অচল
উমানাথ যখন মহাকরণ মেট্রোর দিকে এগোচ্ছে আকাশ তখন কালো করে আসছে। কাল পকেট মেরে মাত্র দুশো টাকা পেয়েছে সে। আজকাল অনলাইন পে-ফে হয়ে লোকে আর টাকা পকেটে নিয়ে ঘোরে না। উমানাথ সেই ছিয়াশি সালের শেষের দিক থেকে পকেট মারছে। তখন মাসের পয়লা তারিখ থেকে পাঁচ তারিখ পর্যন্ত খুব ভালো সময় চলত। পকেটে মাসমাইনে নিয়ে বাবুরা ফিরত। ভিড় ট্রাম বা বাসে উমানাথ আর তার এই পথের গুরু ভোলুদা ঘাপটি মেরে থাকত। সুযোগ পেলেই ফাঁক হয়ে যেত ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলার ‘ক্যাশ পজিশন’। দেশে একটা জমিও কিনেছিল উমানাথ এই পথে রোজগার করে। এখন কোনো ছেলে-ছোকরা এই পথে আর আসতেই চায় না। এখন নতুন নাম হয়েছে ‘স্ক্যাম’।
ইংরেজি উমানাথ বোঝে না। ভোলু বলত, এই লাইনেও ইংরেজি জানলে অনেক উন্নতি করা যায়। যুবক উমানাথ জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘এখানেও পড়াশোনা?’
পড়াশোনা করতে হবে বলে সে ক্লাস ফাইভের পর আর ওই পথ মাড়ায়নি। উমানাথ এখনো মাঝেমধ্যে ভাবে ভোলুর কথা। খুব পোড়খাওয়া হাত ছিল গুরুদেবের। একবার কোনো বাসে উঠলে অন্তত দুটো তিনটে মানিব্যাগ নিয়ে তবে নামত। সেই সব দিন এখন আর নেই। বাজার খারাপ হতে হতে উমানাথ এখন এক বেলা খেয়ে না খেয়ে থাকে। রেল বস্তির হারাধন চায়ের দোকানদার অনেক বার বলেছে, ‘উমাদা এই লাইন ত্যাগ করো, ভদ্রলোকদের আবাসনে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নাও।’ উমানাথের মন মানে না। সেই কোন্ ছোটবেলায় কলকাতায় এসেছে সে। স্টেশনে শুয়ে থাকত প্রথম কয়েক সপ্তাহ। ভোলুদা তাকে তুলে নিয়ে যায় নিজের আস্তানায়। বেলেঘাটা বস্তিতে তখন ভোলুদা দুই বউ নিয়ে থাকে। সেইখানে ট্রেনিং শুরু উমানাথের। কত বার গণপিটুনির হাত থেকে বেঁচেছে সে। জীবনে তিন বার গণপিটুনি খেয়ে বেঁচে শেষে হাসপাতালে তিন মাস করে কাটাতে হয়েছে। জেল খেটেছে প্রথম বার তিন মাস, তার পরে একবার দু’বছর। ভোলুদা বলত, ‘এতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে রে উমা।’
মেট্রোর এসকেলেটর দিয়ে নামার সময় উমানাথের গা ঘেঁষে দাঁড়াল এক কেতাদুরস্ত বাবু। পকেটটা বেশ ফোলা। উমানাথের আঙুলগুলো অবাধ্য হয়ে চনমন করে উঠল। ভোলুদার শেখানো সেই ‘ব্লেড-টাচ’ কৌশল। কিন্তু হাতটা বাড়াতে গিয়েও থমকে গেল সে। বাবুর কানে গোঁজা হেডফোন, সে মোবাইলের স্ক্রিনে আঙুল ঘষতে ঘষতে কারোর সঙ্গে চড়া গলায় বলছে, “আরে ধুর! লিঙ্কে ক্লিক করতেই অ্যাকাউন্ট থেকে এক লাখ গায়েব করে দিল ওড়িশার এক গ্যাং! সব খেলা শেষ!”
উমানাথ আস্তে করে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। বুক পকেটে রাখা আঙুল দুটো কেমন যেন অচেনা লাগছে তার।
হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। এই কয়েক বছর ঠিকমতো খেতে পায়নি উমানাথ। রাস্তার খাবার হোটেলগুলোর দিকে ঠিক দুপুরবেলা এবং রাতেরবেলা তাকিয়ে থাকে সে, এটাই তার একমাত্র শখ। উমানাথ এখনো বেলেঘাটা বস্তিতেই থাকে। ভোলুদা মারা যাওয়ার পর তার বউ দুটিও কোথাও একটা হাওয়া হয়ে গিয়েছে; তাই এত বছরে উমানাথ ওই ঘরটাকে নিজের সাগরেদ বানিয়ে ফেলেছে। তার মতোই এই ছোট্ট বস্তির ঘরটা অনেক কিছুর সাক্ষী।
এই ঘরটাতেই বেশ কিছু বছর আগে উমানাথ এক বিহারী বেশ্যা মেয়েকে এনে রেখেছিল। মনে মনে ঠিক করেছিল তাকে বিয়ে করবে। মেয়েটা মাসখানেক ছিল ওই ঘরটাতে, তারপর একদিন খাঁচার দরজা খোলা পেয়ে উড়ে চলে যায়। ঠিক যেরকম একদিন রুক্ষ ধুলোর দেশ থেকে উমানাথের মলিন জীবনে শাখা-প্রশাখা ছড়ানো ঠান্ডা অনুভূতি নিয়ে এসেছিল সে। উমানাথ আবার একা হয়ে যায়।
অনেকগুলো প্রশ্ন উমানাথের মাথায় ঘুরতে থাকে রাতেরবেলা— জীবন কি কখনো তাকে সুযোগ দিয়েছে সৎপথে রোজগার করবার? সে জীবনেও জানতে পারেনি সৎপথে উপার্জনের ভাত কীরকম খেতে। উমানাথের মনে পড়ে শিশুকালে তারা ভীষণ দরিদ্র ছিল। উমানাথের মা-বাবা দুজনেই ইটভাটায় কাজ করত। উমানাথের একটি বোন ছিল, অপুষ্টিতে মারা যায়। সে যখন পথশিশুদের দেখে, তখন তার মনে পড়ে ছোটবেলায় মরে যাওয়া বোনের কথা। আরও মনে পড়ে এক হিজড়ের কথা। ট্রেন লাইনে পকেটমারি করার সময় ওখানেই আলাপ ওই অর্ধনারী মানুষটির সঙ্গে। ওদের মধ্যে ভালোবাসা হয়েছিল কিনা এখন আর উমানাথের মনে নেই। কী একটা কাজ পেয়ে, খুব সম্ভবত কোনো একটি ডান্স বারে নাচের কাজ পেয়ে চলে যায় মানুষটি মুম্বই। যাওয়ার সময় উমানাথের সর্বস্ব সঞ্চয় তিরিশ হাজার টাকা নিয়ে যায়। কথা ছিল মাসে মাসে ফেরত দেওয়ার, কিন্তু চলে যাওয়ার পরের দিন থেকেই মোবাইল ফোনে আর যোগাযোগ করতে পারেনি উমানাথ। সেই থেকে রেলপথে আর পকেটমারি করে না সে।
যারা সশরীরে মাঠে না নেমে, ভিড়ে গুঁতো না খেয়ে, স্রেফ একটা বোতাম টিপে লাখ টাকা ওড়ায়— তাদের জমানায় উমানাথ বড্ড সেকেলে, বড্ড সৎ। সে ধীর পায়ে উল্টো দিকের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এল। কালই হারাধনকে বলতে হবে ভদ্রলোকদের আবাসনের সিকিউরিটি গার্ডের কাজটা খালি আছে কি না।






Leave a Reply