দুই বন্ধু আর শান্তিনিকেতন
-দেবব্রত কর বিশ্বাস
দুধ চায়ে চুমুক দিয়ে শমীক বলল, “বারো ফুট, বুঝলি তো?” শুনে ফিক করে হেসে অনীকও ফোড়ন কাটল, “হালকা আলুভাজা ফ্লেভারও পাচ্ছি রে!” দু’জনেই হো হো হেসে উঠল। সেই হাসি আর ট্রেনের দুলুনির সঙ্গমে আরও দুলে উঠল চা-ভর্তি দুটি কাগজের কাপ। খানিকটা চা চলকে পড়ল অনীকের প্যান্টে। আর এক ফোঁটা গিয়ে পড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মধ্যবয়স্ক মানুষের সোয়েটার ফাটিয়ে বেরিয়ে আসতে চাওয়া ভুঁড়িতে। ভদ্রলোক বেশ বিরক্ত মুখে বললেন, “ভাই একটু আস্তে! তখন থেকে খালি বাজে বকছেন দু’জন মিলে।” শমীকের মুখে কিছু আটকায় না। ও বলল- “বকছেন কেন? আমাদের ভয় করে না বলুন তো? এদিকে দেশের নেতারা যে সারাক্ষণ বাজে বকে চলেছে, তাদেরও কি এভাবে বকে দেন?” ভদ্রলোক কিছু একটা বলতে যাবেন, এমন সময় পাশে দাঁড়ানো তাঁর স্ত্রী ভদ্রলোকের ভুঁড়িতে আঙুলের খোঁচা দিলেন। বললেন- “ছাড়ো! একটু সোজা ভাবে বসতেও শেখেনি! অসভ্য সব। তখনই বলেছিলাম, জেনারেল কম্পার্টমেন্টে যাব না। এমন পাগলের মতো ভিড়। কে শোনে কার কথা!” শমীক আবার কিছু একটা বলতে গিয়ে ঢোঁক গিলে নিল। অনীক মুখ তুলে দেখল, মহিলাও বেশ স্থূলকায়া। শাড়ির উপর ফুলহাতা সোয়েটার পরেছেন, তার উপর চাদর জড়ানো। মাথায় আষ্ঠেপৃষ্ঠে করে মাফলার জড়ানো। অথচ দরদর করে ঘামছেন। মায়া হল অনীকের। বলল- “কাকিমা, আপনি বসবেন?” মহিলা শুনেও না শোনার ভান করে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। এমন সময় ভিড় ভেদ করে এগিয়ে এল একটা হাত। শোনা গেল, কে যেন বলছেন- “দাদা, চায়ের দামটা!” টাকা মেটাতে মেটাতে শমীক বলল- “কাকা, পরের বার ফিশ ফ্রাই ফ্লেভারের চা খাইয়ো।” হাসির রোল উঠল আশপাশে।
প্রতি বছর শীতকালে নিয়ম করে শান্তিনিকেতনে বেড়াতে যায় দুই বন্ধু। দু’জনেই দু’জনের একমাত্র বন্ধু। এক কালের সহকর্মী কীভাবে যে বন্ধু হয়ে উঠল, এখন আর মনে পড়ে না। তবে নামের মধ্যে ধ্বনিগত মিল থাকাটা একটা কারণ। তবে শুধু নাম নয়। অনেক বিষয়েই অদ্ভুত মিল ওদের। রাশি, গণ, নক্ষত্র, ভাবনাচিন্তার গড়ন.. সবেতেই। যদিও এসবে বিশ্বাস নেই দু’জনেরই। দু’জনেই শিল্পী। অনীক লেখে আর শমীক আঁকে। অনীক কাজ করে কলকাতার এক বাণিজ্যিক পত্রিকায়, বড় পদে। বেশ নামডাকও আছে সাহিত্যরসিক মহলে। শমীক স্বাধীনভাবে নিজের কাজ করে। একটা আঁকার স্কুল চালায়। মাঝেমধ্যেই এগজিবিশন হয় বিভিন্ন গ্যালারিতে। একেকটা ছবি বিক্রি হয় হাজার-হাজার লক্ষ-লক্ষ টাকায়। আর বছরের একটা বড় সময় ধরে ব্যস্ত থাকে দুর্গাপূজার থিম-প্যান্ডেল বানাতে। অর্থনৈতিক দিক থেকে দু’জনেই সুপ্রতিষ্ঠিত। স্ত্রীয়েরাও নিজের নিজের ক্ষেত্রে ভাল কাজ করে চলেছে। কিন্তু কীসের যেন একটা শূন্যতা খেলা করে ওদের মধ্যে। মনে হয়, কিছুই করা হল না জীবনে। এই যে এত আঁকা, এত লেখা সবই যেন ক্ষয়ের চিহ্ন বহন করছে। কীসের ক্ষয়? নিজেরাও জানে না। শিল্পী-মহলে দিন রাত হাসিহাসি মুখে ভদ্র সেজে ক্লান্ত হয়ে পড়ে ওরা। এ কি আদৌ বেঁচে থাকা? নাকি দিন গুজরান করে চলা। বাকিরা বলে, প্রতিভাবান। কিন্তু ওরা ঠিক জানে, কীসের প্রতিভা? সবই তো আহরণ করে মাত্র। প্রকৃতি থেকে, জীবন থেকে খুঁজে নিয়ে নিজের মতো করে সাজিয়ে চলা আঁকার কাগজে, লেখার ওয়ার্ড ফাইলে। খালি শিল্পীর মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ানো। সেই মুখোশ খুলে ফেলতেই শান্তিনিকেতন যায় দু’জনে। রিজার্ভেশন কম্পার্টমেন্টে সেই সুযোগ নেই। তাই জেনারেল। বেঁচে থাকার জন্য ভিড়ের মধ্যে শুধু আলাদা হয়ে আলোকিত হওয়া নয়, ভিড়ে মিশে যাওয়াটাও যে জরুরি।
বোলপুর শান্তিনিকেতন স্টেশন থেকে বেরিয়েই সিগারেট ধরাল দু’জনে। দ্রুত টানে শেষও করে ফেলল। যেন কীসের একটা আক্রোশ সিগারেটের উপর বেশ মিটিয়ে নেওয়া গেল। তারপর টোটো-তে চাপল। ওরা যাবে সোনাঝুরি হাট পেরিয়ে বেশ অনেকটা দূরের একটা হোটেলে। দুটো দিন নিজেদের মতো করে কাটাবে। শমীক বলল, “ওই মহিলা তোর অফার করা সিটে বসল না কেন জানিস?” অনীক জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। শমীক উত্তর দিল, “তুই ওনাকে আন্টি না বলে কাকিমা বলে ডেকেছিস বলে!” হেসে ফেলল অনীক। শমীক আবার বলল- “হাসিস না। এইসব কলকাতার বাবু-বিবিদের আমি হাড়ে হাড়ে চিনি।”
- আমরাও তো কলকাতার বাবু শমীক।
- কিন্তু আমরা তো কালচার মারাতে এখানে আসি না।
- তা ঠিক। আসলে কী বল তো শমীক, উনিশ শতকের বাবু কালচারের একটা নব্য দিক হল এই মাঝেমধ্যে শান্তিনিকেতনে ঘুরে যাওয়া। আগে বাবুরা রাতের বেলায় নিজেদের বাড়িতে ফিরতে লজ্জা পেত, রাঁড়ের বাড়ি যেত। সেই দিন ঘুচেছে। এখন পরিবার নিয়ে শান্তিনিকেতন আসে সংস্কৃতিচর্চা করতে। আজকাল তো রাতে সাঁওতালি মেয়েদের নাচের আয়োজনও থাকে। সঙ্গে থাকে অঢেল মদ। পুরো ফূর্তি। দিন বদলেছে ভাই!
- তাছাড়া আর কী? দেখছিলি না দু’জনে কেমন আশপাশের লোককে ছোট নজরে দেখছিল। এমন একটা হাবভাব করছিল যে মর্গে দাঁড়িয়ে আছে।
টোটোটা হোটেলের সামনে নামিয়ে দিল ওদের। প্রতি বছর আসে বলে চেনা হয়ে গিয়েছে। দোতলার একটা নির্দিষ্ট রুম বরাদ্দ থাকে। রিসেপশনের ছেলেটা হাসিমুখে বলল, “কটেজ তৈরি হচ্ছে স্যর। সুইমিং পুলও হচ্ছে। পরের বার কটেজ নেবেন। আপনারা পুরনো লোক। কমে করে দেব।” হঠাৎ বমি পেল অনীকের। শমীক বলল, “তোর কাছে হজমের ওষুধ আছে রে?”
হোটেলের অদূরে একটি সাঁওতালি মালিকাধীন দোকানে লুচি আলুরদম, ডিম ভাজা আর তিন কাপ করে চা সাঁটিয়ে শুয়ে পড়েছে দু’জনে। গোটা ঘর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে নীরবতা। হঠাৎই মদ খেতে ইচ্ছে করল শমীকের। স্টেশন থেকে ফেরার পথেই কিনে নিয়েছিল। দুটি গ্লাসে মদ ঢালল। একটি গ্লাস অনীকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “আমরা কি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি?” অনীক হেসে বলল, “হ্যাঁ। একদিন মরেও যাব।” শমীক চুপ করে গেল। মৃত্যুর কথা ভাবলেই বহুদিন ধরে মনে জমিয়ে রাখা একটা ইচ্ছে চাগাড় দিয়ে ওঠে ওর। অনীককে বলা হয়নি। কত কথাই তো ওকে বলা হয় না। তবু, সবচেয়ে বেশি জানে অনীকই। জানে বললে ভুল হবে। অনীক জেনে ফেলে। ঘটনা না জানলেও নিজের লেখায় এমন সব কথা লেখে, পড়ে চমকে ওঠে শমীক। এসব তো তার নিজের ভাবনা! তাই ওকেই সব বলা যায়। কিন্তু মৃত্যু সংক্রান্ত ওই কথাটা বলতে চেয়েও কেন যে বলতে পারে না। তিন নম্বর পেগে চুমুক দিয়ে শমীক বলল- “জানিস ভাই, আমি সেতার বাজানো শিখতে চেয়েছিলাম। বাবার টাকা ছিল না। এখন দেখ, কত টাকা আমার। কিন্তু ইচ্ছে হয় না আর।” অনীক কিছু বলল না। এসব কথার কীই বা উত্তর হয়। সে নিজেও কি যা হতে চেয়েছিল পেরেছে? পারেনি। ডাক্তার হতে চেয়েছিল, হয়ে গিয়েছে লেখক। শেষবার হিমালয়ে ট্রেক করতে যাওয়ার সময় একজন যাত্রীকে অসুস্থ হয়ে যেতে দেখে মনে হয়েছিল, যদি সারিয়ে তুলতে পারত! কলেজে পড়ার সময় বিপ্লবী হওয়ারও শখ ছিল খুব। ইউনিয়নের ভোটের প্রচার করার সময় একবার মার খাওয়ার পর ভয় পেয়ে রাজনীতিটাই ছেড়ে দিয়েছিল। স্কটিশে এক ক্লাস জুনিয়র সুকন্যা খুব পছন্দ করত তাকে। সে রাজনীতি ছেড়ে দেবে শুনে অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি এভাবে হেরে যাবে অনীকদা?” কিছু বলতে পারেনি। সেদিনের পর থেকে সুকন্যাকে দেখলেই পালিয়ে যেত। কিছু প্রশ্নের তো সত্যিই কোনও উত্তর হয় না। এখন সে বুঝতে পারে, গড়ে তোলা সহজ, ভাঙা কঠিন। জীবনে নিজেকে ভাঙতে না পারা, অসম্পূর্ণতা থেকেই লিখতে শুরু করেছিল অনীক। ফস করে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে শমীক বলল, “সমাজটা আসলে একটা জেলখানা। যে সমাজে টাকা ছাড়া কিচ্ছু হয় না, যে সমাজে ঠিক সময়ে টাকা না দিলে বাড়ির লোকেরাও ভাল নজরে দেখে না, সেই সমাজকে আমি ঘেন্না করি। একদিন এই জেলটা ভেঙে আমি পালাব।”
- কী হয়েছে? কেন এমন করছিস?
- আমার মেয়ের স্কুলের ফি দিতে হবে। ডেটটা পেরিয়ে গেছে, আমি খেয়াল করিনি। অতসীর নাম্বারে মেসেজ করেছে, ফি না দিলে পরীক্ষা দিতে দেবে না। আমি ভুলে গেছি বলে অতসী আমাকে যাচ্ছেতাই ভাষায় কথা শোনাল। আমি নাকি সব দায়দায়িত্ব ভুলে এখানে ফূর্তি করতে এসেছি। আর স্কুলগুলোই বা কী বল তো? খালি টাকা টাকা আর টাকা! একজন স্টুডেন্টের সম্বন্ধে বলছে, পরীক্ষা দিতে দেবে না? এটা এডুকেশন সিস্টেম? ছিঃ!
পেটে মদ থাকা অবস্থায় মাথায় রোদ পড়লে নেশার ডানা গজায়। তাই ঘোর লেগেছে দুজনের চোখেই। কিন্তু অনীকের মাথায় ঘুরছে সুচেতনার কথা। ওর বউ। এমনিতে শান্তশিষ্ট। কিন্তু রেগে গেলে ওরও মাথার ঠিক থাকে না সব সময়। শান্তিনিকেতনে আসার পর ওকে একটাও মেসেজ করা হয়নি। তড়িঘড়ি মেসেজ পাঠাল অনীক- “খেতে যাচ্ছি বুঝলে?” একটু দূরে হাঁটছে শমীক। ফোনে হেসে হেসে কথা বলছে কারও সঙ্গে। ফোন রেখে দন্ত বিকশিত করে অনীককে বলল, “মানিয়ে নিয়েছি বুঝলি? কত মেয়েকে মানিয়েছি এই জীবনে, আর নিজের বউকে মানাতে পারব না?” অনীক হেসে বলল- “খালি নিজেকেই মানাতে পারিস না।” ম্লান হেসে শমীক বলল- “চাইও না। আর চাই না বলেই কষ্ট হয়। সব বিষ নিজের ভিতর জমাতে জমাতে যেদিন দমবন্ধ লাগে, সেদিন মনে হয় তোর সঙ্গে এখানে চলে আসি।”
- আমারও সেম। তুই হলি উদগ্র বিষধর। আমি স্তিমিত। বিষকে নিজের ভিতর ঠান্ডা করে জমিয়ে রাখি। বরফের মতো। ছুঁলেই কনকন করে ওঠে মন।
- তাই তুই লেখক। শান্ত থাকতে পারিস বলেই ঠান্ডা মাথায় লিখতে পারিস। আর আমি ছটফট করি বলেই ক্যানভাসে আঁচড় কাটি। রং ছিটাই।
- আমি তোর মতো হতে চাই না কখনও।
- পারবিও না অনীক। আমার মতো হতে পারা সহজ নয়। কিন্তু ভেবে দেখ, তুই শান্ত বিষ আর আমি উগ্র বলেই ব্যালান্স হয়ে যায়। তাই তোর সামনে আমি এত খোলা মনে কথা বলতে পারি।
- সেই কারণেই তো এতটা ভাল বন্ধু।
- বিষ ফ্যাক্টরটা কিন্তু কমন, কী বলিস?
- এত বিষ কেন বল তো?
- কেন?
- কারণ আমরা দু’জনেই জীবনকে ভালবাসি। আর জীবনকে ভালবাসলে, জীবনের অমৃত পেতে চাইলে বিষ গ্রহণ করতে হবেই। আমরা এখন যার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, সেই রবীন্দ্রনাথই তো লিখে গিয়েছেন, আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান!
- ধুর শালা! বিষ-টিশ পান করব না আজ। শুধু মদ্যপান করব। এই শান্তিনিকেতনে শুধু মদ খাব আর সারা রাত গল্প করব।
হেসে ফেলল অনীক। বলল, “একদম! কিন্তু চাকনা কী থাকবে ভেবেছিস?” শমীক বলল- “সে দেখা যাবে। আপাতত লাঞ্চটা করি। আজ শালা গোটা মুরগী খেয়ে নেব আমি। হেব্বি খিদে পেয়েছে।”
পেটপুরে মাংসভাত খেয়ে একটা টোটো ধরে সোনাঝুরি হাটে চলে এল দুজনে। বাড়ির সবার জন্যই খানিক কেনাকাটা চলল। অনীকের মনে পড়ল, কত বছর হয়ে গেল, তবু এই হাট পুরনো হল না। প্রথমবার সেই কলেজ পাস করে যখন প্রথম বেড়াতে এসেছিল, তখন এখানে হাট বসত না। সোনাঝুরির রাস্তাও পিচের ছিল না। সুরঞ্জনদা থাকত এখানে। সবে ও সবে কলেজে পড়াতে ঢুকেছে। কী যে ভাল রান্না করত। আর প্রাণভরে ভালবাসতে পারত। সেই প্রথমবার বেড়াতে আসার সময় সুরঞ্জনদা কিছুতেই হোটলে থাকতে দিতে চায়নি অনীককে। জোর করে রাজি করাতে হয়েছিল। টানা দু’দিন সকাল বিকেল স্কুটার নিয়ে অনীককে এই লাল মাটির দেশ ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। সুরঞ্জনদাই প্রথম নিয়ে গিয়েছিল খোয়াইয়ের পাশে সোনাঝুরির জঙ্গলে। কেউ কোথাও নেই। বড় বড় গাছের আড়াল থেকে উঁকি মারছে পড়ন্ত আলো। খোয়াইয়ে, খাদের ঠিক পাশে খুব বিপজ্জনকভাবে দাঁড়িয়েছিল সুরঞ্জনদা। নীচের দিকে একমনে তাকিয়েছিল। জোর গলায় সরে আসতে বলেছিল অনীক। সুরঞ্জনদা হেসেছিল। বলেছিল, “ভয় পাস না। এখানে মাটির ক্ষয় দেখছিস, একদিন বুঝবি, আমাদের জীবনটাও মাটি, যা ক্রমশ ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে।” আজ বুঝতে পারে অনীক। সেই দিনের বছর তিনেক পর একদিন দুম করে খুন হয়ে গিয়েছিল সুরঞ্জনদা। পাড়ার চায়ের দোকানে বসে প্রতিদিনের মতো চা খাচ্ছিল আয়েশ করে। বাইকে করে এসে দুটি ছেলে গুলি করে দিয়ে চলে যায়। আজও ভাবলে শিউরে ওঠে অনীক। অমন ভাল মানুষ। কারা মেরেছিল, কেনই বা মেরেছিল ভগবান জানে। সেই খুনের আজও কোনও নিষ্পত্তি হয়নি। তবে কানাঘুষোয় শুনেছিল, শান্তিনিকেতনের প্রকৃতির যাতে কোনও ক্ষয়ক্ষতি না হয়, তা নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করছিল স্থানীয় পত্রপত্রিকায়। তা বোধহয় ভাল নজরে দেখেনি রাজনৈতিক নেতারা। একদিক থেকে চলে গিয়েছে, ভাল হয়েছে। শান্তিনিকেতনের এই ফূর্তির আখড়া হয়ে ওঠাটাকে মেনে নিতে পারত না। এত ভিড়, এত কোলাহল, এত কেনাকাটা এইসব কিছুই যে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে ঠিক মানায় না। চারপাশে শুধু থিকথিক করছে লোক। কানের পাশ থেকে কেউ চিৎকার করে উঠছে, “এই মামনী, ব্লাউজটা দেখ তো!” কেউ বলছে, “পাঞ্জাবিটা আমাকে মানাবে বলছ? এটা পাড়ার রবীন্দ্রজয়ন্তীতে পড়ব, বুঝলে?” হাসি পেল অনীকের। একটু দূরে একদল সাঁওতালি মেয়ে একে অপরের কোমরে হাত দিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচছে। ঠিক মাঝখানে কলকাতার একজন মহিলাও নাচছেন। সামনে দাঁড়িয়ে আছে শমীক। ব্যাটা আবার কিছু বেফাঁস মন্তব্য না করে বসে! সেই আশঙ্কায় এগিয়ে গেল অনীক। বলল- “কিরে! হাঁ করে দাঁড়িয়ে নাচ দেখছিস কেন?”
- চুপচাপ সার্কাস দেখ। রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিৎ এদের মাথাটা খেয়েছে।
- যাহ। ওরকম কেন বলছিস? সাঁওতালি মহিলাদেরও তো ইনকাম হচ্ছে। ট্যুরিজম বাড়ছে। সব কি আর চিরকাল একই রকম থাকবে? আমার তো ভালই লাগে।
- তাই নাকি? তোর ভাল লাগে? নিজে কখনও এসব করেছিস?
- না, তা করিনি।
- আসলে কী বল তো? এসব একটা সমাজের ক্ষয়ে যাওয়ার লক্ষণ। আর মানুষের ইনকামের পথ পরিবেশ বাঁচিয়েও করা যেতে পারে। তুইও জানিস এটা। কিন্তু নাটক করছিস। আসলে তুই ক্ষয়ে যাওয়াটা চোখের সামনে দেখতে ভয় পাস।
চমকে তাকাল অনীক। কে কথা বলছে? শমীক নাকি সুরঞ্জনদা?
মাঝেমধ্যেই সাঁই সাঁই করে গাড়ি চলে যাচ্ছে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে। ঠান্ডাও লাগছে খুব। আলোআঁধারিমাখা চায়ের দোকানে একটার পর একটা চা খেয়ে যাচ্ছে দু’জনে। হাট থেকে ফিরে হোটেলের রুমে বসে আরও দু’পেগ করে মদ খেয়েছে ওরা। সন্ধে নামতেই এই চায়ের দোকানটায় একবার হলেও আসা চাই। ঘোর লাগা চোখে শমীক দেখল, উল্টোদিকে বসে অনীক মোবাইল ঘাঁটছে। মুখটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। মোবাইলের আলোয় কিছুটা আন্দাজ করা যাচ্ছে মাত্র। ভুতুড়ে লাগছে। অনীক বলে, ওর মাঝেমধ্যেই মনে হয়, মানুষ নামের অসংখ্য জন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে পৃথিবীময়। ভুল তো কিছুই বলে না। শমীক আজকাল টের পায়, অনীক ওর জীবনে একটা দরজার মতো। আলতো করে ভেজানো একটা দরজা। দরজা খুললেই স্নিগ্ধ আলো। স্নিগ্ধ আলোকে খুব ভালবাসে শমীক। অথচ সবাই ভাবে, ও অন্ধকার মনের মানুষ। আসলে যে তেমনটা নয়, সেটা একমাত্র বুঝতে পারে অনীক। তার রুক্ষ মুখের আড়ালে একটা কোমল আর আবেগপ্রবণ মন আছে, তাও অনীক ছাড়া অন্য কেউ বোঝে কিনা সন্দেহ। তাই তো শমীক চায়, সে যেদিন মরে যাবে… কথাটা মনে পড়তেই আবার অস্বস্তি হতে শুরু হল ওর। ভাবনাটা ঘোরানোর জন্য ও বলল- “নতুন কী লিখছিস আজকাল?”
- আবার একটা উপন্যাস লিখব ভাবছি।
- বাহ। ভাল। লেখ লেখ।
- শান্তিনিকেতন নিয়ে।
- বাহ! তাহলে একটা কাজ কর। এখানে বেড়াতে আসা বাবুদের কেচ্ছা নিয়ে রগরগে থ্রিলার নামা তো। দেখবি, মার্কেটে সুপারহিট হয়ে যাবে।
- কেন? আমি কি বটতলার লেখক নাকি?
- ভাই প্লিজ! তোর মুখে এসব কথা শুনতে চাই না। বটতলাই যে আদি সাহিত্য, তা তুই জানিস না এটা বিশ্বাস করব না আমি।
- সে তো আদি সাহিত্য বটেই। আমি তো আদিটুকুই লিখতেই চাই। কিন্তু শান্তিনিকেতনের আদি অবস্থা নিয়ে। মানে যখন জায়গাটা শান্তিনিকেতন হয়ে ওঠেনি। যখন শুধুই জঙ্গল ছিল, রোগাসোগা নদী ছিল আর আদি বাসিন্দারা। সেই হদ্দ গ্রামের কাহিনি লিখতে চাই। আর সেটা লিখতে চাই সুরঞ্জনদার চোখ দিয়ে।
- হুমম। ভাই, তোরা লেখকরা এসব পারিস। অন্যের চোখকে নিজের চোখ, অন্যের মাথাকে নিজের মাথা বানিয়ে নিতে।
- তা একটু পারতে হয় বৈকি!
- কিন্তু অনীক, আত্মা অদলবদল করতে পারিস? তুই তো তন্ত্রচর্চা করিস। আমাকে বলিসনি। কিন্তু আমি জানি। বল না, আত্মা বদল করতে শিখেছিস?
অনীক অবাক হল। গুহ্য সাধনা সে করে বটে, কিন্তু সেটা তো শমীকের জানার কথা নয়। শমীক হেসে বলল- “কী ভাবছিস? কী করে জানলাম? তুই করিস, আমি পড়ি। কিন্তু পড়ে যে সব জিনিস বুঝতে পারি না, তুই অবলীলায় তার উত্তর দিয়ে দিয়েছিলি একদিন। সেদিনকেই আন্দাজ করেছিলাম। এবার আমার কথার উত্তর দে। আত্মা বদলে করতে পারিস?” অনীক বলল- “এই পৃথিবীতে অনেক কিছুই হয়, সবটা জানা যায় না। জানার চেষ্টাও করতে নেই।”
হোটেলের ঘরে মদের নেশায় চুর হয়ে আছে ওরা। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা প্লেটে ছড়িয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটা চিকেন কাবাব। পাশে একটা খালি বোতল। আরেকটিও প্রায় শেষের দিকে। কত যে মদ খেয়েছে দু’জনে, তার হিসেব নেই। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। বাথরুমে যাওয়ার সময় পা টলে যাচ্ছে ওদের। দরাজ গলায় একটা বাউল গান গাওয়া সবে শেষ করেছে শমীক, এমন সময় অনীক বলল- “জানিস শমীক। তুই হলি প্রকৃত শিল্পী। রিয়েল। একদম রিয়েল আর্টিস্ট। গান গাইতে পারিস, খুব পারিস। ছবি আঁকতে পারিস। লিখতেও পারিস। আমি শালা শুধুই লেখক, কিন্তু আমি পারি… আমি ভালবাসি ঐ যে ফাঁকা মাঠ, কোপাই নদী, এঁকে বেঁকে আকাশের চাঁদের সঙ্গে মিশে যায়, তেমন ভাবে জীবনের সঙ্গে মিশে যেতে। তুই ছাড়া আর কেউ… কেই বা বুঝবে, আমি ভালবাসি, ভালবাসি খুব ঐ খোয়াইয়ের খাদে, খাদের নীচে একটা কী যেন বলে জায়গাটাকে, বল না! আরে ঐ যে… আমি ভালবাসি… হ্যাঁ, কী যেন বলছিলাম?” কথাটা শেষ করতে পারল না অনীক। শমীক