আলোর পথযাত্রী

-মধুমিতা দত্ত

রাতের ক্লান্ত অন্ধকার সরিয়ে ভোর শুধু একটু আলো রেখে যায় – যেন নিঃশব্দে বলে , আজও বেঁচে থাকার অনুমতি আছে। কিন্তু সব ভোর সমান নয়। কিছু ভোর আলো ছড়ায় উঠোনে, পাতায়, জানালায় – কিন্তু মানুষের ভেতরে পৌঁছতে পৌঁছতে তার শক্তি ক্ষয়ে যায়। বৃদ্ধাশ্রম “নলিনী নিবাসে”র ভোর তেমনই। যেখানে দিন গোনা হয় না ক্যালেন্ডারে, গোনা হয় স্মৃতিতে; যেখানে প্রতিটি সকাল নতুন দিনের নয়, বরং পুরনো দিনের পুনরাবৃত্তি।

সকালবেলার সূর্যের আলো বৃদ্ধাশ্রম নলিনী নিবাসের ছোট উঠোনটাকে আলোকিত করলেও, সেই আলো যেন ঘরের ভেতর ঢুকেই ম্লান হয়ে আসে। দূরের বাঁশবাগান থেকে পাখির ডাক ভেসে আসে-কিন্তু তা পৌঁছয় না হৃদয়ের ভেতরে। সময় থমকে আছে, ঠিক যেন পুরনো ঘড়ির কাঁটা এক জায়গায় এসে ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরজুড়ে স্তব্ধতা, আর স্মৃতির ভারে বাতাসটাও ভারী। ধূসর দেয়ালগুলোতে লেগে আছে ফেলে আসা দিনের ছায়া-কিছু হাসি, কিছু না-পাওয়া কথার দাগ। উঠোনের গাছগুলোর পাতা ধীরে ধীরে দুলে ওঠে; সেই দোলায় জীবনের গল্প নয়, বরং দীর্ঘশ্বাসের মতো এক নীরব বেদনা ঝরে পড়ে।   

এই বৃদ্ধাশ্রমের প্রাণকেন্দ্র নিঃসন্তান  নলিনী দেবী ও সুধাংশু সেনগুপ্ত। এখানে অনেক আবাসিক আছেন ; কেউ স্মৃতিমুখর, কেউ হাসিখুশি, কেউ বা একেবারে নিঃসঙ্গ। অজিত বোস ৭৫ বছরের একজন অধ্যাপক, যিনি তাঁর ছেলে-মেয়ের ব্যস্ত জীবনের জন্য বৃদ্ধাশ্রমে এসেছেন। তাঁর  চোখে সবসময় একধরনের বিষণ্ণতা খেলা করে। এদিকে কমলিনী সরকার ৬৮ বছরের প্রাক্তন শিক্ষিকা, যিনি স্বামীর মৃত্যুর পর বৃদ্ধাশ্রমে এসেছেন। তাঁর  মধ্যে অদ্ভুত এক প্রাণশক্তি। আর রাকা সেন  হলেন শুধুই একজন বৃদ্ধা , যিনি ঘর বাঁধতে চেয়েও বাঁধতে পারেননি কোনোদিন , অধরা স্বপ্নই থেকে গেলো।  সারাটা জীবন শুধু অন্যের সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো লালন পালন করেছিলেন।

অরুণবাবু বারান্দার চেয়ারে হেলান দিয়ে উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর দৃষ্টিতে যেন কোনো অজানা প্রশ্নের প্রতিফলন, যা উত্তরহীন এক গভীরতার মধ্যে হারিয়ে গেছে। পাশে বসে থাকা প্রমিতাদেবী একটি পুরনো হারমোনিয়ামের ওপর আঙুল চালিয়ে সুরের খোঁজ করছেন। কিন্তু সুর ঠিক মনের মতো ধরা দিচ্ছে না, যেন তাঁর অন্তরের বিষাদের সুর হারমোনিয়ামের প্রতিটি চাবিতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

আশ্রমের এক কোণে নতুন কর্মচারী কাব্য হাসি মুখে সবার জন্য চা তৈরী করে কাপগুলো ট্রেতে সাজাচ্ছিল। তার চোখেমুখে  এক ধরনের নির্মল আনন্দ খেলা করছে। সেইসময় পাশে এসে দাঁড়ালেন এই আশ্রমের সেক্রেটারি মিসেস সুমনা মিত্র। কাব্য একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল,

 “দিদি, এতগুলো মানুষের খরচ… সব কীভাবে সামলান আপনারা?”

সুমনা মিত্র হালকা একটা হাসি হাসলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন “নলিনী দেবী আর সুধাংশু সেনগুপ্ত নিজেদের সঞ্চিত অর্থ তো দিয়েছেনই। তার সঙ্গে আছে সরকারি অনুদান, সমাজের কিছু মানুষের দান। আর -” তিনি একটু থামলেন, “এই আশ্রমের কারো কারো ছেলে বা মেয়েও মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠান। সব মিলিয়েই চলে আমাদের নলিনী নিবাস।”

কাব্য আর কিছু বলল না। চায়ের কাপে চামচটা নড়ল। সেই শব্দে যেন বোঝা গেল – এই বাড়ি চলে হিসেবের খাতায় নয়, চলে মানুষের অসম্পূর্ণ দায়িত্ব আর নীরব ভালোবাসায়।

এমন সময় আশ্রমের দরজার ঘণ্টা বাজল। শীতল নিরবতার মাঝে সেই ঘণ্টার শব্দ যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। মিসেস সুমনা মিত্র দরজা খুলে দেখলেন দরজার ওপারে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। সাথে একজন তরুণ। মিসেস মিত্রের দিকে তাকিয়ে সেই তরুণ  বললেন,” গতকাল আপনার সাথে কথা হয়েছে। তাছাড়া প্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজপত্র সবকিছুই দিয়েছি আপনাকে। আজ নিয়ে এলাম। আমি আসি।” বলে চলে গেলেন।

 আগত বয়স্ক ভদ্রলোকের গম্ভীর চেহারা যেন কিছু না বলা কথার প্রতিচ্ছবি, কপালের গভীরে সোজা ভাঁজ পড়েছে, আর চোখে এক অদৃশ্য চাপা কষ্ট যেন এক দীর্ঘ যাত্রার গল্প বলে। তিনি যেন নিজের কষ্টের বোঝা বহন করছেন, যা কখনো উন্মোচিত হয়নি।

মিসেস মিত্র মুখে সাদর অভ্যর্থনার এক অমলিন  হাসি নিয়ে তাঁকে বললেন, “আপনি অভিজিৎ সেন?” “হ্যাঁ,” ক্লান্ত গলায় উত্তর দিলেন ভদ্রলোক। “আমরা আপনার আসার খবর পেয়েছিলাম। ভেতরে আসুন।” মিসেস মিত্র এক কোমল হাসি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানালেন।

ভদ্রলোকের  উপস্থিতি যেন আশ্রমের পরিবেশে এক নতুন ধ্বনি নিয়ে আসে। চারপাশের নিস্তব্ধতা, আর কষ্টের মেলবন্ধন নতুন এই আগন্তুকের সঙ্গেও এক অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি করে নিলো।

অভিজিৎ বাবু ভেতরে ঢুকলেন। ঘরে বসা বাকি প্রবীণরা চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। অভিজিৎ বাবুর চেহারায় কঠোরতার সাথে  এক ধরনের বিষন্নতা স্পষ্ট। তিনি কারও দিকে তাকালেন না, সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।

এই আবাসনে আরও একজন হলেন শশিশেখরবাবু। তিনি  অবসরপ্রাপ্ত চিফ ইঞ্জিনিয়ার – প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। বিপত্নীক , একটি ছেলে শুভ্র; সেও প্রতিষ্ঠিত। বৌমা সৌমি কলেজের অধ্যাপিকা , বছর পাঁচেকের একটি নাতি সায়ন্তন। এককথায় শিক্ষিত , ভদ্র , সচ্ছল ও সামাজিক পরিকাঠামোতে আপাত সুখী একটি পরিবার। এ হেন পরিবারে যখন বয়োজ্যেষ্ঠ শশিশেখরবাবু  বৃদ্ধাশ্রমে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তখন ছেলে , বৌমা সহ আত্মীয় পরিজন বন্ধু বান্ধব যে কপালে চোখ উঠাবেন সেটা বলা বাহুল্য মাত্র।

অভিজিৎ বাবু আসার পর প্রথম ক’দিন নলিনী নিবাস পূর্বের নীরবতার ছন্দে চলতে লাগলো। তিনি সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করতেন, তারপর নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিতেন। কারও সঙ্গে কথাবার্তা নয়, চোখাচোখিও নয়। যেন এই আশ্রমের দেওয়ালগুলোর মতোই নীরব ও ভারাক্রান্ত।

এক সকালে কাব্য চা দিতে গিয়ে লক্ষ্য করল অভিজিৎ বাবুর টেবিলে একটি পুরনো ডায়েরি পড়ে আছে। কভার ছেঁড়া, পাতাগুলো হলদে। কাব্য না পড়লেও দেখল, পাতার ফাঁকে ফাঁকে অদ্ভুত সুন্দর হাতের লেখা, মাঝে মাঝে আঁকা স্কেচ – একটা নদী, একটা রেললাইন, আর এক কোণে ছোট্ট একটি মেয়ের মুখ।

সেদিনই প্রথম কাব্য জিজ্ঞেস করল, “কাকু, আপনি কি ছবি আঁকতেন ?”

অভিজিৎ বাবু অনেকদিন পরে কারও প্রশ্নে তাকালেন। চোখে বিরক্তি নয়, বরং একরাশ ক্লান্তি। উত্তর দিলেন  “একসময়…”  এই ‘একসময়’-এর মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল একটা বন্ধ দরজা।

পরের দিন বিকেলে প্রমিতাদেবী হারমোনিয়াম নিয়ে উঠোনে বসেছিলেন। হাওয়ায় সুর ভেসে যাচ্ছিল, কিন্তু হাত থেমে থেমে যাচ্ছিল। হঠাৎ অভিজিৎ বাবু দূর থেকে দাঁড়িয়ে পড়লেন ।  

“বেশি জোরে বাজাবেন না,” হঠাৎ অভিজিৎ বাবু বলে উঠলেন,“এই সুরটা একটু নরম ছোঁয়া দিয়ে বাজাতে হবে। ”

সবাই অবাক। প্রমিতাদেবীও।

“আপনি সুর বোঝেন?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

অভিজিৎ বাবু একটু থেমে বললেন,

“আমার স্ত্রী গান শেখাতেন।”

আশ্রমে  এই প্রথম তাঁর অতীতের দরজা একটু খুলল। সেই দিন থেকে বিকেলগুলো বদলাতে শুরু করল। প্রমিতাদেবী হারমোনিয়াম বাজাতেন, অভিজিৎ বাবু বসে থাকতেন-কখনো তাল দিতেন, কখনো শুধু চোখ বন্ধ করে শুনতেন। অজিত বোস ধীরে ধীরে এসে বসতেন, মাঝে মাঝে কোনো কবিতার লাইন বলে ফেলতেন। কমলিনী সরকার চা এনে দিতেন, আর রাকা সেন নিঃশব্দে সবার জন্য বিস্কুট ভাগ করতেন-যেন এটাই তাঁর নিজের সংসার।

একদিন কাব্য একটা প্রস্তাব দিল।

“আমরা  একটা ছোট অনুষ্ঠান করি  নিজেদের জন্য?”

নলিনী দেবী প্রথমে অবাক হলেও সুধাংশু সেনগুপ্ত মৃদু হেসে বললেন,

“এই আশ্রমে যদি নিজেদের জন্য কিছু না করি, তাহলে কাদের জন্য করব?”

অনুষ্ঠানের দিন উঠোনে রোদটা অন্যরকম লাগছিল। শশিশেখরবাবু, যিনি এতদিন নিজের দৃঢ় ব্যক্তিত্বে নিজেকে আলাদা রেখেছিলেন, সেদিন নাতির জন্য লেখা একটা চিঠি পড়ে শোনালেন—কাঁপা গলায়, কিন্তু গর্ব নিয়ে। কমলিনী সরকার আবৃত্তি করলেন, অজিত বোস   নিজের লেখা একটা পুরনো কবিতা পাঠ করলেন । আর রাকা সেন ধীরে ধীরে গেয়ে উঠলেন ,” প্রেম একবারই এসেছিলো নীরবে … “

শেষে অভিজিৎ বাবু এগিয়ে এলেন। হাতে তাঁর সেই ডায়েরি।

“আমি কিছু আঁকতাম,” বললেন তিনি, “আজ মনে হলো দেখাই।”

ডায়েরির পাতায় পাতায় জীবনের গল্প -ভাঙন, ভালোবাসা, হারিয়ে যাওয়া মানুষ। কেউ কথা বলল না। চারপাশে ছিল  শুধু পাখির ডাক আর পাতার মৃদু শব্দ।

তারপর ধীরে ধীরে ডায়েরির শেষ পাতাটা উল্টে অভিজিৎ বাবু একটু থামলেন। সেখানে কোনো আঁকা ছবি নেই শুধু ফাঁকা কাগজ। তিনি মৃদু হেসে বললেন,

“এটা আমি ইচ্ছে করেই ফাঁকা রেখেছিলাম। ভাবতাম আর কিছু আঁকার বাকি নেই। আজ বুঝেছি ছিল।”

নলিনী নিবাসের উঠোনে তখন বিকেলের আলো ঢলে পড়ছে। সেই আলো সবার ভেতরে এক নরম পরশ ছুঁয়ে গেলো। শশিশেখরবাবু চুপচাপ চশমা খুলে রাখলেন, রাকা সেন জানালার দিকে তাকিয়ে গভীর নিশ্বাস নিলেন, আর প্রমিতাদেবীর হারমোনিয়ামের ওপর হাতটা এই প্রথম স্থির হয়ে রইল – যেন সুরটা পাওয়া গেছে।

সেদিন সন্ধ্যায় ঘণ্টা বাজলেও কেউ তাড়াহুড়ো করল না। চা ঠান্ডা হলো, কথাবার্তা ধীরে চলল। কাব্য উঠোনের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভাবল – এখানে মানুষ আসে শেষ ঠিকানা খুঁজতে, অথচ কখন যে নতুন শুরু হয়ে যায় কেউ টের পায় না।

রাতে নিজের ঘরে ফিরে অভিজিৎ বাবু ডায়েরিটা খুলে ফাঁকা পাতাটায় পেন্সিল ছোঁয়ালেন। প্রথম রেখাটা কাঁপা ছিল, দ্বিতীয়টা একটু স্থির। জানালার বাইরে পাখির ডাক নেই, শহরও দূরে তবু ঘরের ভেতরে একটা নরম আলো জ্বলে রইল।

সেই আলো কোনো প্রদীপের নয়, কোনো সূর্যেরও নয় – মানুষের ভেতরে জ্বলে ওঠা আশ্বাসের আলো। নলিনী নিবাসে যাঁরা দিন গুনতে এসেছিলেন তাঁরা বুঝলেন জীবন কখনো শেষ হয়ে যায় না; শুধু তার ভাষা বদলে যায়। আর কিছু গল্প – শেষে নয়, রেশে বাঁচে।

সেদিন সন্ধ্যায় “নলিনী নিবাসে” এক অদ্ভুত পরিবর্তন হলো। মনখারাপের পাশাপাশি এসে বসল আনন্দ – শান্ত, সংযত, বাস্তব। কারণ তাঁরা বুঝে গিয়েছিলেন, এই বয়সে আনন্দ মানে হাসির ঝড় নয়,  আনন্দ মানে কেউ একজন পাশে বসে থাকা, কেউ শোনা, আর কেউ বলা।

“নলিনী নিবাস” তখন আর শুধু বৃদ্ধাশ্রম নয় – তা হয়ে উঠল অসম্পূর্ণ জীবনগুলোর এক যৌথ আশ্রয়, যেখানে মনখারাপ থাকলেও, তার মাঝেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় বেঁচে থাকার উষ্ণ আলো; সবাই, নিঃশব্দে, একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে হয়ে উঠলেন – আলোর পথযাত্রী

 


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading