছিলো মাছের পিঠরঙা একটি স্টিলের আলমারি। আলমারির কপাটে লাগানো আয়না দেখেই মার স্নো মাখা, সোনালী কাজলদানী থেকে হাতে তোলা কাজল চোখে পরা বা রূপালী সুরমাদানী ঝাঁকিয়ে তার ভেতরের বিপজ্জনক শলাকা দিয়ে চোখের
কপাটের এধার ওধার করা এবং সব শেষে শাড়ি পালটানো- ব্যস। আম্মাকে কোনোদিন লিপস্টিক দিতে দেখিনি। শেষের দিকে দিতেন পেট্রলিয়াম জেলি। রাতে মুখ মেজে হাতের তালুতে ঘন

গ্লিসারিনের উপর দু’ফোঁটা তীব্রগন্ধী কেওড়া জল মিশিয়ে পায়ের গোড়ালীতে পরম যত্নে মেখে নিতেন। আম্মার পা কখনো রুক্ষ হতো না। আম্মা তাঁর পায়ের গোড়ালী ঝামা নামের ঘন কলিজা কালারের পাথর দিয়ে স্নান ঘরের কাঠের পিড়িতে বসে ঘষে নিতেন। ছুটির দিনে আমাদের উপর চলতো সে অত্যাচার। আর স্নান শেষে খালি গায়ে কুচিওলা প্যান্ট পরে হিহি করে কাঁপতে থাকলেও তিনি গায়ে গ্লিসারিন-গোলাপজল মাখতেই থাকতেন।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আম্মা শাড়ির কুঁচি ঠিক করার সময় আব্বা তার পেছনে দাঁড়িয়ে চিরুনী চালিয়ে চুল ব্যাকব্রাশ করে নিতেন। তারপর চশমার খোল থেকে হলুদ ফ্লানেল টুকরো বের করে চশমার কাচ মুছে নিয়ে আম্মার সুরমা দেয়া চোখের দিকে তাকিয়ে বলতেন চলো!

তারপর ওরা দু’জন ঘর রিক্সা করে বালুর মাঠ পেরিয়ে হয় খালামনির বাসা বাবুরাইল যেতেন। না হয় যেতেন নারায়নগঞ্জ রাইফেল ক্লাবে। ঐসবই ছিল তাদের সান্ধ্য মিলনমেলার স্থান।
তাদের ফেরার শব্দ শুনতেই ঝিমানো ছেড়ে পড়ার টেবিল থেকে আমি উচ্চ স্বরে মুখস্ত কবিতা শুরু করে দিতাম… “তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে”  ইত্যাদি।

প্লেনের জানালায় আধ ভাঙা স্মৃতি রেখে বাংলাদেশ বিমানের গরম গরম বিরিয়ানীর স্বাদু গন্ধে এবার আমি ভেতরে তাকাই। খাবার দেয়া শুরু হয়েছে।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড় (Shikor)

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading