শিকড়ঃ ১৮ জুলাই

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক পিয়াস মজিদের সাম্পতিক যুক্তরাজ্য সফর উপলক্ষে কবিতা পরিষদের উদ্যোগে আগামী সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, পূর্ব লন্ডনের বাংলাটাউনস্থ দর্পণ মিডি্যায় এক আলোচনা ও সাহিত্যআড্ডার আয়োজন করা হয়েছে। একান্ত ব্যক্তিগত ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর প্রথম যুক্তরাজ্য সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং প্রবাসের কবি–সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ করে দিতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

কবিতা পরিষদের কর্ণধার কবি ইকবাল হোসেন বুলবুল জানান, আয়োজনটি একান্তই স্বল্প পরিসরে ও অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে সম্পন্ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “পিয়াস মজিদের এটি প্রথম যুক্তরাজ্য সফর। এই সফরের মধ্য দিয়ে তাঁকে বিলেতের কবি ও সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি সুযোগ করে দেওয়া এবং একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে বাংলা সাহিত্যচর্চার শতবর্ষী ঐতিহ্য সম্পর্কে অন্তত কিছুটা ধারণা দেওয়াই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য।”

অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাহিত্যপ্রেমীরা উপস্থিত থাকবেন। আলোচনা পর্বে পিয়াস মজিদের সাহিত্যকর্ম, তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধের স্বাতন্ত্র্য, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর চিন্তা এবং সমকালীন সাহিত্য-ভাবনার বিভিন্ন দিক উঠে আসবে। পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে কবিতা পাঠ ও মুক্ত আলাপচারিতা।

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের বহুমাত্রিক পরিসরে কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক পিয়াস মজিদ এক স্বতন্ত্র উপস্থিতি। কবিতা, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, সাক্ষাৎকার ও মুক্তগদ্যের বিচিত্র ভুবনে তাঁর বিচরণ তাঁকে সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মননশীল লেখকে পরিণত করেছে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার নানা অনুষঙ্গ নিয়ে তাঁর গভীর অনুসন্ধিৎসা বাংলা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

১৯৮৪ সালের ২১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন পিয়াস মজিদ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। বর্তমানে তিনি বাংলা একাডেমির জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীকালে তাঁকে একজন বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কবি হিসেবে পিয়াস মজিদের স্বর স্বতন্ত্র ও সংবেদনশীল। তাঁর কবিতায় ইতিহাসচেতনা, নাগরিক জীবনের সংকট, প্রেম, স্মৃতি এবং অস্তিত্ববোধের নানা অনুষঙ্গ একত্রে ধরা পড়ে। ভাষা ও চিত্রকল্পের অভিনব ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি সমকালীন বাংলা কবিতায় নিজস্ব এক ভুবন নির্মাণ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য; নাচপ্রতিমার লাশ, মারবেল ফলের মওসুম, গোধূলিগুচ্ছ, কুয়াশা ক্যাফে, কবিকে নিয়ে কবিতা, প্রেমের কবিতা এবং নিঝুম মল্লার।

প্রাবন্ধিক হিসেবেও পিয়াস মজিদ সমানভাবে সমাদৃত। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মনীষীদের জীবন ও কর্ম নিয়ে তাঁর প্রবন্ধে গবেষণার গভীরতা ও সাহিত্যিক গদ্যের সৌন্দর্য মিলেমিশে একাকার হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে করুণ মাল্যবান ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কবিতাজীবনী, কামু মার্কেস ইলিয়াস ও অন্যান্য, মনীষার মুখরেখা, আমার রবি আমার ইন্দ্র এবং পড়ার টেবিল থেকে।

সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পিয়াস মজিদ ২০১২ সালে এইচএসবিসি–কালি ও কলম সাহিত্য পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সৃজনশীলতা ও মননশীলতার এক অনন্য সম্মিলন, যেখানে কবিতা ও প্রবন্ধ পরস্পরকে সমৃদ্ধ করেছে।
কমর্মজীবনে তিনি বাংলা একাডেমির সহপরিচালক হিসাবে নিয়োজিত আছেন।

কবিতা পরিষদের এই আয়োজন স্বদেশ ও প্রবাসের সাহিত্যিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে এবং বিলেতে বাংলা সাহিত্যচর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে এক নতুন সংলাপের সূচনা করবে বলে আয়োজকদের প্রত্যাশা।

শিকড়ের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের আয়োজক কবি ইকবাল হোসেন বুলবুল ও কবি পিয়াস মজিদকে অভিনন্দন।


