রঘুনাথ বাগচীর ধূসর জগৎ
রঘুনাথ বাগচী। বিশাল চেহারা। বুদ্ধি চেহারার ঠিক বিপরীত। গ্রামের মানুষের সাথে রঘুনাথও জানে সেটা। কোন কিছুই ঠিকঠাক ভেবে উঠতে পারে না সে। যখন মেঘ নিয়ে ভাবে, মেঘ সুন্দর আবার কুটিলও, বৃষ্টি ঝরায়, ঝড় আনে, ব্যস্ এটুকুই। কিন্তু কোত্থেকে আসে আর কোথায়ই বা যায়, তার কূলকিনারা করতে পারে না। কিছুক্ষণ সে মেঘের মতোই চিন্তার মহাশূন্যে ভেসে থাকে, তারপর সিদ্ধান্তে আসে- সব তাঁর (ঈশ্বর) ইচ্ছা। বৃষ্টি হয়ে ঝরে যাওয়ার মতো এক শান্তি হয় তার।
রঘুনাথ এখন বসে আছে মৌলভী দ্বীন মোহাম্মদের টিনের বাড়ির শান বাঁধানো পৈঠায়। মনুষ্যকূলের মধ্যে মৌলভী সাবই এ গ্রামে তার একমাত্র বন্ধু। এই মানুষটিকে তার ভালো লাগে। শাদা শুভ্র দাড়ি, চেহারাটা কালো কিন্তু মনটা তার দাড়ির মতোই শাদা। বয়সও তার মতো সত্তুরের কোঠায়।
ঘরের নকশাকাটা মেহগনি কাঠের দরজা খুলে দ্বীন মোহাম্মদ বেরিয়ে আসতে আসতে বলে, ‘কী রে রঘু, এই ভরদুপুরে?’
‘স্লামালেকুম হুজুর।’
‘ওয়ালাইকুমু আসসালাম। আজকে তোগের দূর্গাপূজার শেষদিন না?’
মাথা নাড়ে রঘু। ‘হ। মায়ের বিসর্জন হবে। মনডা খারাপ। তাই তুমার কাছে আসলাম। তুমি তো জানো তুমার সাথে কথা ক’লে আমার মনডা ভালো হয়।’
‘হ রে। তা জানি। তুই মানুষডা ভালো। তোর মনডা শিশুর মত সরল। আমি জানি তুই আল্লার বিশেষ নেয়ামত।’ মৌলভী, লুঙ্গি পরা, স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে, উল্টোদিকের পৈঠায় বসতে বসতে বলে, ‘তা বলতোরে রঘু, করোনা কি এইবার যাবে?’
রঘুনাথ নাকের সামনে থেকে হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বলে, ‘না হুজুর। আরও কয়েকটা পুন্নিমা লাগবে। তারপর যাবে।’
দ্বীন মোহাম্মদ এই ভবিষ্যতবাণীতে বিশ্বাস করলো। এই রঘুনাথই ২০১৯ সালের শেষের দিকে তাকে বলেছিল, হুজুর, কালরাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, ঠিক স্বপ্ন না, জাগে জাগেই দেখলাম, একটা বালাই একটা ডাইনীর রূপ ধরে আগায়ে আসতেছে। খুউব ভয়ংকর। খুউউউব। বুকডার মধ্যে চিনচিন করে ব্যথা করে হুজুর।’
তার কয়েকদিন পরেই শোনা গেল চীনদেশে করোনা না কী একটা মরণ ব্যাধির আবির্ভাব ঘটেছে। তারপর এক এক করে পুরো পৃথিবী গ্রাস করলো সেই ব্যাধি। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। এই গ্রামেই তো মারা গেল ১০ জন লোক। রঘুনাথ উদ্ভ্রান্তের মত সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ায়। মানুষ চায়ের দোকানে, হাঁটে মাঠে ঘাটে কতরকম আলাপ করে। রঘুনাথ শোনে, কিন্তু বেশির কথাই বুঝতে পারে না। এই রোগ নাকি চীনের তৈরি করা রোগ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, মাস্ক, লকডাউন, গণটীকা কর্মসূচি। এতসব কথা তার মাথায় ঢোকে না। তার বুদ্ধি কম। ভাবনাচিন্তা বেশিদূর এগোয় না। তবে এটুকু বোঝে, এই রোগ অনেক ক্ষতি করে দেবে পৃথিবীর। মৌলভী সাবকে অনেকবার বলেছে সে একথা।
দ্বীন মোহাম্মদ বিশ্বাস করে, এই আলোভোলা কমবুদ্ধির মানুষটার কিছু অলৌকিক ক্ষমতা আছে। গ্রামের মানুষও কম-বেশি জানে, কিন্তু হয় মেনে নিতে কষ্ট হয় তাদের অথবা উপেক্ষা করে।
একবার বর্ষাকালে মৃত্যু-শয্যায় থাকা সর্দারপাড়ার আলেফ সর্দারের দাদিমাকে দেখতে গিয়েছিলো রঘুনাথ। আলেফ তার ছেলে দশরথের বন্ধু। দশরথ তখন হাইস্কুলের শেষভাগ থেকে ঝরে পড়ে একটা অলঙ্কার তৈরির দোকানে স্বর্ণকারের কাজ শিখতে শুরু করেছে। দশরথই তাকে বলেছিল, আলেফের দাদীমার মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা। রঘুনাথ সকালের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিল আলেফদের বাড়ি তার দাদীমাকে দেখতে। দাদীমা রঘুনাথের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন অন্তিম ইচ্ছার কথা, তার কৈ মাছের ঝোল খেতে ইচ্ছে করছে।
গ্রামের বাজারে খোঁজা হলো, পাওয়া গেল না। আশপাশের গ্রামের বাজারগুলোতেও খোঁজাখুঁজি করা হলো। ফলাফল শূন্য। রঘুনাথ কেমন একটা ফাঁকা চোখে আকাশে ভেসে যাওয়া একখণ্ড মেঘের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, বৈকালেই কৈ মাছ পাওয়া যাবে। মাসিমা মৃত্যুর আগে অবশ্যই কৈ মাছ খাবেন।
লোকজন তার কথা পাত্তা দিল না। নির্বোধ, পাগল একটা। পশুপাখির সাথে কী সব বিড়বিড় করে, এমন লোককে পাত্তা দেয়ার কোন কারণও নেই।
ঐদিন দুপুর গড়িয়ে গেলে আকাশে মেঘ ঘন হয়ে এলো। শুরু হলো বৃষ্টি। তেমন প্রবল নয়, মাঝারি ধরনের। আলেফ বারন্দা থেকে দেখল, উঠোনের এক কোণে গড়িয়ে যাওয়া বৃষ্টির পানিতে একটা আলোড়ন তৈরি হচ্ছে। তারপরই অগভীর পানিতে লাফাতে শুরু করল কিছু প্রাণী। আলেফ প্রথমে ভেবছিল, ব্যাঙট্যাং কিছু হবে। তারপর অপরিমেয় বিস্ময় নিয়ে সে আবিষ্কার করল, ওগুলো কৈ মাছ। খালি হাতেই ধরে ফেলল প্রায় গোটা বিশেক কৈ।
এই গল্প ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মত দিলো, কৈ গুলো বরষার পানিতে পার্শ্ববর্তী একটা পুকুর থেকে উঠে এসেছিল। এখানে রঘুনাথের বিশেষ কোন কৃতিত্ব নাই। তবে কেউ কেউ স্বীকার করল, রঘুনাথ লোকটা নির্বোধ হলেও জন্মগতভাবে তার জ্যোতির্বিদ্যায় কিছুটা দখল আছে।
মৌলভী দ্বীন মোহাম্মদ কিন্তু অন্যরকম করে ভাবে। আল্লাহ তাকে একটা জিনিস কম দিয়েছে, আর সেই খামতির জায়গাটা পূরণও করে দিয়েছে তাকে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে।
যাই হোক, ঐদিন সন্ধ্যায় কৈ মাছের ঝাল ঝাল ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে আলেফের দাদীমা রাত ১১টা ৫৯ মিনিটে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়।
মৌলভী সাব কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে রঘুনাথের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন ওটা একটা কিতাব। অতীত হয়ে যাওয়া কোন লিপিতে লেখা। পড়া যাচ্ছে না, কিন্তু অক্ষরগুলোর বিন্যাস প্রবলভাবে আকর্ষণ করছে।
‘রঘুনাথ।’
‘বলো হুজুর।’
‘তোর ছেলের কী খবর? খোঁজ খবর নেয় তো? পয়সা পাতি পাঠায় তো বাড়িতে?’ দশরথ বাজারের একটা অলঙ্কার তৈরির দোকানে কাজটাজ শিখে যশোর শহরে গিয়ে একটা বড় জুয়েলারি তে কাজ নেয়। এখন এলাহী অবস্থা। নিজে নবম শ্রেণির গণ্ডী টপকাতে না পারলেও বিয়ে করেছে এমএ পাশ মেয়ে। ঐ মেয়ে কী একটা এনজিও তে চাকরিও করে। ছিমছাম একটা বাসা ভাড়া করে থাকে। তার এক ছেলে এক মেয়ে। দুজনই নাকি ইংরেজি ভার্সন স্কুলে পড়ে। দশরথ গ্রামে কমই আসে, কিন্তু এখানে রঘুনাথ আর রঘুনাথের যে বাল্য বিধবা পিসিমা থাকে তাদের খাওয়া-পরার খরচা সে-ই টানে। তাতেই খুশি রঘুনাথ। এই ৬৫ বছর বয়সে তাকে যে আলুর চপ, পেঁয়াজী, বেগুনী আর পাপড় ভেজে পেট চালাতে হচ্ছে না তাতেই আহ্লাদে আটখান। একগাল হেসে উত্তর দেয় রঘুনাথ, ‘হা হা, সব ঠিকাছে। ছ’লডা বড় ভালো, বুঝলে তো হুজুর! আমার মত আধপাগলা বলদ না। তার এলেম আছে। আমার নাতি নাতনি রে ইংরিজি ইস্কুলে ভর্তি করাইছে। সব তাঁর ইচ্ছে…’।
এক অলৌকিক আলো তার চোখেমুখে দুর্বোধ্য এক নকশা তৈরি করেছে। এই নকশা সবাই দেখতে পায় না, মৌলভী সাব দেখতে পায় আর তার হৃদয় গ’লে এক বিশুদ্ধ ভালোবাসার ধারা বেরিয়ে আসে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। সূর্য মাথার উপর উঠে এসেছে। একটু পর আজান হবে, নামাজের সময় হয়ে আসছে।
‘হুজুর’।
‘হুমম।’
‘তুমার বেড়ালডা কৈ? আশেপাশে তারে দেখা যাচ্ছে না ক্যান?’
‘আমি জানতাম, তুই এই প্রশ্নডাই করবি। কালকে রাতের পর থেকে তারে আর দেখতিছি না। কই যে গেল…’
রঘুনাথের বেড়ালপ্রীতি, বেড়ালের ভাষা বোঝা আর বেড়ালদের সাথে কথাবার্তা চালানোর ব্যাপারটা এই গ্রামের অনেকেই জানে, কিন্তু মানে না। পাগলছাগল একটা, পশুপাখিদের সাথে বিড়বিড় করা আর তাদের ভাষা বোঝা তো আর এক জিনিস না। কিন্তু মৌলভী মানে। শুধু মানেই না, বিশ্বাসও করে। এটা হয়, হতেই তো পারে। আল্লাহ তাআলা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন আর তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে গুঁজে দিয়েছেন অপার সব বিস্ময় আর রহস্য।
এদিকে রঘুনাথের মাথার খোড়লের মধ্যে জেগে উঠেছে এক ধূসর জগৎ। আবছা সব সাদাকালো দৃশ্য।… চাঁদের মৃদু আলোয় একটা বেড়াল। উঠোনে, একা। হঠাৎ ইঁদুরটাকে দেখলো সে। এই আকৃতির ইঁদুর খুব একটা দেখা যায় না। বেড়ালটার চোখ জ্বলে উঠল, এমন শিকার ধরার সুযোগ জীবনে খুব কম আসে। ধাওয়া করল ইঁদুরটাকে। ইঁদুর জান বাঁচাতে দক্ষিণ দিকে ছুটল। একটা পায়ে হাঁটা পথ। বেড়াল মরিয়া। ইঁদুরও তাই। দুজনই ছুটছে। একজন আততায়ী, ক্ষীপ্র। অন্যজন প্রাণভয়ে ভীত, বাঁচার জন্য ডেসপারেট। কিছুদূর গিয়ে ইঁদুর ঢুকে পড়ল একটা আম-কাঁঠাল-মেহগনি আর নানারকম ঔষধি গাছে ভরা জংগলের ভেতর। ঢুকল বেড়ালও। দুজনের মধ্যে দূরত্ব এক বা দুহাত হবে। লাফিয়ে পড়লেই হয়ে যাবে। শিকার ঢুকে যাবে শিকারীর থাবায়।
হঠাৎ একটা দশাসই চেহারার গোখরো লাফিয়ে পড়ল বেড়ালটার উপর। একের পর এক কামড় দিচ্ছে শরীরে, বিষ ঢালছে। রক্তাক্ত হয়ে গেল বেড়ালের শরীর। এক মিনিটও লাগল না তার মারা যেতে। ইঁদুরটা হারিয়ে গেল ঔষধি গাছের একটা ঝোপের মধ্যে।
রঘুনাথের এই অন্য জগতে যাওয়াটা দেখতে পাচ্ছে দ্বীন মোহাম্মদ। ওর চোখ দুটো ধূসর হয়ে গেছে। মানুষের চোখ বলে মনে হয় না, যেন ভীনগ্রহের কোনো প্রাণী। মুখের এক পাশ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা লালা বের হচ্ছে।
‘রঘুনাথ। ওই রঘুনাথ।’
ধূসর জগতের গোলক ধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসতে তাকে এক প্রকার সাহায্য করল দ্বীন মোহাম্মদ।
‘হু। হুজুর।’ রঘুনাথের কণ্ঠস্বর আর্দ্রতামুক্ত, শীতের শুষ্ক বাতাসের ভুস করে বের হয়ে আসে।
‘কী হইসে তোর? শরীর খারাপ লাগতিছে?’
মাথা নাড়ে রঘুনাথ। হু, তার শরীর ঠিক লাগছে না।
‘পানি খাবি?’
আবার সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে সে। মৌলভী সাব চীৎকার করে পানি দিতে বললে, বাড়ির একটা ছোট্ট মেয়ে একটা মেলামাইনের গ্লাস ভরতি পানি রেখে যায়। রঘুনাথ এমনভাবে পানি খায়, যেন সে টানা তিন ধরে খাবার-পানি ছাড়াই একটা মরুভূমি পাড়ি দিয়ে এসেছে। তার শরীর ভরতি এক মরুভূমি তৃষ্ণা।
গ্লাস রেখে উঠে দাঁড়ায় সে। বলে, ‘আজকে যাই হুজুর। শরীরটা ঠিক নাই।’ তারপর শরীরটাকে দুই হাত সামনে এগিয়ে দিয়ে দ্বীন মোহাম্মদের দিকে ফিরে খনখনে গলায় বলে, ‘তোমার বিড়াল আর ফিরে আসপে না হুজুর।’ কথাটা বর্শার ফলার মত বুকে এসে বেঁধে মৌলভী দ্বীন মোহাম্মদের। তার বিস্ফারিত চোখের সামনে দিয়ে রঘুনাথ বাগচী উত্তর দিকের প্রধান পথে না গিয়ে দক্ষিণ দিকের পায়ে হাঁটা পথের দিকে হাঁটতে থাকে।
২.
দুপুর গড়িয়ে গেছে। রঘুনাথ মুসলমান পাড়া থেকে বেরিয়ে ইট বসানো বড় রাস্তায় উঠে আসে। এখানে রাস্তার দু’পাশে বেশ কিছুদূর পর্যন্ত ফাঁকা, ধানী জমি। রাস্তাটা সোজা চলে গেছে পূর্বমুখে শালিখার দিকে। বড় রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে উত্তর দিকের উপরাস্তায় নেমে পড়ে সে। ঢুকছে হিন্দু পাড়ায়। দুর্গাপূজা চলছে। প্রথম দুইদিন প্রচুর ঢাকঢোল আর মাইক বেজেছে। করোনার কারণে সরকারের নানারকম বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও উৎসবে কোন খামতি ছিল না। হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল, কুমিল্লা আর কোথায় কোথায় কী সব সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা হয়ে গেল। উৎসব মাটি। সাম্প্রদায়িক শব্দটাই উচ্চারণ করতে পারে না রঘুনাথ। মানেও বোঝে না। রক্ত ঝরার কথা শুনে বুঝেছে, শব্দটা অভিশপ্ত। আজ বিসর্জন। পড়ন্ত দুপুরে পুরো হিন্দুপাড়াটা যেন ভাতঘুমে ডুব দিয়েছে। একটা অস্বস্তিকর চুপ মেরে থাকা। মনের উপর একটা পাহাড়সমান ওজন নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে হাটতে থাকে সে।
রাস্তার দুইপাশ দিয়ে সারি সারি কাঠের বাড়ি। মাঝে মাঝে একটা দুটো ইঁটের বাড়িও আছে। বাড়িগুলোর বাইরের পাশ রাস্তার দিকে অর্থাৎ বাড়ির সামনের ফটকগুলো রাস্তার উল্টো দিকে, রাস্তা থেকে বাড়িগুলোর ভেতরটা যেন না দেখা যায়, তাই এ ব্যবস্থা। শত শত বছর ধরে এভাবেই চলছে।
বেশ কয়েকটা বাড়ি পার হয়ে আসার পর একটা বাড়ির পেছনের ঘন জঙ্গল থেকে শোনা গেল, ‘রঘুনাথ বাবু, ও রঘুনাথ বাবু। আপনাকে ভালো দেখাচ্ছে না। শরীর ঠিক আছে তো?’
লীলার গলা। লীলা একটা মিনি বেড়াল। এ বাড়ির পোষা।
রঘুনাথ দাঁড়ায়। এদিক ওদিক খুঁজে একটা শিরিষ গাছের নীচে লীলাকে আবিষ্কার করে সে।
‘লীলাদেবী, দুপুরে ঘুমান নি নাকি? হু। ঠিক ধরেছেন। আমার শরীর ভালো নেই। মনটাও খারাপ।’
‘কেন? কেন?’ লীলার গলায় স্পষ্ট উদ্বেগ।
‘মৌলভী সাহেবের বেড়ালটা…’
‘কথা কেড়ে নিয়ে বলে লীলা, ‘আমি জানি। কাল রাতে সাপের আক্রমণে মারা গেছে সে।’
‘কীভাবে জানলেন লীলাদেবী?’ প্রশ্নটা না করে পারে না রঘুনাথ।
‘আমাদের বেড়াল সমাজে তথ্য আদান-প্রদানের নিজস্ব ধরন আছে। মানুষের চেয়েও দ্রততম আমাদের তথ-প্রবাহ।’
‘ও আচ্ছা। তা ঠিক আছে। ভীষণ কষ্ট পেয়েছি আমি। এইমাত্র তার মৃতদেহ খুঁজে বের করে কবর দিয়ে এসেছি।’
‘ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি অনেক ভালো মনের একজন মানুষ। মানুষের ভিতরে এই ধরনের মানুষ খুব বিরল।’
রঘুনাথের কষ্টটা যেন একটু কমলো।
‘আসুন লীলাদেবী তার আত্মার শান্তি কামনায় আমরা এক মিনিট নিরবতা পালন করি।’
হাতে ঘড়ি নেই রঘুনাথের। সময়ও দেখতে পারে না। এক মিনিট আন্দাজ করে দু’জনেই চুপ করে থাকে। এবং তার দু’জনেই প্রায় এক সাথে কথা বলে উঠে, ‘তারপর খবরাখবর কী?’
লীলা বলে, ‘ভালো না।’
রঘুনাথ বলে, ‘ভালো না। দেশে পূজা নিয়ে খুব ঝামেলা চলছে।’
লীলার গায়ের রং টা একদম আলাদা ধরনের। সাদা, কালো আর বাদামী রঙের মিশেল। ব্যক্তিত্বেও সে আলাদা, এই গ্রামের অন্যান্য বেড়াল থেকে। লীলা মন্ডলবাড়ির বেড়াল, আদর-যত্ন- খাওয়া-দাওয়ার কোন অভাব নেই। মন্ডলদের মতোই। এক শতাব্দী ধরে এই পরিবার অবস্থাসম্পন্ন। কয়েক বিঘা ফসলী জমি আছে। বাজারে কাঁচামালের আরত আছে। শোনা যায, আগে চিত্রানদী দিয়ে বড় বড় গয়না নৌকায় করে দূরদূরান্ত থেকে মালামাল আসত। এখন নদী মৃত হলেও ব্যবসা মরে নি। এখন স্থলপথে ট্রাক ভরতি করে মালামাল আসে। এই প্রজন্মে মন্ডল পরিবারে ওরা দুই ভাই শুধু। দুই ভাইই মোটামুটি পড়ালেখা করে ব্যবসার হাল ধরেছে। বড় ভাই অভয় মন্ডল, ছোট ভাই জয় মন্ডল। বছরখানেক হল অভয় বিয়ে করেছে। জয় এখনও ব্যাচেলর। পয়মন্ত সংসার। ওদের বাবা মারা গেছে, কিন্তু মা আছে। থাকার জন্য বিশাল বড় পাকা ঘর। আলদা রসুইঘর। উঠানের এক কোনে পাকা বাথরুম। বাড়িটা অসংখ্য ফলজ বৃক্ষ দিয়ে ঘেরা। এই বাড়ির মতোই লীলার চেহারাটাও ঝকঝকে, আকর্ষণীয়।
লীলা চিন্তিত হয়ে বলে, ‘ও আচ্ছা।’
রঘু জানতে চায় লীলার খবর কেন ভালো না। কী সমস্যা হয়েছে তার।
লীলা একটু ভেবে উত্তর দেয়, ‘আজ এ বাড়িতে একটা খুন হবে।’
খুনখারাবি খুব খারাপ জিনিস। আবার একটা ধাক্কা খায় রঘুনাথ।
‘আপনি কীভাবে জানলেন লীলাদেবী?’
‘আমি কিছু দিন ধরেই একটা কিছু আঁচ ‘করছিলাম, বুঝলেন তো রঘুনাথ বাবু। একটা কিছু যা মানুষের মধ্যে আমি প্রায়ই দেখি।’
‘কী সেটা?’
‘সম্পর্ক।’
দ্বিধা জর্জর রঘু বলে, ‘একটু পরিষ্কার করে যদি বলেন লীলাদেবী। আমার বুদ্ধি খাটো। কঠিন ব্যাপারগুলো ঠিক বুঝতে পারি না।’
‘মনুষ্যজাতির মধ্যে আমি সম্পর্ক ব্যাপারটার কোন কিনারা দেখতে পাই না। মানে কোন সূত্র মেনে চলে না। অধিকাংশ সর্ম্পকই দেখি জটিল হয়ে ওঠে! আমাদের বেড়ালদের মধ্যে এই ধরনের জটিলতা নাই। আমরা মুহূর্তের সম্পর্ক গুলোকেই বিশ্বাস করি, বিশ্বাস রাখি এবং পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করি।’
রঘুনাথের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারে নাই।
এবার লীলা মূল প্রসঙ্গে চলে যায়। ‘অভয় বাবুর স্ত্রীর নাম সম্পা। বিয়ের পর থেকেই আমি খেয়াল করেছি, ওদের খুব আলগা ধরনের। এর কারণ হচ্ছে অভয় বাবু। তিনি সম্পাকে…ঠিক কী বলব… ঐভাবে কাছে টেনে নেন নাই। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখেছি, অভয় বাবু বিয়ের আগে থেকেই অন্য একটা মেয়ে মানে আপনি চিনবেন রঘুনাথ বাবু, সাহা বাড়ির অক্ষয় সাহার মেয়ে রুপালি সাহার সাথে একটা সম্পর্কে ছিলেন।’
রঘুনাথ মাথা নাড়ে। এবার সে একটু একটু বুঝতে পারছে।
লীলা বলে চলে, ‘রুপালি সাহা বিয়ে করেন নি। একটা স্কুলে চাকরিও করেন। আমি অভয় বাবুর মোবাইলে কথপকথন শুনে বুঝতে পেরছি, ওনাদের সম্পর্ক টা শেষ হয় নাই। ব্যাপারখানা কতটা জটিল দেখেন, শম্পাদেবী আবার জড়িয়ে পড়েছেন অভয়বাবুর ভাই জয় মন্ডলের সাথে।’
লীলা দম নেয়ার জন্য একটু থামে। রঘু বলে, ‘হুঁ বুঝলাম। কিন্তু এর সাথে খুনের সম্পর্ক কী?’
‘আমি দেখেছি, পৃথিবীতে সবকিছুই একটা পরিণতির দিকে যেতে চায়। তা ভালো হোক বা মন্দ হোক। খুব বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকতে চায় না।… পূজার দুইদিন আগে এনাদের মা বেড়াতে গেছেন তার মামাবাড়িতে, খুলনায়। ফিরতে দেরী আছে। কাল ব্যবসার ব্যাপারে জয়বাবু গেছে ঢাকায় কয়েকদিনের জন্য। এই সুযোগে খুনটা হবে এখানে।’
‘কে খুন হবে?’
‘শম্পাদেবী। আমি কাল অভয়বাবুকে রুপালি দেবীর সাথে ফোনে কথা বলতে শুনেছি। অভয়বাবুর কথা শুনে যেটুকু বুঝেছি…।’
৩.
ঘুম আসছে না রঘুনাথের। পিসিমার রান্না করা ভাত খেয়েছে ঘন্টা দুয়েক হয়ে গেছে। বাইরে ধুমছে নেমেছে বৃষ্টি। বিসর্জনের দিন আগে হোক পরে হোক বৃষ্টি হবেই। এ যেন নিয়তি নির্ধারিত। জন্মের পর থেকে দেখে আসছে রঘুনাথ। নিজের জীবনে যা কিছু হয়েছে, সব নিয়তি বলেই মেনে নিয়েছে সে। নির্বোধ হয়ে জন্মানো, মা-বাবা, পাড়াপড়শিদের চূড়ান্ত অবহেলার ভিতর দিয়ে বেড়ে ওঠা, একটা কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার আইবুড়ো এবং কুশ্রী কন্যাকে বিবাহ, প্রথম সন্তান প্রসবের সময় তার অকাল মৃত্যু, বালবিধবা পিসিমার হাতে তার সন্তান দশরথের বড় হয়ে ওঠা, তার বেড়ালের ভাষা বুঝতে পারার আশ্চর্য ক্ষমতা, তার মাথার খোড়লের মধ্যে ভিন্ন একটা জগত যে জগতের সাথে বাস্তব পৃথিবীর পার্থক্য শুধু রঙে আর সময়ে- এই সবকিছু সে নিয়তি নির্ধারিত বলেই মেনে নিয়েছে; তার কুশ্রী স্ত্রীর সঙ্গে- লীলা যেমন বলছিল- তেমন একটা সম্পর্ক হয়ে ওঠা…নিয়তি নয়? কুশ্রী মানে দেখতে সুন্দর নয়। কিন্তু সেই সরলা বালাকে দেখলেই তো তার মনটা আর্দ্র হয়ে উঠত। প্রকৃতপক্ষে তাকে ভাবলেই এখনও ভিজে যায় তার মন। শরীরের স্পন্দনগুলো কেমন পাল্টে যায়। আজও তার স্পর্শ চায় বার্ধক্য নেমে আসা শরীর। এসবকিছুই কোথাও একটা ছক করা আছে বলে বিশ্বাস করে রঘুনাথ।
আজ রাতে মন্ডল বাড়িতে একজন খুন হবে। সে কি নিজে ও বাড়িতে গিয়ে বলে দেবে যে, শম্পাদেবী, আপনাকে আজ খুন করা হবে, আপনি পালান? অথবা থানায় গিয়ে পুলিশকে বলবে? তাতে কি পাল্টাবে কিছু?
শম্পাকে খুন হতেই হবে!
চোখ বন্ধ করলো রঘুনাথ। আর সঙ্গে সঙ্গে সে ঢুকে পড়লো সেই ধূসর জগতে।
…মশারীর ভেতরে শুয়ে আছে অভয় আর শম্পা। জগতটা এম্নিতেই কুয়াশার পরতে ঢাকা, মশারী টাঙানো থাকায় তার ভেতরটাতে, রঘুনাথ দেখছে, দুজন অস্পষ্ট মানুষ অদ্ভূত এক খেলায় মেতে উঠেছে। খেলাটা চেনা আবার অচেনাও। অনেক্ষণ পর একজন খেলতে খেলতেই ঘুমিয়ে পড়ল। অন্য মানুষটি বালিশের মত কিছু একটা ঘুমন্ত মানুষটির মুখের উপর চেপে ধরল। কিছুক্ষণ ছটফট করলো ঘুমন্ত মানুষটি। তারপর থেমে গেল। অন্য মানুষটি এবার উঠে মশারী খুলে ফেলল। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল রঘুনাথ। এ কি দেখছে সে? উঠে দাঁড়ানো মানুষটা শম্পা! হন্তারক তাহলে শম্পাদেবী! তা কী করে হয়? নিয়তি তো বদল হওয়ার নয়।
প্রায় জোর করেই সেই জগৎ থেকে ফিরে এলো রঘু। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সারা গা ঘামে ভিজে জবজব করছে। উঠে জগ উঁচু করে ধরে পুরোটা পানি খেল সে। জানালা খুলে দিল। বৃষ্টির ঝাপটা ঢুকল ঘরে। শরীরটাকে বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যেত দিল।
অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার এসে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করল। ফের ধূসর জগৎ!
…এবারও হত্যাকাণ্ড শেষ হল। কিন্তু মশারী খুলে ফেলার পর রঘুনাথ দেখল, হন্তারক অভয় মন্ডল। তারপর অভয় বাবু যা করল তা হচ্ছে, সিলিঙ ফ্যানের উপর দিয়ে একটা দড়ি ছুড়ে দিয়ে, দড়ির এক মাথা শম্পার গলায় ভালো করে পেঁচিয়ে দিল। দড়ির অন্য মাথা প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে টেনে টেনে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দিল শম্পা দেবীকে।
এই দৃশ্যটা লীলার বলা দৃশ্যের সাথে মিলে যাচ্ছে। পরবর্তীতে সবকিছু শান্ত হয়ে গেলে অভয় মন্ডল বিয়ে করবে রুপালি সাহাকে।
মাথার ভেতর ভীষণ জ্বালা করছে রঘুনাথের। যেন একটা নয়, দুটো জগৎ রয়েছে ওখানে। পরস্পর বিপরীত ধর্মী ঘটনার জন্ম দিচ্ছে, আর ঘটনাগুলো পরস্পরের সাথে সংঘৃষ্ট হয়ে মাথার ঘিলু উলোটপালট করে দিচ্ছে রঘুনাথের।
তাহলে কোনটা নিয়তি? চরম এলোমেলো হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো সে। আবার সেই ধূসর জগৎ। খেলাটা একই আছে। এক পর্যায়ে মশারীর ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একজন। শম্পা। দরজার দিকে এগোলো। খিল খুলল। দরজা খুলে বাইরে এলো। বৃষ্টি হচ্ছে। ফের ভেতরে ঢুকে ছাতাটা নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে নেমে পড়ল। বাথরুমে গিয়ে ঢুকল। পাঁচ মিনিট পর, বাথরুম থেকে বের হয়েই একটা চিৎকার দিয়ে উঠল। ‘সাপ সাপ। মরে গেলাম রে।’
একটা কেউটে তার পায়ে ছোবল দিয়ে পালিয়ে গেছে। অভয় ঘর থেকে ছুটে এল। স্ত্রীকে কোলে তুলে ঘরের বারান্দায় নিয়ে এল। বারান্দায় শুইয়ে দিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। মারা গেছে শম্পা।
তারপর পুরো দৃশ্যটা ঝরঝর করে ভেঙে পড়ল করোটির মধ্যে।
রঘুনাথের মাথার মধ্যে এখন তিনটি জগতের উপস্থিতি। সে টের পাচ্ছে। তিনটি জগৎ পরস্পর ঠেলাঠেলি করছে। রাত শেষ হতে অনেক বাকী আছে। ভোর অব্দি কে জানে আরও কত জগৎ তৈরি হবে!
কিন্তু বাস্তব জগতে কী ঘটে তা দেখতে হলে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করা ছাড়া বিকল্প কোন উপায় নেই রঘুনাথ বাগচীর হাতে।






Leave a Reply