হাসল। এদিকে ওর চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। ও বলল, “তখন তোকে বলছিলাম না আত্মা বদল করতে চাই। তোর আত্মাকে আমি নিজের মধ্যে চাই। তোর মতো লিখব বলে। পারিস? তুই বলবি না জানি। মুখেই খালি বেস্ট ফ্রেন্ড বলিস।” অনীক শমীকের ডান হাত চেপে ধরল, “বদল করতে হবে কেন? আমি যা যা পারি না, তুই তো পারিস। ব্যাস, ব্যালান্স হয়ে গেল তো… ভাই!” শমীক বলল- “বেরোবে কি? চল বেরোই।” রাত দুটো বাজে। হোটেলের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কোনও ঘর থেকে ভেসে আসছে নাক ডাকার শব্দ। কোনও ঘর থেকে সঙ্গমকালীন গোঙানোর শব্দ। শীতকাল বলে সেই শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ওরা দুজন নীচে নেমে এলো। হোটেলের মূল গেটটা ভেজানো। পাশে শুয়ে ঘুমোচ্ছে সিকিউরিটি গার্ড। তাকে পাশ কাটিয়ে ওরা দুজন নেমে এল রাস্তায়। হাঁটতে শুরু করল। রাস্তায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। হাড়মাংস জমিয়ে দেওয়া শীত। তবু ওরা দুজন হাঁটছে। দুজনের চোখেই জল। হাঁটতে হাঁটতে ওরা অনেকদূর চলে এসেছে। যেন বহু বছর দূরে এসে গিয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ দূরের রাস্তা দিয়ে লরি চলে যাচ্ছে। এছাড়া কোথাও কোনও আলো নেই। হোটেলটাও এত দূরে চলে গিয়েছে, দেখা যাচ্ছে না। এমন ভয়ংকর অন্ধকারকে মৃত্যুর মতো মনে হল শমীকের। আবার সেই কথাটা মনে এল অনেকদিন পর। কিন্তু আজ আর কোনও অস্বস্তি হচ্ছে না। শমীক অবশেষে মুখ ফুটে বলেই ফেলল অনীককে- “আমার সময় হয়ে এসেছে রে ভাই। আর বেশি বছর বাঁচব না। আমার অনেকদিনের ইচ্ছে, আমার মৃত্যুর পর আমার ছাই নিয়ে তুই নিজের হাতে হিমালয়ের মাটিতে মিশিয়ে দে। তুই তো সাধক মানুষ, বল না, পারবি না? এটুকু করবি না আমার জন্য? তোর যাওয়া-আসা-থাকা-খাওয়ার সব খরচ আমার টাকায় হবে। আমি অতসীকে বলে যাব। এবার রাজি না হলে ক্যালাব।” থমকে গেল অনীক। পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফ্ল্যাশলাইট ফেলল শমীকের মুখে। দেখল, মুখভর্তি বয়স-রেখা। চোখে ভারী চশমা। সামান্য কুঁজো হয়ে যাওয়া শরীর। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে অনীকের দিকে। অনীক হাসার চেষ্টা করল। বলল- “সিনিয়র সিটিজেন হয়ে গেলি, তবু তুই সেই… শালা… একই থেকে গেলি। প্রতিবার বেড়াতে এসে হাঁটতে বেরিয়ে সেই এক কথা। সেম। সেম। আচ্ছা বেশ। আমি যাব। শান্তি?” ফ্ল্যাশলাইটেই দেখা গেল, শমীক হাসছে। হাসতে হাসতে শমীকের মুখটা কেমন অনীকের মতো হয়ে যাচ্ছে। সেটা দেখে শান্তি পেল অনীক। বড় শান্তি।
————————————————————






Leave a Reply