দুধের দাম

-ডি. অমিতাভ


“হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।”
ধ্রুপদপ্রভু বেশ সুরেলা গলায় এবং গলা খুলে বলে চলেছে নাম কথা। মাটির দাওয়া, তার উপর ডেকরেটার্স থেকে ভাড়া করা পাল। ধর্মের কাজ বলে মাধাই ডেকরেটার অবশ্য বেশ ফর্সা পালটাই দিয়েছে। কোথাও নোংরা নেই। এরকম পালে ব’সে একটা তৃপ্তি আসে ধ্রুপদের। এখানে অবশ্য সবাই তাকে ধ্রুপদপ্রভু বলে। বয়েসে প্রায় সবাই তার থেকে বড়। বেশির ভাগই মহিলা। পুরুষ নেই বলা যাবে না। পুরুষও আছে। সংখ্যায় কম। অবশ্য জমা লোকও কম। এ লাইনে লোক বড়ই কম। পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ডাল ছাড়া নিরামিষ খেতে হয়। মাছ মাংসের তো প্রশ্নই নেই। বৈষ্ণবের হাতে ছাড়া অন্ন গ্রহণ চলবে না। এতো বিধি নিষেধ থাকলে কেউ আসে বৈষ্ণব হ’তে ?
আজ গোপাল দোয়ারীর বাড়ি নামহট্ট। গোপালও বৈষ্ণব অতএব গোপালপ্রভু। মুদি দোকানে কাজ করে গোপাল। আগে লোকে গোপলে, গোপে সব অবজ্ঞা সূচক নামে ডাকতো। মাঝ বয়েসে এসে কুচকুচে কালো গোপাল দোয়ারী দীক্ষা নেয়, বৈষ্ণব হয়। গলায় তার তুলসী মালা। মাথায় কাঁচাপাকা চুলের লম্বা টিকি। দ্বাদশ অঙ্গে খড়ি মাটির গোপীচন্দন। লোকে আগে ভড়ং বলতো। গোপাল কানে নিতো না। খেটে খাওয়া সৎ মানুষ। ধর্মে মন টেনেছে। আর কোন দিকে তাকায় না। কে কী বলল মনেও করতো না। দু-এক বছরে পুরো ব্যাপারটা একটু একটু ঘুরে যায়। গোপলকে কেউ ভক্তিমার্গ থেকে ফেরাতে পারে না। মুদি দোকানে যেমন খাটার তেমনি খাটে। শুধু তার জীবনে গোবিন্দের প্রতি ভক্তিটাই পাল্টে দেয় সব কিছু। দোকানে সময় পেলে মালা জপে। খদ্দের এলে মাল দেয়। গোপালের মালিক তার থেকে দু-এক কথা কৃষ্ণকথা শুনতে শুনতে ঝপ করে ঝাঁপ মারে কৃষ্ণসগরে। আর সেই থেকে হরিহরপুর অঞ্চলে গোপাল দোয়ারীকে আর কেউ তুচ্ছ করে না। বরং বৈষ্ণবরীতি মেনে গোপালপ্রভু বলে।
গোপাল দোয়ারী নামহট্টে জোগাড় ভালোই করেছে। হরিহরপুর প্রত্যন্ত গাঁ। এ গাঁয়ে কাঠের চেয়ার পাওয়া বড় মুশকিল। গোপাল তাও করেছে। কাঠের চেয়ারে গুরুদেবের ছবি সাজিয়েছে। পাশে টবে তুলসী গাছ। তুলসী গাছের গোড়ায় সাইকেল মার্কা ধূপ। গুরুদেবের বাঁধানো ছবির সামনে চেয়ারের নীচে মাটির প্রদীপ। গুরুদেবের ছবি আজকালকার প্লাস্টিকের চেয়ারে বসানো যাবে না। বিধান। কাঠের চেয়ার অথবা ভুমিতে। কিন্তু ভূমিতে গুরুদেবকে বসানো অসম্মানের। তার আসন উপরে। এটাও বিধান। তাই গোপাল পাশের গাঁ হাসিনপুরের সরকারদের বাড়ি থেকে একটা পুরানো কাঠের চেয়ার চেয়ে এনেছে। হাসিনপুরের সরকাররা পুরানো বড়লোক। লোকে বলে এককালে নাকি জমিদার ছিল। সরকারদের মেজকত্তা গোপালকে চেয়ারটা দেওয়ার সময় অনেক কথা জানতে চেয়েছে। মানে বয়েস হয়েছে, ধর্মে মতি আসছে। কী খেতে হয়, দুবেলা নাম করতে হয় কিনা। গোপাল বলে এসেছে ধ্রুপদপ্রভুকে পাঠিয়ে দেব, উনি সব বুঝিয়ে দেবে।
ধ্রুপদ গোপাল দোয়ারীর বাড়ির নামহট্টে ভাগবত পাঠ করার পর এখন বলছে বৈষ্ণবদের কী কী করনীয়। মানে মূল সাধারণ কথা। নিরামিষ খাওয়া কেন শরীরের পক্ষে ভালো, উপবাস কেন জরুরী তা অল্প বিস্তর বিজ্ঞানের সঙ্গে মিশিয়ে ধর্মকথা রূপে পরিবেশন করছে ধ্রুপদ। যতটা সে অন্য বড় বড় প্রভু, মহারাজ, গুরুদেবের থেকে শুনেছে সেগুলোই নিজের ভাষায় বলছে নিজের অঞ্চলের মানুষের মনের মতো। এ অঞ্চলে বৈষ্ণবদের মধ্যে ধ্রুপদপ্রভু বেশ জনপ্রিয়। তাকে পাওয়াও যায় ডাকলেই। তার চাহিদাও কম। মাঠে খাটলে যে রোজ সেই টাকা দিলেই সে খুশি। কৃষাণের টাকায় ধর্মকথা শোনানোর মানুষ পেয়ে গরীবলোকে ধ্রুপদকে মাথায় ক’রে রাখে।
সেই দুপুর থেকে ভাগবত পাঠ শুরু করে এখন শেষের পর্বে। ধ্রুপদ মনে মনে তাড়াহুড়ো করছে। সন্ধে হবো হবো। আর দেরী করা যাবে না। অনেকটা রাস্তা যেতে হবে। হরিহরপুর আর তাদের গ্রাম পঞ্চান্নখালির মধ্যে বেশ বড় একটা মাঠ। সেই মাঠের রাস্তা দিয়ে লোকজন বড় একটা যায় না। পঞ্চান্নখালির হাট-বাজার, রেল স্টেশান উল্টোদিকে। আবার হরিহরপুরের লোকজনও দিনের বেলা চাষের কাজ ছাড়া বগেরমাঠের দিকে যায় না। বগেরমাঠের চারি দিকে জায়গায় জায়গায় মোটা মোটা তালগাছ। আগেকার দিনে ঠেঙাড়েরা ঐ সব তালগাছের আড়ালে একজন একজন লুকিয়ে থাকত। এখন অবশ্য সে মেঠোপথ নেই। বেশ চওড়া রাস্তা। পঞ্চায়েত থেকে প্রতি বছরই মাটি ধরানো হয়। শোনা যাচ্ছে ও রাস্তায় ইট পড়বে সামনে বছর। ধ্রুপদ খুব একটা সাহসী মানুষ না। ভয়ে পড়লে কৃষ্ণকে প্রাণপণে ডাকে। সময় সময় জোরে জোরে ডাকে। কৃষ্ণ নামে তার এতটুকু সামাজিক লজ্জা নেই। সেই কৃষ্ণ নাম জপার পদ্ধতি জানিয়ে সে তার ধর্মকথা শেষ করে, হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ; হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে। এই ষোলো নামে তুলসীমালার একটা তুলসী জপা হবে। এরকম ভাবে ষোল নাম একশো আট কাঠির মালা পুরো জপতে হবে প্রতিদিন এবং আমৃত্যু। তবেই পরপারে সপ্তম স্বর্গে ভগবানের দেখা মিলবে।


বছর ছাব্বিশের ধ্রুপদ বিয়ে করেছে পাঁচ বছর আগে। মালতী আর তিন বছরের টুকাইকে নিয়ে সংসার। তার বাবা মা থাকে ভাইএর কাছে। ভাই একটা প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করে। অল্প হলেও ভাই এর নিয়মিত আয়। ভাই সাবেক বাড়িতে থাকে। ধ্রুপদ সেই বাস্তু ভাইকে দিয়েছে মা বাবাকে জীবনসত্ত্ব দেখভালে শর্তে। নিজে বাস রাস্তার কাছাকাছি জায়গা কিনে নতুন বাড়ি তুলেছে। সেটা অবশ্য মালতীর জন্য।

  • এ বাড়িতে আমি থাকতে পারবুনি বলে দিলুম ! বিয়ের পরে পরে মালতী ধ্রুপদকে বলেছিল।
  • কেন এ বাড়িতে কী হয়ছে ?
  • তোমার মা-বাবা-ভাই মাছ মাংস খায়। আমার মাছের গন্দ সজ্য হয় নে।
  • ওরা তো আলাদা উদিকে আন্না করে। আমাদের সাতে তো খায়নে !
  • বিয়ের আগে তো বলোনি তোমরা মাছ মাংস খাও ?
    ধ্রুপদ খুব ছোটবেলা থেকে বৈষ্ণব। বৈষ্ণবসঙ্গ তার ভালো লাগে বলে তাদের সঙ্গেই ঘুরে বেড়ায়। এরকম ঘুরতে ঘুরতেই মালতীর সঙ্গে আলাপ। ভালোবাসা। তারপর পালিয়ে নিয়ে এসে বিয়ে। বিয়ে বলতে তেমন কিছুই হয়নি। সিন্দুর তোলা বিয়ে। মালতী আজন্ম নিরামিষাশী। তার পরিবার কয়েক পুরুষ বৈষ্ণব। লেখা পড়া না করলেও ভাগবদগীতা শুনে শুনে মুখস্ত। চৈতন্য মহাপ্রভু বলতে অজ্ঞান। শ্রীকৃষ্ণ তার একমাত্র আরাধ্য দেবতা।
    সতেরো বছরের পুচকে মেয়ের সঙ্গে প্রেম ভালোবাসার সময় কে আর কবে বাড়ির প্রকৃত অবস্থার বর্ণনা দিয়েছে ! বিশেষ ক’রে সে বাড়িতে যদি অভাব নিয়ত দরজায় কড়া নাড়ে। ধ্রুপদও মালতীকে বাড়ি সম্পর্কে তেমন কিছু বলেনি। এক কাপড়ে মালতীকে নদীয়ার করিমপুর থেকে তুলে এনেছিল কোলকাতা পেরিয়ে গঙ্গার মোহনা বরাবর। সেই মেয়ে যে বিয়ের মাস ঘুরতে না ঘুরতে ফোঁস করবে ধ্রুপদ ধারণা করেনি। তার ইচ্ছা ছিল মালতীর হাত ধরে ঘুরে বেড়াবে মঠে মঠে। কিন্তু এ মেয়ে যে বড়ই সংসারী। বিয়ের আগের দু-হাত তুলে নগরসংকীর্ত্তন নাচ কেবল বিছানাতেই সামান্য দাগ রাখে। তার বাইরে বোঝাই যায় না এ মেয়ে কোন এককালে বুলবুলির মতো বুলে বেড়িয়েছে।
    অগত্যা ধ্রুপদ মঠে মঠে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন ছেড়ে মাঠে মাঠে কাজ করে বেড়ায়। অল্প টাকা জমিয়ে সামান্য জমিও কেনে গ্রামের মধ্যেই পাকা রাস্তার কাছাকাছি। বিয়ের বছরেই শালি জমি মাটি ফেলে উঁচু করে। সে বছর কী এক ভাগ্যে পঞ্চায়েত থেকে বাড়ি তৈরীর টাকাও মেলে। নিজের নামে জমি থাকলেই পাওয়া যাচ্ছিল না পাকা বাড়ি বানাবার সরকারি অর্থ। চঞ্চলদা অবশ্য সেবার খুব সাহায্য করেছিল ধ্রুপদকে। চঞ্চলদা তখন পঞ্চায়েত সদস্য। পরের বারে অবশ্য হেরে যায়। বাড়ি পাওয়ার পরের বছরই মেয়ে টুকাই এর জন্ম। সময়টা খুব সুখের কাটে ধ্রুপদের। তবে টাকাকড়ির টানাটানি ছিলই। জমি কেনার দাম মেটানোর, মেয়ের জন্মের পর বাড়তি খরচ, তাছাড়া নতুন ভিটেয় নতুন নতুন খরচ তো ছিলই। আজ ঘাট বাঁধো, বর্ষা নামলে বাড়ির রাস্তায় দুটো করে ইট বিছানো, রান্না ঘরের চালের খড় পাল্টাও। এসব করতে করতে ধ্রুপদ জেরবার হয়ে যাচ্ছিল। সে আরও খাটছিল। দিনে মাঠের কাজ। রাতে নামসংকীর্ত্তন। যে দিন মাঠে কাজ থাকে না দূর দূরান্তে নামহট্টে চলে যায়। সেখানে ভাগবত পাঠ ক’রে মাঠের রোজ তুলে নেয়। তার দেনা অগাধ, আয় সামান্য। ধ্রুপদ এতটা চাপ নিতে নিতে বেশ কিছুটা বুড়িয়ে যায়; অন্তত মনে মনে।
  • কী গো, তুমি প্রায় রাতেই তো বাইরে থাকছো ! আমার কী হবে ?
    মালতী আদর করে মাস ছয়েক আগে ধ্রুপদকে বলেছিল। ধ্রুপদ তখন একটা নামহট্টে যাবে বলে তৈরী হচ্ছিল। বেশ দূরে। শহরে যাওয়ার শেষ বাসটা ধরার তাড়া ছিল। সে ব্যাগে নিজের প্রিয় ভাগবতগীতাটা ভ’রতে ভ’রতে হেসে বলে, তুমিও চলো না আগের মতো। দুজনে মিলে ভাগবত পাঠ করবো। এই বইটা দুজনে এক সঙ্গে কত পাঠ করেছি মনে আছে ?
  • ভাগবত পাঠ করলে কি ক্ষিদে মিটবে ?
  • আরে পাগলী আমাদের দেনাগুলো মেটাবার জন্য, ভালো দুটো খাবার জন্য, টুকাইকে ভালো করে মানুষ করার জন্যই তো এতো খাটছি। কাল সকালেই তো ফিরব গো।
    ধ্রুপদ আদর করে গাল টিপে দেয় বউএর। একটা দ্রুত চুমু খেতে যায়। মালতী নাকের পাটা ফুলিয়ে সরে যায়। মুখে বলে, রাতের খাবার দিনে খেলে বাসি লাগে। পুরুষ মানুষ হয়েছো কিছুই বোঝ না ?
    ধ্রুপদের তাড়া ছিল বাস ধরার। ফতুয়াটা চাপিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়। বাসে বসে বসেই দ্বাদশ অঙ্গে খড়ি মাটির গোপীচন্দন লাগিয়ে নেবে ঠিক করে। শহরের দিকে শেষ বাসে বড় একটা লোক থাকে না।
    শেষ ছ’মাসে ধ্রুপদ খুব খেটেছে। দেনা প্রায় শোধ করেও এনেছে। মেয়ে টুকাইএর স্কুলে ভর্তি হতে এখনও দেরি আছে কিন্তু সে যেন তার সমস্ত উৎসাহ টুকাইএর স্কুলে ভর্তি নিয়ের মাতিয়ে রেখেছে। মালতীর সঙ্গেও তার বেশিরভাগ কথাই হয় মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে।
  • টুকাইকে ভালো ইস্কুলে ভর্তি করবো কি বলো ?
    ধ্রুপদ বাড়ির দোলায় বসে সকালের মুড়ি খেতে খেতে মালতীকে বলে।
  • ইস্কুল যাবেকোণ রে বাবা ! অনেক দেরি আচে তার।
  • তা দেরি থাক আমি কিন্তু প্রাইমারী ইস্কুলে টুকাইকে দুবুনি। হুকুমপুরের সারদা কেজি ইস্কুলে দুবো ওরে।
  • সে যে চুলোয় দ’ও দেবেকোন। একন থেকে মাথা খেওনি তো বাপু ! কাল কী খাবো তার নেই ঠিক আর উনি মেয়েকে বড় ইস্কুলে নেকাপড়া শেকাবে ! আর একটা ছেলে হ’লে চালাবে কী ভাবে ভেবেচো ?


গোপাল দোয়রীর বাড়ির নামহট্ট থেকে ফিরতে ধ্রুপদের বিশেষ দেরী হয় না। একদম পাশের গ্রাম। গ্রামের মেয়েরা সন্ধের শাঁখ বাজাতে শরু করেছে আর সেও বাড়ির বাঁশের বেড়া ঠেলে ঢুকে পড়ে। অনেকটা রাস্তা হেঁটে এসেছে ভাদ্র মাসের ভ্যাপসা গরমে। বেশ কদিন বৃষ্টি হয়নি। খুব পিপাসা লাগে ধ্রুপদের। দাবায় বসে হাঁক মারে, মালতী জলদে একটুকুন।
আজ পাওনা গন্ডাও বেশ ভালই হয়েছে। মনটা বেশ ফুরফুরে। সে আরও নরম করে আস্তে হাঁক দেয়, যাতে সামনের রাস্তায় শব্দটা না যায়, মোলু, একটু জল দাও গো !
তার আদুরে ডাকে অন্য একটা পিপাসাও ধরা পড়ে। কিন্তু ধ্রুপদের পিপাসার ডাকে কেউ সাড়া দেয় না। সে নিজেই উঠে মাটির ঘড়া থেকে স্টিলের গ্লাসে জল গ’ড়িয়ে খায়। এক কামরা ঘর আর দাওয়া। সংসারের বেশীর ভাগ জিনিষ ঘরের ভেতরে ঠাসাঠাসি। বাইরে শুধু দোলা, জলের ঘড়া আর মাদুরটা চালের বাতায় গোঁজা। সে মাদুরে মেয়ে সারাদিন হামা টানে। জল গড়াতে গিয়ে সে লক্ষ্য করে ঘরের দরজায় তালা মারা।
ধ্রুপদ দোলাটা পেড়ে বসে। পাওনা গন্ডা ভরা ব্যাগ দরজার পাশে হেলান দিয়ে রাখে। ভাবতে থাকে বউ কোথায় গেল এই ভর সন্ধ্যাবেলা ! মনে মনে ভাবে হয়তো ওবাড়িতে মাকে দেখতে গেছে। শাউড়ি-বউএ খুব ভাব না থাকলেও মায়ের কদিন ধ’রে জ্বর বলে হয়তো দেখতে গেছে। সে দোলায় হালকা দুলতে দুলতে অপেক্ষা করতে থাকে। তার বাড়িটা একটু একেনে। কারেন্ট এখনও নিতে পারেনি। হুক করে টেনে জ্বালায়। সেটা দিনে খোলা থাকে। সন্ধে হ’লে মালতীই আঁকশি দিয়ে লাগিয়ে দেয়। সেটাও আজ লাগানো হয়নি। ধ্রুপদ ঠিক লাগাতে পারে না। অভ্যাস নেই। মালতীই ওকাজটা করে। ধ্রুপদ অন্ধকারেই চুপচাপ ব’সে অপেক্ষা করতে থাকে বউএর।
ঘুম ভাঙে মশার কামড়ে। ক্লান্তিতে বেশ লম্বা একটা ঘুম ঘুমিয়ে নিয়েছে ধ্রুপদ। বাড়ি পাশেই কচু বাড়ি থেকে মশাগুলো তেড়ে না এলে আরও ঘুমোতো সে। ঘুম ভেঙেও দেখে বউ বাড়ি ফেরেনি। সে ধীরে সুস্থে দোলা থেকে নামে। ভরা ব্যাগটা ঘরের জানলায় বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়। কুকুর বেড়ালে মুখ দিতে পারে। ওবাড়িতে যেতে হবে। উঠোনের বেড়াটা ভালো করে লাগিয়ে দেয়। তারপর রাস্তা দিয়ে ওবাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকে। আজ যেন বেশি অন্ধকার লাগে তার। রাত্রি বেশি হয়নি কিন্তু রাস্তায় একটা জনপ্রাণী নেই।

  • মা, জ্বর কমেচে তোর ?
  • না রে খোকা ! তুই এতো রেতে কেন এলি ?
  • তোর বউমা ঘরে নেই। ভাবলুম তোর জ্বর শুনে দেকতে এয়েচে।
  • বউ ঘরে নেই ? বউ তো অনেক দিন এ বাড়ি আসেনি। বাপের বাড়ি যায়নি তো ?
    খুব চিন্তায় পড়ে যায় ধ্রুপদের মা। এটা ওটা বলতে বলতে বউ এর হাজারটা দোষ শুনিয়ে অভিযোগ করতে শুরু করে ছেলের কাছে। ধ্রুপদ উঠে আসে মায়ের কাছ থেকে। ভাবে এখানে দেরি করে লাভ নেই। হয়তো এতক্ষণে মালতী বাড়ি চলে এসেছে।
    অভিমান আর রাগের মাঝামাঝি একটা অনুভূতি নিয়ে অন্ধকার রাস্তায় বাড়ি ফিরতে থাকে ধ্রুপদ। আজ মালতীর জন্য তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছে। অনেকদিন আদর করা হয়নি বউটাকে। আজ খুব বড়-আদর করার ইচ্ছা করছে তার। আর আজকেই বউটা বাড়ি নেই ! রাস্তায় হরেনকাকার সঙ্গে দেখা হয় তার। হরেনকাকা স্টেশানে তাস খেলে সন্ধেবেলা। ধ্রুপদ কিছুই জিজ্ঞাস করে না। তার বদ্ধমূল ধারণা সে বাড়ি গিয়ে দেখবে মালতী বাড়িতে তার জন্য অপেক্ষা করছে।
    রাত অনেকটাই হয়েছে। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিল দোলায়। তারপর ওবাড়ি গিয়েছিল মালতীর খোঁজে। রাত বোঝা যায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে, ব্যাঙেদের করর্ কর্ ডাকে। জোনাকিগুলো অন্ধকারে আজ রাতে যেন নিভছে আরও বেশি উজ্জ্বলতায়। ধ্রুপদ ঘরে ফিরে দেখে একই রকম প’ড়ে আছে তাদের সাধের বাড়ি। এই প্রথম মনে হয় বাড়িটা হাঁ করে যেন গিলতে আসছে। খুব কান্না পায় তার। তার থেকেও বেশী ভয় লাগে ধ্রুপদের। সে জোরে জোরে হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ নাম জপতে থাকে।
    ধ্রুপদ জলের কুঁজো থেকে বড় করে একগ্লাস জল গ’ড়িয়ে খায়। তারপর চলের বাতা থেকে মাদুরটা টেনে শুয়ে পড়ে। মাদুরে মেয়ের হিসুর গন্ধ। খুব আপন মনে হয় সেই গন্ধটা। মনে হয় পাশেই মেয়ে শুয়ে আছে। আর তার পাশে মোলু !


মশার কামড়ে ধ্রুপদের সারারাত ভালো ক’রে ঘুম হয়নি। ভোর রাতে বৃষ্টি নেমেছিল। তাতেই তার ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে গাঁময় রটে গেছে ধ্রুপদ বৈরাগীর বউ পালিয়েছে। এ গ্রামে অনেকদিন পর বউ পালালো। বউ পালানোর খবর প্রতিবেশীর কাছে সব সময়ই বেশ মুচমুচে। তাও আবার বছর বাইশ-তেইশের কচি বউ। গতর নাকি ভালো ছিল ! ছুঁকছুঁকে মাগী ছিল ! সবই কানে আসে ধ্রুপদের। শুনতে না চাইলেও কানে কানে শুনিয়ে দিয়ে যায় পড়শীরা। ধ্রুপদের কিছুই বিশ্বাস হয় না। মোলু তার মনের সবটা জুড়ে আছে। ভালোবেসে বিয়ে করা বউ কখনও পালায় না ! কোথাও একটা ভুল হচ্ছে ভাবে ধ্রুপদ। তার মনে হয় বউ রাগ ক’রে বাপের বাড়ি চলে গেছে।
ধ্রুপদ কাউকে কিছু না জানিয়ে ট্রেন ধরে। ঘরের দরজা যেমন চাবি তালা লাগানো আছে তেমনই থাকে। শুধু কাল বিকালে গোপাল দোয়ারীর নামহট্টে পাওয়া ধুতিটা পাল্টে নেয়। বাকী মাল ওবাড়ি মায়ের কাছে পৌঁছে দেয়। শিয়ালদা থেকে ট্রেন পাল্টে সোজা শ্বশুরবাড়ি। পালিয়ে বিয়ে করে তার শ্বশুবাড়ি বলে কিছু ছিল না। এই প্রথম যে শ্বশুরবাড়ি গেল; তাও বউ খুঁজতে। কিন্তু মালতী সেখানেও যায়নি !
ধ্রুপদ তবুও তার ভালোবাসার নারীর প্রতি মনে মনেও কোন অভিযোগ করে না, নিতান্তই তার মনে আক্ষেপ, না বলে যাওয়ায়। বললে সে হয়তো ঠিক তার প্রয়োজনীয় বস্তুর জোগান দিয়ে তাকে ধরে রাখে পারতো। তার দিক থেকে তো কোন ফাঁক ছিল না। তবু জীবনের কোন ফাঁক দিয়ে হঠাৎ হারিয়ে গেল মোলু। কান্না এসে নদী হয়ে উঠতে চায় চোখের কোণে আর বুকের ভাঁজ। তবু সে কাঁদে না। মনের দুঃখ মনের মধ্যে চেপেই বাড়ি ফিরে আসে পরদিন।
বাড়ি এসে তালা খোলে চাবির মিস্ত্রি ডেকে। তালা ভাঙতে মন চায় না। চাবি আছে মালতীর কাছে। সে বাড়ি না থাকলে যদি বউ বাড়ি ফেরে কী ক’রে ঘরে ঢুকবে ! গ্রামের লোক অবাক হয়, বউএর প্রতি ধ্রুপদের কোন রাগ নেই দেখে।
ধ্রুপদের বন্ধুবান্ধব বড় একটা নেই ! খুব ছোটবেলা থেকেই তার জীবনচর্চা অন্যরকম খাতে বইছে। তবু পরের দিন শ্বশুরবাড়ি থেকে বাড়ি ফিরলে জানতে পারে মালতী নাকি চঞ্চলদার সঙ্গে পালিয়েছে। তাদের গ্রামের প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্য। তার সরকারিবাড়ি পেতে খুব সাহায্য করেছিল চঞ্চলদা। সে খুব অবাক হয়। তার থেকে বয়েসে অন্তত: দশ বছরের বড় চঞ্চলদার সঙ্গে মালতীর কিসে মনের মিল হ’লো ? মালতীর থেকে তো প্রায় পনের বছরের বড়। কী করবে ভবে পায় না ধ্রুপদ। চঞ্চলদা তো রাজনীতির লোক ! ক্ষমতাবান ছিল এক সময়।
ধ্রুপদ ভয়ে ভয়ে থানায় ডাইরী করে। সেখানে সে কারো নামে অভিযোগ করে না। মিসিং ডাইরী। বউ নিখোঁজের সন্দেহর জায়গায় কারও নাম বলার সাহস পায় না। থানার ডিউটি অফিসার বার বার অশ্লীল প্রশ্নের কিনারা দিয়ে ঘুরে যাচ্ছিল। ধ্রুপদ একরাশ হতাশা আর বিরক্তি নিয়ে বাড়ি ফেরে। বউ পাওয়া গেলে আপনাকে জানিয়ে দেব : এই আশ্বাস পায় থানা থেকে।
বউ পালানোর গল্পটা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। ভাদ্রের পর আশ্বিন পড়তেই গাঁয়ের মানুষ দুর্গা পূজা নিয়ে মেতে ওঠে। নতুন জামা কাপড়ের সুগন্ধে পুরনো হয়ে যায় ধ্রুপদের পালানো বউ নিয়ে ভালোবাসার বাড়াবাড়ি। মা দুর্গার রূপের ছটায় চাপা পড়ে কচি বউএর গতরের বর্ণনা। পূজা কাটতে না কাটতে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে যায়। ধ্রুপদ এ বছর আর ধান কাটার কাজে নামে না। তার বদলে দূর দূরান্তের নামহট্টে চলে যায়। ভাগবত পাঠ করে। যা অল্প সল্প পায় তাতেই চলে যায়। থাকা খাওয়া ফ্রি। হাতে পয়সা জমলেই সে বেরিয়ে পড়ে মালতীকে খুঁজতে। আগে মালতীর গল্পচ্ছলে বলা দূরসম্পর্কের আত্মীয় বা পুরানো বান্ধবীর বাড়িতেও উপস্থিত হয়, যদি খুঁজে পাওয়া যায় বউকে।
শীতের শুরুতে এক সন্ধে নাগাদ ধ্রুপদ বাড়ি ফেরে। তার বুঝি মনে হয়েছিল বউ মালতী, বাচ্চা নিয়ে আর বাইরে থাকতে পারবে না, বাড়ির নিশ্চিত উষ্ণতায় ফিরে আসবে। এসে আশাহত হয় আবার। ধুলো পড়েছে ঘরের জানলা দরজায়। ভাঁজ করে গুটানো বিছানার উপর বিড়ালের থাকার জায়গা হয়েছে। পোড়োবাড়ি মনে হয় বাড়িটাকে। তবু আজ রাতটা এই বাড়িতেই কাটাতে হবে। একটু সন্ধে হ’তে মনে হয় মার সঙ্গে একবার দেখা করা উচিত। হয়তো মায়ের কাছে মালতীর কোন খবর থাকতে পারে।
অন্ধকারেই বেরিয়ে পড়ে ধ্রুপদ। ওবাড়ি যাওয়ার পথেই পড়ে চঞ্চলদার বাড়ি। কী মনে করে ঢুকে পড়ে সে বাড়িতে। মাটির বাড়ি। দাবায় বাঁখারীর বেড়ায় জাফরী। ধ্রুপদ অবাক হয় কিছুটা। চঞ্চলদা বহু লোকের সরকারী টাকায় বাড়ি বানিয়ে দিয়েছে আর নিজে একটা ঘর নেয়নি !

  • বউদি, বাড়ি আছো ?
    ধ্রুপদ দাবার নীচে থেকে হাঁক মারে। বাঁখারীর জাফরীর উপর পলিথিনের ঝাঁপ। চঞ্চলের বউ ভেতর থেকে উঁকি মারে পলিথিন সরিয়ে। বলে, ভেতর এসো ঠাকুরপো।
  • না বৌদি ওবাড়ি যাব। একটা কথা জানার ছিল।
  • হ্যাঁ !
  • তোমার কাচে চঞ্চলদার কোন খপর আচে ?
  • সে ওলাওটার খপর রেকে কী করবো ! কচি মাগী পেয়ে আমাকে তিন তিনটে বাচ্চা-কাচ্চা গচিয়ে ফুর্তি মারাচ্চে !
    ধ্রুপদ এই ভয়টাই পাচ্ছিল। চঞ্চলদার বউএর কাছে এলে একটা হইচই কাণ্ড ফেলে দেবে। সে চুপচাপ উঠোনে দাঁড়িয়ে শোনে চঞ্চলদার রোগা লম্বা অস্থি চর্মসার বউ এর কথা। বোঝা যায় তার উপর দিয়েও শেষ দুমাস ঝড় বয়েছে এলোমেলো। ঝড় সামলে নিয়েছে কিন্তু ঝড়ের তিক্ততা রয়ে গেছে বউদির মুখে।
  • বাবু নাকি নেতা ছেল। গরীবের নেতা। ঝ্যাটা মারি অমন নেতার মুকে। পিরিতের নাঙেদের সব ঘর বাইনে দেচে আর আমার জন্নে নবডঙ্কা। তিন তিনটে বাচ্চা বিইয়ে গতরের কিচ্চু রাখেনে হারামীর বাচ্চাটা। এই গতর খাইটেই চারটে পেরানি বেঁচে আচি। তোমার বউ আমার ভাতার নে ভেগেচে। ডবগা মাগ সামলাতে পারুনি তুমি। আর নিরামিষ খেলে কী আর ও মাগী সামলানো যায় ! আমার ভাতারকে দ্যাকো গিয়ে ও মাগীর হাল কী করেচে। দুবেলা বাংলা খেয়ে মাগীর গতরের দফারফা করে দেচে এদ্দিনে। যাগ গে ওসব ঢ্যামনা ঢ্যামনীদের কতা। আমার ছোটো ছেলে দুদ খায়। আমার শুকনো বুকে দুদ নেই। দুদের দামটা দিও গো ঠাকুরপো। তোমারই মেয়ের মতো তো বয়েস গো !

Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading