সাহিত্য সম্মাননা ২০২৬ : এক দীর্ঘ শব্দযাত্রার স্বীকৃতি
–ফারুক আহমেদ রনি
মাশূক ইবনে আনিস। কাব্য ও কবিতার মানুষ। আমার বন্ধু।
আজ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আমাদের কাব্যিক বাস। অমৃত শব্দবন্ধনার একপ্রাণ, নাড়িনিঃসৃত শ্বাসের সম্পর্ক আমাদের। অদৃশ্য, অথচ অস্তিত্বের গভীরে অবিরাম প্রবহমান। এক কথায়, আমরা কজন একই শ্রেণির মাঠচষা কাব্যকলার মানুষ; কবিতা নিয়েই কাটিয়ে দিয়েছি জীবনের চল্লিশটিরও বেশি বছর। এই দীর্ঘ সহযাত্রায় কবিতা কখনো আমাদের আলাদা করেনি; বরং সময়ের ভাঙাগড়ার ভেতর আমাদের আরও নিবিড় করেছে। শব্দের ভেতর দিয়ে আমরা একে অন্যকে চিনেছি, হারিয়েছি, আবার নতুনভাবে ফিরে পেয়েছি। আমাদের বন্ধুত্বের ভেতর যেমন জীবন ছিল, তেমনি ছিল কবিতা; আর কবিতার ভেতরও বারবার ফিরে এসেছে জীবনেরই বহুবর্ণ অনুরণন।

“আমরা” শব্দটি এখানে কোনো ব্যক্তিগত সর্বনাম নয়; এটি একটি প্রজন্মের সম্মিলিত উচ্চারণ। আশির দশকের সেই রৌদ্রোজ্জ্বল, কাচভাঙা শব্দশক্তির ভেতর আমরা যারা দাঁড়িয়ে ছিলাম, তাদের মধ্যে মাশূক ইবনে আনিস, ফারুক আহমেদ রনি এবং দিলু নাসের একই কাব্যভুবনের তিনটি আলাদা উচ্চারণ। তাঁরা একা নন; তাঁরা একটি সময়ের পরিভাষা, একটি সাহিত্যিক যাত্রার ভিন্ন ভিন্ন আলোকরেখা। ইস্ট লন্ডনের অলিগলি, ব্রিক লেন, হোয়াইটচ্যাপেল এবং আলতাব আলী পার্কের কচি থেকে বুড়ো হয়েওঠা লন্ডন প্লেন, সাইকামোর কিংবা ইংলিশ ওক- বৃক্ষরাজি সাক্ষ্য দেবে আমাদের পদচারণার গল্প। সেই বৃক্ষেরা জানে, কত বিকেল, কত সন্ধ্যা, কত রাত আমরা শব্দের পেছনে ছুটেছি; কখনো কবিতার জন্য, কখনো কবিতার ভেতর নিজেদের খুঁজে পাওয়ার জন্য।
কখনো কোন এক বিকেলে দিলু নাসের অথবা মাশূক ইবনে আনিসের ফোন; ‘কবি কোথায় আছেন? দিলু আছে আমার সঙ্গে, চলুন কোথাও বসি।’ তারপর স্যাডওয়েল, আমার বাড়িতে, টেমসের পারে, ব্রিক লেন, হোয়াইটচ্যাপেল। যেখানে ইচ্ছে, সেখানেই বসে যেত আমাদের আড্ডা।
আমরা একে অপরের লেখা পড়তাম, প্রশ্ন করতাম, দ্বিমত পোষণ করতাম, আবার নতুনভাবে ভাবতাম। সাহিত্য আমাদের কাছে কোনো প্রতিষ্ঠানের পাঠ ছিল না; ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস, নিরন্তর অনুশীলন এবং শব্দের প্রতি গভীর আস্থা।
সাথে সাথে আমাকে সারাক্ষণ বিধ্বস্ত করে যে নামটি সে আর কেউ নন প্রয়াত বন্ধু দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু। আমাদের সাহিত্যিক আড্ডার মূল পরিসর ছিল কবিতা। কিন্তু সেই আড্ডার নির্ধারিত সময় বা বিষয় একই ছিল না। অনেক সময় যোগাযোগ হতো টেলিফোনে, লন্ডন আর বার্মিংহামের মধ্যবর্তী অদৃশ্য তারের ভেতর দিয়ে।
দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু থাকতেন বার্মিংহামে, আমরা লন্ডনে। রাত গভীর হতো, আর সেই গভীরতার ভেতর শব্দ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত। একটি কবিতার একটি লাইন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চলত। একটি শব্দের জন্য পুরো কবিতার কাঠামো ভেঙে আবার গড়া হতো। তখন আমরা বুঝিনি, কিন্তু আজ বুঝি, সেই টেলিফোন সংলাপই ছিল আমাদের প্রথম সাহিত্য-বিদ্যালয়।
মাশূক ইবনে আনিসকে নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে স্মৃতিগুলো আমাকে একটু ইমোশনাল করে ফেলে, বিশেষ করে মঞ্জুর অকালপ্রয়াণ আমাদের জন্য কেবল একজন বন্ধুর চলে যাওয়া ছিল না; সেটি ছিল একটি ভাষার নীরব পতন। তার কণ্ঠের ভেতর যে কবিতা ছিল, তা আর ফিরে আসবেনা। কিন্তু সেই কবিতা আজও আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের লেখায়, আমাদের নীরব আড্ডায় বেঁচে থাকবে।

আমরা কখনোই বিত্তবান বা বিত্তের উত্তরাধিকারী নই, কৃত্রিম বৈরাগীও নই; পার্থিব প্রাপ্তির মোহ থেকে ক্রমশ ছিটকে পড়া সময়ের অনুগত, কাব্য ও কবিতার শব্দ-ঐশ্বর্যে নিজেদের সমর্পণ করা দীর্ঘ, কণ্টকময় বোহেমিয়ান পথের পথিক। জীবনের সহজ প্রাপ্তির চেয়ে আমরা অনেক বেশি বিশ্বাস করেছি কঠিন শব্দের দীপ্তিতে। তাই আমাদের অর্জন হয়তো বাহ্যিক নয়, কিন্তু অন্তর্গত; দৃশ্যমান নয়, অথচ গভীরতম অর্থে স্থায়ী।
আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই দিলু নাসের ও আমার নাম একসঙ্গে উল্লেখ করছি। কারণ এই তিন শিল্পসত্তা যেন একই শব্দবাহী শিরায় প্রবাহিত। তাঁদের সাহিত্যচর্চা, বন্ধুত্ব, ভাবনা এবং সাংস্কৃতিক অবস্থান একই সময়ের ভিন্ন ভিন্ন অথচ পরস্পর-সম্পর্কিত উচ্চারণ।
আরও একটি কারণে তিনজনের নাম একসঙ্গে স্মরণ করছি, গত তিন বছরে উক্ত তিনজনই যথাক্রমে সম্মিলিত সাহিত্য সাংস্কৃতিক পরিষদের সাহিত্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। যথাক্রমে ফারুক আহমেদ রনি, দিলু নাসের ও এবারে পুরস্কৃত হোন মাশূক ইবনে আনিস। তাই এই নামগুলো একত্রে উচ্চারণ করা আমার কাছে কেবল একটি তথ্য নয়; এটি একটি সময়ের সাহিত্যিক স্মৃতিকে সম্মান জানানো।
বিশেষ করে মাশূক ইবনে আনিস, দিলু নাসের এবং ফারুক আহমেদ রনি; সাহিত্য ও বন্ধুত্বের ভেতর অনুভূতি, স্মৃতি, চিন্তা এবং চেতনার প্রায় সমগ্র পরিসরজুড়ে একত্রিত একটি উপসংহার। গত বছর আমি দিলু নাসেরকে নিয়েও ‘শিকড়’-এ লিখেছিলাম। এবারও চেষ্টা করছি, স্বল্প পরিসরে হলেও, মাশূক ইবনে আনিসকে নিয়ে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস তুলে ধরতে। তাঁর এই প্রাপ্তিতে আমি অভিভূত, আনন্দিত এবং ব্যক্তিগতভাবেও গভীর গর্ব অনুভব করছি। কারণ তাঁর এই সম্মান কেবল একজন কবির প্রাপ্তি নয়; আমাদের দীর্ঘ সাহিত্যিক সহযাত্রারও এক উজ্জ্বল স্বীকৃতি।

বিলেতের বাংলা ডায়াস্পোরার সাহিত্যপরিবারটি এককভাবে বিস্তৃত হয়নি, কিংবা বিলেতের বাংলা সাহিত্য কোনো একক প্রতিভার সৃষ্টি নয়। এর অন্তঃসার, এর মূল নির্যাসের গভীর সত্য নিহিত রয়েছে আমাদের অগ্রজ এবং সহযোদ্ধা কবিবন্ধুদের সম্মিলিত সাধনায়। এটি একটি সম্মিলিত নির্মাণ। এখানে কবি, সম্পাদক, সংগঠক, এবং পাঠক সবাই মিলে নির্মাণ করেছেন একটি সাহিত্যভূমি, যার ভিত গাঁথা হয়েছে নিষ্ঠা, শ্রম ও ভালোবাসার দীর্ঘ অনুশীলনে। যেখানে বাংলা ভাষা প্রবাসেও তার শিকড় হারায়নি; বরং নতুন আবাসস্থল, তাঁদের পরিশ্রমেরই উত্তরাধিকার আমরা, আমাদের প্রজন্ম এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম।
আমার বেশ কয়েকটি লেখায় বারবার আশি ও নব্বই দশকের বিলেতের কবিদের নিয়ে লিখেছি। আবার সার্বিকভাবে এই সময়কাল নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। আমি বিশেষভাবে এই সময়টিকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছি, কারণ বিলেতে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং এবং সৃজনশীল সময় ছিল সেই দুর্বার দুই দশক। আজ আমরা বিলেতে বাংলা সাহিত্যের যে অবস্থান দেখতে পাই, তার অগ্রণী ভূমিকা এবং ভিত্তি নির্মাণ করেছেন সেই সময়ের কবি, সাহিত্যিক, সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরাই। তাঁদের হাতেই রচিত হয়েছিল সেই ইতিহাস, যার ওপর দাঁড়িয়ে আজকের প্রজন্ম পথ খুঁজে পায়।
মাশূক ইবনে আনিস : কাব্যিক জীবনালেখ্য
মাশূক ইবনে আনিস একজন কবি, সম্পাদক ও শব্দশ্রমিক। এই বৃহৎ সাহিত্যপরিসরের ভেতর তিনি এক স্বতন্ত্র উপস্থিতি। তিনি কেবল কবিতা লেখেননি; কবিতার জন্য একটি পরিসর নির্মাণ করেছেন, একটি আবহ তৈরি করেছেন, যেখানে নতুন ও প্রতিষ্ঠিত, উভয় ধরনের লেখকের জন্য ছিল সমান অবস্থান।
তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘আদি কাকতাড়ুয়া’ ছিল একটি লিটল ম্যাগাজিনের চেয়েও অনেক বেশি কিছু; এটি ছিল একটি সাহিত্যিক বিবেক। এখানে প্রতিষ্ঠা নয়, প্রতিভাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পরিচয় নয়, লেখাই ছিল মুখ্য। সাহিত্য কোনো অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের অলংকার নয়; সাহিত্য একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার জায়গা। মাশূক ইবনে আনিস সেই দায়বোধ থেকেই তাঁর সম্পাদনা, তাঁর সৃজন এবং তাঁর সাহিত্যিক অবস্থানকে প্রসারিত করতে পেরেছেন।
বাবা প্রয়াত আনিস উদ্দীন এবং মা প্র্য়াত ছায়া বিবির একমাত্র পুত্রসন্তান মাশূক ইবনে আনিসের জন্ম বাংলা ৯ চৈত্র; ইংরেজি তারিখ ২৩ মার্চ, তৎকালীন সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ মহকুমার জগন্নাথপুর থানার সৈয়দপুর গ্রামের মোকামপাড়ায়। দুই বড় বোনের মধ্যে একজন বর্তমানে সিলেট শহরে বসবাস করছেন। পারিবারিক জীবনে তিনি দুই পুত্রসন্তান; থিওন আনিস ও জিলান আনিস এবং একমাত্র কন্যাসন্তান রুবাইয়াত তমা আনিসের জনক। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রামের বিদ্যালয়ে। পরবর্তীকালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সরকারি এম.সি. কলেজে অধ্যয়ন করেন। লেখালেখির সূচনা আশির দশকে। শুরুতে ছড়া ও কবিতা দিয়ে সাহিত্যচর্চা শুরু হলেও কলেজজীবন থেকেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সাহিত্যপত্র, ম্যাগাজিন ও স্মরণিকায় নিয়মিতভাবে ছড়া, কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হতে থাকে।
নব্বইয়ের দশকে তিনি লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। প্রবাসজীবনে এসে তাঁর সাহিত্যচর্চা আরও বিস্তৃত হয়, আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। ভৌগোলিক দূরত্ব তাঁর ভাষাকে বিচ্ছিন্ন করেনি; বরং প্রবাসের অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় যুক্ত করেছে নতুন অনুভব, নতুন বাস্তবতা এবং নতুন জীবনবোধ।
তিনি ‘শিকড়’ সাহিত্য-পরিবারের জন্মলগ্ন থেকেই একজন সক্রিয় সদস্য। একইভাবে ‘সংহতি’-রও তিনি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে একজন ঘনিষ্ঠ স্বজন। প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চার এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসরে তাঁর ভূমিকা দীর্ঘ, আন্তরিক এবং অবিচ্ছিন্ন।
তাছাড়াও তিনি বাংলা সাহিত্য পরিষদ এবং সম্মিলিত সাহিত্য সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে সম্মিলিত সাহিত্য সাংস্কৃতিক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সাহিত্য তাঁর কাছে শুধু ব্যক্তিগত সৃজনের বিষয় নয়; বরং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতারও একটি নিরন্তর অঙ্গীকার।
তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ এবং; যদি বিদ্রোহ করি, অবশিষ্ট শূন্য এক, অলৌকিক মাশূকনামা এবং অর্কের অধিবাস। এছাড়াও প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে স্বয়ম্ভূ এবং গানের গ্রন্থ মাশূকে ইলাহি।
২০১২ সালে তিনি ‘সংহতি সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন এবং ২০২৬ সালে সম্মিলিত সাহিত্য সাংস্কৃতিক পরিষদ , যুক্তরাজ্য তাঁকে সাহিত্য সম্মাননায় ভূষিত করে।
এই সম্মান তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যসাধনা, নীরব নিষ্ঠা এবং শব্দের প্রতি অবিচল বিশ্বাসেরই স্বীকৃত।

মাশূক ইবনে আনিসকে কেবল একজন কবি হিসেবে দেখা যাবেনা। তাঁকে দেখতে হয় একটি সময়ের ভেতর দিয়ে, একটি প্রজন্মের ভেতর দিয়ে, একটি সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের ভেতর দিয়ে। তিনি শুধু কবিতা লেখেননি; কবিতার জন্য পরিসর তৈরি করেছেন। তিনি শুধু শব্দ ব্যবহার করেননি; শব্দের জন্য পরিবেশ নির্মাণ করেছেন। তিনি কেবল একজন লেখক নন; তিনি একটি সাহিত্যিক সময়ের সহনির্মাতা।
আমরা যারা এই সময়ের সাক্ষী, তারা জানি; ডায়াস্পোরা বাংলা সাহিত্য কোনো একক নামের ইতিহাস নয়। এটি একটি সম্মিলিত কর্মের ইতিহাস, একটি দীর্ঘ শব্দযাত্রার ইতিহাস, একটি ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার নিরলস সংগ্রামের ইতিহাস। সেই ইতিহাসে মাশূক ইবনে আনিস একজন নীরব স্থপতি। তাঁর কবিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাঁর উপস্থিতি, তাঁর সম্পাদনা, তাঁর বন্ধুত্ব এবং তাঁর সাহিত্যিক দায়বদ্ধতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় একজন মানুষের লেখা যতটা স্মরণীয় হয়ে থাকে, তার চেয়েও বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকে তাঁর নির্মিত সাহিত্যিক পরিবেশ। মাশূক ইবনে আনিস সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁদের অবদান তাঁদের ব্যক্তিগত সৃষ্টির সীমানা অতিক্রম করে একটি প্রজন্মের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে।
সময়ের সীমানা অতিক্রম করে তাঁর সৃষ্টি আমাদের অনুভবের গভীরে মানবতা, সৌন্দর্য এবং মমত্বের চিরন্তন অনুরণন হয়ে বেঁচে থাকবে। শব্দের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা, কবিতার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার এবং সাহিত্যকে ঘিরে তাঁর দীর্ঘ পথচলা আগামী প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
শিকড় পরিবারের পক্ষ থেকে কবি মাশূক ইবনে আনিসকে আন্তরিক অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।
ফারুক আহমেদ রনি
সম্পাদক, শিকড়
কবি মাশূক ইবনে আনিস- এর একগুচ্ছ কবিতা
সক্রেটিস; নম: নম: …
সতত সর্বদা আমি নিপীড়িত মনে
নিজকে জানিতে আমি করেছিনু পণ
ঘুরিনু হাজারপথ জ্ঞান অন্বেষণে
প্রশ্নে হয়েছে চিন্তার শুদ্ধ অনুরণন।
আমারে করিয়া শেষ উদ্ভাবনের শুরু
হাড়িশূন্য; নাহি খাদ্য ঝুটেছিনু মুখে
ন্যায়ের দণ্ডিত মান কাঁপে দুরুদুরু
সত্যকে দেখিলাম আমি উজ্জ্বল ভূলোকে
সমাজ-সংসার-ধর্মে জ্ঞান-ই বিস্ময়
জ্ঞানে স্রষ্টা নিরূপিত নির্ধারিত হয়
এহেন মানবজন্মে জিজ্ঞাসাই সার
প্রশ্ন করো অহরহ জানো নিরন্তর
জানাতেই খুঁজে পাবে অমিয় উত্তর
ভুবন সমুদ্রে হবে সহজ পারাপার।
শ্রীচরণেষু…
মাধবকুণ্ডে কখনো হবে’না যাওয়া
আমাদের আর ;
ঐ-প্রেম ; যা ছিলো দৈব, যা ছিলো স্বপ্নে পাওয়া
দেখা আর পাবোনা’কো তার
প্রপাতের জল; কী সুতীব্র তার গতি
ঝর্ণার জলে নতুনের সমারোহ
আমরাতো এখন বিস্ময়সূচক যতি
নেই; কোনো মাহাত্ম্যে-ই, না প্রেম না দ্রোহ
কেবল-ই পদ্মপুরাণের বর্ণনায় আছি
বিদ্যমান
আমাদের প্রেম; ব্রহ্মার চরণ-স্পর্শী
পদ্ম
এইতো প্রত্যাশা, আজন্ম আরাধ্য
এই ছিলো দু’য়ে সম্প্রদান
মাধবকুণ্ডে’র ঝর্ণার জলে নামি’নি আমি, তুমিও না,
তাই; হয়তো, তুমি জুলিয়েট হও’নি
আমিও রোমিও না…!
জলবৎ তরলং
তুমি তাকালে-ই প্রেমে পড়তে হতো –এতোটা প্রেম ছিলো
কামও ছিলো দৃষ্টিতে, কল্পনায় তোমাকে ভাবলে চৈত্রের খরার রাতেও
মেঘের আনাগোনা হতো বুকে– আমি ভিজতাম বৃষ্টিতে।
তুমি কথা বলতে কম–স্মিত হাসির মধ্যেই বুঝিয়ে দিতে কী চাও,
বুকে আগুনের উত্তাপ ছিলো যেন; ভিস্যুবিয়াস–মুখে ফুটতোনা কোনো রাও।
কন্ঠ; এতো-ই সুমিষ্ট ছিলো’যে শ্রবণে মনে হতো সমুদ্র মন্থনের-পর;
আলিঙ্গনের আকুতি, তুমি যেন জাদুশৃঙ্গ– উপরে ওঠে
সকলেই বিসর্জন চায়–চায় দিতে আত্মহুতি।
জয়ের জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড তুমি–সকলেই জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়, এরপর;
ঘুমদেয় একটানা –স্বপ্নের আকাশে তারা স্বর্গের শূন্যতায়
মেলে-ধরে বিপুল ডানা.
সমাপ্তি’র মৃন্ময়ী’র কথা ভেবে
মনেপড়ে, তারুণ্য আর;
যৌবনের মাঝামাঝি সময়ে যে-আমায় প্রথম
এক-ঝাপটা খামচি মেরে বলেছিলো –এই দাগ দেখে মনে রাখিস
মনেপড়ে, সেই বাউণ্ডুলে মেয়েটির মুখ, –তাঁর মুখে আমি
পাঠ করেছি
রবীন্দ্রনাথে’র সমাপ্তি’র মৃন্ময়ী
সেই জুবুথুবু মনস্ক
মেয়েটি; এখনো অশ্বগন্ধার মতো আমায়; থিতুকরে
ঘুমের বালিশে,
ত্রিপ্রহর রাত্রের সঙ্গমযজ্ঞে, সে-আমার সকল ক্লান্তির ক’রে অবসান।
মনেপড়ে, তাঁর ওষ্ঠ, আনকোরা অধরের মায়া, আর;
অনভ্যস্ত চুম্বনের মোহাচ্ছন্নতা।
মনেপড়ে; সেই তাঁর নামে
একজোড়া শালিক পাখি
কিনে এনে অবমুক্ত করি আনন্দধামে
সেই দিন থেকে মেয়েটির নাম রাখি
মৃন্ময়ী, জোছনার সাঁকো,
তাঁরে প্রেমপত্রে লিখি ‘ ভুলে যেয়ো’নাকো…!
ইরা, ইরিনা ও দেবী সরস্বতী’র সম্প্রসারণ-ভাব
১.
নক্ষত্রেরও এক পিদিম আছে; আমি তারে ইরা সম্বোধন করেছি
শাওন মাসের দ্বিতীয়পক্ষের দ্বিপ্রহর রাত্রে
২.
সুভদ্রার সঙ্গে তাঁর মিল ছিলো না কোনও,
তবু জাগানিয়া দিয়ে; জাদু জানতো, মন্ত্র না-পড়ে-ই আত্মস্হ করতো
জল ও অঙ্গের স্বরূপ
৩.
ইরা’র পেটের ভেতরে জন্মাই কতো কতো নামে, কী বৃক্ষ,
কী বৃষ্টি, কী পাখি, কী রত্ন, কী মানুষ! ইরা মাতৃসম,
ইরা; প্রেমের নির্জাস হয় জন্মান্তে, হয় প্রেমিকাও।
৪.
সব চন্দ্রে-ই পূর্ণিমা হয় না, চাঁদও বিরক্তি হয় কারও কারও,
সব প্রেম-ই মানানসই হয় না হয়তো, তাই ;
কাঠের বুকে আলপিন বিঁধলে প্রেম অভিধা দিও না ভুলেও।
৫.
চোখের অভিলাষ ছিলো—শুভ্রতায় দেখবে ফুলের পরাগ,
পরাগ দেখার আগেই আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছি বলে-ই;
চোখের কর্ণিয়ায় আজ; নেই কোনো আলো।
৬.
নিরন্তর ডুব দেই গহন ও অধিরের বুকে, কখনও-ই ঝুটেনি মুক্তোরদানা,
নিজেকে তবুও নি:স্ব ভাবি না আমি।
৭.
তুমি; দারুণ হাওয়ায় মতো এক অনঙ্গি স্পৃহা,
তোমাকে প্রেমিকা করলে আমার আর; মরতে হ’বে না…
শায়েরি: মহব্বত
ভালবাসা মানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের রূপায়ণ নয়,
কারও কিছু হারানোর বেদনা আর; কারও কিছু প্রাপ্তির জয়।
ভালোবাসাকে প্রেমে পরিণত করতে গেলে-ই
যত ইতিঅন্ত কাহিনী জন্ম নেয়, চরম সুখের দাম্পত্যেও
ঐ-প্রেম সেই বিগত দিনের মত-ই অনাহুত কষ্ট দেয়।
ভালোবাসা কখন হয়েছিলো প্রেম প্রেমিকও জানে না
প্রেমিকাও না, প্রেম এক দুরারোগ্য ব্যাধি
একবার দেহে এলে আর; সারেও না।
ভালোবাসা না বলেই আসে অনাহুত অতিথির মত,
মন ও দেহ ভেঙে ছারখার তবু ; মনে হয় সব-ই অক্ষত।
ভালবাসলে-ই তাঁরে পাইবার বাসনা-পোষণ এ-বড় কঠিন কাজ পিও,
তা’রে চিনিবার তরে মুক্ত-আকাশে উড়িবার-মতো সুযোগ-করিয়া দিও…
মনি হক আমার অজানাকে জানারমন্ত্র
স্মৃতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি মার্বেলের মত গড়িয়ে-গড়িয়ে।
মনিভাই বলতেন,”
–জানো মাশূক, মানুষ তার স্মৃতি পরিভ্রমণ করে,
স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে যায় জান্নাতুল ফেরদৌসে, হাবিয়া জাহান্নামে,
প্রেমিকার বুকে, আর ; গৃহকর্ত্রীর মশারির নিচে “।
আমি; স্মৃতির সঙ্গে ঢাকার পূর্বানী হোটেলে’র বলাকা রেস্টুরেন্টে ব’সে
মিয়ার বাজারে’র আইটেমে’র দোকানের পরোটা খাই;
ডিমের অমলেট দিয়ে। পাগলের সুখে কাগজকে টাকা-ক’রে
গুনতে-থাকি ফজরের নামাজের আজানের আগপর্যন্ত,
কী অদ্ভুত স্মৃতির এই হাট!
এখানে এখনও প্রায়শই আমি ও মনিভাই জিন্দাবাজারের
জল্লারপাড়ের রাজা ম্যানশনের প্যারাডাইম প্রেসে বসে
কবিতা’র বৃত্তের পাঠ নিই নিখুঁত-কাঁথা-বুননের মতো-করে।
মনিভাই, আমি ও সিগমুন্ড ফ্রয়েড সাকুরা’য় ব’সে লাচ্ছি সেমাই খাই
ঘনদুধের স্বাদে আর; চালাক ইঁদুরের সম্মুখে বিড়ালটি’র
কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার মুখচ্ছটায় ডুবে যেতে দেখছি
আগুনের পরশমণিকে– সন্ধ্যার সূর্যাস্তের আদলে।
মনিভাই কী আসলে-ই স্মৃতির ভ্রমাংশের কোন অচেনা পথ আমার
নিরন্তর জানা’র যাত্রাপথে…
তুমি আনুষঙ্গিক আমার
তোমাকে প্রয়োজন আমার–
নিশ্বাসের প্রয়োজনের নিমিত্তে…।
তোমাকে প্রয়োজন জনসমাগমে,
নি:সঙ্গতায়, নিঝুম-নিসর্গে, বদ্ধ জলাশয়ের পাড়ে বসে
মাছরাঙা পাখিটি’র শিকার-শিল্প অবলোকনে,
তোমাকে আমার প্রয়োজন–
নিশ্বাসের প্রয়োজনে…।
কিশোর-কিশোরী’র উদগ্র প্রেমের মতো,
মানতের মোমবাতির মতো, শাহজালাল মাজারের সিন্নির মতো,
আইসিইউ’র অক্সিজেনের মতো,
গোপন জরুরি পাসওয়ার্ডের মতো,
গ্রীষ্মের গরমে সেদ্ধ-হওয়া দাম্পত্যকর্ম সম্পাদনের রাতে
অতিজরুরি বিদ্যুতের মতো, হাঁপ ছেড়ে বাঁচা বাথরুমে
স্নানের ঠান্ডা জলের মতো,
আর; মধ্যরাতের গগন-চুম্বী ইচ্ছে নির্যাপণ-দমনকালে
তোমাকে প্রয়োজন; আমার জীবনমৃত্যুর সাঁকোর মতো।
মেঘ-বৃষ্টির মতো বিচ্ছিন্ন তুমি হ’য়ো না,
বেহুলার ভেলায় লখিন্দরের শব হ’য়ো না,
প্রেম-বিচ্ছেদের সর্বশেষ চিঠির ভাষার মতো
হৃদয়বিদারক হ’য়ো না, পিতার লাশ-বহনের
কান্নার কলরোল হ’য়ো না, তুমি কখনও
অন্যের জন্যে পার্লারে সাজানো কন্যে হ’য়ো না।
তোমাকে প্রয়োজন আমার–
নিশ্বাসের প্রয়োজনের নিমিত্তে, তোমাকে আমার প্রয়োজন;
নিশ্বাসের প্রয়োজনে, —জরথুস্ত্রেদের আহুরা-মাজদা
ঈশ্বর যেমন আনুষঙ্গিক; তুমিও আমার,
আমি তা-ই বলে আসছি যুগে-যুগে জনে-জনে– বহুজনে…
যেভাবে থেকে যায় সম্পর্ক
কিছু-কিছু সম্পর্ক আছে যা; থেকে-যায়
চোরকাঁটা বনের মতো লেগে থাকে হৃদযন্ত্রে,
শরীরেও সর্বক্ষণ অনুভূত হয় হৃদকম্পনের মতো,
স্মৃতিজাগানিয়ায় সম্পর্কটা দু:খে গীত গায় –সুখে করে কীর্তনিয়া গান,
কিছু-কিছু সম্পর্ক আছে যা; থেকে-যায়
মাজারের মোম ও আগরবাতির মতো জ্বলে অহর্নিশ,
ধুঁয়ার কুন্ডুলিতে স্মৃতির দাহ হয়, পেখমের মতো সৌন্দর্য নিয়ে
ওড়ে বেড়ায় সুখের সোয়াপাখি’র ঝাক, এভাবে-ই
কিছু-কিছু সম্পর্ক আছে যা; থেকে-যায়
থেকে যায় জঠরে, রক্তের প্রতিটি কোষে,
ঠোঁটের স্পন্দনে, আলিঙ্গনের বিমূর্ত মায়ায়,
জননেন্দ্রিয়ের গভীরেও মিলে তার অস্তিত্ব,
তাকে যতটা সরিয়ে দাও –ততোটা স্মরণীয় হয়
উত্তরকালে আর; এভাবে-ই
কিছু-কিছু সম্পর্ক আছে যা; থেকে-যায়
আমার সম্পর্কও থেকে যাচ্ছে কথায় কবিতায়,
প্রেমে, জন্মে, মৃত্যুর মতো চিরন্তনে, ভালোবাসার মতো
নির্লিপ্ততায়, বাতাসের বাহনের জাগতিক অনুষঙ্গে আর;
চোখের সুনির্দিষ্ট প্রক্ষেপণে আর; জন্মসম চুম্বনের লালিত আকাঙ্ক্ষায়…
কিছু-কিছু সম্পর্ক আছে যা; থেকে-যায়
আত্মম: দিব্যাং
স্যাডওয়েলে’র সেইন্ট পোল’স চার্চের পেছনের সেমেট্রিমত
একটা পার্কে বসি। বসি; প্রায়শ’ই। শতবর্ষী বৃক্ষগুলোর সঙ্গে
সখ্যতা হয়ে গেছে।
সামারসিজনে বৃক্ষদের মাথাভর্তি সবুজ পত্রপল্লবও
আমাকে প্রণোদনা দেয় ভালোবাসা।
পাখিদের গীতমুখরতায় কর্ণে-বাজে কাঞ্চন-নিক্বণের তাল।
আমি নিমগ্নচিত্তে বিমুগ্ধনয়নে দেখি পাতার ফাঁকে
পাখিদের নিঃস্বার্থ সঙ্গমকলা।
শিখি পুরুষপাখিটার নারী পটানো’র কৌশল।
বায়ু’র দুর্দান্ত তাণ্ডবের সঙ্গে বৃক্ষের ধস্তাধস্তি দেখি;
দেখি শতবছর ঠিকে থাকার রণকৌশল।
সংগ্রামী গাছগুলো আমার;
জাহাজি লস্কর পূর্বপুরুষের হাভাতি দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ঝড়ের পরেও ঝরে-না-পড়ার প্রতিজ্ঞাটিকে মনে করিয়ে দেয়।
বৃক্ষে’র ধৈর্যমন্ত্রের পাঠ আমি আয়ত্ত করেছি;
চার্চের পার্কের বেঞ্চের পাঠাগারে।
পাখির অব্যর্থ প্রেমের মন্ত্র শিখেছি
সেমেট্রির নাম ফলক পড়তে পড়তে।
আর; নি:সঙ্গ কাকের একা চলার নিসর্গীয় সৌন্দর্যেও
আমার ভিতরে ক্ষরণের চিমটি অনুভব করছি নিজের হৃদপিণ্ডে।
যেহেতু; জন্মগতভাবে একা ও অন্ধকার-প্রকোষ্ঠে
আমার প্রত্যাবর্তন ছিলো নিয়মমাফিক,তাই;
স্যাডওয়েলের সেইন্ট পোল’স চার্চের সিমেট্রি পার্কে’র
বাগানের রকমারি ফুলগুলো অবিকল আমার মায়ের মত-ই
তাকায় আমার চোখের দিকে আর আমি পাঠ নিই;
জীবাণু সংক্রামণে’র শিল্পকলা আর;
রমণ-যুদ্ধের রণকৌশলের…।






Leave a Reply