স্বপন বিশ্বাস
ছোট গ্রাম বনকুনি। চারদিকে ধানখেত, মাঝখানে কাঁচা রাস্তা, পুরোনো বটগাছ, আর সন্ধ্যা নামলে শঙ্খধ্বনিতে ভরে ওঠা এক সনাতনী জনপদ। গ্রামের প্রায় সব মানুষই সনাতন ধর্মাবলম্বী—কারও পরিচয় শূদ্র, কারও কপালী, কারও নাপিত কারওবা বৈরাগী। বহু বছর ধরে তারা পাশাপাশি থেকেছে, একে অন্যের ঘরে গিয়েছে, উৎসব-অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশ নিয়েছে। কিন্তু ঐক্যের ভিতটা ছিল সরলতায় গড়া, শক্ত শিক্ষায় নয়। কারণ গ্রামের খুব অল্প মানুষই উচ্চশিক্ষিত; অধিকাংশই কৃষিনির্ভর, অভাবের সঙ্গে লড়াই করা মানুষ।এই গ্রামেরই যুবক লমিন, অল্প কয়েক বছরের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে অর্থশালী হয়ে ওঠে। কীভাবে তার এই উত্থান—তা নিয়ে নানা কথা ছিল, কিন্তু নিশ্চিত কিছু কেউ বলতে পারত না। কেউ বলত ব্যবসা, কেউ বলত গোপন লেনদেন, কেউবা ফিসফিসিয়ে বলত অবৈধ পথের কথা। তবে সত্য যাই হোক, অর্থের জোরে তার প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে। দরিদ্র মানুষ বিপদে পড়লে তার কাছেই যেত। কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ মেয়ের বিয়ের জন্য, কেউ চাষের খরচের জন্য। লমিন টাকা দিত, কিন্তু সে শুধু সাহায্য করত না—মানুষের দুর্বলতা চিনত, এবং সেই দুর্বলতার ভেতর দিয়ে নিজের আধিপত্য তৈরি করত।
অভাবের সংসারে কিছু মানুষ সাময়িক স্বস্তি পেলেও ধীরে ধীরে দেখা গেল, লমিনের সঙ্গে কয়েকটি পরিবারের সম্পর্ক স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গ্রামের লোকের মুখে মুখে গুঞ্জন উঠল—সে গরিব পরিবারের কয়েকজন সুন্দরী নারীর সঙ্গে অস্বচ্ছ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। বিষয়গুলো কেউ প্রকাশ্যে বলত না, কারণ টাকার কাছে অনেকে নীরব হয়ে থাকত।কিন্তু যখন খবর উঠল, নিজের ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে, তখন আর বিষয়টি চেপে রাখা গেল না। এক বিকেলে ঘটনাটি কয়েকজনের চোখে পড়ে যায়। মুহূর্তে খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে।
যে মানুষ একসময় সাহায্যদাতা হিসেবে সম্মান পেত, সে হঠাৎই ঘৃণার কেন্দ্রে পরিণত হলো। বাজারে, মন্দিরের আঙিনায়, চায়ের দোকানে—সবখানে তার নাম উচ্চারিত হতে লাগল অবজ্ঞার সঙ্গে। লমিন কিছুদিন এলাকা ছেড়ে দূরে থাকল, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে নিজের হারানো প্রভাব ফিরে পাওয়ার পথ খুঁজতে লাগল।ঠিক তখনই দুর্গাপূজাকে ঘিরে গ্রামে মতবিরোধ তৈরি হলো। প্রতিমা কোথায় হবে, কারা পরিচালনা করবে, ব্যয় কেমন হবে—এসব নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে অস্বস্তি বাড়তে লাগল। এই সময় বিশ নামের এক ব্যক্তি লমিনে কাছে গেল। বিশ ছিল আবেগপ্রবণ, সহজে প্রভাবিত হয় এমন মানুষ।
লমিন সুযোগ বুঝে বলল,
“তোমরা আলাদা করে পুজো করো, এবারের সব খরচ আমি দেব।”বিশ যেন হঠাৎ বড় স্বপ্ন দেখল। ফিরে এসে নিজের বাড়ির সামনে পুজোর আয়োজন শুরু করল। বাঁশ উঠল, ত্রিপল টাঙানো হলো, এবং সে ঘোষণা দিল—এবার তিন দিন যাত্রা হবে, একদিন নাচ-গান হবে।এই ঘোষণায় গ্রামের অনেক অশিক্ষিত ও সাধারণ মানুষ নতুন আকর্ষণ অনুভব করল। তারা ভিড় জমাতে শুরু করল। কেউ ভাবল—এবার বড় কিছু হবে, কেউ ভাবল—এটাই উন্নতি।কিন্তু পুজোর পরিবেশ ধীরে ধীরে ভিন্ন দিকে মোড় নিল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রার ভাষা অশালীন হতে লাগল, নাচ-গানে ভক্তির চেয়ে প্রদর্শনী বেশি হয়ে উঠল। প্রবীণরা অস্বস্তিতে সরে গেলেন। কেউ প্রতিবাদ করলেন, কেউ চুপ করে দেখলেন।সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো গ্রামের সম্পর্কের ভিতরে।একদল বলল—নতুন আয়োজন দরকার, আনন্দ দরকার। আরেকদল বলল—এতে ধর্ম নয়, প্রদর্শন হচ্ছে।এরপর থেকে বনকুনি আর আগের মতো রইল না।দুর্গাপূজা হয়ে গেল দুই ভাগে, মানুষও ভাগ হয়ে গেল দুই দলে। কার বাড়িতে কে যাবে, কার নিমন্ত্রণে কে বসবে—এসবও ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে গেল। এক সময় যে মানুষ একসঙ্গে প্রতিমা বিসর্জনে যেত, তারা এখন আলাদা সারিতে দাঁড়ায়।মিল সরাসরি সামনে না থাকলেও তার বপন করা বিভেদের বীজ শেকড় গেড়ে বসে গেল।সেই থেকে আজও চলছে বিভাজন।নতুন প্রজন্ম অনেকেই জানে না শুরুটা কোথা থেকে হয়েছিল, কিন্তু বিভক্ত পরিবেশের মধ্যে বড় হচ্ছে। কেউ কারও প্রতি পুরো আস্থা রাখতে পারে না। উৎসব এলেও আনন্দের ভেতর এক ধরনের অদৃশ্য দূরত্ব থেকে যায়।গ্রামের প্রবীণরা মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন—“একটা ভুল সিদ্ধান্ত কখনও কখনও বহু বছরের সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়।”বনকুনির মাঠে এখনও ধান হয়, সন্ধ্যায় এখনও শঙ্খ বাজে, কিন্তু মানুষের ভেতরে যে রেখা টানা হয়েছে—তা সহজে মুছে যায় না। ️






Leave a Reply