পিয়াস মজিদের একগুচ্ছ কবিতা

ভাষায় খচিত

স্বপ্নে শুনলাম
আশপাশে কেউ কথা বলছিল
আঞ্চলিক ভাষায়,
কয়েকজন পুরোপুরি প্রমিত বাংলায়,
অনেকে অচেনা বিদেশি বাক্যে।
আর আমাকে ধরল
ভাষানিরপেক্ষ বোবায়।
স্বপ্ন ভাঙলে দেখলাম
তোমার পাশের সিটে
এলেবেলে বসে আছি;
ভাষাশিক্ষার দুর্গম ক্লাসে।


এমন

ঝরে গেছি
খাঁ খাঁ চরাচরে
হাসতে হাসতে
কুড়িয়ে নাও আমাকে
তারপর ডি-কোড করো
আমার পর্যুদস্ত দশার ভাষার
চোরাচালান চলুক
বাংলা থেকে ইড্ডিশ কবিতায়।
সে এক পৌষে
লালমনিরহাটে শোনা মিহি চার্চবেলে
প্রভুর সঙ্গে তোমার মহিমা মিশিয়ে
জুত করে এত বেঁচে আছি যে,
এখন চারপাশে মুকুলের মত্ত মওসুমে
কীভাবে ঝরে যাচ্ছি,
টেরই পাচ্ছি না।


অ্যাভারেজ গরমের কবিতা

গরমের ছুটিতে তোমার অন ডে-শরীর নিয়ে কোথায় যাবে, কী করবে; ভেবেছ কিছু অগাস্টিন? এমন গ্রীষ্মদিনে কারা দলে দলে মান্ডায় যায়, কারা নির্জনে সান্ডা খায়- তোমার কাছে নিশ্চয়ই আছে তার খবরাখবর। পরিবাগের দিকে তোমার রিক্সা ঢুকে গেলে গায়ে লাগতেও পারে হাওয়া, জল্লাদিনী-ছাওয়া। আর যারা খেতে ও কারখানাতে খাটছে ভূতের বেগার, ব্রাইটার সামার ডে-তে তুমি তাদের স্মরণে মনের আকাশে বানিও ফুলের পাহাড়। অগাস্টিন, তোমার যেসব প্রেমিকা গরম সহ্য করতে না পেরে চলে গেছে তুষারের দেশে, তাদের বরফ-হৃদয়ে মাঝেমধ্যে ডুব দিয়ে থেকো। দেখিও, প্রেম মরে গেল তার শীতল অবশেষ কতটা বাড়িয়ে তুলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন! এসি বাড়াও, এসি কমাও, এসিটা একটু বন্ধ করো, এসিটা আবার চালাও, এসিটাকে ফাকড আপ হতে দাও। কাঁচা আমের টকের মতো মিষ্টি একটা ব্যাপার বৈশাখি ভাবনার কেন্দ্রীয় প্রান্ত ছুঁয়ে থাকুক। অগাস্টিন, তোমার দিকে তারানা তাক করে আছে তীর; জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে এলোমেলো স্মৃতির মীড়ে আহিরভৈরবের ভিড়। তোমার ঘামে ভেজা বক্সারে প্রায়শই বাৎসায়ন ঘুরেফিরে। তুমি নির্বিকার লোকাল বাসে, জানলার পাশের সিটে বসে হোটেল-সমুখের গনগনে চুলায় পরোটার সঙ্গে ভাজা হতে হতে তোমার মহাকাব্যিক মন নিয়ে গরমাগরম একটা ম্যাক্সিম নামিয়ে ফেলার কথা ভাবছ নাকি, অগাস্টিন?


দশা

যাকে ভুলে যাওয়া ভালো,
তার চলে যাওয়ার রাস্তা আমি
বানান করে মুখস্থ করছি।


সূফি বুলভার্দ

কামকাননে ফুল ছড়ানো
প্রেম কুড়িয়ে নাও।
গান থই থই নদীতে
নাচের নৌকা চালাও।
টুটাফাটা আয়নায় জিন্দা তুমি দাঁড়াও,
নিজের অক্ষত লাশ নিজে দেখে যাও।
তোমাকে ভেবেই
গোপন মধুবন,
ফণাতোলা সাপেরও
নুয়ে আছে মন।


ভেজা বেতস

আবার আষাঢ়
মেঘে যার শুরু
বৃষ্টিতে শেষ নাই তার।
শুধু পানশালা
শুধু ভোজসভা!
কারা যেন
মল্লারের মাংস রান্না করছে;
আদিকাল থেকে
জ্বলতে থাকা
তোমার-আমার
চোখের জলের চুলায়।


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading