ছলছল চোখে
শীতকালের দুপুরে খোলা বারান্দায় খাতা কলম নিয়ে রোদ পোহাতে বসে ভাবছি শীতকাল নিয়ে একটা ছোটগল্প লিখলে মন্দ হয় না। শীতকাল শুধুই কি কণকণে ঠাণ্ডা নিয়ে আসে? ঠাণ্ডা ছাড়াও কত কিছুই তো নিয়ে আসে নিজের সঙ্গে। শীতের মরশুমেই রকমারি সবজিতে দোকানপাট ভরে ওঠে, নলেন গুড়ের হাঁড়িতে মাছি-মৌমাছির ভনভনানি শুরু হয়, বাড়িতে বাড়িতে পায়েস-পুলি-পিঠের ধুম লেগে যায়, ঝাঁকাভরা বাহারি ফুলের রকমারি চারাগাছ মাথায় নিয়ে বাড়ির সামনে দিয়ে ফুলেরচারা বিক্রেতার হাঁক দিতে দিতে যাওয়া ‘ফুলের চারা লাগবে-এ-এ-এ?’, মাথায় মাটির হাঁড়ি কিংবা কাগজের মোড়কের বোঝা নিয়ে বাড়ির সামনে দিয়ে ফিরিওয়ালার হাঁক দিতে দিতে যাওয়া ‘জয়নগরের মোয়া-আ-আ-আ… নেবেন-ন-ন-ন’, কিংবা ‘খাটি নলেন গু-উ-উ-ড় আছে-এ-এ-এ।’
শীতকালেই ফুলবাগিচায় নরম রোদমাখা রকমারি ফুল মাথা দোলাতে দোলাতে বাতাসের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠে। শহরের আনাচেকানাচে জমে ওঠে রকমারি বাহারি ফুলের প্রদর্শনী। কাকভোরে গায়ে সোয়েটার চাপিয়ে গলায় মাফলার পেঁচিয়ে কচিকাঁচাদের ভাড়ার গাড়িতে চেপে হৈ-হৈ করতে করতে দূরে কোথাও পিকনিক করতে যাওয়া। তাদের অনেকের উৎসাহ এতোটাই মারাত্মক হয় যে, প্রবল শীতে সাতসকালেই ডিজের বাজনার তালে তালে নাচতে নাচতে গিয়ে হাজির হয় কোন নদীতীরে অথবা রেলওয়ে ব্রিজের তলায় কিংব কোন জঙ্গলাকীর্ণ নির্জন এলাকায়।
শীতকালে রাস্তা-ঘাটের চেহারা আমূল বদলে যায় কম্বল-সোয়েটারের পসরা সাজিয়ে নিয়ে বসা ভিনরাজ্যের পসারিদের দৌলতে। ওদের কথাতেই জব্বর একটা ছোটগল্পের প্লট চলে এল আমার মাথায়। অমনি খাতা কলম নিয়ে গল্প লিখতে শুরু করলাম, ‘শীতকাল = উল + উলকাঁটা। বুনন পটীয়সী নারী = মা, কাকীমা, মাসি-পিসি, দিদা, ঠাম্মি, দিদি, বোন, প্রেমিকা এবং স্ত্রী।’
এতটা লেখার পর কলমের ডাটি চিবোতে চিবোতে ভাবছি শীতের মরশুমে উল এবং উলকাঁটার পিছনে আর কার কার ভূমিকা রয়েছে। ভাবনায় ডুবে ছিলাম বলে খেয়ালই করি নি কে যেন পিছনে দাঁড়িয়ে লেখাটুকু পড়ে নিয়ে আচমকা আমার কানের পাশে মন্ত্রোচ্চারণের ভঙ্গীতে বলে উঠল, “ম-র-ণ!”
ওই ‘মরণ’ শুনে এতটাই চমকে গেলাম যে, সেইমুহূর্তে মনে হল আমি বুঝি মরেই গিয়েছি। যমরাজ নিজেই হয়তো আমাকে নিতে এসেছেন। তাই হয়তো অমন করে উচ্চারণ করলেন তাঁর অমোঘ মারণমন্ত্র। খুব ইচ্ছে হল মারা যাবার আগে যমরাজকে স্বচক্ষে দেখে নিই। সেইমত পিছনে ঘুরতেই যমরাজের মুণ্ডুর সঙ্গে আমার মাথা সজোরে ঠুকে গেল। মাথা ঠোকাঠুকির দরুন দু’চোখে অন্ধকার দেখতে দেখতে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।
যমালয়ে আসার পর চোখ খোলার সুযোগ পেলাম মুখে জলের ছিটে এসে পড়ায়। অমনি নতুন একটা ইচ্ছে আমাকে পেড়ে ফেলল। শুনেছি যমালয়ের আশেপাশেই নাকি স্বর্গের অপ্সরারা মনের সুখে নৃত্য গীত করে থাকেন। যমরাজকে যখন স্বচক্ষে দেখা হল না তখন নাহয় অপ্সরাদের মুখগুলো দেখে নেবার সুযোগ হাতছাড়া করবো কেন? সেইভেবে চোখ খুলে যা দেখলাম তাতে আমার পিলে চমকে গেল।
চোখ খুলে দেখি সহধর্মিণী লালির মুখটা ঝুলে আছে আমারই মুখের ওপর! লালির এক হাতে একটা জলের মগ, অন্য হাতের জলভরা তালু থেকে ফোটা ফোটা জল ঝরে পড়ছে আমার মুখের ওপর। লালি যেন তৈরি হয়ে রয়েছে আমার মুখে আবার জলের ঝাপটা দেবার জন্য। বুঝলাম লালি নিজেই জলের ঝাপটা দিয়ে আমাকে যমের দুয়ার থেকে মর্ত্তে টেনে নামিয়েছে।
আমাকে চোখ খুলতে দেখে লালি ‘হিহি’ করে হাসতে হাসতে আমার পাশে ধপ্ করে বসে পড়ে বলল, “এক গুঁতোতেই ছবি হয়ে যাবে ভেবেছিলে? তোমাকে কি ছবি হতে দেব ভেবেছ? ছবি হবার আগে আমাকে জানিয়ে যাবে না সেটা হতে দেব কেন?”
আমতা আমতা করে বললাম, “তোমাকে কি জানিয়ে যেতে হবে গো?”
আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে লালি জবাব দিল, “আমি কবে থেকে বুনন পটিয়সী হলাম মরার আগে সেকথা বলে যাবে না তুমি? উল এবং উলকাঁটা নিয়ে আমাকে কবে বসতে দেখেছ শুনি? অবশ্য আমাকে যে হাতে উলকাঁটা তুলে নিতে দেখেছ সেবিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। এবার বল দিকি, উল এবং উলকাঁটা দিয়ে বুনে তোমাকে কী এমন মহার্ঘ বস্তু উপহার দিয়েছি যে, আমাকে বুনন পটিয়সী ভেবে নিতে এতটুকুও কষ্ট হল না তোমার?”
মিনমিন করে লালিকে বললাম, “গেল বছর নতুন একটা উলের মাফলার উপহার দিয়ে বলেছিলে না, ‘আমাদের পনেরোতম বিবাহবার্ষিকীতে এই মাফলারটা বুনে উপহার দিলাম তোমাকে?’ তাতেই বুঝে গিয়েছি যে, উলকাঁটা দিয়ে উল বোনার এলেম আছে তোমার।”
লালি অমনি খড়খড়ে গলায় বলে উঠল, “ওরে আমার কোথাকার কানেখাটো বুদ্ধুরাম এলেন! ‘বুনে উপহার দিলাম‘ নাকি ‘কিনে উপহার দিলাম’ বলেছিলাম তোমাকে?”
এবার চিন্তিত মুখে বললাম, “যতদূর মনে পড়ছে, আমি কিন্তু তোমাকে ‘বুনে উপহার দিলাম’ বলতে শুনেছি।”
লালি এবারও খড়খড়ে গলায় বলল, “তাই নাকি চাঁদু? আরও একবার ভাল করে ভেবে বলো দিকি, আমি ঠিক কি বলেছিলাম তোমাকে? যদি বলতে পার তো ভাল নইলে…।”
লালি বাকী কথা বলে শেষ না করে আমার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাল জবাবের আশায়। লালিকে অমন করে তাকাতে দেখেই আমার পিলে চমকে গেল। লালির ওই ‘নইলে’ শুনে শীতকাল নিয়ে ছোটগল্প লেখার ইচ্ছেটাও উবে গেল আমার মন থেকে। সর্বনাশ করেছে! ঠিক কি বলেছিল সেকথা মনে না করতে পারলে লালি কী বরাবরের মত আজও উলের বদলে আমাকেই উলকাঁটা দিয়ে বুনে থুড়ি ধুনে দেবে? নাকি ধুনে দেবার জন্য অস্ত্র হিসেবে অন্য কোন অস্ত্র হাতে তুলে নেবে? এই বাড়িতে অমন বস্তুরও অভাব নেই। ছেলের ক্রিকেট ব্যাট বা উইকেট, মেয়ের র্যাকেটের হাতল, হাতপাখার ডাঁটি… ইত্যাদি ইত্যাদি প্রচুর উপকরণই তো লালির অস্ত্রভাণ্ডারে মজুত রয়েছে।
শত চেষ্টা করেও মাফলার ‘বুনে দিয়েছে’ না ‘কিনে দিয়েছে’ বলেছিল সেকথা মনে করতে না পারলেও কোন না কোন অজুহাতে আমাকে যে মাঝেমাঝেই উলকাঁটা দিয়ে বেশ করে ধুনে দেয় সেকথা শরীরের এখানে সেখানে গজিয়ে ওঠা কালশিটের দাগগুলো মনে করিয়ে দিতেই আমার গোটা শরীর ব্যথায় টনটন করে উঠল। আমাকে ভাবনায় ডুবে থাকতে দেখে লালি ঝঙ্কার দিয়ে উঠল, “কি হলো চাঁদু, কিছু মনে পড়েছে তোমার? নাকি আমাকেই মনে করিয়ে দিতে হবে?”
শুনেই আঁতকে উঠে বললাম, “নাহ্ না-আ-আ-আ, মানে…”
আমাকে কথার মাঝখানেই চুপ করিয়ে দিয়ে লালি বলল, “না মানে? যদি মনে করতে পার তো ভাল নইলে আজ কিন্তু অনেক দুঃখ লেখা হতে থাকবে তোমার ওই ভাঁজ পড়া রুলটানা দু’আঙ্গুলে কপালে।”
লালির কথায় হাসি চাপতে না পেরে হাহা করে হাসতে হাসতে বললাম, “আমার কপালে দুঃখ লিখবে তুমি? তাহলেই হয়েছে। হাহাহা…।”
আমার হাসির জবাবে লালি এমন কটমট করে তাকাল যে, তাতেই বুকে জমে থাকা সব সাহস নিমেষে বুক থেকে উবে গেল। মুখের হাসিটুকুও মুছে গেল তার ওই দৃষ্টির যাদুতে। ভয়ভীত চোখে লালির দিকে তাকিয়ে কোনমতে বললাম, “আহা লালি, খামোখা চটছ কেন? তুমি যে আজও লিখতে-পড়তে শেখো নি সেকথা নিজেই আমাকে বলেছ। তাই না তোমাকে অমন কথা শোনানোর সাহস দেখাতে পেরেছি। হাহাহা… যে এই জীবনে ‘দ’-ও লিখতে শেখে নি সে কেমন করে আমার কপালে দুঃখ লিখবে শুনি?”
লালি এবার অদ্ভুত চোখে তাকাল আমার দিকে। লক্ষ্য করলাম, লালির রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখটা এক মুহূর্তের জন্য ব্যথায় নীল হয়ে গিয়েছিল। লালি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে আবার স্বমুর্তি ধারণ করল, “দেখবে লিখতে পারি কিনা? দেখতে চাও তুমি? বেশ, তহলে আজই তোমাকে লিখে দেখাচ্ছি আমি।”
আমার বুকে ভয়ের ঝরনাধারা নামিয়ে দিয়ে লালি পা দাপাতে দাপাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। লালিকে অমন করে চলে যেতে দেখে আমার বুকের ধুকপুকুনি শতগুণ বেড়ে গেল। গত পরশুর মত লালি আজও কী আমাকে ধুনে দেবার ব্যবস্থা করতে গিয়েছে? সেদিন উলকাঁটা দিয়ে ধুনে দিয়েছিল। আজও কী ওই একই বস্তু দিয়ে ধুনে দেবে ঠিক করেছে? নাকি নতুন কোন হাতিয়ার জোগাড় করে আনতে গেল? এর বেশী আর ভাবতে না পেরে লালির ফিরে আসার অপেক্ষায় পিঠ শক্ত করে পেতে রেখে দু’চোখ বন্ধ করে থাকলাম।
সেদিন তুফানি লালির ঝড়ঝাপটার সামনে পড়ে গিয়ে ‘বুনে দিয়েছিল’ না ‘কিনে দিয়েছিল’ সেই ব্যাপারটা মাথায় ঢুকিয়ে নিয়েছি। দেখতে দেখতে ক্যালেন্ডারের পাতা জানান দিল দুর্গাপুজোর সময় হল। দুর্গাপুজো মানেই অফিসের বোনাস, অফিসের পর লালিকে নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে ছেলেমেয়েদের নতুন নতুন পোশাক-জুতো ইত্যাদি কেনাকাটা করার সঙ্গে সঙ্গে পাড়া বেপাড়ার অত্যুৎসাহী যুবকদের চাঁদার বিল নিয়ে গৃহস্থদের উত্যক্ত করা… ইত্যাদি ইত্যাদির সময় হয়ে এল।
বোনাসের টাকা হাতে পাবার পর লালির সঙ্গে পুজোর বাজার করতে বেরোতে হয়েছে।কেনাকাটার শেষে কেনাকাটার হিসেব মেলাতে গিয়ে দেখি বোনাসের সঙ্গে মাসমাহিনার টাকাও গলে গিয়েছে আমার পকেট থেকে। সেই থেকে বুনন থুড়ি ধুনন পটীয়সী লালির ভয়ে নিজের দুঃখের কথা কাউকে বলতে পারার উপায় নেই জেনে মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছি। পুজোর দিনগুলোয় ছেলেমেয়ে এবং লালির মুখে হাসি ফুটে থাকলেও আমার মুখে আজও অমাবস্যার রাত ঝুলে আছে।
দেখতে দেখতে যাপিত জীবনে আরও একটা শীতকাল চলে এল। ভুলেও শীতকাল নিয়ে কিছু লেখার সাহস পেলাম না। কিন্তু কথায় আছে না, ‘অভাগা যেথানে যায় সাগরও শুকিয়ে যায়? আমার যে সেই হালই হয়েছে। লালির উলকাঁটা নিয়ে ধুননের প্রকোপ কিছুতেই নিজেকে রক্ষা করতে পারছি না। পরিণামে যা যা ঘটার সবই ঘটে চলেছে আমার যাপিত জীবনে।
আজ বিকেলে এক বাল্যবন্ধু দেখা করতে এসে আমার মুখ দেখে সন্দেহ প্রকাশ না করে থাকতে পারল না, “কিছু কী ঘটেছে তোমার সঙ্গে? মনে দুঃখ পুষে না রেখে আমাকে খুলে বলতে পার। তাতে তোমার দুঃখ কিছুটা হলেও লাঘব হবে।”
বন্ধুর পীড়াপীড়িতে অবশেষে মুখ খুলতেই হল আমাকে, “আজ অফিস ছুটি ছিল। বিকেলে চোখেমুখে জল দিয়ে এসে সবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছি এমন সময় ডোরবেল বেজে উঠল। চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখি দরজার বাইরে পাড়ারই গুটিকতক ষণ্ডামার্কা যুবক দাঁড়িয়ে আছে। ওদের মধ্যে থেকে এক যুবক দেঁতো হেসে বলল, চাঁদাটা দিন দাদা। আমি অবাক হয়ে বললাম, পুজোর মাস তো কবেই উৎরে গিয়েছে! এই শীতকালে আর কিসের চাঁদা চাইছ তোমরা? তখন অন্য একটি যুবক দেঁতো হেসে বলল, আমরা এট্টু ফুত্তিটুত্তি… ছাড়ুন দাদা, দু’হাজারের একটা পাত্তি। আমি রেগে গিয়ে ‘হবে না’ বলতে যেতেই বাড়ির ভিতর থেকে লালির তীক্ষ্ণ গলা ভেসে এল, একবার ভিতরে এসে শুনে যাও তুমি। লালির কাছে যেতেই আমাকে চাপা গলায় ধমক দিয়ে বলল, তোমাকে হাড়ে হাড়ে চিনি বলেই বলছি, জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে মোটেই বিবাদ করবে না তুমি। ওরা যা চাইছে দিয়ে দাও তুমি।”
এতটা বলে আমি চুপ করে গেলাম দেখে বন্ধুটি উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল, “দিলে দু’হাজারের একটা পাত্তি?”
জবাব না দিয়ে বন্ধুর দিকে ছলছল চোখে তাকালাম। এই চোখ দেখে বন্ধু যা বোঝার নিজেই বুঝে নিক।






Leave a Reply